• Post author:
  • Reading time:1 mins read

ঢাকা শহরের প্রথম লাইব্রেরি কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই হয়তো নর্থব্রুক হল লাইব্রেরির কথা বলবেন। কিন্তু সঠিক জবাব হবে, রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিটি নর্থব্রুক হলের ১৩ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

১৫২ বছরের পুরনো এই লাইব্রেরিটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং পাঠকের অভাবে বইয়ের পাতায় জমেছে ধুলোর আস্তরণ।

কোভিড পরিস্থিতিতে অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। মাসের পর মাস লাইব্রেরিটি বন্ধ থাকার কারণে আগে যাও কিছু পাঠক ছিল, এখন তাও নেই। যদিও লাইব্রেরিটি চালু হয়েছে কিন্ত বেশিরভাগ সময়ই এটি বন্ধ থাকে। কেবলমাত্র পাঠক আসলে এটি খুলে দেয়া হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল। এটি পার হয়েই বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজ। আর এখানেই রয়েছে রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি। ব্রাহ্ম মন্দির নির্মাণের সময় তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক অভয় চন্দ্র দাস মন্দির ভবনে লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করেন।

অবশ্য পরবর্তীকালে লাইব্রেরির জন্য একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৮৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি এটি নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু কালক্রমে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় লাইব্রেরিটিকে সরিয়ে আবারো মন্দির ভবনে নিয়ে আসা হয়।

বর্তমানে এটিকে ব্রাহ্ম মন্দিরের দ্বিতীয় তলার একটি অংশে রাখা হয়েছে। কেউ লাইব্রেরিতে ঢুকতে চাইলে তাকে নড়বড়ে কাঠের পাটাতন আর অপ্রশস্ত খাড়া সিঁড়ি বেয়ে কষ্ট করে আসতে হবে। এমনকি পর্যাপ্ত আলোর অভাবে এখানে দিনের বেলায়ও সবকিছু ঠিকমত চোখে পড়ে না।

লাইব্রেরির প্রবেশ পথেই রয়েছে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি। এছাড়া কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জসীম উদদীন এবং সুফিয়া কামালের ছবিও দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। এমনকি বিশ্বের বড় বড় সব লাইব্রেরির ছবিও তাতে শোভা পাচ্ছে।

বর্তমানে এই লাইব্রেরিতে ৫ থেকে ৬শ’ বই রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মহাভারতের ২১ পর্ব, বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলী। এখানকার বেশিরভাগ বই ব্রাহ্ম ধর্ম সংক্রান্ত। রাজা রামমোহন, স্বামী বিবেকানন্দ রচনাবলী ছাড়াও সব ধর্মের পবিত্র গ্রন্থও রয়েছে।

এছাড়া বঙ্কিম, বিভূতি, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবালেরও কিছু বই রয়েছে। এই লাইব্রেরিতে বাংলা সাহিত্যের বহু রথী-মহারথীদের পা পড়েছে। ১৯২৬ সালে নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটি দেখতে এসেছিলেন। এছাড়া জ্ঞানতাপস এবং বহু ভাষাবিদ ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও এখানে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়েছেন।

এমনকি কবি বুদ্ধদেব বসু , প্রফেসর মোহাম্মদ আব্দুল হাই, কাজী মোতাহার হোসেন, বেগম সুফিয়া কামাল এবং কবি শামসুর রাহমানও প্রায়ই এই লাইব্রেরিতে আসতেন।

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে লাবণ্য গুপ্তর বিয়েও হয়েছিল এই ব্রাহ্ম মন্দিরে। কবির মা কুসুমকুমারী দেবীও রামমোহন রায় লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী আর্মি এই লাইব্রেরিতে ক্যাম্প করেছিল। এসময় শতাব্দী পুরনো সাময়িকী, বই, মূল্যবান নথি লুট এবং ধ্বংস করা হয়েছিল। এর আগে লাইব্রেরির সংগ্রহে ৩০ হাজারের মত বই ছিল।

এগুলোর মধ্যে কিছু দুর্লভ বইও ছিল।স্বাধীনতার পর লাইব্রেরিটি পুনরায় চালু করা হয়। কিন্তু এখান থেকেই এই লাইব্রেরির ভগ্ন দশা শুরু। দোতলা লাইব্রেরি ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। ভবন ধসে পড়ার আশংকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(রাজউক) ২০০৪ সালে এটি ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেয়।

২০০৫ সালে তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য এবং ট্রাস্টি প্রাণেশ সমাদ্দার হাইকোর্টে একটি রিট করেন। তিনি ঐতিহাসিক এই ভবনটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্তির আবেদন জানান। একই সময়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়েও এই দাবি জানিয়ে আরেকটি আবেদন করা হয়। ২০০৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জানায়, ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইনের আওতায় এই ভবনটিকে প্রাচীন স্থাপত্য হিসেবে গণ্য করা যায় না।

এছাড়া এটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণেরও যোগ্য নয়।একই বছরে তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন জানায়, ঢাকার ঐতিহাসিক, নান্দনিক ভবনের একটি তালিকা করেছে রাজউক। সেখানে স্থান পাওয়া ৯৩ টি ভবনের মধ্যে রামমোহন রায় লাইব্রেরিটিও রয়েছে। ফলে রাজউকের নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন ছাড়া তালিকাভুক্ত স্থাপনাগুলোর আংশিক বা সম্পূর্ণ অপসারণ, পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ করা যাবে না।

এদিকে ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক রণবীর পাল রবি জানান, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০০৪ সাল থেকে লাইব্রেরিটি বন্ধ ছিল। ১০ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৪ সালে মন্দির ভবনে এটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পাঠকের অভাবে এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘ঢাকা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষকরাই মূলত লাইব্রেরিতে আসেন।

সাধারণ পাঠকরা লাইব্রেরিতে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। বিশেষ করে করোনার পর পাঠকের সংখ্যা একদমই কমে গিয়েছে।‘ঢাকা শহরের প্রথম প্রতিষ্ঠিত এই লাইব্রেরিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে পাঠকদের আবারও এখানে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

সূত্র: ডেইলি স্টার

Leave a Reply