• Post author:
  • Reading time:1 mins read

মূল: হারুকি মুরাকামিঅনুবাদ: তানিয়া কামরুন নাহার

কোয়েঞ্জি স্টেশনে এসে দ্রুতগামী পাতাল ট্রেনে টেংগো উঠে পড়লো। ট্রেন পুরো খালি। কীভাবে আজ সারাদিন কাটাবে এখনো ভাবেনি সে। সে কোথা থেকে এসেছে, কী করেছে কিংবা করেনি, শুধু সে-ই জানে। দশটা বাজে, গ্রীষ্মের একটি সকাল। সূর্য গরম হচ্ছে। ট্রেন পার হয়ে যাচ্ছে…শিনজুকু, ইয়োৎসুয়া, ওছানোমিজু। সব শেষে পৌঁছলো টোকিও সেন্ট্রাল স্টেশনে। সবাই নেমে গেলো। টেংগো নিজের মতো হাঁটতে লাগলো। একটা বেঞ্চে বসে সে ভাবতে লাগলো, কোথায় যাওয়া যেতে পারে। ‘চাইলে যেখানে খুশি আমি যেতে পারি,’ মনে মনে ভাবলো। ‘দেখে মনে হচ্ছে আজকের দিনটায় আরও গরম পড়বে। সমুদ্রের দিকে যাওয়া যায়।’ হাত তুলে সে প্লাটফর্ম গাইডের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। তখনই সে বুঝতে পারলো এতক্ষণ ধরে সে কী করছিলো।

সে কয়েকবার চেষ্টা করেছিলো তার হাত নাড়াতে। কিন্তু  হঠাৎ তার মনে হলো, কোথাও যাওয়া উচিত হবে না। সম্ভবতো অবচেতন মনে সে ওই মুহূর্তে কোয়েঞ্জির ট্রেনে উঠে পড়েছিলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ালো। তারপর স্টেশনে কর্মরত একজনকে জিজ্ঞেস করলো চিকুরাতে সবচেয়ে দ্রুতো কীভাবে যাওয়া যায়। ট্রেনের সময়সূচির মোটা বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলো লোকটা। তাতেয়ামার দিকে একটা বিশেষ ট্রেন সাড়ে এগারোটার সময় যাবে, সে ওটাতে যেতে পারে। লোকাল ট্রেন হওয়াতে সে চিকুরাতে দুপুর দুইটার দিকেই পৌঁছে যেতে পারবে। টেংগো এরপর টোকিও-চিকুরা চক্রাকার ট্রেনের টিকিট কিনে নিলো। তারপর একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভাত, তরকারি ও সালাদের অর্ডার করলো।

বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া তার জন্য বেশ বিরক্তিকর। সে এই লোকটিকে বিশেষ পছন্দ করে না। তেমনি তার বাবাও তাকে কখনো তেমন ভালোবাসেনি। তার বাবা চার বছর আগে অবসর নিয়েছেন। এর পরপরই চিকুরাতে কগনিটিভ ডিস অর্ডারের রোগীদের জন্য বিশেষায়িত একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। টেংগো তাকে দুই বারের বেশি দেখতে যায়নি। প্রথমবার গিয়েছিলো হাসপাতালের সুবিধার জন্য। বাবার একমাত্র আত্মীয় হিসেবে কিছু কাজের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তাকে যেতে হয়েছিলো। দ্বিতীয়বার গিয়েছিলো প্রশাসনিক কিছু কাজের জন্য। ব্যাস, এই দুই বার-ই।

সাগর তীরে অনেকখানি জায়গা জুড়ে হাসপাতালটি বানানো হয়েছে। কাঠের তৈরি অভিজাত ভবনের সঙ্গে এখন তিনতলা পর্যন্ত কঠিন কনক্রিটের ভবনের একটা অদ্ভুত সংমিশ্রণের একটা হাসপাতাল। এখানকার হাওয়া একদম নির্মল আর বাইরে সাগরের ঢেউগুলোও বেশ শান্ত। বাগানের প্রান্তে একটা পাইনের বন রয়েছে, যা সাগরের ঝড়ো বাতাসের গতিকে কমিয়ে দেয়। হাসপাতালের সেবার মান খুবই ভালো। স্বাস্থ্য বিমা, অবসরের পর পাওয়া বোনাস, সঞ্চয় ও পেনশন দিয়ে টেংগোর বাবা এখানেই সম্ভবত তার বাকিটা জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবেন। উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো উত্তরাধিকার নেই। এখানে অন্তত তার যত্নটা ভালো হবে। এজন্যই টেংগো ভীষণ কৃতজ্ঞ। তার থেকে কিছু নেয়া বা কিছু দেয়ার ইচ্ছে টেংগোর নেই। তারা দুজন আলাদা সত্ত্বা, আলাদা ভাবে এসেছেন, যাবেনও আলাদাভাবে, সম্পূর্ণভাবে আলাদা জায়াগায়। কোনো ক্রমে দুজন জীবনের কয়েকটা বছর একত্রে কাটিয়েছেন-এইটুকুই। ব্যাপারটা এভাবে সামনে এলো, যা লজ্জার, কিন্তু এজন্য টেংগোর কিছুই করার নেই।

টেংগো চেকের মাধ্যমে টাকা দিলো। তারপর তাতেয়ামার ট্রেনের জন্য প্লাটফর্মে অপেক্ষা করতে লাগলো। একটি সুখী সুখী চেহারার পরিবার তার সহযাত্রী, যারা সৈকতে কয়েকদিন বেড়ানোর জন্য যাচ্ছে।

বেশিরভাগ মানুষই মনে করে রবিবারটা বিশ্রামের জন্য বুঝি। ছোটোবেলা থেকে এখন পর্যন্ত টেংগো কখনো রবিবার দিনটিকে উপভোগ করতে পারেনি। তার কাছে রবিবারটা হলো চাঁদের কুৎসিত রূপ, যা শুধু অন্ধকার দিকটাই দেখায়। সপ্তাহ শেষে ছুটির দিন এলে তার পুরো শরীর জুড়ে আলসেমি আর ব্যথা শুরু হয়ে যায়। আর খাওয়ার ইচ্ছা একেবারেই গায়েব। সে প্রার্থনাও করে, যেন রবিবার আর না আসে। কিন্তু তার প্রার্থনা কেউ শোনে না।

টেংগোর শৈশবে তার বাবা ছিলেন জাপানের আধা সরকারি রেডিও ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ক- এনএইচকে’র গ্রাহক ফি সংগ্রাহক। এমনকি প্রতি রবিবারে তিনি টেংগোকেও তার সঙ্গে নিতেন গ্রাহকদের দরজায় দরজায় গিয়ে টাকা আদায়ের জন্য। কিন্ডারগার্টেনে পড়ার সময় থেকেই টেংগো এই কাজ শুরু করেছিলো। স্কুলের পঞ্চম গ্রেড পড়ার সময় পর্যন্ত একটা ছুটির দিনও সে মাফ পায়নি। এনএইচকে’র অন্য ফি সংগ্রাহকেরাও রবিবারে কাজ করতো কিনা, এ ব্যাপারে তার কোনো ধারণা নেই। তবে যদ্দুর তার মনে পড়ে, তার বাবা সব সময় এ কাজ করতেন। তার বাবা অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি উদ্যমী হয়ে কাজ করতেন। কারণ, সপ্তাহের অন্যান্য দিনের বদলে রবিবারেই সহজে মানুষদেরকে ঘরে পাওয়া যেতো।

টেংগোর বাবা অবশ্য কিছু উদ্দেশ্য নিয়েই তার সঙ্গে ছেলেকে নিয়ে যেতেন। একটা কারণ হচ্ছে, ছেলেকে একা ঘরে রেখে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সপ্তাহের অন্য দিনগুলো ও শনিবারে  টেংগো স্কুল বা ডে কেয়ারে থাকতে পারতো। কিন্তু রবিবারে এসব বন্ধ থাকতো। আরেকটা কারণ যেটা গুরুত্বপূর্ণ, টেংগোর বাবা বলতেন যে, একজন বাবা কী ধরনের কাজ করেন তার সন্তানের তা জানা উচিত। ছোটোবেলা থেকেই একটি শিশুর জানা দরকার, কোন কাজের মাধ্যমে তাকে সাহায্য করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সে শ্রমের মর্যাদাও দিতে শিখবে। টেংগোর বাবাকে তার বাবার খামারে কাজের জন্য পাঠানো হয়েছিলো। শেষে তিনি এতই বৃদ্ধ হয়ে গেলেন যে অন্যান্য দিনের মতো রবিবারটাকে আলাদা করে বুঝতে পারতেন না। সবচেয়ে ব্যস্ত সময়েও টেংগোকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতেন, এমনই একটা জীবন পেয়েছে সে।

টেংগোর বাবার তৃতীয় ও শেষ কারণটা সবচেয়ে হিসেবি। আর ওটাই টেংগোর মনে গভীর একটা আতঙ্কের ছাপ ফেলে দিয়েছে। এমন একটা বাচ্চা থাকায় টেংগোর বাবার কাজটা সহজ হয়েছে। সমাজে এমন কিছু লোক লোক আছে যারা ঠিক করে রাখে, তাদের বাচ্চারা নিজেই টাকা আয় করতে পারলে ওদেরকে টাকা দেয়া বন্ধ করে দেবেন। তেমনি, টেংগোর বাবা রবিবারে সবচেয়ে কঠিন রাস্তাটা বেছে নিতেন। টেংগো সকাল থেকেই টের পেতো যে, তাকে কী করতে হবে। আর এসব করতে তার ভালো লাগতো না। সে এটাও বুঝতে পারতো যে, খুব বুদ্ধি করে তাকে চলতে হবে। বাবাকে খুশি রাখতে হবে। বাবাকে খুশি করতে পারলে, সেদিন তিনি ভালো ব্যবহার করতেন। নিজেকে তার মনে হতো, যেন একটা প্রশিক্ষিত বানর।

টেংগোর একটা সান্তনা ছিলো। বাবার পিটুনিগুলো লোকচক্ষুর আড়ালেই হতো। ইচিকাওয়া শহরের বাইরে মফস্বল একটি এলাকায় তারা থাকতো। আর তার বাবা শহরের কেন্দ্রে ফি সংগ্রহ করতে যেতেন। অন্তত তার স্কুলের সহপাঠীদের বাসায় ফি সংগ্রহ করতে তারা যেতো না। ফলে বড় বাঁচা বাঁচতো টেংগো। তবে মাঝেমধ্যে শহরের মার্কেটের আশেপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তার সহপাঠিদেরকে রাস্তায় দেখতে পেতো। এরকম হলেই সে তার বাবার পেছনে লুকিয়ে পড়তো যেন তারা তাকে দেখতে না পায়।

টাউন অব ক্যাট গল্পের লেখক হারুকি মুরাকামি।

সোমবার স্কুলে তার বন্ধুরা খুশিতে নানান গল্প করতো।  আগের দিন কোথায় তারা বেড়াতে গিয়েছিলো, কী করে সারাদিন কাটিয়েছে, সেসব নিয়ে। তারা শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানাতে ঘুরতে গিয়েছিলো কিংবা কেউ বেসবল খেলা দেখতে। গ্রীষ্মে তারা সাঁতার কাটতে যেতো আর শীতে স্কি করতে। কিন্তু টেংগোর গল্প করার মতো কোনো কিছু ছিলো না। রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পুরোটা সময় সে তার বাবার সঙ্গে অপরিচিত সব মানুষের বাসার দরজায় কলিংবেল বাজাতো। মাথা নতো করে অভিবাদন জানাতো। তারপর তাদের থেকে টাকা সংগ্রহ করে দরজা থেকে ফিরে আসতো। যদি কেউ টাকা না দিতো, তার বাবা ভালো ভালো কথা বলে ভোলাতো কিংবা হুমকি দিতেন। ভালো কথায় কেউ যদি টাকা দিতে না চাইতো, তার বাবা চিল্লানো শুরু করতেন। কখনো কখনো রাস্তার কুকুরদের মতো অভিশাপ দিতেন। এসব কথা তো বন্ধুদের সাথে টেংগো বলতে পারে না। মধ্যবিত্ত সমাজের কলার উঁচু বাবুগিরি করা লোকদের ছেলেমেয়েদের সামনে টেংগোর নিজেকে এক ধরনের এলিয়েনের মতো মনে হতো। আলাদা এক দুনিয়ায় আলাদা এক জীবন তার। ভাগ্যক্রমে তার ফলাফল ছিলো অসাধারণ, এমন কি অ্যাথলেটেও ভালো ছিলো। এলিয়েনের মতো হলেও অচ্ছুত ছিলো না। বরং বেশিরভাগ সময় সে সম্মানিত হতো। কোনো কোনো ছেলে তাকে তাদের বাসায় বা অন্য কোথাও বেড়াতে যেতে বলতো মাঝে মাঝে। কিন্তু মাথা নেড়ে তাদেরকে নিরাশ করতো সে। তারপর থেকে তাকে আর কেউ কিছু বলতো না। কঠিন টোহোকু অঞ্চলের এক কৃষক পরিবারের তৃতীয় ছেলে সন্তান ছিলেন টেংগোর বাবা। তাকে দ্রুতই ঘর ছাড়তে হয়েছিলো। মাঞ্চুরিয়া পার হয়ে ভিটেমাটিতে যেতে, সেই উনিশ শ ত্রিশে। বিস্তৃত ও ভালো জমিগুলোকে মাঞ্চুরিয়াকে সরকার স্বর্গ হিসেবে ঘোষণা দিলো। কিন্তু তিনি তা বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি জানতেন যে, ‘স্বর্গ’ যেখানে সেখানে পাওয়া যায় না। তিনি দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত মানুষ ছিলেন। বাড়িতে থাকলে অনাহারে একটা জীবন কাটাতে হতো। এখানে অন্তত তা হচ্ছে না। এতে তিনি খুশি। মাঞ্চুরিয়াতে তিনি ও তার মতো অন্যান্য ভিটে প্রাপ্তদের খামারের জন্য দরকারি জিনিস ও ছোটো অস্ত্র দেওয়া হলো। এরপর সবাই একসঙ্গে জমি চাষ শুরু করলো। পাথুরে জমি ছিলো অনুর্বর। শীতে সব কিছু জমে ছিলো। কখনো কখনো রাস্তার কুকুরগুলোকেই তারা খেতো। সরকার শুরুর অল্প কিছু বছর তাদেরকে বরাদ্দ দিয়েছিলো। ১৯৪৫ এর আগস্টে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন মাঞ্চুরিয়া পুরোপুরি দখল করে নিলো, তখন তারা স্থির হতে পারলো। টেংগোর বাবা এরকমই চেয়েছিলেন। তার প্রতি প্রসন্ন কিছু অফিসার ছিলো। তাদের মারফত আসন্ন পরিস্থিতির গোপন খবর পেয়েছিলেন। সোভিয়েতরা সীমান্ত পেরিয়ে গেছে, এ খবর পাওয়ার মুহূর্তেই তিনি ঘোড়ায় করে পাহাড় পার হলেন। দ্রুত লোকাল ট্রেন স্টেশনে গিয়ে সেকেন্ড-টু- লাস্ট ট্রেনে উঠে পড়লেন ডা-লিয়েন আসার জন্য। খামারের সব লোকের মধ্যে তিনিই একমাত্র বছরের শেষে জাপানে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। যুদ্ধ শেষে, টেংগোর বাবা টোকিওতে চলে আসেন। কাঠমিস্ত্রির কাজ শেখার চেষ্টা করলেও তাতে তার তেমন আয় হচ্ছিল না। তাই কালোবাজারি করতে থাকেন। আসাকুসাতে মদের দোকানের ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতে থাকলেন। ওই সময়ে একদিন মাঞ্চুরিয়াতে পরিচয় হওয়া একজন পরিচিত বন্ধু কর্মকর্তার সঙ্গে ধাক্কা খান। ওই ব্যক্তি জানতে পারলেন, টেংগোর বাবা একটা ভালো কাজ খুঁজছে এবং কঠিন সময় পার করছে। তিনি তখন এনএইচকে’র গ্রাহক বিভাগের এক পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে আলাপের প্রস্তাব টেংগোর বাবাকে দেন। টেংগোর বাবা খুশিমনে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। টেংগোর বাবা এনএইচকে সম্পর্কে কিছুই জানতেন ন। শুধু স্থায়ী একটা রোজগারের পথ তার দরকার ছিলো।

এনএইচকে’তে টেংগোর বাবা তার কাজগুলো ভীষণ দায়িত্ব নিয়ে পালন করতেন। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো, শত বিরূপ পরিস্থিতিতেও হাল ছাড়তেন না। জন্মের পর হাতে গোনা কয়েকবার মাত্র যে ব্যক্তি ভরপেট খেতে পেয়েছে, এনএইচকে’র ফি সংগ্রহ করার কাজ তার জন্য এমন কোনো কষ্টের বিষয় নয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিশাপও যদি তার দিকে ছুড়ে দেয়া হয়, সেটাও তার জন্য কিছুই নয়। বড় কথা হচ্ছে, একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে, সবচেয়ে নিচু পদে কাজ করতে পারাটাও তার জন্য মন্দ না। তার কাজের দক্ষতা ও আচরণ এতো ভালো ছিলো যে, এক বছর পরেই কমিশন সংগ্রাহক থেকে একবারে পুরোদস্তুর স্থায়ী কর্মী হিসেবে র‍্যাংক পেয়ে গেলেন। এমন আর কখনো এনএইচকে’তে শোনা যায়নি। দ্রুতই তিনি করপোরেশনের মালিকানাধীন অ্যাপার্টমেন্টে উঠে গেলেন এবং কোম্পানির হেলথ কেয়ার প্ল্যানেও যুক্ত হলেন। সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এটাই ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় উত্থান, যা তিনি এর আগে কখনো জীবনে পাননি।

ছোট্ট টেংগোকে তার বাবা কখনো ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে কিংবা বই পড়ে শুনিয়ে ঘুম পাড়াননি। বরং তার ছোটোবেলার সত্যিকারের ঘটনাগুলো শোনাতেন। ভালোই গল্প বলতেন তিনি। তার ছেলেবেলা বা তারুণ্যের গল্পের ঠিক কোনো মানে থাকতো না, কিন্তু শুনতে বেশ লাগতো। খুবই মজার ছিলো গল্পগুলো, আবার কখনো ভয়ঙ্কর। যদি কোনো জীবন রঙ আর বৈচিত্র দিয়ে মাপার উপায় থাকতো, তবে টেংগো বাবার জীবনই সমৃদ্ধ হতো, সম্ভবতো। কিন্তু এনএইচকে’তে কাজ শুরু করার পরের গল্পগুলো সেই প্রাণশক্তি হারাতে লাগলো। একজন নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হলো। তাকে বিয়ে করলেন। একটা বাচ্চা হলো- সে টেংগো। টেংগো জন্মের অল্প কয়েক মাসে পরেই তার মা অসুস্থ হয়ে মারা যান। তার বাবা একাই তাকে লালন পালন করতেন, এনএইচকে’তে সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করেও। এখানেই গল্প শেষ।

কীভাবে তিনি টেংগোর মায়ের সঙ্গে পরিচিত হলেন, বিয়ে করলেন, তিনি কেমন নারী ছিলেন, কীভাবে মারা গেলেন, খুব সহজেই মারা গেলেন নাকি অনেক ভুগে—টেংগোর বাবা তাকে বলতে গেলে কিছুই বলেনি। যদি টেংগো কখনো জিজ্ঞেস করতো, তিনি এড়িয়ে যেতেন। বেশিরভাগ সময়, এমন সব প্রশ্ন তার মেজাজ খারাপ করে দিতো। টেংগোর মায়ের একটা ছবিও তিনি রাখেননি।

টেংগো তার বাবার গল্পগুলো বিশ্বাস করতো না। তার মনে হতো, তার জন্মের মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই তিনি মারা যাননি। মাকে নিয়ে তার একমাত্র স্মৃতি, সে বছর দেড়েকের তখন। তার মা খাটের পাশে এক লোককে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আর সে লোক তার বাবা না। তার মা ব্লাউজ খুলে মাটিতে ফেলে দিয়েছেন। আর ওই লোক, যে তার বাবা নয়, তার মায়ের স্তন চুষছিলেন। টেংগো তাদের পাশেই শুয়ে ঘুমাচ্ছিলো। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিলো। কিন্তু একইসঙ্গে, সে ঘুমাচ্ছিলো না। সে তার মাকে দেখছিলো।

Leave a Reply