• Post author:
  • Reading time:3 mins read

জাপানের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির ‘Hear the Wind Sing’ এর ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। সে সাক্ষাৎকারের প্রথম অংশ…

মুরাকামি: ঠিক ৪০ বছর আগে নতুন লেখক হিসেবে মে মাসে আমি গুনজো পুরস্কার পাই। অনুষ্ঠানের তারিখ ছিলো ৮ মে। টোকিওর শিমবাসিতে দাই-ইচি হোটেলে অনুষ্ঠানটা হয়।

প্রশ্নকারী: আপনি বিগত ৪০ বছর ধরে পেশাদার লেখক। এমন কী নাৎসুমি সসেকির লেখকজীবন মাত্র ১০ বছর। দারুণ একটা অর্জন। আপনি কী মনে করেন?

মুরাকামি: প্রত্যেক ১০ বছরে আমি মোড় নিই। প্রতিটি মোড়ে আমার লেখার স্টাইল ও গল্পের ধরন বদলে যায়। লেখতে আমার কখনো বিরক্ত বোধ আসে না। সব সময় একটা লক্ষ্য থাকে। এটা দারুণ ব্যাপার।

প্রশ্নকারী: আপনার একটি উপন্যাস, ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ কিছুদিন আগে মলাটবদ্ধ হলো। এই উপন্যাস নিয়ে কিছু শুনতে চাই।

মুরাকামি: প্রথমেই উপন্যাসের নাম নিয়ে বলি। মোৎসার্টের ‘অপেরা ডন জিওয়ান্নি’ থেকেই এমন নাম। কিন্তু আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম, ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ (কিশিদাঞ্চো গোরোশি) শব্দটার মধ্যে একটা আশ্চর্য, অস্থির একটা অনুরণনে। আর মনে হলো এমন একটা নামে যদি কোনো গল্প জাপানে লিখতে পারতাম। শুরুটা এভাবেই হলো।

প্রশ্নকারী: তাহলে শুধু টাইটেল দিয়েই শুরু হলো?

মুরাকামি: ‘সৈকতে কাফকা’র বেলাতেও এমন হয়েছিলা। প্রথমে নামটা মাথায় এলো। তারপর ভাবতে লাগলাম, কেমন গল্প লেখা যায়। এরপর লেখা শুরু করি। এজন্যই লিখতে এতো সময় লাগলো। আমার তো মনে হয়, ‘নরওয়েজিয়ান উড’ একমাত্র বই, যেটা লেখার সময় এরকম ঘটেনি। এমন কি লেখা শেষেও আমি নাম খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

প্রশ্নকারী: আমার মনে হয়, ‘দ্য গার্ডেন ইন দ্য রেইন’ও সম্ভাবনাময় একটা নাম হতে পারতো (নরওয়েজিয়ান উড’র জন্য)।

মুরাকামি: আর, ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ এর সময় মনে হচ্ছিলো, যদি আমি গল্পের কোথাও ‘নিশে নো এনিশি’ (ফেট ওভার টু জেনারেশন্স) যোগ করে দিতে পারতাম উয়েদা আকিনারি (১৮শ শতাব্দীর লেখক) থেকে।

প্রশ্নকারী: আপনার গল্প সংকলন ‘হারুসামে মোনোগাতারি’ (বসন্তের বৃষ্টির গল্প) নিয়ে বলছিলেন। যেখানে একটি গল্পে আবিষ্কার হয়, ‘সকুশিনবুৎসু’- বৌদ্ধ সাধুরা মৃত্যুর বিন্দুতে পৌঁছে যান। এরপর মমিতে পরিণত হলেও জীবিত থাকেন। এই ব্যাপারটি তপস্যার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করেন। ঠিক?

মুরাকামি: দক্ষিণ তোহোকু অঞ্চলে ভ্রমণের সময় আমি অনেক মমি দেখেছিলাম। কাইয়োটোর পরিচিত বইয়ের দোকানে গিয়ে আমি একটি বইতেও পড়েছিলাম। এই মমিগুলো কিভাবে তৈরি হয় সেখানে এ ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছিলো।

প্রশ্নকারী: আরেকটি ইউয়েদা গল্পের সংকলন ‘ইউগেৎসু মোনোগাতারি’ (জোছনা ও বৃষ্টির গল্প), সেখানেও ‘সৈকতে কাফকা’ পাওয়া গিয়েছিলো, তাই না?

মুরাকামি: আমি আকিনারিকে পছন্দ করি। বিশেষ করে ওই গল্পটা- ‘নিসে নো ইনিশি’। নিজ থেকে মমিতে রূপান্তরিত হয়েছে- গল্পটা এমন একজন সাধুকে নিয়ে লেখা। যাকে খুঁড়ে বের করে এনে পুনরজ্জীবিত করার পরে একজন অপদার্থ ব্যক্তি হয়ে যায়। ইউয়েদা আকিনারি পৃথিবী নিয়ে বিদ্রুপ করতেন। তাই তিনি এমন উল্টোপাল্টা গল্প লিখেছিলেন। এগুলো সাধারণ অতিপ্রাকৃত গল্প নয়।

প্রশ্নকারী: হুম, আচ্ছা!

মুরাকামি: আমার বাবার বাড়ি ছিলো কাইয়োটো’র জুডো-শুর (দ্য পিওর ল্যান্ড স্কুল) বৌদ্ধ মন্দিরে। নিশ্চিতভাবেই, তিনি মারা গেলে স্কুলের একজন ভিক্ষু বৌদ্ধ সূত্র পাঠ করেছিলেন। আমি সেই ভিক্ষুর সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি যে, তাঁর মন্দিরের মাঠে আকিনারির সমাধি রয়েছে। আমি এরপর জানতে চেয়েছি তিনি আমাকে সমাধিটি দেখাতে পারেন কি না। এটিতে একটি কাঁকড়া খোদাই করা হয়েছিলো। এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, আকিনারি– সব সময় ছিদ্রান্বেষী ছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর একটি ইচ্ছা ছিলো তাঁর সমাধিটির পাশ দিয়ে শুধু হেঁটে যেতে পারে, এমন কোনো কিছু খোদাই করা উচিত।

প্রশ্নকারী: দারুণ একটা গল্প।

মুরাকামি: মন্দিরটি সম্ভবত এর পরবর্তী বছরগুলিতে কিছুটা হলেও আকিনারি’র যত্ন নিয়েছিলো।

প্রশ্নকারী: ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ ও আকিনারি’র ‘নিসে নো ইনিশি’ এ দুটো একটা আরেকটকে জড়িয়ে আছে। যেখানে ‘কিলিং কমেন্ডেটর’ এর প্রধান চরিত্র যে বাড়িতে থাকতো, সেখানকার ঝোপঝাড় কাটতে শুরু করলে অতীতের ‘একটি গর্ত’ দেখা দেয়।

মুরাকামি: আমার গল্পগুলোর থিম স্বাভাবিকভাবেই সচেতন মনের তলায় পড়ে থাকা… অবচেতন ও অসচেতন মনকেই উন্মোচিত করে। আমরা যতোই সচেতন মনের গভীরে যাই, দেখি যে এর তলায় রয়েছে অদ্ভুত এক পৃথিবীর নিচে অন্ধকার সব প্রাণী। শেষ পর্যন্ত, আমরা কেবল এই অন্ধকার থেকে কী টেনে বের করতে পারি তা নির্ধারণের জন্য আমাদের প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করতে পারি, তাই না? আমাদের ও আমাদের চারপাশের সচেতনতার সব দিক তীক্ষ্ণ করা এবং আমাদের প্রবৃত্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমরা যুক্তি বা আগের কোনো উদাহরণের ওপর নির্ভর করতে পারি না। কারণ এক অর্থে, এটি বিপজ্জনক।

‘বন্য ভেড়া শিকার’ আদতে ‘ভেড়ার রাখাল’। ‘বাতাসের শেষ পাখির উপাখ্যান’ হচ্ছে কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখা অন্য আরেক পৃথিবী। ‘পুরো সিদ্ধ ওয়ান্ডারল্যান্ড ও পৃথিবীর শেষ’ হচ্ছে ‘INKlings’। আর এখন আছে ‘দ্য কমেন্ডেটর’।

প্রশ্নকারী: আমি খুবই আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলাম আর অপেক্ষা করছিলাম কমেন্ডেটরের আগমন কিভাবে হবে। যদিও সে ৬০ সেমি প্রায়, কিন্তু খুব দারুণ।

মুরাকামি: সে যদি দেখতে বিশাল হতো, তবে এই চরিত্র নিয়ে কাজ করাটা কঠিন হয়ে যেতো। আর হয়ত সে দেখতে ভয়ানক হতো। যেহেতু সে ছোট, তাই তার দিকে মনোযোগ দেয়াটা সহজ আর তাকে নিয়ন্ত্রণ করাও। আনুপাতিকভাবে সব কিছুই ছোট হয়ে যাচ্ছে। সে একটি অস্তিত্ব, কিন্তু দৈনন্দিন জীবন থেকে আলাদা।

প্রশ্নকারী: ‘সৈকতে কাফকা’-তে মানুষ নয় এমন চরিত্র ছিলো, যেমন কেন্টুকি ফ্রায়েড চিকেন মাস্কট কর্নেল স্যান্ডারস ও জনি ওয়াকার। কিন্তু প্রথমবার হলেও মানুষ নয়, এমন চরিত্র বারবার এসেছে আর গল্প এগিয়ে গেছে।

মুরাকামি: এটি সত্য যে, কমেন্ডেটোরের মতো এমনটি আগে কখনও হয়নি যা পুরো গল্প জুড়ে বহুবার এসেছে।

প্রশ্নকারী: কমেন্ডেটোর নিজেকে ‘একটি ধারণা’ বলেছে। সংক্ষেপে, একটি বিশ্বাস।

মুরাকামি: একদম ঠিক। কিন্তু আমি মনে করি না যে, তাকে মাত্র একটি অর্থ দিয়ে তাকে বোঝানো সম্ভব। উপন্যাসটা লেখার পরে আমি এটা নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু কমেন্ডেটর হচ্ছে মূল চরিত্রের আত্মস্বরূপের একটি সংমিশ্রণ। সম্ভবত সে একটা আয়নার মতো, প্রত্যেক পাশে চরিত্রটির ভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়। এছাড়াও, সে অতীতের একজন বার্তাবাহক বা ঐতিহাসিক কোনো সংযোগও হতে পারে। এগুলোর সব কয়টাই হতে পারে। এমন কি আমিও জানি না ঠিক কোনটা। আমরা শুধু পাঠকদের উপরেই ব্যাপারটা ভাবার জন্য ছেড়ে দিতে পারি।

প্রশ্নকারী: আপনি এটাও লিখেছেন যে (দ্য কমেন্ডেটোর) কিছুটা স্বাভাবিক ধারণা।

মুরাকামি: আমি বলবো না যে সে খুব ভালো মানুষ। কিন্তু সে খারাপও নয়। আমি বিশ্বাস করি সে একজন ‘পথনির্দেশক’, যে ওই ধরনের মূল্যের বাইরে চলে গেছে। আর সে এমনও নয় যে, সবাই তাকে দেখতে পাবে। যারা দেখতে পায় শুধু তারাই তাকে দেখতে পায়।

প্রশ্নকারী: দ্য কমেন্ডেটোরের ভাষা বেশ আলাদা। সে ‘আরানাই’ ভাষা ব্যবহার করে। (ইংরেজি অনুবাদে এটি নেতিবাচক অর্থে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু জাপানি ভাষায় ‘আরু’ মানে হওয়া ও ‘নাই’ মানে ‘না’।) সে যখন মাত্র একজন ব্যক্তির সঙ্গেও কথা বলে, তখনও সে বলে ‘শোকুন’ (আমার বন্ধুরা)।

মুরাকামি: এ শব্দগুলো কিভাবে অনুবাদ করবেন। এগুলো নিয়ে অনুবাদকদের সত্যিই অনেক কঠিন সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

প্রশ্নকারী: প্রধান চরিত্র সারাক্ষণই বলে যাচ্ছে, ‘আমার বন্ধুরা’। সে বিশ্বাস করে যে, কমেন্ডেটোর তার ধারণাগুলো এক বচনে দ্বিতীয় পুরুষকে জানাচ্ছে না। ‘আরানাই’, যা ‘আরু’র নেতিবাচক, এটি বোঝায় যে কমেন্ডেটোর ধারণাগত একজন।

মুরাকামি: ঠিকই ধরেছেন। জার্মান দার্শনিক কাজের অনুবাদের মতো এক ধরনের অনুভূতি তৈরি হয় এতে। ‘আরানাই’ অনেকটা জার্মান শব্দ ‘nicht sein’ (হয় না) এর মতো। দীর্ঘদিন আমিও অনুবাদের কাজ করেছি। তাই উপযুক্ত শব্দ বিভিন্নভাবে ব্যবহার করার অভ্যাস আমার আছে। হয়ত এজন্যই এ ব্যাপারগুলো আমার মনে এতো স্বচ্ছন্দে চলে আসে। শব্দের অনুরণন আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি মিউজিকেও বেশ ভালো। এজন্যও এটা হতে পারে। 

প্রশ্নকারী: আপনি অনেক অনুবাদ করেছেন এবং বিদেশেও প্রচুর গিয়েছেন। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরেও থেকেছেন। তারপরেও আপনার সবগুলো উপন্যাস জাপানের প্রেক্ষিতে। ‘কিলিং কমেন্ডেটোর’সহ।

মুরাকামি: এরকম হওয়ার কারণ, ‘ভেতর’ ও ‘বাইরে’ এই দুইয়ের মধ্যে বিনিময় করতে ভালো লাগে আমার। যেমন, দ্য কমেন্ডেটোর উপন্যাসে, পাশ্চাত্যের কেউ একজন। সে পরছে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর সেই প্রাচীন অশোকের সময়ের জাপানি স্টাইলের পোশাক। এটাই কিন্তু পাঠকদেরকে ভাবাবে। অতীত থেকে আমাদের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে তাদের মনে প্রশ্ন তৈরি করবে। এই চরিত্রটা যদি ডন জিওভান্ননির মতো পোশাক পরতো, তবে এটা কোনো গল্পই হতো না।

প্রশ্নকারী: সত্য।

মুরাকামি: আমি যখন প্রথম লেখতে শুরু করি, সে সময় অনেক উপন্যাসই বিদেশের প্রেক্ষিতে। কিন্তু আমি এতে আকৃষ্ট হলাম না। বরং আমার আগ্রহের জায়গাটা ছিলো, কাউকে দিয়ে কোনো কাজ বা আধ্যাত্মিক কিছু বিনিময় করা। সাহিত্যে এমন স্টাইল তৈরি করা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ ছিলো। তাই সাহিত্যের শব্দভাণ্ডার পুনর্বিন্যাসের দরকার ছিলো।

প্রশ্নকারী: কাজগুলো জাপানের প্রেক্ষিতে হলেও পরে কিন্তু বিদেশি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

মুরাকামি: আমার মনে হয়, এভাবে একটি ‘চিন্তা’ বা ‘ধারণা’ কে মূর্ত করে দেখানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। যেমন কমেন্ডেটোর প্রাচীন জাপানি পোশাক পরে, সংস্কৃতির পার্থক্য পার হয়ে এগিয়ে যায়। এভাবেও বলা যায়, আপনারও যদি একই ধারণা থাকে, যে ধরনের মাটিতে তাদের মূল রয়েছে তার ওপর নির্ভর করে এর অর্থ বদলে যাবে। লেখার সময়, আমার আগ্রহ থাকে কিভাবে চরিত্রগুলো নিজের থেকে বিচ্যুত হয় আর একে অন্যের উপর সমাপতিত (overlap) হয়।

Leave a Reply