• Post author:
  • Reading time:2 mins read

আনিকা তাবাসসুম।

সময়ের গুণী অভিনেতাদের একজন চঞ্চল চৌধুরী। মঞ্চনাটক থেকে শুরু করে ছোটো পর্দায় যার বিচরণ শক্তিশালী। ‘আয়নাবাজি’ ও ‘দেবী’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয়ও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। বর্তমান সময়ের নাটক ও অভিনয়ে আগ্রহী তরুণরা কীভাবে নিজেদের আরও দক্ষ ও সৃজনশীল করতে পারে সে বিষয়ে কথা বলেছেন ফিকশন ফ্যাক্টরির সঙ্গে।

ফিকশন ফ্যাক্টরির পক্ষে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা তাবাসসুম।

আনিকা: ছোটবেলায় বই পড়া হয়েছে? কী ধরনের বই পড়তেন?

চঞ্চল চৌধুরী: একদম ছোটবেলায় বলতে… যখন স্কুলে পড়ি, তখন উপেন্দ্রকিশোর রায়ের, সুকুমার রায়ের ছড়ার বই, গল্পের বই পড়তাম। সেসময় ছড়া বা সুন্দর সুন্দর গল্প পড়তে মজা লাগতো। সেই সঙ্গে পুরো স্কুল লাইফটা জুড়েই পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি যেসব বই পড়া হতো, সেগুলো পড়া হতো আনন্দের জন্যই বা মজার জন্য। তখন তো আর শেখার জন্য সেভাবে পড়া হতো না। আমরাও কিন্তু এখন আমাদের সন্তানদের জন্য এরকম ভালো ভালো, মজার মজার কবিতা বা গল্পের বই কিনে দেই, পড়তে বলি। মনে হয় এগুলো পড়লে ওদের ভালো লাগবে, আনন্দ পাবে।

আনিকা: শুদ্ধ’র (চঞ্চল চৌধুরীর সন্তান) ক্ষেত্রেও পরিবার থেকে তাহলে নিশ্চয়ই চান, চেষ্টা করেন যে ও পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বই পড়ুক?

চঞ্চল চৌধুরী: আমি শুধু চাই না, ওর সঙ্গে প্র্যাকটিস করি। আমি ছোটোবেলা থেকে যেসমস্ত ছড়া, কবিতা, গান বাজনা, ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ পেয়েছি… আমি তো গ্রামে মানুষ, আমার তো সে সুযোগও ছিলো না। কিন্তু তারপরেও সেই আবহটা কিছুটা পেয়েছিলাম, আর পরবর্তীতে ওই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। তাই আমি বা আমার স্ত্রী এবং ফ্যামিলি পারসন যারা আছি, আমরা আমাদের সন্তানের ক্ষেত্রে কিন্তু ঠিক ওই আবহটাই দেয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের সন্তান যেন এসবের মধ্য দিয়ে বড় হয়। শুদ্ধ’র একটা গানের টিচার আছে, আর্টের টিচার আছে, করোনার কারণে হয়তো রেগুলার বাসায় প্র্যাকটিস করতে পারছে না, কিন্তু আমি প্রতিদিনই খোঁজ নেই, আজকের রেওয়াজ করেছে কি না, সে ছবি আঁকে কি না। আমি এখন কথা বলছি, ও পাশে বসে মুভি দেখছে। করোনার এই সময়ে আমাদের ভালো একটা অভ্যাস হয়েছে, ভালো ভালো মুভি দেখার। এই বয়সী একটা সন্তানের ক্ষেত্রে আজকাল বাবা-মা এগুলো করাতে চান না। তারা এভাবে চিন্তাই করে না। কিন্তু একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে গেলে, শুধু লেখাপড়া শিখিয়ে লাভ নেই। ওর যদি একটা ছবির প্রতি ভালোবাসা না হয়, গানের প্রতি-একটা কবিতার প্রতি ভালোবাসা না হয়, তাহলে তো ও পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারবে না। আমি নিজে গান না গাইতে পারলাম, কিন্তু আমার গানটাকে তো, কবিতাটাকে তো ভালোবাসতে শিখতে হবে। সেই শিক্ষাটা তো নিজে নিজে হয় না। পরিবার থেকে তার কানটা তৈরি করে দিতে হয়। ও এখন আমার সাথে যে গান গায় বা যে গান শোনে, আমি হয়তো আমার ছোটোবেলায় এই সুযোগই পাইনি। সো, এটা বাবা মায়ের ওপর নির্ভর করে তার সন্তান আসলে কীভাবে বড় হবে, তার জীবনে পড়ালেখার পাশাপাশি কী কী যোগ হবে। এমন না যে স্পেশালিস্ট হতে হবে। আমার ছেলে বিখ্যাত সংগীতশিল্পী হবে বা চিত্রকর হবে বা অভিনেতা হবেই-তা আমি বলছি না। কিন্তু প্রতিটা বিষয় সম্পর্কে তার একটা ধারণা বা আগ্রহটা থাকতে হবে। তাকে বই পড়তে হবে। বাসায় তার একটা আলাদা বুক শেলফ আছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বই আছে। যার কথা বললাম, উপেন্দ্রকিশোর রায়, সুকুমার রায়, ছোটোদের যতো গল্পের বই, সেসব আলাদা করা আছে ওর জন্য। আমরা উৎসাহিত করি, যখনই সময় হবে-সুযোগ হবে, এই বইগুলো ও পড়বে।

আনিকা: আপনার ছোটোবেলার পর বা স্কুলজীবন পার করার পর কীরকম বই পড়া হয়েছে?

চঞ্চল চৌধুরী: আমি তো আসলে নব্বই দশকের… নব্বই দশকে কলেজে ভর্তি হই। সেসময়ে আমাদের দেশে লেখালেখির ক্ষেত্রে যারা আগানো, যেমন, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন… বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের অনেক বই পড়েছি। সেসময় তসলিমা নাসরিনের বেশকিছু বই পড়েছিলাম। আর… তারপর যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম, ভার্সিটিতে পাঠ্য বইই বেশি পড়া হতো। টিউশন করতাম, মঞ্চনাটক করতাম, তারপর তো আস্তে আস্তে জীবন জীবিকার প্রয়োজনে কাজ শুরু করতে হলো, ব্যস্ততা আরও বেড়ে গেলো। পড়ার সময় কমে যেতে থাকলো।

                 এটা তো আমি সময় অনুযায়ী বললাম যে এই এই বইগুলো পড়তাম। কিন্তু এর বাইরে, রবীন্দ্রনাথ অথবা নজরুল, বা শরৎচন্দ্র এদের কিছু কিছু বই পড়ার অভ্যাস তখন থেকে গড়ে উঠেছিলো। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ওপার বাংলার ভালো কিছু লেখক, আমাদের কবি শামসুর রাহমান, শামসুল হক… এদেরও বই পড়া হতো। একদম সব বই সমগ্র ধরে হয়তো পড়া হয়নি। কিন্তু যতটা সময়-সুযোগ হতো, এনাদের লেখা পড়তাম।

আনিকা: আপনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বা ছাত্র ছিলেন, তখনকার তুলনায় এখনকার ছেলেমেয়েদের পড়ার (সাহিত্য) অভ্যাস কী কমে গেছে? বা গেলেও এর পেছনে কারণ কী মনে করেন?

চঞ্চল চৌধুরী: হ্যাঁ, আমার মনে হয় এই অভ্যাসটা কমছে। কমছে নানান কারণে। তার মধ্যে অন্যতম একটা কারণ হলো, আগে শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে বড় হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু পাঠ্যবইটাই একমাত্র ছিলো না। আর জীবনটা এতো গতিশীল ছিলো না। এখন জীবন তো অনেক ফার্স্ট। ইন্টারনেটের জগতে আমরা প্রবেশ করেছি। আকাশসংস্কৃতির যুগে, গুগলে সার্চ দিলেই পুরো পৃথিবীকে আমরা জানতে পারি। তখন কিন্তু এতো গতি ছিলো না । তখন হাতে অফুরন্ত সময় ছিলো। সেই সময়টাকে মানুষ একটু পড়াশোনা করে কাটাতো। এখন জীবনটা এতো দ্রুত হয়ে গেছে, এই টিকে থাকার লড়াইয়ে এসে, প্রতিযোগিতা এতো বেশি, সেই প্রতিযোগিতায় এসে এই চর্চাগুলো কেউই করছে না। আর বর্তমানে স্টুডেন্টরা কিন্তু গার্ডিয়ানদের দ্বারাও অনেক চাপের মধ্যে থাকে। তাকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেতেই হবে। এখন ক্লাসে ২০ জনের মধ্যে সবার কিন্তু ঊনিশ বিশের পার্থক্য। সন্তানের সংখ্যা কম, মা বাবা অনেক যত্নশীল হতে গিয়ে প্রেসার দিয়ে ফেলেন বেশি পড়াশোনা করার জন্য। এখন প্রতিযোগিতা বেশি, স্টুডেন্টদের মধ্যে ভেরিয়েশন কম, তাই প্রতিযোগিতায় ভালো করতে স্টুডেন্ট তখন পাঠ্যবই নিয়েই এতো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে… এই সময়ের প্রয়োজনে টিকে থাকতে, পরিবারের কথা ভেবেও, নিজের ইচ্ছা না থাকলেও জীবন-জীবিকা, টিকে থাকার জন্য তাকে এই কাজগুলোকেই বেশি প্রাধান্য দিতে হয়। তখন এই বই পড়া বা শিল্প সাহিত্য চর্চার দিকে সময়টা দেওয়া হয় না। আর এই বই পড়া, কবিতা-গান-ছবি আঁকা এসব তো মূলত পরিবার থেকেই শুরু হয়। পারিবারিক শিক্ষা-সামাজিক শিক্ষা প্রভাব ফেলে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তো পরের ব্যাপার। এখকার অনেক ফ্যামিলিতেই এই চর্চাটা করা হয় না যে এগুলো করে কী হবে! তার দরকার ভালো রেজাল্ট। ভালো চাকরি। তখন গান-কবিতা না করলে, আগ্রহ না থাকলেও কিছু যায় আসে না। কিন্তু একজন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার জন্য এগুলো দরকার আছে। একজন অনেক ভালো রেজাল্ট করলো, বড় চাকরি পেলো, সেটা একটা জীবন। সে জীবনটাকে কিন্তু আমি পরিপূর্ণ জীবন মনে করি না, যদি তার জীবনে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির কোনো ছোঁয়া না থাকে। যে কারণে এখন অনেকেরই শুধু ওই একাডেমিক ব্রিলিয়ান্স আছে, কিন্তু শিল্প সাহিত্য নিয়ে তার বক্তব্য খুব নাজুক।

আনিকা: আপনি তো মঞ্চ নাটকে অনেকদিন কাজ করেছেন। নাটক সাহিত্যের বড় একটা অংশ। নাটকে কাজ করার আগে তো স্ক্রিপ্টটা পড়া হতো। তখন স্ক্রিপ্ট পড়েই কী কোনো চরিত্র মাথায় তৈরি হয়ে যেতো কিছুটা নাকি পরিচালকের নির্দেশনার পরই চরিত্র চিত্রন হতো?

চঞ্চল চৌধুরী: মঞ্চের যে সিস্টেমে আমরা কাজ করি, সেখানে একটা নাটকের জন্য তিন-ছয় মাসের একটা রিহার্সেল হয়। ক্যারেক্টার ব্রিফিং, রিডিং- অনেককিছু হয়। একটা ক্যারেক্টার দাঁড় করানোর জন্য, পোলিশ করার জন্য মাসের পর মাস কাজ করা হয়। বেসিক্যালি, ভাবনাটা তো ডিরেক্টর দেন। কিন্তু স্ক্রিপ্টে ক্যারেক্টারটা উল্লেখ থাকে। একটা স্ক্রিপ্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেইটা একটা স্কেলিটন যদি ধরি, অভিনেতা সেটা বহন করেন। ডিরেক্টর সেখানে মাংস কাঠামো যোগ করেন, অভিনেতা তা জীবন্ত করে তোলেন তার অভিনয়ের মাধ্যমে। লেখাটা মূল স্ট্রাকচার। সেই স্ট্রাকচারের সঙ্গে ডিরেক্টরের ডিরেকশন আর অভিনেতার অভিনয়- এই তিনটা মিলে একটা চরিত্র পূর্ণাঙ্গ হয়।

      মঞ্চে না শুধু, আমি যে ক’টি ফিল্ম করেছি বা যে নাটকগুলো করি সেখানেও আমি স্ক্রিপ্টের প্রতি মনোযোগ দেই। এখন তো অনেক চল হয়ে গেছে যে, স্ক্রিপ্ট ছাড়াই নাটক হয়। স্ক্রিপ্ট ছাড়া যখন নাটক হয়, তখন তার চরিত্র নির্মাণ করার কোনো সুযোগ থাকে না। ইম্প্রোভাইজ ডায়ালগের মাধ্যমে কখনো চরিত্র নির্মাণ সম্ভব না। সেক্ষেত্রে স্ক্রিপ্টে, একজন রাইটারের কাজ হচ্ছে, গল্পটি তৈরি করা এবং তার সঙ্গে গল্পে কিছু চরিত্র তৈরি করা। সেই চরিত্রে অভিনয় করে, অভিনেতা চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলবেন দর্শকের কাছে। এরকমটাই হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা আসলে এই সিস্টেমটার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি না। মঞ্চ নাটকে এখনো এভাবেই হয়। কিন্তু টেলিভিশনে একটা দুর্দশার সময় আমরা পার করছি। একটা সময়ে, আজ থেকে ৮-১০ বছর আগে, স্ক্রিপ্ট পাস হতো চ্যানেলে। স্ক্রিপ্ট জমা দিতে হতো। চ্যানেলগুলো বা যারা প্রোগ্রামের দায়িত্বে থাকতেন তারা স্ক্রিপ্টটা পড়তেন। পড়ার পর যদি পছন্দ হতো তখন হয়তো প্রযোজক-ডিরেক্টরকে বলতেন। তারপর ডিরেক্টর স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী কোন কোন অভিনেতা অভিনেত্রী লাগবে সেসব কাস্টিং করে নাটক হতো। এখন সেটা হয় না। এখন যেটা হয় তা হলো- ‘আমার এই এই আর্টিস্টকে লাগবে।’ এজেন্সি বা চ্যানেলের কাছে কোনো ডিরেক্টর গেলে তাকে একজন বা দুইজন আর্টিস্টের কথা বলে দেয়া হলো। যে আপনি এদের কথা মাথায় রেখে কোনো একটা স্ক্রিপ্ট রেডি করেন। তখন ডিরেক্টর রাইটারকে বললো, কাস্টিং এই দুই-তিনজন, তুমি একটা গল্প লিখে দাও। এটা হয়, যদি স্ক্রিপ্ট করা হয়।

       আর যদি স্ক্রিপ্ট ছাড়া হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। এখন আমাকে নিয়ে যদি কোনো নাট্যকার দশটা নাটক লেখেন, বারবারই তো লেখার মধ্যে আমিই চলে আসবো। আমার কথাই তার মাথায় থাকবে। তখন কোনো চরিত্র সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা সেখানে কম থাকে। কিন্তু যখনই একজন রাইটার নিজে সৃষ্টি করেন যে, আমি একটি গল্প লিখবো, কে এই চরিত্রে অভিনয় করবে আমি জানি না। তখন সে নিজের মতন করে সৃষ্টিটা করতে পারবে। চরিত্রের প্রয়োজনে ঘটনা, ঘটনার প্রয়োজনে চরিত্র আসবে। তারপর একটা পূর্ণাঙ্গ গল্প তৈরি হবে। এই মাপের রাইটারও এখন বাংলাদেশে হাতে গোনা দুয়েকজন, নাটকের ক্ষেত্রে।

       আরেকটা বিষয় বলতে চাই যে, রেফারেন্স বা পড়াশোনা তো অবশ্যই করা দরকার। যদি কেউ কবিতা লিখতে চায়, অভিনয় করতে চায়… তাকে জানতে হবে অনেক কিছু। বিশেষ করে অভিনয় করতে গেলে পড়ালেখাটা তো একেবারেই অপরিহার্য। সেটা বোঝা যায় যখন আমরা কাজ করতে যাই। অনেক স্ক্রিপ্টে বা গল্পে অনেক রেফারেন্স থাকে না? যেমন কোনো বিখ্যাত চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করে হয়তো কোনো কথা বলা হলো। সেই চরিত্রটার কথা হয়তো আমরা জানিই না। তখন কিন্তু খেই পাওয়া যায় না। যেহেতু গল্পটা কারো হয়তো পড়া নেই। যেমন এখন ম্যাক্সিমাম যারা অভিনয় করতে আসেন, তাদের পড়াশোনা কিছুটা কম। আমি পাঠ্যপুস্তকের পড়াশোনার কথা বলছি না। এর বাইরে…। যে অঙ্গনে আমি কাজ করি, সেই অঙ্গনকে জানার জন্য অনেক বই পড়তে হবে। যেমন চিত্রশিল্পী হতে হলে শিল্পকলার ইতিহাসটা জানতে হবে। দেশ-উপমহাদেশ-সারা বিশ্বের শিল্পের ইতিহাসটা না জানলে ভালো চিত্রশিল্পি যেরকম হওয়া যাবে না, তেমনই অভিনয় করতে গেলে অনেক গল্পের বই, অনেক চরিত্র, অনেক লেখকের বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হবে, মাথায় রাখতে হবে। ভালো ভালো মুভি দেখতে হবে। সেসব থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজের মতো করে কিছু তৈরি করতে হবে।

‘প্রবলেমটা হলো অনেকে আবার, যারা পড়াশোনা করে, তাদের মধ্যে যদি অসততা থাকে, তারা করে কী, কোনো একটি গল্পের চরিত্রের ধরনটাকে সে নকল করা শুরু করে। দেখা বা পড়া হচ্ছে নিজের জ্ঞান বাড়ানোর জন্য। নকল করার জন্য নয়। প্রভাবিত হতে পারে। সেটা ভিন্ন ব্যাপার।’

সে জায়গা থেকে আবার আমি এভাবে চিন্তা করি যে, আমার খুব বেশি বিশ্বসাহিত্যের ওপর দখল নেই। ছোটোবেলা থেকে কিছু বই পড়তে পড়তে এখানে আসার ফলে যা হয়েছে, আমার কাছে অনেক বেশি চরিত্রের রেফারেন্স নেই। আমি চারুকলার ছাত্র হওয়ায়, শিল্পকলার ইতিহাস, মঙ্গলকাব্য, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন – এ বিষয়গুলো আমার পাঠয়সূচিতেই ছিলো। আর আমাদের তো সৃজনশীলতা নিয়েই কাজ করতে হতো, যার ফলে, এই ভাবনাটা আমার মাঝে থাকার কারণে, আমি যখন কোনো চরিত্র নির্মাণ করতে যাই, সেই চরিত্রটি সম্পূর্ণভাবেই আমার দ্বারা সৃষ্ট মৌলিক চরিত্র। বিশ্বসাহিত্যের অনেক পড়ালেখার সঙ্গে সময় এবং ব্যস্ততার কারণে পরিচয় হয়নি, এটা বলতে আফসোসই লাগে। তাও মনে হয়, যদি আমি অনেক বেশি বিদেশি চরিত্র নিয়ে থাকতাম, হয়তো কিছু প্রভাব চলে আসতে পারতো আমার চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে।

আনিকা: এখন তো অনেক স্ক্রিপ্টেই সৃজনশীলতার বেশ অভাব দেখা যায় তাহলে… আবার অনেকে এখন সাহিত্যগুলো পড়ে না, সেক্ষেত্রে সাহিত্য থেকে বা সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র বা নাটক দেখা বা পড়া কি ভালো প্রভাব ফেলতে পারে?

চঞ্চল চৌধুরী: অবশ্যই ভালো ফল আসতে পারে। একটা সময় আমাদের নাটকের মধ্যেও শিল্পগুণ বা সাহিত্যগুণ ছিলো। এটা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। শিল্প-সাহিত্য বর্জিত শুধুই বিনোদনের একটি স্থূল উপাদান হিসেবে নাটক এখন এখন প্রচলিত। এখান থেকে কিছু সুবিধাবাদী লোকজন সস্তা বিনোদন দিয়ে, যে নাটকের গল্প- ডায়ালগ বা ঘটনার কোনো শিল্পমান নেই, সাহিত্যমান নেই… দিনের পর দিন একটা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে নানান ভাবে এটাকে ব্যবহার করে এই জায়গাটা নষ্ট করেছে। তা একটি নাটক বা সিনেমার মধ্যে যদি সে লেখার মধ্যে যদি সাহিত্যগুণ না থাকে, শিল্পগুণ না থাকে, সে নাটক আমি করবো কেন? এখন অনেক নাটকেরই গল্প বা অভিনয় স্থূল রুচির পরিচায়ক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিল্পমান তো থাকতে হবে। পথের-পাঁচালি তো শুধুই একটি সিনেমা নয়। এর সাহিত্যমূল্য কতটা! এভাবে তো চিন্তা করতে হবে। 

আনিকা: আপনার নিজের পড়া কোন চরিত্রে কাজ করার ইচ্ছা আছে? মিসির আলি (দেবী চলচ্চিত্রে) তো করলেন, এর বাইরে? 

চঞ্চল চৌধুরী: নাহ… এই প্রশ্ন অনেকেই আমাকে করেছে, অনেকে বলেছেও আমাকে এই চরিত্রটতে ভালো লাগবে। প্রায় পঁচিশ বছর- আর দেড় দুই বছর অভিনয় করলে পঁচিশ বছর হয়ে যাবে- কখনো কোনো চরিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছা জাগেনি যে বিখ্যাত কোনো সাহিত্যের চরিত্র আমি করতে চাই। অনেকে বলে যে আপনার স্বপ্নের চরিত্র কী, যে চরিত্র করতে চান। এইটা আমার কখনোই মনে হয়নি। বিখ্যাত বিখ্যাত চরিত্র আছে আমাদের শিল্পসাহিত্যে। অনেকসময় অনেক মুভিতেও অনেক ভালো ভালো চরিত্র এসেছে, যেটা দেখে অনেকেই বলছে যে আমি যদি ওইরকম একটা চরিত্র করতে পারতাম। সেই বিখ্যাত অভিনেতার রেফারেন্স দিয়েই বলে যে ওই সিনেমার ওই চরিত্রটিতে আপনাকে মানাবে বা এরকম কিছু। এইটা আমার কখনো মনে হয়নি। আমার মনে হয় কী, আমার কাছে যে পাণ্ডুলিপিটা আসবে সেটা নাটক বা সিনেমা যাই হোক না কেন ওইখানে আমার যে চরিত্র থাকবে সেই চরিত্রে যেন আমার আগের করা চরিত্রের চাইতে আলাদা কিছু আমি করতে পারি, এটাই হচ্ছে আমার স্ট্রাগল।

আনিকা: আপনার জীবন নিয়ে যদি কোনো বই হয় সেক্ষেত্রে সেইটা কি আপনিই লিখতে চাইবেন নাকি অন্য কেউ যদি লোখার অনুমতি চায় আপনি সে অনুমতি দেবেন?  

চঞ্চল চৌধুরী: আমার জীবনটা এতো মূল্যবান না যে আমাকে নিয়ে বই লেখা হবে। বই লেখার মতো কিছু করেছি বলে আমার মনে হয় না। অতএব, এটা আমার ভাবনার মধ্যেও নাই। বাকি যে ক’দিন আমি বাঁচবো, তার মধ্যে নিজেকে ওই জায়গায় নিতে পারবো কি না যে আমাকে নিয়ে লেখা হবে বই, এতোটা যোগ্যতা আমার এখনো অর্জন হয়নি বা ভবিষ্যতেও হবে কি না আমি জানি না।

আনিকা: আপনার নিজের কখনো কিছু লিখতে ইচ্ছা করেনি?

চঞ্চল চৌধুরী: আমার যা কিছু ইচ্ছা করে, আমার যা কিছু দর্শন, তা আমার কথা কাজের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। আমি আজ যে কথাগুলো বললাম, এসবের মধ্য দিয়েও আমার চিন্তাভাবনা নিয়ে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। আলাদা করে লিখে কিছু বলতে হবে এরকম মনে হয় না। এখন তো অনলাইনের যুগ। আমি ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস দেই, ছোটো ছোটো করে, এক দুই মাস পর পর কিছু জিনিস লেখা হয়, সেটাই আমার জীবন। করোনার মধ্যে এই প্র্যাকটিসটা শুরু হয়েছে। সেসব লেখার মধ্যেই আমার নিজস্ব ভাবনা কাজ করে। কী লিখছি, কী কারণে লিখছি, এই ব্যাখ্যাটা থাকে। ওই লেখার মধ্যেই আসলে আমি আছি। আলাদা করে নিজের জীবনী বা অন্য কিছু লিখবো ওই আশাটাও আমি করি না। কারণ আমি যা কিছু করছি, যা ভাবছি তা আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকেই। এই মিডিয়াতে অনেকে কাজ করে, অনেক সেলিব্রিটি কাজ করেন। আমি নিজেকে সেলিব্রিটি মনে করি না। আমি একজন অভিনয়শিল্পী। আমার কাজ অভিনয়টা করা। সে জায়গা থেকে আমি কাজ করছি, সেখান থেকে মানুষ আমাকে চিনছে। অনেকে কাজের সঙ্গে, নিজের সঙ্গে শঠতা করে। সততা প্রকাশ করে না। কিন্তু আমি আমার কাজ করতে গিয়ে, কখন কাউকে তোয়াজও করি নয়া, কম্প্রোমাইজও করি না। মানুষের সঙ্গেও করি না কাজের সঙ্গেও না। আমি সব ইন্টারভিউয়ে যা বলি, ফেসবুকে যা লিখি, তাই আমার বিশ্বাস। কোনো শেখানো বুলিও নয়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি। এসবের মধ্যেই আসলে আমি প্রকাশিত হই৷ তাই আলাদা করে লেখার কথা ভাবি না।

আনিকা: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য। ভালো থাকবেন।

চঞ্চল চৌধুরী: তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ। ফিকশন ফ্যাক্টরির জন্য শুভ কামনা।