• Post author:
  • Reading time:4 mins read

Soccer in Sun and Shadow

মূল: এদুয়ার্দো গালিনো

ফুটবল

ফুটবলের ইতিহাসকে সৌন্দর্য থেকে কর্তব্যের পথে এক করুণ যাত্রা বলা যেতে পারে। এককালে ফুটবল ছিলো ‘খেলার আনন্দে খেলা’। নান্দনিকতাই ছিলো শেষ কথা। খেলাটা ব্যবসায় পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সৌন্দর্যকে শেকড় থেকে উপড়ে নেয়া হলো। এই একবিংশ শতাব্দির পৃথিবীতে পেশাদার ফুটবলের কাছে অলাভজনক সবকিছুই নাকি অনর্থক! আর অনর্থক মানেই বাতিল। যেই পাগলাটে আবেগ একজন পূর্ণবয়ষ্ক মানুষকে বেলুন নিয়ে খেলা শিশুতে পরিণত করে, বানিয়ে দেয় উলের বল নিয়ে খেলা বেড়ালছানা, সেই আবেগ কাউকে এক পয়সার লাভ দেয় না। উদ্দেশ্য, সময় বা রেফারিকে ভুলে বল নিয়ে ব্যালে নর্তকের মতো দক্ষতা প্রদর্শন একালে নাকি শুধুই অকাজ!

ফুটবল নামক খেলাটি এখন কয়েকজন প্রতিদ্বন্দী ও একদল দর্শক নিয়ে এক প্রদর্শনীর নাম। আর এই প্রদর্শনী এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যতম লাভজনক ব্যবসা। সেখানে খেলার সৌন্দর্যকে শুধুই বাহুল্য ধরা হয়। পেশাদার স্পোর্টস টেকনিশিয়ানরা ফুটলকে বিদ্যুৎগতি ও জান্তবশক্তির প্রদর্শনী বানিয়ে ছেড়েছে। এই ফুটবলে না আছে খেলার আনন্দ, না আছে কল্পনাবিলাস। এমনকি স্পর্ধাও আজ বেআইনি।

সৌভাগ্যবশতঃ আজও মাঠে কদাচিৎ এক আধজন বেয়াদবকে চোখে পড়ে। সমস্ত চিত্রনাট্য ভুলে, প্রতিপক্ষের সবাইকে ফাঁকি দিয়ে বলটাকে ড্রিবলিং করে এগিয়ে যায় তারা। স্বাধীনতার নিষিদ্ধ অভিযানে রেফারি এবং দর্শক জনতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেতে ওঠে শারীরিক আনন্দের নেশায়।

খেলোয়াড়

রুদ্ধশ্বাসে সে উইং বরাবর ছুটছিলো। তার একপাশে যাবতীয় স্বর্গীয় গৌরব, অপরদিকে রসাতলের খাদ।

সে প্রতিবেশিদের ঈর্ষার পাত্র। সে পেশাদার খেলোয়াড়। অন্যরা যখন অফিস কারখানার চাপে পিষ্ট হয়, সে তখন খেলাধুলার মতো রঙ্গতামাশা করে টাকা কামায়। শুধু তাই নয়, টিভি আর পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তার চেহারা নজরে আসে। রেডিওতে বারবার উচ্চারিত হয় তার নাম। নারীরা তাকে কামনা করে। শিশুরা তার মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এর পিছে এক বালতি ঘাম লুকানো আছে। এতো শতো আর কে জানতে চায়। ক্লান্ত বা ব্যর্থ হওয়ার অধিকারটুকুও নেই তার। তাই বা কে চায় বুঝতে! মহল্লার অন্য বাচ্চাদের মতো তার শুরুটাও ছিলো নিজের আনন্দের জন্যে। আজ সে খেলে বেড়ায় নানা স্টেডিয়ামে। জয় বাদে আর কোনো বিকল্প ভাবনা তার জন্যে নিতান্তই বিলাসিতা।

ব্যবসায়ীরা তাকে রোজ কেনাবেচা করে। তাকে ধার দেয় অন্যের কাছে। খ্যাতি ও অর্থের প্রতিশ্রুতিতে সেও নিজেকে পণ্যে পরিণত হতে দেয়। যতো সাফল্য আসে, যতো অর্থ উপার্জন হয়, ততোই সে আরও বেশি করে জড়াতে থাকে নাগপাশে। সামরিক বাহিনীর মতো কঠোর বিধি ও নিয়ম ঘেরা জীবন তার। প্রতিদিন তাকে বরদাস্ত করতে হয় প্রশিক্ষণ সূচির নির্যাতন। মুড়ি মুড়কির মতো পেইনকিলার আর কোর্টিসোন খেয়ে চোখ ঠাউরে নিজের শরীরের সকল ব্যথা বেদনা দমিয়ে রাখতে হয়। প্রতিটা ম্যাচের আগে তাকে বন্দী করা কয় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। সেখানে তাকে দিতে হয় বাধ্যতামূলক শ্রম। খেতে হয় স্বাদহীন খাবার। জল ছাড়া কোনো পানীয় জোটে না তার কপালে। সর্বোপরী থাকতে হয় পুরোপুরি একাকীত্বের মাঝে।

বাকি সকল মানবীয় পেশায় ক্ষয় আসে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু একজন ফুটবলারের জীবনে বার্ধ্যক্য আসে অকালে, বয়স তিরিশ পেরোতে না পেরোতেই। খুব দ্রুতই তার পেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে আসতে থাকে। কতো কথা চলে তখন তার পিছে,

‘ঢালু মাঠেও লোকটা আর গোলে বল ঠেলতে পারবে না’

‘ও? ধুর! গোলকিপারের হাত বেঁধে রাখলেও ওকে দিয়ে আর গোল হবে না’

এমনও হতে পারে, তিরিশের আগেই হয়তো ফুরিয়ে যেতে হলো। আচমকা বল লেগে নাকের হাড় ভেতরে ঢুকে গেলো। হয়তোবা দুর্ভাগ্যক্রমে পেশীতন্তু ছিঁড়ে গেলো। হয়তো কারো বেকায়দা লাথিতে ভেঙে গেলো কোনো হাড়। তা যদি আর পুরোপুরি ঠিক না হয়, ওখানেই তার ইতি। কোনো এক সকালে ঘুম ভেঙে সেই ফুটবলার আবিষ্কার করলো, সে তার পুরোটা জীবনটা এক জুয়ায় বাজি ধরেছিলো। আজ সে একদিকে প্রায় কপর্দকহীন, অপরদিকে না আছে তার সেই খ্যাতি।

খ্যাতি হছে সেই নারীর মতো যার পিছে চিরকাল ছুটে চলতে হয়। ছেড়ে যাওয়ার সময় বিদায়ী চিঠিখানাও লিখে রেখে যায় না!

গোলকিপার

কেউ কেউ তাকে বলে দারোয়ান; কিপার, বাউন্সার, গোলি– এরকম কতো নাম তার। কিন্তু তাকে শহীদ বলেও ডাকা যেত, ডাকা যেত অনুতাপী বা পাঞ্চিং ব্যাগ বলেও। তারা বলে, সে যেখান দিয়ে হাঁটে সেখানে নাকি ঘাস গজায় না।

সে সবসময়ই একা, দূর থেকে গোটা ম্যাচ দেখার দণ্ডে দণ্ডিত। গোলপোস্ট ছেড়ে নড়ার উপায় নেই তার। তার সদা সহচর দুই পোস্ট আর ক্রসবার। তার অপেক্ষা ফায়ারিং স্কোয়াডে নিজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার। এককালে সে রেফারির মতোই কালো পোশাকে থাকতো। আজকাল রেফারিদেরকেও আর কালো কাক সেজে থাকতে হয় না। গোলকিপারও রঙচঙে পোশাকে নিজের একাকীত্বের সান্তনা পায়।

সে গোল দেয় না, তার কাজ গোল ঠেকানো। গোল হচ্ছে ফুটবলের উৎসব। স্ট্রাইকার গোল দিয়ে হুল্লোড়ের আতশবাজী জ্বালায় আর গোলকিপার বাজিতে লাগা আগুন নেভানোর ভেজা কম্বল।

সচরাচর সে পরে ১ নম্বর জার্সি। সে কি সবার আগে পারিশ্রমিক পায়? উঁহু, সে নিজেই বরং সবার আগে মূল্য চুকায়। দোষ সবসময় গোলকিপারের। এমনকি তার দোষ না থাকলেও সকল দায় তার ঘাড়েই চাপে। যখনই নিজ দলের কোনো একজন খেলোয়াড় ফাউল করে, সাজাপ্রাপ্ত হয় সেই গোলি। তাকে ওই বিস্তীর্ণ খালি নেটের সামনে একা জল্লাদের সামনে দাঁড় করিয়ে বাকি সবাই সরে পড়ে। আর যদি একটা বাজে সন্ধ্যা আসে, যদি তার দলের খেলা একটু খারাপ হয়, তাকেই তার মূল্য চুকাতে হয়। বৃষ্টির মতো উড়ে আসা বল সামলে তাকেই বাকিদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।

বাকি খেলোয়াড়েরা যখন তখন টুকটাক ভুল করে আবার একটা দৃষ্টিনন্দন ড্রিবল বা অসামান্য পাস বা চমৎকার ভলি দিয়েই ভুলের মাসুল দিতে পারে। কিন্তু তার পক্ষে তা অসম্ভব। জনতার কাছে গোলকিপারের কোনো ক্ষমা নেই। তাকে কি ধোঁকা দিয়ে বাইরে টেনে আনা হয়েছে? সে কি বোকা বনেছে? বল কি তার পায়ের ফাঁক গলে চলে গেলো? তার চিরবিশ্বস্ত আঙুল কি আচমকা অসাড় হয়ে গেলো? তার সামান্য একটা ভুলে একটা ম্যাচ বরবাদ হয়ে যেতে পারে, ছুটে যেতে পারে চ্যাম্পিয়নশিপ। আর সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরা ভুলে যায় তার চিরকালের অর্জন। তার দিকে নিরন্তর ছুড়তে থাকে অপমান, অমর্যাদা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে অভিশাপ কুড়িয়ে চলতে হয়।

আইকন

এক ঝলমলে দিনে পবনদেবী চুমু খেলো এক মানবের পায়ের অবহেলিত অপমানিত পাতায়। আর সেই চুম্বন থেকেই জন্ম নিলো সকলের ভক্তির এক আইকন। হয়তো কোনো শীর্ণ টিনের চালার নিচে এক জীর্ণ নোংরা বিছানায় তার জন্ম হলো। কিন্তু, সে পৃথিবীর বুকে পা রাখলো একটা ফুটবল আঁকড়ে ধরে।

হাঁটতে শেখার সময় থেকেই সে জানতো কীভাবে খেলতে হয়ে। একদম ছোটবেলা থেকেই সে দর্শকদের আমোদ যুগিয়ে গেছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও সে বাড়ির পেছনের মাঠে খেলার পাগলামিতে মেতে বলে লাথি মেরে চলতো। যৌবনের শুরুতে তাকে দেখা গেলো বল নিয়ে উড়ে চলতে, স্টেডিয়ামের পর স্টেডিয়াম মাতিয়ে রাখতে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ, জয়ের পরে জয়। তার দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিক খেলা অগণিত দর্শকের অভিবাদন পেয়েছে।

বল নিজেই যেন তাকে খুঁজে নেয় মাঠে; তাকে চেনে, তাকে চায়। বল তার পায়ের পাতায় দোল খায়, বিশ্রাম নেয়। সেও বলকে আদর করে, তার মুখে বুলি ফোটায়। ভাষাহীন সে একান্ত আলাপচারিতা একেবারেই তাদের নিজস্ব। তার ওয়ান-টু পাস, মাধ্যাকর্ষণকে বুড়ো আঙুল দেখানো ড্রিবল, অবিশ্বাস্য ব্যাকহিল গোল, মাথার ওপর দিয়ে করা ভলি– এসবের গুণে বাকি চিরসাধারণেরাও কখন যেন অসাধারণ হয়ে ওঠে খেলার মাঠে। সে যখন খেলে তার দলে যেন থাকে বারো জন খেলোয়াড়। আবেগের বশে বাড়িয়ে কেউ কেউ হয়তো ১৫/২০ জনও বলবে।

উচ্ছল হাস্যে চঞ্চলা বল বাতাসে ভাসে। সে তাকে টেনে নামায়, তাকে আদর করে ঘুম পাড়ায়, তাকে স্তুতিতে ভাসিয়ে দেয়, তার সঙ্গে মাতে নৃত্যে। এমন অভুতপূর্ব দৃশ্যে আপ্লুত হয়ে তার ভক্তরা নিজেদের অনাগত প্রজন্মের জন্যে দুঃখ করে। এমন দৃশ্য পরের প্রজন্ম হয়তো কখনো স্বচক্ষে দেখতে পাবে না।

কিন্তু আইকন হয়ে কেউ একজন থাকে খুবই সীমিত সময়। বাকি সময়ের জন্যে সে একজন অতি সাধারণ মানুষ। এক সময় যাদুকরী স্বর্ণালী পায়ের সেই দেবতা হয়ে যায় খোঁড়া হাঁস। তারকার যাত্রা শেষ হয় সুপারনোভা থেকে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে। সং-এর পোশাকের চাইতেও বেশি তালি/পট্টি তখন তার শরীর জুড়ে। যৌবনের এক্রোব্যাট এখন প্রায় প্রতিবন্ধী। শিল্পী এখন শুধুই বোঝা।

জনতার তোষামোদের ঝর্ণাধারা এখন বিদ্রুপ বিদ্বেষের বজ্রাঘাত। ইন্দ্রপতন সবসময় হুড়মুড়িয়ে হয় না। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার পতনের সঙ্গে সঙ্গে জনতা তাকে খুবলে খেয়ে ফেলে।

ভক্ত

সপ্তাহে একদিন করে, ভক্তের কাজ হচ্ছে বাড়ি থেকে পালিয়ে স্টেডিয়ামে যাওয়া। চতুর্দিকে উড়তে থাকে ব্যানার-ফেস্টুন; হৈ-হট্টগোল, আতশবাজি আর ড্রামের আওয়াজে বাতাস থাকে মুখরিত। কনফেত্তির বৃষ্টি ঝরে অবিরাম। শহরের সেদিন রুটিন ভুলে হারিয়ে যাওয়ার দিন। শুধু অস্তিত্ব থাকে ওই মন্দিরের। সেই পবিত্রভূমিতে পৃথিবীর একমাত্র নাস্তিকবিহীন ধর্ম তার দৈবচ্ছটা প্রদর্শন করে। ঘরে বসে টিভিতে সেই আশ্চর্য দেখাটাই হয়তো বেশি আরামদায়ক হতো ভক্তের জন্যে। তবুও, তার কাছে বরং ওই তীর্থই বেশি পছন্দ, যেখানে অপদেবতাদের সঙ্গে স্বর্গদূতের সশরীরী যুদ্ধটা সে নিজের চোখে দেখতে পায়।

একজন ভক্ত ওখানে শক্ত মুঠোয় নিজের রুমাল চেপে ধরে। নিজের থুথু থেকে নিয়ে উৎকণ্ঠার ছোঁয়া ঢেঁকুর পর্যন্ত গিলে ফেলে! বিড়বিড়িয়ে আপনমনে প্রার্থনা ও অভিসম্পাত করে এবং আচমকা তার স্বরে চিৎকার করে। ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে পাশের অপরিচিতকে জড়িয়ে ধরে নিজ দলের গোল দেয়ার খুশিতে। যতক্ষণ এই পৌত্তলিক সমাগম চলতে থাকে, প্রচুর ভক্তের দেখা মেলে। বাকি হাজার হাজার উপাসকের সঙ্গে সেও নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে- আমরাই সেরা এবং সকল রেফারিই কুটিল, সকল প্রতিপক্ষই প্রতারক।

‘আজ আমার ক্লাবের খেলা ছিলো’, ভক্ত সচরাচর এভাবে বলে না। সে বরং বলবে, ‘আজ আমরা খেলেছি’। সে জানে, সে হচ্ছে ১২ নম্বর খেলোয়াড় যে ঘুমন্ত বলেও উদ্দীপনা যুগিয়ে খেলার গতি প্রকৃতি পালটে দিতে পারে। তেমনি মাঠের ১১ জনও জানে, ভক্তবিহীন মাঠে খেলা যেন সংগীত ছাড়া নাচ।

ম্যাচ শেষ হওয়ার পরেও ভক্ত গ্যালারিতে বসে উদযাপন করে। ‘আহা! কী একখানা গোলই না আজকে আমরা দিলাম’ বা ‘কী গো-হারানটা ওদের হারালাম’। অথবা হয়তো সে হেরে গিয়ে চিৎকার করতে থাকে- ‘ওরা ফের আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করলো’ বা ‘এই রেফারি চোর’। তারপর সূর্য অস্তাচলে যেতে থাকে, সঙ্গে সঙ্গে ভক্তও। খালি হতে থাকা স্টেডিয়ামে ছায়া ঘনিয়ে আসে। কংক্রিটের চত্বরে জ্বলতে থাকে নিভু নিভু কিছু বনফায়ার। ধীরে ধীরে কন্ঠস্বর ও আলো ঝিমিয়ে যেতে থাকে। একা পড়ে থাকে স্টেডিয়াম, ভক্ত ফিরে যায় তার নিজস্ব জগতে, আমরা রূপান্তরিত হয় আমিত্বে। ভক্তরা চলে যায়, ভিড় ভেঙে যায়, ভাঙা মেলার বিষাদে হারিয়ে যায় দিন।

উগ্রভক্ত

উগ্রভক্ত হচ্ছে পাগলা গারদের থাকার উপযুক্ত ভক্ত। সকল প্রমাণকে নস্যাৎ করার কারিগর। স্রোতে ঘুরপাক খাওয়া ভাঙা জাহাজের মতো দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে তার আক্রোশ দেখিয়ে চলে।

এই উগ্রভক্ত স্টেডিয়ামে আসে দলীয় পতাকায় শরীর মুড়ে, অতি উত্তেজনায় কম্পমান এক পরাশক্তিরূপে! প্রিয় দলের জার্সির রঙে রাঙানো থাকে তার মুখ। যাওয়ার পথে যে উশৃঙ্খল আর হট্টগোলের চুড়ান্ত করে ফেলে। সে কখনো একা আসে না। বিপজ্জনক শতপদীর মতো একদল উগ্র জনতার সঙ্গে মিলে এই কাপুরুষ অন্যদের মাঝে আতঙ্ক ছড়ায়। বাকি সময়ে ভিতু এই লোকটি নিজেই হয়ে দাঁড়ায় ভয়াবহ। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে লোকটি যাপন করে আকাঙ্খাবিহীন জীবন। হয়তো সে জড়িত থাকে উচ্চাশাবিহীন কোনো পেশায়। অথচ এই লোকটিই সপ্তাহান্তের এই দিনটিতে নিজেকে ভাবতে থাকে সর্বশক্তিমান। একদিনের জন্যে মুক্তিপ্রাপ্ত এই লোকটির মনে সকল কিছুর প্রতি ঝরে পড়ে প্রতিহিংসা।

মৃগি রোগগ্রস্তের মতো, লোকটি মাঠের দিকে তাকিয়ে থেকেও ম্যাচটি দেখতে পায় না। গ্যালারিই তার রঙ্গমঞ্চ, তার যুদ্ধক্ষেত্র। স্রেফ প্রতিপক্ষের ভক্তের উপস্থিতিই তার মধ্যে অমার্জনীয় উস্কানি জাগিয়ে তোলে। শত্রু সবসময়ই দোষী, ধোলাই তার পাওনা। এমনকি যে নির্ঝঞ্ঝাট দর্শক শুধুমাত্র বলেছিলো ‘প্রতিপক্ষ তো ন্যায্যতার সঙ্গেই খেলছে’, তাকে মেরামত করাও আবশ্যকর্তব্য। আর এসবেই তার তৃপ্তি।

গোল

ফুটবলের ক্ষেত্রে গোল হচ্ছে অর্গাজমের মেতো। আধুনিক যুগের ফুটবলে গোল এই অর্গাজমের মতোই ক্রমাগত অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। অর্ধশতক আগেও গোলবিহীন ০-০ স্কোরের ম্যাচ ছিলো দুষ্প্রাপ্য। আর আজকের দিনে, গোটা ম্যাচ জুড়ে ১১ জন খেলোয়াড়ই গোল ঠেকানোর উদ্দেশ্য নিয়ে পারলে ক্রসবার ধরে ঝুলে থাকে। এর পরে আর গোল দেয়ার মতো সময় কই তাদের।

নেটে কাঁপুনি তুলে ঢুকে পড়া সাদা বুলেট যেই উন্মাদনা ছড়ায় তা রহস্যময় বা পাগলাটে মনে হতে পারে। কিন্তু এই অলৌকিক ঘটনা নিয়মিত ঘটে না। একটা সাধারণ গোলও দর্শক ও ভাষ্যকারদের মুখে ‘গোওওওওওওওওওওওওওল’ হয়ে উচ্চারিত হয়। বুকের গভীর থেকে উচ্চারিত এই আওয়াজে একজন অপেরা গায়কও স্তব্ধ হয়ে যাবে। এমনকি স্টেডিয়াম পর্যন্ত যেন ভুলে যায় সে কংক্রিটের তৈরি, মাটি থেকে নিজেকে মুক্ত করে ডানা মেলতে চায় আকাশে।

রেফারি

এ হলো একজন খামখেয়ালি লোক। এক নরাধম নিপীড়ক যে বিরোধী পক্ষ ছাড়াই নিজের স্বৈরশাসন চালিয়ে যায়। এক আত্মম্ভরী জল্লাদ যে নাটকীয় ভঙ্গিতে নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদর্শন করে চলে। দুই ঠোঁটের ফাঁকে বাঁশি গুঁজে অনিবার্য অদৃষ্টের শিঙ্গা ফুঁকে গোল ঘোষিত করে বা বাতিল করে দেয়। কার্ড হাতে নিয়ে সে সর্বনাশের রঙ ফোটায়। হলুদ রঙ দেখিয়ে পাপীকে শাস্তি দিয়ে অনুতাপ করতে বাধ্য করে। লাল রঙ দেখিয়ে তাকে পাঠায় বাধ্যতামূলক নির্বাসনে।

আর আছে লাইনসম্যান, যারা নিজেরা শাসন করে না। তারা শুধু পাশ থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে এবং শাসককে সহায়তা করে। শুধু রেফারিই মাঠে নামে। মাঠভর্তি জনতার সামনে প্রকাশ ঘটায় নিজের আত্মম্ভরিতার। তার কাজই হচ্ছে নিজেকে ঘৃণার পাত্রে পরিণত করা। ফুটবলের একমাত্র সার্বজনীন অনুভূতি হচ্ছে, ‘সবাই রেফারিকে ঘৃণা করে’। সে শুধুই টিটকারি পায়, হাততালির প্রাপ্তি তার জোটে না।

তার চাইতে বেশি কেউই দৌড়ায় না। তার শ্বাসের আওয়াজে বাইশটি খেলোয়াড়ের কান ঝালাপালা হয়ে যায়। এই লোকটি ম্যাচের পুরোটা সময় জুড়ে বিন্দুমাত্র না থেমে দৌড়াতে বাধ্য। ঘোড়ার মতো দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্তিতে তার পিঠ ভেঙে আসতে থাকে। অথচ তার এই যন্ত্রণার বিনিময়ে দর্শক তার মুণ্ডুপাত করে। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘামের নহর বইয়ে সে সাদা বলটার পিছে ছুটতে থাকে। অথচ বলটা তাকে অগ্রাহ্য করে বাকি সবার পায়ে পায়ে ঘোরে। খেলতে তো তারও ইচ্ছা হয়। কিন্তু সেই অধিকার তাকে কখনোই দেয়া হয় না। তবুও, সে শুধু ওই পবিত্র সবুজ ভূমিতে উপস্থিত থাকার আশায় শতো অপমান, টিটকারি, ঢিল এবং অভিশাপ সহ্য করে চলে।

কদাচিৎ হলেও, এক আধ সময় দর্শকেরা তার বিচারের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে। কিন্তু তখনও তার অক্ষত থাকার সুযোগ নেই। পরাজিত দল তার কারণেই হারে। বিজয়ীরা তাকে ছাড়াই জেতে। তার অস্তিত্ব যদি নাও থাকতো, ভক্তরা প্রয়োজনে সকল ভুলের বলির পাঁঠা বনিয়ে সকল দুর্ভাগ্যের দায় চাপাতে তাকে উদ্ভাবন করে নিতো। তারা যতোই তাকে ঘৃণা করতে থাকে, ততোই তাকে তাদের প্রয়োজন পড়ে।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একজন রেফারিকে পরে থাকতে হতো শোকের পোশাক। কার জন্যে? হয়তো তার নিজের জন্যেই। ইদানিংকালে সে রঙচঙে পোশাক পরে নিজের বেদনা গোপন করার সুযোগ পায়।