• Post author:
  • Reading time:10 mins read

লেখক: জো হিল, নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্টসেলিং লেখক

উৎসর্গ

আমার মা’কে—গল্পরানির জন্য একটা তুচ্ছ যন্ত্র

ডিসেম্বর ২০০৮, এফসিআই এঙ্গলউড, কলোরাডো

আটটা বাজার একটু আগে নার্স থর্নটন চার্লি ম্যাংক্সের জন্য রক্তের একটা উষ্ণ ব্যাগ নিয়ে লং-টার্ম-কেয়ার ওয়ার্ডে এসে ঢুকলেন। তিনি কাজ করছিলেন অনেকটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো। কাজে তার মন বসছিলো না। অবশেষে তিনি মনস্থির করলেন তার ছেলে জোসিয়াহকে তার শখের নিন্টেন্ডো ডিএসটা কিনে দেবেন। শিফট শেষ করে, টয়স ‘আর’ আস বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই সেখানে যেতে পারবেন কি না তার হিসাব করছিলেন। তিনি আদর্শগত কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে ছেলের আবদার উপেক্ষা করে আসছিলেন। জোসিয়াহর সব বন্ধুর একটা করে ডিএস থাকলেও তার কিছু আসে-যায় না। বাচ্চারা যে সবখানে হাতে-ধরা ভিডিও গেম নিয়ে ঘোরাঘুরি করে, এই ব্যাপারটাই তার ভালো লাগে না।

এলেন থর্নটন ছোট ছেলেদের বাস্তব দুনিয়া ভুলে আলো ঝলমলে পর্দার ভেতর দিয়ে কাল্পনিক জগতে ডুব দেয়াটাকে ঘৃণা করতেন; যে জগতে বিনোদন চিন্তার জায়গা কেড়ে নেয়, আর খুনের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করাটা একটা শিল্প হিসাবে ধরা হয়। তার শখ ছিলো তার একটা বাচ্চা থাকবে যে বই ভালোবাসবে, স্ক্র্যাবল খেলবে আর বরফের মাঝে জুতো পরে হাঁটার অভিযানে যাবে তার সঙ্গে। ভাগ্যের কী পরিহাস!

এলেন তার প্রতিরোধ ধরে রেখেছিলেন, যতোক্ষণ সম্ভব ছিলো তার পক্ষে। এরপর, গতকাল বিকালে তিনি জোসিয়াহকে দেখলেন, সে তার বিছানায় বসে একটা পুরনো ওয়ালেট নিয়ে নিন্টেন্ডো ডিএস মনে করে খেলছে। ডংকি কংয়ের একটা ছবি কেটে নিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের স্লিভের ভেতর, যেখান থেকে ছবি দেখা যায়। কাল্পনিক বোতাম চেপে বিস্ফোরণের শব্দ করছিলো সে। বড়দিনে যেটা পাবে বলে জোসিয়াহ নিশ্চিত ছিলো, সেটা ইতোমধ্যেই পেয়ে যাওয়ার ভান করতে দেখে তিনি খানিকটা মর্মাহত হলেন। কোন জিনিসটা ছেলেদের জন্য ভালো আর কোনটা খারাপ তা নিয়ে এলেনের নিজস্ব তত্ত্ব থাকতে পারে। কিন্তু সান্তাকেও তার সঙ্গে একমত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

খাটের পাশ দিয়ে আইভি র‍্যাকের কাছে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অন্যমনস্ক থাকায় তিনি চার্লি ম্যাংক্সের মধ্যে কোনো পরিবর্তন খেয়াল করেননি। ঠিক তখনই ম্যাংক্স গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, যেন সে অবসন্ন। এলেন চোখ নামিয়ে দেখলেন ম্যাংক্স তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে আছে। ম্যাংক্সকে খোলা চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি এতোটাই ঘাবড়ে উঠলেন যে তার হাত থেকে রক্তের ব্যাগটা লাফিয়ে উঠলো। আরেকটু হলেই সেটা পড়ে যাচ্ছিলো তার পায়ের ওপর।

সে ছিলো বিশ্রীরকমের বৃদ্ধ, বিশ্রী বলাই বাহুল্য। তার বিশাল টাক মাথাটা যেন এক ভিনগ্রহী চাঁদের মানচিত্র, যেখানে বার্ধ্যকের ছোপ আর ক্ষত-রঙের সার্কোমাগুলো একেকটা মহাদেশ। লং-টার্ম-কেয়ার ওয়ার্ডের—যার আরেক নাম সবজির খামার, সমস্ত রোগীর মধ্যে, বছরের এই সময়টায় চার্লি ম্যাংক্সের চোখ খোলার ব্যাপারটাতে ভয়াবহ কিছু একটা ছিলো। ম্যাংক্স বাচ্চাদের পছন্দ করতো। নব্বইয়ের দশকে অনেকগুলো বাচ্চাকে সে গায়েব করে দিয়েছে। ফ্ল্যাট আয়রন্সের নিচে তার একটা বাড়ি ছিলো। যেখানে সে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে তার যা ইচ্ছে তাই করতো। তাদের খুন করতো, তাদের স্মরণে বড়দিনের গয়না ঝুলিয়ে রাখতো। পত্রিকাগুলো জায়গাটার নাম দিয়েছিলো স্লেই হাউজ। হো, হো, হো।

বেশিরভাগ সময়েই এলেন তার মাতৃসত্ত্বাকে কাজের সময়ে দূরে সরিয়ে রাখতে পারতেন। চার্লি ম্যাংক্স তার সামনে আসা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কী করেছিলো সে চিন্তা থেকে নিজের মনকে সরিয়ে রাখতে পারতেন। সেই বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর বয়স তার জোসিয়াহর থেকে মোটেও বেশি না। এলেন তার অভিযোগের ফল নিয়ে মোটেও ভাবতেন না, যদি তার পক্ষে সম্ভব হতো। রুমের ওপাশে থাকা রোগী তার বান্ধবী আর তার দুই বাচ্চাকে বেঁধে, ঘরে আগুন জ্বালিয়ে তাদের পুড়িয়ে মেরেছিলো। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো রাস্তার ধারের এক বার থেকে। সেখানে সে বুশমিলস খেতে খেতে রেঞ্জার্সের বিপক্ষে হোয়াইট সক্সের খেলা দেখছিলো। এলেন বুঝতেন না এসব মনে করে তার কী লাভ। কাজেই তিনি নিজেকে শিখিয়েছিলেন তার রোগীদেরকে তাদের সঙ্গে লাগানো যন্ত্র আর ড্রিপ ব্যাগের বর্ধিতাংশ হিসাবে ভাবতে: মাংসের ইন্দ্রিয়।

এফসিআই এঙ্গলউডে, সুপারম্যাক্স জেল হাসপাতালে কাজ করার পুরো সময়টাতে এলেন কখনো চার্লি ম্যাংক্সকে চোখ খুলে থাকতে দেখেননি। তিনি তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। আর এই পুরো সময়টা ম্যাংক্স কোমায় ছিলো। এলেনের রোগীদের মধ্যে তার অবস্থাই সবচেয়ে করুণ। জরাজীর্ণ চামড়ার নিচে কয়েকটা হাড় ছাড়া আর কিছুই নেই। তার হৃদপিণ্ড চলতো ধীরে। চলতে থাকা একটা মেট্রোনোমের মতো, যতোটা ধীর হওয়া সম্ভব। ডাক্তার বলেছেন তার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা মোটেও একটা ক্রিমড কর্নের ক্যানের থেকে বেশি না। কেউ বলতে পারে না তার কতো বয়স, কিন্তু তাকে দেখতে কিথ রিচার্ডসের থেকেও বৃদ্ধ লাগতো। এমনকী তার চেহারাও খানিকটা কিথ রিচার্ডসের মতোই—টাক মাথার কিথ, যার মুখে কেবল খয়েরি রঙের কয়েকটা ছোট ছোট তীক্ষ্ণ দাঁত অবশিষ্ট।

ওয়ার্ডে আরো তিনজন কোমায় যাওয়া রোগী ছিলো। হাসপাতাল-কর্মীরা যাদের ডাকতো ‘গর্ক’। এদের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটালে বোঝা যেতো, প্রত্যেক গর্কেরই কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। ডন হেনরি, যে লোকটা তার বউ-বাচ্চাদের পুড়িয়ে মেরেছিলো, মাঝেমধ্যে ‘হাঁটতে’ যেতো। সে অবশ্য বিছানা ছেড়ে উঠতো না। কিন্তু তার পা দুটো চাদরের নিচে দুর্বলভাবে হাঁটার তালে নড়াচড়া করতো। লেনার্ড পটস নামে আরেক লোক পাঁচ বছর ধরে কোমায় ছিলো, যার আর ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। আরেক কয়েদি তার খুলি চিরে একটা স্ক্রু-ড্রাইভার একদম মস্তিষ্কে বিঁধিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু কখনো কখনো সে এমনভাবে গলা খাঁকারি দিয়ে চেঁচিয়ে উঠতো ‘আমি জানি!’, যেন সে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দেয়া এক ছোট্ট শিশু। হয়তো চোখ খোলাটাই ছিলো ম্যাংক্সের বৈশিষ্ট্য, এলেন আগে কখনো খেয়াল করেননি।

‘হ্যালো, মিস্টার ম্যাংক্স!’ এলেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বললেন। ‘কেমন লাগছে আজ আপনার?’

তিনি অর্থহীন এক হাসি হেসে ইতস্তত করলেন। তার হাতে এখনও দেহ-তাপমাত্রার রক্তের ব্যাগটা ধরা। তিনি কোনো উত্তরের আশা করছিলেন না। কিন্তু তার মনে হয়েছিলো ম্যাংক্সকে তার অনুপস্থিত ভাবনাগুলো জড়ো করতে কিছুটা সময় দেয়া উচিত। যখন সে কিছু বললো না, এলেন এক হাত দিয়ে তার চোখের পাতা বন্ধ করতে সামনে ঝুঁকলেন।

ম্যাংক্স তার হাতটা ধরে ফেললো। এলেন চেঁচিয়ে উঠলেন, সামলাতে না পেরে রক্তের ব্যাগটা তার হাত থেকে পড়ে গেলো। মেঝেতে বাড়ি খেয়ে গোলাপি একটা বিস্ফোরণের মতো ছড়িয়ে গেলো চারদিকে। উষ্ণ রক্ত ছিটকে এসে ভিজিয়ে দিলো তার পায়ের পাতা।

       ‘আহ!’ তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘আহ! আহ! ও ঈশ্বর!’

       টাটকা তরল লোহার মতো গন্ধ তাঁর নাকে এসে লাগলো।

‘তোমার ছেলে, জোসিয়াহ’, চার্লি ম্যাংক্স তাকে বললো। তাঁর কর্কশ কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে আসছিলো। ‘ক্রিসমাসল্যান্ডে তার জন্য জায়গা খালি আছে, অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে। আমি ওকে একটা নতুন জীবন দিতে পারি। দিতে পারি ঝকঝকে নতুন দাঁত।’

ম্যাংক্সের মুখে ছেলের নাম শোনাটা ছিলো কব্জির ওপর ম্যাংক্সের হাত বা রক্তে ভেজা পায়ের থেকেও ভয়ংকর। (পরিষ্কার রক্ত, নিজেকে বললেন তিনি, পরিষ্কার) দণ্ডপ্রাপ্ত এই খুনী আর শিশু-নিপীড়কের মুখে নিজের ছেলের কথা শুনে তার মাথা প্রচণ্ড রকম ঘুরতে শুরু করলো, যেন তিনি কাচের একটা লিফটে দাঁড়িয়ে তীব্রগতিতে ছুটে যাচ্ছেন আকাশের দিকে। আর পুরো পৃথিবীটা তার পায়ের নিচ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

‘ছাড়ুন’, ফিসফিসিয়ে বললেন তিনি।

‘ক্রিসমাসল্যান্ডে জোসিয়াহ জন থর্নটনের জন্য জায়গা খালি আছে, আর তোমার জন্য জায়গা আছে ঘুমঘরে’, চার্লি ম্যাংক্স বললো। ‘গ্যাসমাস্ক ম্যান জানে তোমাকে নিয়ে কী করতে হবে। জিঞ্জারব্রেডের ধোঁয়া দিয়ে তোমাকে শেখাবে তাকে ভালোবাসতে। ক্রিসমাসল্যান্ডে তোমাকে নিয়ে আসা সম্ভব না। আনতে পারতাম, কিন্তু গ্যাসমাস্ক ম্যানই তোমার জন্য ভালো হবে। গ্যাসমাস্ক ম্যান একটা দয়াবতার।’

‘বাঁচাও’, এলেন চেঁচিয়ে উঠলেন। কিন্তু তাঁর আর্তনাদ চিৎকার হয়ে বেরোলো না। বেরোলো ফিসফিসানি হয়ে। ‘বাঁচাও আমাকে।’ তিনি গলায় জোর খুঁজে পেলেন না।

‘আমি জোসিয়াহকে দেখেছি সম্ভাবনার কবরস্থানে। জোসিয়াহর একবার রেইথে চড়া উচিত। ও ক্রিসমাসল্যান্ডে চিরসুখে থাকবে। পৃথিবী সেখানে তাকে ধ্বংস করতে পারবে না, কারণ ক্রিসমাসল্যান্ড পৃথিবীতে নেই। আছে আমার মাথার ভেতর। আমার মাথার ভেতরে তারা সবাই নিরাপদ। জানো, আমি এটা নিয়ে স্বপ্ন দেখছি। ক্রিসমাসল্যান্ড। আমি ক্রিসমাসল্যান্ডকে স্বপ্নে দেখি, কিন্তু যতোই হাঁটি সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো হয় না। আমি শুনি বাচ্চারা গান গাইছে। কিন্তু ওদের কাছে যেতে পারি না। আমি শুনতে পাই ওরা আমার নাম ডেকে চিৎকার করছে। কিন্তু সুড়ঙ্গটা আর শেষই হয় না। আমার রেইথ দরকার। রেইথে চড়া দরকার।’

তার খয়েরি পিচ্ছিল নোংরা জিভটা বেরিয়ে এলো মুখ থেকে, ভিজিয়ে নিলো তার শুষ্ক ঠোঁট। এরপর সে এলেনকে ছেড়ে দিলো।

‘বাঁচাও’,’’ এলেন ফিসফিস করলেন। ‘বাঁচাও, বাঁচাও, বাঁচাও’, তাকে আরও কয়েকবার কথাটা বলতে হলো। তারপর তিনি সবাইকে শোনানোর মতো করে বলার শক্তি পেলেন। এরপর নরম চ্যাপ্টা জুতো পায়ে তিনি দরজা দিয়ে বেরিয়ে ছুটে গেলেন হল ধরে, বুকের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করতে করতে। পেছনে ফেলে গেলেন টকটকে লাল পায়ের ছাপ।

দশ মিনিট পর রায়ট গিয়ারের দুজন অফিসার ম্যাংক্সকে খাটের সাথে বেঁধে ফেললেন। যেন  সে আবার চোখ খুলে উঠে বসার চেষ্টা করতে না পারে। কিন্তু পরে যে ডাক্তার তাকে দেখতে এলেন, তিনি বললেন ম্যাংক্সের বাঁধন খুলে দিতে।

‘এই লোক ২০০১ থেকে বিছানায় শুয়ে আছে। তাকে দিনে চারবার করে পাশ ফিরিয়ে দিতে হবে যাতে তার শরীরে কোনো ক্ষত না হয়। যদি সে কোমায় নাও থাকতো, তবুও সে এতোই দুর্বল যে তার পক্ষে কোথাও যাওয়া সম্ভব না। সাত বছর ধরে পেশি যেভাবে ক্ষয় হয়েছে, নিজে থেকে উঠে বসতে পারে কি না সন্দেহ।’

এলেন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন—তিনি ঠিক করে রেখেছেন, যদি আবার ম্যাংক্স চোখ খোলে তাহলে তিনিই সবার আগে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু ডাক্তারকে এই কথাটা বলতে শুনে তিনি শক্ত পা টেনে এসে ডান হাতের কব্জি থেকে হাতা গুটিয়ে ক্ষতচিহ্নটা দেখালেন, যেখানটা ম্যাংক্স ধরে রেখেছিলো।

‘কী মনে হয়, উঠে বসার ক্ষমতা নেই এমন কেউ এটা করেছে? মনে হচ্ছিলো কাঁধ থেকে আমার হাতটা টেনে খুলেই ফেলবে।’ তার পা দুটো আহত হাতটার মতোই জ্বলছিলো। তিনি রক্তে ভেজা প্যান্টিহোজটা খুলে গরম পানি আর অ্যান্টিবায়োটিক সাবান দিয়ে পা ধুয়ে ফেলেছিলেন। এখন তিনি জিম স্নিকার্স পরে আছেন। অন্য জুতোগুলো পড়ে আছে আবর্জনার মধ্যে। যদি সেগুলোকে বাঁচানোও যেতো, তার মনে হয় না তিনি আবার কখনো সেগুলোকে পরতে পারতেন।

প্যাটেল নামের তরুণ ভারতীয় ডাক্তার লজ্জিত, ক্ষমাপ্রার্থী দৃষ্টিতে এলেনের দিকে তাকালেন, এরপর সামনে ঝুঁকে ফ্ল্যাশলাইট ফেললেন ম্যাংক্সের চোখে। চোখের মণি বড় হলো না। প্যাটেল ফ্ল্যাশলাইটটাকে সামনে-পেছনে দোলাতে থাকলেন। কিন্তু ম্যাংক্সের চোখ প্যাটেলের বাম কানের ঠিক পেছনে একটা বিন্দুতেই স্থির রইলো। ডাক্তার ম্যাংক্সের নাক থেকে এক ইঞ্চি দূরে হাততালি দিলেন। ম্যাংক্স চোখের পাতা ফেললো না। প্যাটেল আস্তে করে ম্যাংক্সের চোখের পাতা নামিয়ে দিয়ে চলতে থাকা ইকেজি এর পাঠ পড়ে দেখলেন।

‘এর আগে বারোবার ইকেজিতে যা পাওয়া গেছে এবারও তার থেকে আলাদা কিছু আসেনি’, প্যাটেল বললেন। ‘গ্লাসগো স্কেলে রোগীর স্কোর নয়, আলফা কোমায় সাধারণত যেমন থাকে তেমন একটা ধীর আলফা-তরঙ্গ কার্যক্রম পাওয়া গেছে। আমার মনে হয় সে কেবল ঘুমের মাঝে কথা বলছিলো, নার্স। এই লোকের মতো গর্কদের বেলায় এমনটা হয়েই থাকে।’

‘তার চোখগুলো খোলাছিলো’, এলেন বললেন। ‘ঠিক আমার দিকেই তাকিয়েছিলো। আমার নাম জানে। আমার ছেলের নাম জানে।’

প্যাটেল বললেন, ‘তার পাশে থাকতে অন্য কোনো নার্সের সঙ্গে কখনো কথাবার্তা বলেছেন? বলা যায় না, লোকটার অবচেতন মন হয়তো কিছু একটা ধরে ফেলেছে। আপনি হয়তো আরেক নার্সকে বললেন, ‘ও, জানো, আমার ছেলে এইমাত্র স্পেলিং বি জিতেছে।’ ম্যাংক্স হয়তো তখন শুনেছে, এরপর স্বপ্ন দেখার মাঝে নামটা বলে ফেলেছে।’

এলেন মাথা নাড়লেন, কিন্তু তার মাথার একটা অংশে চিন্তা চলতে থাকলো। সে জোসিয়াহর মাঝের নাম জানে। তিনি নিশ্চিত ছিলেন হাসপাতালে কাউকেই তিনি মাঝের নামটা বলেননি। ক্রিমসমাসল্যান্ডে জোসিয়াহ জন থর্নটনের জন্য একটা জায়গা আছে, চার্লি ম্যাংক্স তাকে বলেছিলো। আর তোমার জন্য জায়গা রাখা আছে ঘুমের ঘরে। ‘তাকে রক্ত দেয়া হয়নি’, এলেন বললেন। ‘দুই সপ্তাহ ধরে সে রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। ক্যাথেটার থেকে মূত্রনালীতে সংক্রমণ হয়েছে। যাই নতুন এক ব্যাগ নিয়ে আসি।’

‘দরকার নেই। বুড়ো ভ্যাম্পায়ারটার জন্য রক্তের ব্যবস্থা আমি করছি। দেখুন। আপনার ছোট একটা ভয়ের অভিজ্ঞতা হলো। ভুলে গিয়ে বাড়ি যান। আপনার শিফট আর কতোক্ষণ বাকি, এক ঘণ্টা? আজ আপনার ছুটি। আগামীকাল দিনটাও ছুটিতে থাকুন। শেষমুহূর্তের কোনো কেনাকাটা বাকি আছে? সেরে ফেলুন। এসব ভুলে খানিকটা বিশ্রাম নিন। বড়দিন এসে গেছে, নার্স থর্নটন।’ ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন। ‘জানেন না বছরের সবচেয়ে সুন্দর সময় এটা?’

শর্টার ওয়ে

১৯৮৬-১৯৮৯

হ্যাভারহিল, ম্যাসাচুসেটস

দস্যি মেয়েটা প্রথমবারের মতো যখন লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডের মাঝের ছাউনি-ঢাকা সেতুর ওপর দিয়ে গিয়েছিলো, তার বয়স তখন ছিলো আট বছর।

ঘটনাটা ঘটেছিলো এভাবে- তারা সবেমাত্র লেক থেকে ফিরেছিলো, আর দস্যি মেয়েটা তার বেডরুমে বসে ডেভিড হ্যাসেলহফের পোস্টার লাগাচ্ছিলো। কালো চামড়ার জ্যাকেট, গালে টোলপড়া হাসি, K.I.T.T. এর সামনে আড়াআড়ি হাত রাখা। এমন সময় সে হঠাৎ তার বাবা-মায়ের বেডরুম থেকে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলো।

দস্যি মেয়েটা খাটের মাথার ওপর এক পা রেখে, বুক দিয়ে পোস্টারটা দেয়ালে ঠেসে ধরে কোণাগুলো বাদামি টেপ দিয়ে আটকে দিচ্ছিলো। সে থমকে গিয়ে মাথা কাত করে শোনার চেষ্টা করলো। তবে ভয়ে নয়। শুধু এই ভেবে অবাক হচ্ছিলো তার মা আবার কী নিয়ে রাগারাগি করছে। শুনে মনে হলো মা কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে।

‘—ছিলো, আমি জানি ওটা আমার কাছে ছিলো!’ মা চেঁচিয়ে উঠলেন।

‘তুমি কি পানির কাছে থাকতে ওটা খুলেছিলে? লেকে নামার আগে?’ ক্রিস ম্যাককুইন জিজ্ঞেস করলো। ‘গতকাল বিকালে?’

       ‘আমি ইতোমধ্যেই বলেছি তোমাকে, আমি সাঁতার কাটতে যাইনি।’

       ‘কিন্তু তুমি হয়তো সানট্যান লোশন লাগানোর আগে ওটা খুলেছিলে।’

তারা এই কথাগুলোই ঘুরেফিরে বারবার বলতে থাকলো। কিন্তু দস্যি মেয়েটা ঠিক করলো তাদের কথায় আর কান দেবে না। আট বছর বয়সে দস্যি মেয়েটা—সেকেন্ড গ্রেড টিচারের কাছে ভিক্টোরিয়া, মায়ের কাছে ভিকি, কিন্তু বাবার কাছে এবং নিজের হৃদয়ে দস্যি মেয়ে। মায়ের চেঁচামেচিতে ঘাবড়ে যাওয়ার দিন অনেক আগেই পার করে এসেছে। লিন্ডা ম্যাককুইনের হাসির ফোয়ারা আর হতাশার অতি-উত্তেজিত কান্না দস্যি মেয়েটার নিত্যদিনের জীবনেরই অংশ, বেশিরভাগ সময়ইসেগুলো গুরুতর কিছু ছিলো না।

মেয়েটা পোস্টারটা সমানভাবে বিছিয়ে টেপ লাগানো শেষ করলো। এরপর পিছিয়ে এসে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখলো। ডেভিড হ্যাসেলহফ; কতো অসাধারণ। সে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কোথাও আঁকাবাঁকা আছে কি না। এমন সময় সে জোরে দরজা বাড়ি খাওয়ার শব্দ শুনলো। সঙ্গে আরেকটা আর্তনাদ—আবার তার মা—এরপর তার বাবার কণ্ঠস্বর।

       ‘আমি কি জানতাম না আমরা এদিকেই এগোচ্ছি?’ বাবা বললো। ‘একদম ঠিক সময়ে।’

       ‘আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি বাথরুমে খুঁজে দেখেছো কি না, তুমি বলেছিলে তুমি দেখেছো। তুমি বলেছিলে তুমি সবদেখেছো। তুমি কি বাথরুমে খুঁজেছো?’

       ‘জানি না। না। সম্ভবত না। কিন্তু তাতে কিছু আসে-যায় না কারণ তুমি ওটা বাথরুমে ফেলে যাওনি, লিন্ডা। তুমি কি জানো, আমি কেন জানি তুমি তোমার ব্রেসলেটটা বাথরুমে রেখে যাওনি? কারণ তুমি ওটা সৈকতেরেখে এসেছো গতকাল। তুমি আর রেজিনা রোসন গায়ে রোদ লাগিয়ে আর এক বালতি মার্গারিটা গিলে এতোটাই আরামে ছিলে, তোমার যে একটা মেয়ে আছে সেটা ভুলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে। এরপর ঘুম থেকে উঠে যখন টের পেলে ওকে ডে ক্যাম্প থেকে নিয়ে আসতে তোমার এক ঘণ্টা দেরি হয়ে যাবে—’

       ‘আমার এক ঘণ্টা দেরি হয়নি।’

       ‘—তখন তুমি ঘাবড়ে গিয়ে চলে গেলে। তুমি ফেলে এসেছো তোমার সানট্যান লোশন, ফেলে এসেছো তোমার তোয়ালে, ফেলে এসেছো তোমার ব্রেসলেট, আর এখন—’

       ‘আমি মাতালও ছিলাম না, যদি সেটা ভেবে থাকো। আমি মাতাল অবস্থায় মেয়েকে নিয়ে গাড়ি চালাই না, ক্রিস। ওটা তোমার স্বভাব—’

       ‘—আর এখন তুমি সবসময়ের মতো চেঁচামেচি করে অন্যের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছো।’

       দস্যি মেয়েটা খেয়াল করলো না যে সে ম্লান আলোর ফ্রন্ট হল ধরে ধীরে ধীরে তার বাবা-মার বেডরুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দরজাটা প্রায় আধফুট খোলা, বাবা-মার বিছানার একটা অংশ আর তার ওপরে রাখা সুটকেসটা দেখা যাচ্ছে। সুটকেস থেকে জামা-কাপড় বের করে মেঝের ওপর চারদিকে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। দস্যি মেয়েটা জানতো তার মা প্রচণ্ড উত্তেজনায় জিনিসপত্র এদিক ওদিক ছুঁড়ে হারানো ব্রেসলেটটা খুঁজছে। ব্রেসলেটটায় একটা সোনালি বৃত্তের ওপর চকচকে নীলা আর বরফকুচির মতো হীরার একটা প্রজাপতি বসানো।

তার মা সামনে-পেছনে পায়চারী করতে থাকলো। কাজেই দস্যি মেয়েটা বেডরুমের দরজার ফাঁকে কয়েক সেকেন্ড পর পর মার ভেসে ওঠা চেহারা দেখতে পেলো।

‘এর সঙ্গে গতকালকের কোনো সম্পর্কই নেই। আমি তোমাকে বলেছি আমি ব্রেসলেটটা সৈকতে হারাইনি। আজকে সকালেই ওটা সিংকের পাশে ছিলো, আমার কানের দুলগুলোর ঠিক পাশেই। যদি ওটা ফ্রন্ট ডেস্কে ওদের কাছে না থাকে তাহলে কোনো এক কাজের মেয়ে ওটা নিয়েছে। ওরা এসবই করে বাড়তি রোজগারের জন্য। গ্রীষ্মে বেড়াতে আসা মানুষ যা ফেলে যায় তাই কুড়িয়ে নেয়।’

দস্যি মেয়েটার বাবা খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো। এরপর বললো, ‘জিসাস। ভেতরে ভেতরে কতো জঘন্য একটা মানুষ তুমি। আর আমি কি না তোমার সাথে আমার বাচ্চা নিলাম।’

দস্যি মেয়েটা শিউরে উঠলো। প্রচণ্ড কাঁপুনি দিয়ে একটা উষ্ণতা উঠে এলো তার চোখের পেছনে, কিন্তু সে কাঁদলো না। তার দাঁতগুলো ঠোঁটের ওপর উঠে এসে গভীরে ডুবে গেলো, এমন একটা কনকনে ব্যথার জন্ম দিলো যেটা তার চোখের পানিকে আটকে রাখলো।

তার মা এমন কোনো প্রতিরোধ না দেখিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। সে আবার দৃষ্টিসীমায় ভেসে উঠলো, এক হাত মুখের ওপর চাপানো, কাঁধগুলো ঝাঁকুনি খাচ্ছে। দস্যি মেয়েটা চাইছিলো না তাকে কেউ দেখে ফেলুক, তাই সে হলওয়ে ধরে পিছু হটলো।

নিজের রুম পেরিয়ে করিডর হয়ে সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো সে। বাসার ভেতরে থাকার কথা ভাবতেই তার অসহ্য লাগছিলো। ঘরের ভেতর একদম বাসি একটা গন্ধ। এক সপ্তাহ ধরে এয়ার কন্ডিশনারটা কাজ করছে না। সবগুলো গাছ মরে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

সেখানে গিয়ে পৌঁছানোর আগে তার কোনো ধারণা ছিলো না সে কোথায় যাচ্ছে। যদিও যেই মুহূর্তে সে তার বাবাকে বিশ্রী কথাটা বলতে শুনেছে—ভেতরে ভেতরে কতো জঘন্য একটা মানুষ তুমি—তখন থেকে তার গন্তব্য অনিবার্য। গ্যারেজের সাইড ডোর দিয়ে ঢুকে নিজের র‍্যালি টাফ বার্নারটার কাছে গেলো সে।

র‍্যালি টাফ বার্নারটা সে মে মাসে জন্মদিনের উপহার হিসেবে পেয়েছে। এটাই তার সারা জীবনে পাওয়া জন্মদিনের সমস্ত উপহারের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়…তখনকার, এবং চিরদিনের জন্য। এমনকি তার বয়স যখন তিরিশ হবে, তার ছেলে যখন তাকে জিজ্ঞেস করবে তার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর জিনিস কোনটা, তখনও হলদে রিম আর চ্যাপ্টা টায়ারের এই ডে-গ্লো নীল র‍্যালি টাফ বার্নারটার কথাই মনে আসবে তার। এটা তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস; তার ম্যাজিক ৮ বল, তার কিস কালারফর্মস সেট, এমনকী তার কোলিকোভিশনের থেকেও।

সে বাইকটা দেখেছিলো শহরের কেন্দ্রে প্রো হুইলজের জানালায়, তার জন্মদিনের তিন সপ্তাহ আগে, যখন সে তার বাবার সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিলো। জিনিসটা দেখে সে বড় করে একটা ওওহ শব্দ করেছিলো। তার বাবা খুশি হয়ে তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়েছিলো। ডিলারের সঙ্গে কথা বলে শোরুমের ভেতরে তাকে বাইক চালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। বিক্রয়কর্মী মেয়েটাকে বারবার অনুরোধ করছিলো অন্য বাইকগুলো দেখার জন্য, তার মনে হচ্ছিলো সিট একদম নিচুতে নামিয়ে দিলেও টাফ বার্নারটা মেয়েটার জন্য খুব বেশি বড়। মেয়েটা বুঝতে পারেনি লোকটা কীসের কথা বলছিলো। জিনিসটা জাদুর মতো; সে একটা ঝাড়ুতে চড়ে অনায়াসে হ্যালোউইনের অন্ধকার চিরে উড়ে যেতে পারতো, মাটি থেকে হাজার ফুট উঁচুতে। তার বাবা অবশ্য দোকানদারের কথায় রাজি হওয়ার ভান করেছিলো, আর ভিককে বলেছিলো সে আরও বড় হলে এমন কিছু একটা পেতে পারে।

তিন সপ্তাহ পর বাইকটা চলে এলো ড্রাইভওয়েতে, হাতলের ওপর একটা সাদা রূপালি ফিতা লাগানো। ‘তুমি এখন আরও বড়, তাই না?’ বলে তার বাবা চোখ টিপেছিলো।

ভিক গ্যারেজের ভেতর ঢুকে পড়লো, তার বাবার বাইকের বামপাশে টাফ বার্নারটা দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা ছিলো। বাবার বাইকটা বাইসাইকেল না, একটা কালো ১৯৭৯ হার্লি-ডেভিডসন শোভেলহেড, যেটাতে চড়ে বাবা এখনও গ্রীষ্মে কাজ করতে যায়। ভিকের বাবা একজন বিস্ফোরণকর্মী, একটা রোড ক্রুয়ের অংশ হিসেবে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক দিয়ে পাহাড় ভাঙে সে। বেশিরভাগ সময়ই অ্যানফো দিয়ে, কখনো একদম টিএনটি। সে একবার ভিককে বলেছিলো, শুধুমাত্র একজন বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষেই সম্ভব নিজের বদভ্যাস থেকে লাভ করা। যখন ভিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিল এর অর্থ কী, সে বলেছিলো যেসব মানুষ বোমা ফাটায় তাদের বেশিরভাগই হয় টুকরো টুকরো হয়ে যায় না হয় জেলে যেতে হয়। কিন্তু তার বেলায় সে বছরে ষাট হাজার ডলার কামায়, আর কোনো দুর্ঘটনায় যদি অঙ্গহানি হয় তো আরো ভালো; তার বিশাল একটা জীবন বীমা প্যাকেজ আছে। শুধু কড়ে আঙ্গুলটা উড়ে গেলেও তার দাম বিশ হাজার ডলার। তার মোটরসাইকেলে ছিলো এয়ারব্রাশে পেইন্টে আঁকা একটা ছবি, আগুনের সামনে আমেরিকান-পতাকার বিকিনি-পরা, হাস্যকর রকমের যৌনাবেদনময়ী, সোনালি চুলের এক তরুণী দুই পা ছড়িয়ে একটা বোমার ওপর বসে আছে। ভিকের বাবা কারো পরোয়া করতো না। অন্য বাবারা জিনিসপত্র তৈরি করতো। ভিকের বাবা পাহাড়-পর্বত উড়িয়ে দিয়ে হার্লিতে চড়ে ঘুরে বেড়াতো, সিগারেট দিয়ে ফিউজ ধরিয়ে। তার কোনো তুলনা নেই।

দস্যি মেয়েটার অনুমতি ছিলো পিটম্যান স্ট্রিট উডসের পথ ধরে র‍্যালিতে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর। পিটম্যান স্ট্রিট উডস ছিলো তাদের বাড়ির পেছনের সীমানা পেরিয়ে তিরিশ-একরের স্ক্রাব পাইন আর বার্চ ঘেরা জায়গাটার অনানুষ্ঠানিক নাম। মেয়েটার মেরিম্যাক নদী আর ছাউনি-ঢাকা সেতু পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি ছিলো, এরপর তাকে ফিরতে হতো।

ছাউনি-ঢাকা সেতুটার ওপারে, যার আরেক নাম শর্টার ওয়ে ব্রিজ, জঙ্গল আরো সামনে এগিয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু ভিকের সেতু পার হওয়া নিষেধ ছিলো। শর্টার ওয়ে ছিলো সতেরো বছরের পুরনো, তিনশো ফুট লম্বা, মাঝখানটা ঝুলে পড়তে শুরু করেছিলো। এর দেয়ালগুলো ছিলো নদীর দিকে ঢালু, দেখে মনে হতো দমকা বাতাসেই সেতুটা ভেঙে পড়বে। একটা শেকলের বেড়া দিয়ে সেতুর প্রবেশপথটা বন্ধ করা ছিলো, অবশ্য বাচ্চারা এক কোণায় ইস্পাতের তার গলে ভেতরে ঢুকে গাঁজা আর চুমু খেতো। বেড়ার ওপর টিনের সাইনবোর্ডে লেখা হ্যাভারহিল পিডি কর্তৃক অনিরাপদ ঘোষণা করা হলো। জায়গাটা ছিলো অপরাধী, ভবঘুরে আর মানসিক বিকারগ্রস্তদের আড্ডাখানা।

ভিক অবশ্য এখানে আগেও এসেছে (সে কোন শ্রেণিতে পড়ে সে আলাপে না যাওয়াই ভালো), বাবা অথবা অনিরাপদ সাইনবোর্ডের দেখানো ভয়ভীতি উপেক্ষা করে। সাহস করে বেড়া গলে দশ কদম সামনে এগিয়েছিলো। দস্যি মেয়েটা কখনোই কোনো বাজি থেকে পিছিয়ে আসতে পারেনি, এমনকি নিজের সঙ্গে ধরা বাজি থেকেও না। বিশেষত নিজের সঙ্গে ধরা বাজি থেকে না।

ওখানে ছিলো আরও পাঁচ ডিগ্রি ঠান্ডা, পাটাতনের মাঝের ফাঁকগুলো তাকিয়ে ছিলো এক শ ফুট নিচের বাতাস-ছুঁয়ে-যাওয়া পানির দিকে। কালো টার-পেপারের ছাদের ছিদ্রগুলো থেকে ধুলোভর্তি আলোর রেখা এসে ঢুকছিলো। অন্ধকারের মধ্যে থেকে বাদুড়েরা জ্বলজ্বল চোখে তাকাচ্ছিলো।

শুধু একটা নদীই না, বরং স্বয়ং মৃত্যুর ওপর সেতু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা ছায়াঢাকা সুড়ঙ্গটা ধরে হেঁটে যেতে যেতে ভিকের শ্বাস-নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠলো। আট বছর বয়সী ভিক বিশ্বাস করতো সে যে কোনো কিছুর থেকে বেশি দ্রুত, এমনকি একটা সেতুধসের থেকেও। কিন্তু তার এই বিশ্বাসে খানিকটা চিড় ধরলো যখন সে আসলেই ছোট ছোট পা ফেলে ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দ-তোলা জরাজীর্ণ কাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে শুরু করলো। সে দশ কদম না, বরং বিমকদম সামনে এগিয়ে গেলো। অবশ্য প্রথম যখন জোরে পপ করে শব্দ হলো তখন সে খরগোশের মতো পেছন দৌড়ে শেকলের বেড়ার নিচে চলে এলো। তার মনে হচ্ছিলো হৃদপিণ্ডটা গলার কাছে চলে এসেছে, দম আটকে মারা যাবে এখনই।

এবার সে বাইকটা ঘুরিয়ে দিলো বাড়ির পেছনের উঠোনের দিকে। পরের মুহূর্তেই সে নেমে এলো পাথর আর শেকড় ডিঙিয়ে জঙ্গলের মাঝে। বাড়ি থেকে দূরে সরে গিয়ে সে সোজা ঢুকে পড়লো তার বানানো একটা নাইট রাইডার গল্পের ভেতর।

সে ছিলো নাইট ২০০০ এ। তারা ঘুরে বেড়াচ্ছিলো, গাছে চড়ছিলো অনায়াসে। ওদিকে গ্রীষ্মের দিনটা ডুবে যাচ্ছিলো হলদে গোধূলিতে। তারা নেমেছিলো একটা মাইক্রোচিপ উদ্ধার অভিযানে, যার ভেতরে ছিলো আমেরিকার প্রত্যেকটা মিসাইল সাইলোর অবস্থানের গোপন তথ্য। জিনিসটা লুকানো ছিলো মায়ের ব্রেসলেটের ভেতর। চিপটা একটা রত্নপাথরের প্রজাপতির অংশ, যেটা চতুরভাবে হীরার মতো করে লুকানো। ভাড়াটে গুণ্ডাদের কাছে ছিলো এটা। তারা এই তথ্য বিক্রি করতে চেয়েছিলো সবচেয়ে বেশি দাম হাঁকা ক্রেতার কাছে- ইরান, রাশিয়ানরা, হয়তো কানাডা। ভিক আর মাইকেল নাইট উপরাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো তাদের গোপন আস্তানার দিকে। মাইকেল ভিকের প্রতিশ্রুতি চাইছিলো যেন ভিক অপ্রয়োজনীয় কোনো ঝুঁকি না নেয়, কোনো বোকামি না করে। ভিক মাইকের দিকে তাকিয়ে হেসে চোখ উপরে তুললো। কিন্তু তারা দুজনেই বুঝতে পারলো, তাদের পরিকল্পনার যে রকম সংকট, তাতে কোনো এক পর্যায়ে ভিককে বোকামি করতে হবে, যা তাদের দুজনের জীবনকেই ঠেলে দেবে বিপদের দিকে, আর খারাপ লোকদের কাছ থেকে পালানোর জন্য মরিয়া হয়ে তাদের কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে।

কিন্তু এই গল্পটা খুব একটা সন্তোষজনক না। প্রথমত, সে অবশ্যই গাড়িতে নেই। সে একটা বাইকে চড়ে শেকড়বাকড় মাড়িয়ে যাচ্ছে। প্যাডেল চালাচ্ছে জোরে, মশাদের থেকে দূরে থাকার মতো জোরে। তাছাড়াও, সে একদম আরাম করে দিবাস্বপ্ন দেখতে পারছে না যেমনটা সে সাধারণত করে থাকে। সে ভাবতে থাকলো, জিসাস। ভেতরে ভেতরে কতো জঘন্য একটা মানুষ তুমি। হাঠাৎ তার পেটে মোচড় দিয়ে উঠলো, তার মনে হলো বাড়ি ফিরে সে দেখবে বাবা চলে গেছে। দস্যি মেয়েটা মাথা নিচু করে আরও দ্রুত প্যাডেল চেপে চেপে গেলো। এমন একটা ভয়ংকর চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে রাখার এটাই একমাত্র উপায়।

তার পরবর্তী চিন্তা ছিলো সে বাইকে বসে আছে—টাফ বার্নারে না, তার বাবার হার্লিতে। সে দুহাতে জড়িয়ে রেখেছে বাবাকে, তার মাথায় তার জন্য বাবার এনে দেয়া হেলমেট। কালো রঙের পুরো-মাথা-ঢাকা হেলমেট পরে তার মনে হচ্ছিলো যেন সে অর্ধেক স্পেসস্যুট পরে আছে। তারা ফিরে যাচ্ছিলো লেক উইনিপেসকিতে, তার মায়ের ব্রেসলেট ফিরিয়ে আনতে; বাড়ি ফিরে তারা এটা দিয়ে মাকে চমকে দেবে। বাবার হাতে ব্রেসলেটটা দেখে মা চেঁচিয়ে উঠবে, বাবা হেসে উঠবে, এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরবে লিন্ডা ম্যাককুইনের কোমর, চুমু খাবে গালে, এরপর তারা আর ঝগড়া করবে না।

       দস্যি মেয়েটা ঝিকমিক সূর্যের আলোর মধ্যে দিয়ে, ঝুলে পড়া ডালগুলোর নিচে দিয়ে এগিয়ে গেলো। সে ৪৯৫ এর যথেষ্ট কাছে ছিলো শব্দগুলো শোনার জন্য: একটা আঠারো-চাকার গতি কমে আসার গর্জন, গাড়িগুলোর গুঞ্জন, আর হ্যাঁ, এমনকি একটা মোটরসাইকেলের দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাওয়ার গুড়গুড় শব্দ।

যখন সে চোখ বন্ধ করলো, সে নিজেই ছিলো হাইওয়েতে, সুন্দর সময় পার করছিলো, বাঁকের ধারে কাত হয়ে এগিয়ে যাওয়া বাইকের ওজনহীনতা উপভোগ করছিলো। সে খেয়াল করলো না যে সে এখন বাইকে একা, আরও বড় এক মেয়ে, যে নিজে থেকে থ্রটলে মোচড় দেয়ার মতো বড়। সে তাদের দুজনকেই চুপ করিয়ে দেবে। সে ব্রেসলেটটা নিয়ে ফিরে আসবে, ছুঁড়ে ফেলবে বিছানার ওপর তার বাবা-মার মাঝে, এরপর কোনো কথা না বলে চলে আসবে সেখান থেকে। তারা লজ্জায় একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করবে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সে কল্পনা করছিলো, দিনের অন্তিম আভা আকাশ থেকে হারিয়ে যেতে যেতে তার বাইকটা ছুটে চলছে মাইলের পর মাইল।

       ফার গাছের গন্ধের বিষণ্নতা পেছনে ফেলে সে কাঁচা রাস্তা ধরে এগিয়ে চললো, যে রাস্তাটা এগিয়ে গেছে সেতুর দিকে। স্থানীয়রা যেটাকে এক শব্দে শর্ট-অ্যাওয়ে বলে ডাকে।

সেতুর দিকে এগোতে ভিক দেখলো শেকলের বেড়াটা নিচে নামানো। তারের জট খুঁটি থেকে নামানো, ধুলার মাঝে পড়ে আছে। প্রবেশপথটা—যেটা দিয়ে মাত্র একটা গাড়ি কোনোমতে ঢুকতে পারে—তার চারদিক আইভি ঝোপে ঘেরা, নিচে বয়ে চলা নদী থেকে মৃদু বাতাস এসে ঢুকছে। এর মাঝে একটা আয়তাকার সুড়ঙ্গ, যেটা বর্ধিত হয়ে অবিশ্বাস্য রকমের উজ্জ্বল একটা বর্গে পরিণত হয়েছে, যেন অপর প্রান্ত গিয়ে মিলেছে সোনালি গমের একটা উপত্যকায়, অথবা কেবল সোনার।

ভিক গতি কমালো—এক মুহূর্তের জন্য। টানা সাইকেল চালাতে চালাতে সে চলে গিয়েছিলো সমাধি স্তরে, নিজের মস্তিষ্কের অনেকখানি গভীরে। যখন সেবেড়া ডিঙিয়ে ঠিক আঁধারের মাঝে চলতে থাকার সিদ্ধান্ত নিল, সে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন করেনি। এখন থামাটা হবে তার সাহসের জন্য একটা ব্যর্থতা, যেটা সে হতে দিতে পারে না। তাছাড়াও, গতির ওপর তার আস্থা ছিলো। যদি তার পায়ের নিচ থেকে কাঠের তক্তাগুলো ভাঙতে শুরু করে, সে তখনও সাইকেল চালিয়েই যাবে, ভেঙে পড়ার আগেই পালিয়ে যাবে পঁচা কাঠের নাগালের বাইরে। যদি কেউ ওখানে থাকে—কোনো ভবঘুরে যে একটা ছোট মেয়ের গায়ে হাত দিতে চায়—ভিক তাকে পেরিয়ে যাবে সে কোনোকিছু করতে পারার আগেই।

পুরনো কাঠ ভেঙে পড়ছে, অথবা এক ছন্নছাড়া লোক তাকে ধরতে চাইছে, এমন চিন্তায় ভিকের মনসুন্দর এক আতংকে আচ্ছন্ন হয়ে উঠলো। থেমে যাওয়ার বদলে সে উঠে দাঁড়িয়ে আরো জোরে প্যাডেল চাপতে শুরু করলো। এক শান্ত সন্তুষ্টি নিয়ে সে ভাবলো, যদি সেতুটা ভেঙে দশ তলার সমান নিচে নদীতে পড়ে যায়, আর এই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে সে মারা যায়, তাহলে দোষ তার বাবা-মার, কারণ তারাই ঝগড়া করে তাকে বাড়ি থেকে পালাতে বাধ্য করেছে। তখন একটা উচিত শিক্ষা হবে তাদের। তারা প্রবলভাবে ভিকের শূন্যতা অনুভব করবে, শোকে-অপরাধবোধে অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর এমনটাই হওয়া উচিত, তাদের দুজনের সঙ্গেই।

ভিকের টায়ারের নিচে শেকলগুলো ঝনঝনিয়ে উঠলো। সে ঢুকে পড়লো বাদুড় আর পঁচা জিনিসের গন্ধে ভরা এক ভূগর্ভস্থ অন্ধকারে।

ভেতরে ঢুকতেই ভিক দেখলো তার বামদিকের দেয়ালে সবুজ স্প্রে পেইন্টে কিছু একটা লেখা। সে লেখাটা পড়ার জন্য গতি কমালো না, কিন্তু তার মনে হলো লেখাটা টেরি’স। ব্যাপারটা বেশ মজার। কারণ তারা একবার টেরি’স নামে একটা জায়গায় দুপুরের খাবার খেয়েছে। টেরি’স প্রিমো সাবস ইন হ্যাম্পটন, যেটা ছিলো সেই নিউ হ্যাম্পশায়ারে, সমুদ্রের ওপর। লেক উইনিপেসকি থেকে বাড়ি ফেরার পথে তারা সাধারণত এখানেই থামতো, হ্যাভারহিল থেকে লেকে যাওয়ার পথের ঠিক মাঝামাঝি ছিলো এই জায়গাটা।

ছাউনিঢাকা সেতুর ভেতরে শব্দ অন্যরকম। ভিক নদীর শব্দ শুনতে পেলো, এক শ ফুট নিচে। কিন্তু শব্দটা খরস্রোতা পানির বদলে রেডিও-টিভির ঝিরঝির শব্দের মতো মনে হলো। সে নিচে তাকালো না, পায়ের নিচে কাঠের তক্তার মাঝের ফাঁকগুলো দিয়ে নদী দেখতে তার ভয় লাগলো। ডানে-বামেও তাকালো না, সেতুর শেষ প্রান্তে চোখ স্থির রাখলো।

সাদা আলোর ঝলকানির মাঝ দিয়ে সে এগিয়ে গেলো। একটা উজ্জ্বল আলোর ফালি ভেদ করে এগোতে গিয়ে সে বাম চোখে দূর থেকে আসা এক রকম ধাক্কা অনুভব করলো। পাটাতনটা একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি তৈরি করছিলো। পায়ের ঘোরার সাথে তাল মিলিয়ে তার মাথায় এখন শুধু দুই শব্দের একটা চিন্তা ঘুরছিলো। পৌঁছে যাচ্ছি, পৌঁছে যাচ্ছি।

       সেতুর শেষমাথার উজ্জ্বল বর্গ ক্রমশ আরও বড় হলো, আরও নিবিড় হলো। সেদিকে এগোতে গিয়ে সে প্রায় প্রবল এক উত্তাপের বিকিরণ অনুভব করলো। অদ্ভুতভাবে স্যানট্যান লোশন আর অনিয়ন রিংয়ের গন্ধ এসে লাগলো তার নাকে।সেতুর শেষ মাথায় কেন কোনো গেট নেই এটা ভেবে তার অবাক লাগলো না।

       ভিক ম্যাককুইন, দস্যি মেয়ে যার আরেক নাম, গভীর এক শ্বাস নিয়ে শর্টার ওয়ে থেকে বেরিয়ে গিয়ে সূর্যের আলোর ভেতর প্রবেশ করলো। সাদা নয়েজের হিসহিসে গর্জন হঠাৎই থেমে গেলো, যেন এতোক্ষণ সে আসলেই রেডিওর ঝিরঝির আওয়াজ শুনছিলো আর কেউ এসে সুইচটা অফ করে দিলো।

       সে আরও প্রায় বারো ফুট সামনে এগোলো, এরপর দেখতে পেলো সে কোথায় আছে। ব্রেক চাপতে পারার আগেই বুকের ভেতর তার হৃদপিণ্ডটা জমে শক্ত হয়ে গেলো। সে এতো জোরে থামলো, এতো শক্তি দিয়ে, যে বাইকের পেছনের টায়ার অন্যদিকে ঘুরে গেলো, পিচের মাঝে পিছলে গিয়ে ধুলো ছড়ালো দু’দিকে।

       সে এসে পড়েছে একটা একতলা দালানের পেছনে, একটা পাকা রাস্তার গলিতে। তার বামদিকে একটা আস্তাকুঁড় আর বেশ কয়েকটা ময়লার ক্যান ইটের দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো। গলির এক মাথা কাঠের উঁচু বেড়া দিয়ে আটকানো। বেড়ার অন্য পাশে একটা রাস্তা। ভিক চলমান যানবাহনের শব্দ শুনতে পেলো, শুনলো একটা গাড়ি থেকে ভেসে আসা গান: অ্যাব্রা-অ্যাব্রা-ক্যাড্যাব্রা…আমি কাছে এসে তোমাকে ধরতে চাই…

       প্রথম দেখাতেই ভিক টের পেলো সে ভুল জায়গায় এসে পড়েছে। সে শর্টার ওয়েতে বহুবার এসেছে, মেরিম্যাকের অপর প্রান্তের উঁচু পারের পেছনে প্রায়ই তাকাতো সে, জানতো ওখানে কী আছে: গাছপালাভর্তি এক পাহাড়, সবুজ, শীতল ও নীরব। কোনো রাস্তা নেই, দোকান নেই, গলি নেই। সে মাথা ঘুরিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো।

       শর্টার ওয়ে ব্রিজতার পেছনে গলির মুখটা জুড়ে রয়েছে। সেতুটা একটা একতলা ইটের দালান আর চুনকাম করা কংক্রিট আর কাচের পাঁচতলা উঁচু দালানের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে আছে।

       সেতুটা এখন আর নদীর ওপর নেই, বরং এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যে জায়গাটা অনেক কষ্টে সেতুটাকে ধরে রেখেছে। ভিক সেতুটা দেখে হিংস্রভাবে কেঁপে উঠলো। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে দূরে অপর প্রান্তে পিটম্যান স্ট্রিট উডসের নীলাভ-সবুজ ছায়া দেখতে পেলো।

       ভিক বাইক থেকে নামলো। তার পা প্রচণ্ড কাঁপছিলো। সে হেঁটে হেঁটে তার র‍্যালিটাকে আস্তাকুঁড়ের কাছে নিয়ে এসে পাশে হেলান দিয়ে রাখলো। সে খেয়াল করলো, শর্টার ওয়ে নিয়ে সোজাসাপ্টা ভাবার সাহস তার নেই।

       রোদে পঁচে যাওয়া ভাজা খাবারের দুর্গন্ধ আসছিলো গলিটা থেকে। ভিক চাইছিলো নির্মল বাতাস। সে একটা স্ক্রিন ডোরের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলো, যেখান থেকে দেখা যায় কোলাহলপূর্ণ, বাষ্পভর্তি রান্নাঘর, এবং পৌঁছে গেলো একটা উঁচু কাঠের বেড়ার কাছে। পাশের দরজার ছিটকিনি খুলে চেনা একটা সরু ফুটপাথে চলে এলো সে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই সে দাঁড়িয়ে ছিলো এখানে।

       বামে তাকিয়ে সে দেখলো দীর্ঘ সৈকত এবং তার পেছনে বিশাল সমুদ্র। ঢেউয়ের সবুজ চূড়া সূর্যের প্রখর উজ্জ্বলতায় চকচক করছে। সাঁতারের পোশাক পরা ছেলেরা ফ্রিসবি ছুঁড়ে দিচ্ছে, দেখানোর মতো করেলাফ দিয়ে আবার সেটা লুফে নিয়ে বালিতে পড়ে যাচ্ছে। সমুদ্রপারের প্রশস্ত রাস্তায় গাড়ি চলছে গায়ে গা ঘেঁষে। ভিক অস্থির পায়ে এক কোণায় হেঁটে গেলো, তাকালো পথচারী জানালায়…

টেরিস প্রিমো সাবস

হ্যাম্পটন বিচ, নিউ হ্যাম্পশায়ার

ভিক সামনে হেলান দিয়ে রাখা, বিকালের রোদে পুড়তে থাকা এক সারি মোটরসাইকেলের পাশ দিয়ে হেঁটে এলো। অর্ডার নেয়ার জানালায় ছিলো বিকিনি টপ আর ছোট শর্টস পরা এক সারি মেয়ে। তাদের মুখ হাসিতে উজ্জ্বল। তাদের হাসির শব্দে ভিকের মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ হলো, তার কাছে শব্দটা কাচ ভাঙার শব্দের মতো লাগলো। ভেতরে ঢুকলো সে। পিতলের ঘণ্টা বেজে উঠলো দরজায়।

       জানালাগুলো খোলা ছিলো। কাউন্টারের পেছনে ছয়টা ডেস্কটপ ফ্যান ঘুরে ঘুরে টেবিলের দিকে বাতাস দিচ্ছিলো। তবুও ভেতরটা ছিলো অনেক গরম। ছাদ থেকে ঝুলতে থাকা ফ্লাইপেপারের লম্বা ফিতা বাতাসে দুলছিলো। ফ্লাইপেপারে আটকে থাকা মৃতপ্রায় মাছিগুলোর দিকে তাকাতে দস্যি মেয়েটার ভালো লাগছিলো না, যখন তার ঠিক নিচেই মানুষজন মুখে হ্যামবার্গার ঢোকাচ্ছে। আগে যখন সে এখানে তার বাবা-মার সাথে দুপুরের খাবার খেতে এসেছিলো তখন সে ফ্লাইপেপারটা খেয়াল করেনি।

       ভিকের মাথা ঝিমঝিম করছিলো, যেন সে অগাস্টের রোদে ভরপেটে দৌড়েছে অনেকক্ষণ। সাদা গেঞ্জি পরা বড়সড় এক লোক ক্যাশ রেজিস্ট্রারের পেছনে বসে ছিলো। তার কাঁধ দুটো ছিলো লোমশ, রোদে পুড়ে লাল, আর নাকের ওপর ছিলো দস্তার গুঁড়োর একটা লাইন। তার শার্টের ওপর একটা প্লাস্টিক ট্যাগে লেখা ‘পিট’। সারাটা বিকাল এখানেই ছিলো সে। দু’ঘণ্টা আগে, ভিক দাঁড়িয়ে ছিলো তার বাবার পাশে, যখন ক্রিস ম্যাককুইন তাদের বার্গার বাস্কেট আর মিল্কশেকের জন্য পিটকে টাকা দিচ্ছিলেন। তারা দুজন রেড সক্স নিয়ে কথা বলছিলেন, যারা খেলার মাঠে বেশ ভালো সময় পার করছে। মনে হচ্ছিলো ১৯৮৬ সালে এসে অবশেষে তারা তাদের অভিশাপ ভাঙতে পারবে। ক্লেমেন্স সবাইকে হারিয়ে দিচ্ছিলো। এক মাসেরও বেশি খেলা বাকি থাকতেই ছেলেটা সাই ইয়ংকে পিছে ফেলেছে।

       ভিক পিটের দিকে ঘুরলো। যদি আর কোনো কারণ না থাকে তাহলে শুধু তাকে চিনতে পেরেছে এই কারণেই। কিন্তু এরপর সে পিটের সামনে শুধু দাঁড়িয়েই রইলো, চোখের পাতা ফেললো বারবার, কী বলবে বুঝতে না পেরে। পিটের পিঠের দিকে ঘুরতে থাকা একটা ফ্যান পিটের শরীরের আর্দ্র গন্ধ টেনে নিয়ে ছুঁড়ে দিলো দস্যি মেয়েটার মুখের দিকে। না, তার এখানে একদমই ভালো লাগছে না।

       অসহায়তার এক অপরিচিত অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়ে ভিকের কান্নার উপক্রম হলো। সে এখন দাঁড়িয়ে আছে নিউ হ্যাম্পশায়ারে, যে জায়গাটা তার নিজের নয়। শর্টার ওয়ে ব্রিজ আটকে আছে পেছনের গলিতে, আর কোনোভাবে এটা তার দোষ। তার বাবা-মা ঝগড়া করছে, তাদের কোনো ধারণাই নেই সে তাদের থেকে কতো দূরে চলে গেছে। এর সবকিছুই, এবং আরও বেশি বলা দরকার। ভিকের বাসায় ফোন করা দরকার। পুলিশকে ফোন করা দরকার। কোনো একজনের গলিতে গিয়ে সেতুটা দেখে আসা দরকার। তার চিন্তাগুলো এক অস্বস্তিকর গোলমালে রূপ নিচ্ছিলো। তার মাথার ভেতরটা একটা বিশ্রী জায়গা, মনোযোগ কেড়ে নেয়া কোলাহল আর ঘুরে ঘুরে উড়তে থাকা বাদুড়ে ভর্তি এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ।

       কিন্তু কথা শুরু করার ঝামেলা থেকে বিশালদেহী লোকটা তাকে উদ্ধার করলো। ভিককে দেখে তার চোখের ভ্রুজোড়া কাছাকাছি চলে এলো। ‘এই তো। আমি ভাবছিলাম আর কখনো তোমাকে দেখতে পাবো কি না। তুমি ওটার জন্য ফিরে এসেছো, তাই না?’

       ভিক শূন্য চোখে পিটের দিকে তাকালো। ‘ফিরে এসেছি?’

       ‘ব্রেসলেটটার জন্য। যেটার ওপর একটা প্রজাপতি বসানো।’

       পিট একটা চাবি নিয়ে খোঁচা দিলো, আর কয়েনের টুংটাং শব্দে রেজিস্টার ড্রয়ারটা খুলে গেলো। ভিকের মায়ের ব্রেসলেটটা ছিলো পেছন দিকে।

       ব্রেসলেটটা দেখে ভিকের পায়ের মাঝে আরেকটা দুর্বল কাঁপুনি তৈরি হলো, অস্থির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। শর্টার ওয়ে থেকে বেরিয়ে অদ্ভুতভাবে নিজেকে হ্যাম্পটন বিচে আবিষ্কার করার পর এই প্রথমবারের মতো তার মনে হলো সে কিছু বুঝতে পারছে।

       ভিক তার কল্পনায় তার মায়ের ব্রেসলেট খুঁজতে বেরিয়েছিলো, আর কোনো একভাবে সেটা পেয়ে গেছে। সে আসলে বাইক নিয়ে বেরই হয়নি। হয়তো তারা বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়াও হয়নি কখনো। গলির ভেতর সেতু আটকে যাওয়ার ব্যাখ্যা একটাই হতে পারে। সে পেটভর্তি মিল্কশেক নিয়ে রোদে পুড়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে আর এখন স্বপ্ন দেখছে। এটা মাথায় রেখে তার এখন যা করা উচিত তা হলো মার ব্রেসলেটটা নিয়ে সেতু পার হওয়া, এর মাঝেই হয়তো তার ঘুম ভেঙে যাবে।

       ভিক বাম চোখের পেছনে আরেকটা ভোঁতা ব্যথা টের পেলো। একটা মাথাব্যথা সেখানে শেকড় গেঁড়ে বসছে। বিশ্রী একটা মাথাব্যথা। আগে কখনো স্বপ্নে তার মাথাব্যথা হয়েছে বলে মনে পড়লো না।

       ‘ধন্যবাদ’, কাউন্টারের অপর পাশে থাকা পিটের বাড়িয়ে দেয়া হাত থেকে ব্রেসলেটটা নিতে নিতে দস্যি মেয়েটা বললো। ‘আমার মা এটা নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলো। অনেক মূল্যবান এটা।’

       ‘খুবই চিন্তিত, না?’ পিট একটা কড়ে আঙুল নিয়ে কানের ভেতর সামনে-পেছনে ঘোরাতে লাগলো। ‘এর সঙ্গে অনেক আবেগ জড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে।’

       ‘না। মানে হ্যাঁ, আসলেই আছে। ব্রেসলেটটা ছিলো তার দাদির, আমার পরদাদির। কিন্তু আমি বলতে চাইছি আসলেও এর দাম অনেক।’

       ‘আহ-হাহ’, পিট বললো।

       ‘এটা একটা অ্যান্টিক’, দস্যি মেয়েটা বললো। সে বুঝতে পারছিলো না কেন সে পিটকে ব্রেসলেটটার মূল্য বিশ্বাস করানো এতো দরকার মনে করছে।

       ‘এটা অ্যান্টিক হবে যদি এটার কোনো মূল্য থাকে। যদি এটার কোনো মূল্য না থাকে তাহলে এটা শুধুই একটা পুরনো জিনিস।’

       ‘এটা হীরা’, দস্যি মেয়েটা বললো। ‘হীরা আর সোনা।’

       পিট হেসে উঠলো, সংক্ষিপ্ত; শ্লেষাত্মক এক হাসি।

       ‘আসলেই’, ভিক বললো।

       পিট বললো, ‘নাহ। কস্টিউম জুয়েলারি। হীরার মতো দেখতে ওগুলো? জির্কোনিয়াম। আর ব্যান্ডের ভেতরটা দেখো, রূপালি হয়ে যাচ্ছে না? সোনার রং উঠে যায় না। যেটা ভালো সেটা ভালোই থাকে, শত আঘাতের পরও।’ তার ভ্রূ কুঁচকে উঠলো, এক অপ্রত্যাশিত সহানুভূতির ভঙ্গিতে। ‘তুমি ঠিক আছো? তোমাকে খুব একটা সুস্থ মনে হচ্ছে না।’

       ‘আমি ঠিক আছি’, ভিক বললো। ‘আমি অনেক রোদে পুড়েছি।’ যেটা খুবই বড় মানুষের কথার মতো মনে হলো।

       সে অবশ্য ঠিক ছিলো না। তার ক্লান্ত লাগছিলো, আর পা দুটো স্থিরভাবে কাঁপছিলো। সে বেরিয়ে আসতে চাইছিলো, পিটের ঘাম, অনিয়ন রিং, আর বুদ্বুদ-ওঠা চর্বির পাঁচমেশালি গন্ধ থেকে দূরে। চাইছিলো স্বপ্নটা শেষ হয়ে যাক।

       ‘তুমি কি নিশ্চিত তোমার ঠান্ডা কিছুর দরকার নেই?’ পিট জিজ্ঞেস করলো।

       ‘ধন্যবাদ, কিন্তু দুপুরে যখন এসেছিলাম তখন মিল্কশেক খেয়েছি।’

       ‘মিল্কশেক খেয়ে থাকলে এখানে খাওনি’, পিট বললো। ‘ম্যাকডোনাল্ডসে, হয়তো। আমাদের কাছে যেটা আছে সেটা হলো ফ্রাপে।’

       ‘আমার যেতে হবে’, দরজার দিকে ঘুরতে ঘুরতে ভিক বললো। সে বুঝতে পেরেছিলো রোদে-পোড়া পিট খুব যত্নের সঙ্গে তাকে দেখেছে। তার সহানুভূতির জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ করছিলো সে। তার মনে হলো দুর্গন্ধ আর অসভ্য আচরণ সত্ত্বেও পিট একজন ভালো মানুষ। যে ধরনের মানুষ হ্যাম্পটন বিচে নিজে নিজে ঘুরে বেড়ানো অসুস্থ চেহারার ছোট মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করে। কিন্তু পিটকে আর কিছু বলার সাহস হলো না তার। তার কপাল আর ওপরের ঠোঁট ঘামে ভিজে গেছে। পায়ের কাঁপুনি দমিয়ে রাখতে তাকে অনেকখানি মনোযোগ দিতে হচ্ছিলো। তার বাম চোখে আবারও ব্যথা উঠলো। এবার আরেকটু কম হাল্কাভাবে। ভিকের মনে হলো টেরিসে আসাটা নিছকই তার কল্পনা, একটা নির্দিষ্ট শক্তিশালী স্বপ্নের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে, যেখানে নিজেকে ধরে রাখা কঠিন, পিচ্ছিল একটা ব্যাঙকে তালুবন্দী করার মতো।

       ভিক বাইরে এসে গরম কংক্রিটের ওপর দিয়ে দ্রুত হেঁটে গেলো, হেলান দিয়ে পার্ক করানো মোটরসাইকেলগুলোর পাশ দিয়ে। কাঠের উঁচু বেড়ার দরজা খুলে টেরিস প্রিমো সাবসের পেছনের গলিতে ঢুকলো।

       সেতুটা আগের জায়গাতেই আছে। বাইরের দেয়ালগুলো দুপাশের দালানগুলোর সঙ্গে ঠাসা। জিনিসটা দেখতেই কষ্ট হচ্ছিলো। ভিকের বাম চোখে ব্যথা শুরু হলো।

       এক বাবুর্চি বা ডিশওয়াশার—যে রান্নাঘরে কাজ করে, গলির ভেতর আস্তাকুঁড়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার পরনে তেল-রক্ত মাখা একটা অ্যাপ্রন। কেউ অ্যাপ্রনটার দিকে ভালোমতো তাকালে সম্ভবত টেরিসে দুপুরের খাবার খাওয়ার চিন্তা বাদ দেবে। লোকটা খাটো গড়নের, লোমশ মুখ। ট্যাটু করানো বাহু থেকে শিরা ফুটে বেরুচ্ছে। রাগ এবং ভয়ের মাঝামাঝি একটা অভিব্যক্তি নিয়ে সেতুটার দিকে তাকিয়ে ছিলো সে।

       ‘কোন ধরনের ফাজলামি?’ লোকটা বললো। বিভ্রান্ত একটা চাহনি দিলো ভিকের দিকে। ‘দেখলে ওটা, খুকি? মানে…কোন ধরনের ফাজলামি এটা?’

       ‘আমার সেতু। চিন্তার কিছু নেই। আমি সঙ্গে নিয়ে যাবো’, ভিক বললো। সে নিজেও বুঝলো না তার এই কথার অর্থ কী।

       ভিক হাতল মুঠোয় নিয়ে বাইকটাকে ঘোরালো। ঠেলে নিয়ে এলো সেতুর দিকে। বাইকের পাশ দিয়ে দুই কদম হাঁটলো। এরপর দুই পা ছড়িয়ে উঠে বসলো বাইকে।

       সামনের টায়ার কাঠের তক্তার ওপর ঝাঁকি খেয়ে উঠলো এবং সে মিলিয়ে গেলো হিসহিসে অন্ধকারে।

       সেতু দিয়ে র‍্যালিটা এগিয়ে যেতে যেতে নির্বোধ ঝিরঝির শব্দটা আবার জেগে উঠলো। আসার সময় ভিক ভেবেছিলো সে নিচে বয়ে যাওয়া নদীর শব্দ শুনছে, কিন্তু আসলে তা নয়। দেয়ালগুলোতে ছিলো বড় বড় ফাটল, আর সেগুলো ঝলকে উঠতেই সে প্রথমবারের মতো সেগুলোকে দেখতে পেলো। ওগুলোর ভেতর দিয়ে সাদা আলোর ঝিকিমিকি দেখলো সে, যেন দেয়ালের ওপাশে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিভিটা বসানো আছে, আর টিভিটা এমন এক চ্যানেলে আটকে আছে যে চ্যানেলে এ মুহূর্তে কোনো সম্প্রচার হচ্ছে না। এক ঝড় এসে ধাক্কা দিলো কাত হয়ে থাকা জরাজীর্ণ সেতুটাকে, একটা আলোর ঝড়। দেয়ালের ওপর আলোর বৃষ্টির ধাক্কায় তার মনে হলো সেতুটা একদিকে বেঁকে গেছে।

       ভিক চোখ বন্ধ করলো, আর কিছু দেখতে চাইছিলো না সে। প্যাডেলের ওপর দাঁড়িয়ে সে অপর প্রান্তের উদ্দেশে রওনা দিলো। তার প্রার্থনার মতো ছড়া আবার শুরু করলো—পৌঁছে যাচ্ছি, পৌঁছে যাচ্ছি—কিন্তু তার এতোটাই অসুস্থ আর দম বন্ধ লাগছিলো যে সে একটা চিন্তা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারছিলো না। শুধু তার নিঃশ্বাস আর গর্জাতে থাকা ঝিরঝির শব্দ, অন্তহীন ঝর্ণার মতো শব্দ, যার প্রবলতা ক্রমেই বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে পৌঁছে যাচ্ছে পাগল করা এক তীব্রতায়, এরপর আরও বেশি। ভিক চেঁচিয়ে উঠতে চাইলো—থামো, কথাটা তার ঠোঁটে চলে এলো, থামো, থামো। তার ফুসফুস বাতাস জড়ো করলো চিৎকার করার জন্য, আর ঠিক এ সময়েই তার বাইকটা ধপ করে পড়ে গেলো…

Leave a Reply