সেদিন সকাল ভোর ৫’ টায় ঘুম থেকে উঠি। কারণ সেদিন ছিল আমার নাটকের শুটিং। সকলেই গোসল করে রেডি হয়ে বসে আছি ফোন কল এর অপেক্ষায়। শুটিং এর গাড়ি বাসার নিচে আসলে আমাকে কল করে। আমিও যেয়ে গাড়িতে উঠি। আমরা ছিলাম ৬ জন। আমি, ড্রাইভার, শরাফত ভাই, অনিক দা, এবং প্রোডাকশন হাউজের ২ জন। গন্তব্য ছিল উত্তরা। আমাদের প্রথম শুট উত্তরা শান্ত-মরিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। সেখানে যেয়ে আমরা নাস্তা করে ফেলি সবাই। কিছুক্ষন পর আমাদের বাকি আর্টিস্টরাও চলে আসে। আমাদের মেকআপ আর্টিস্টও তৈরি ছিল। সকলে নাস্তা করার পর আর্টিস্টদের মেকআপ শুরু হয়। ঘণ্টা খানেক বাদেই মেকআপ এর কাজ শেষ হয়ে যায়। এর পরপর-ই শুটিং এর কাজ শুরু হয়। ৩টা দৃশ্য করার পর এইখানের শুট শেষ হয়। সময় তখন দুপুর ১’টা ছুঁই ছুঁই। বাকি দৃশ্য হবে ‘গোলাপ গ্রাম’ নামক জায়গায়।
গোলাপ-গ্রাম জায়গা সম্পর্কে কিছু না বললেই নয়। বিশেষ করে এই গ্রামটি গোলাপ চাষের জন্য পরিচিত। বেশিরভাগ জমিনে শুধু গোলাপ আর গোলাপ। এটি মূলত সাভার হাইওয়ে থেকে আনুমানিক ২০ কিলো দূরে অবস্থিত। খুবই কম মানুষের বসবাস এখানে। যাই হোক মূল গল্পে ফেরত আসি।
আমাদের গাড়ি ছিল ৩ টা। একটি শুটিং এর গাড়ি, বাকি ২টি আর্টিস্টদের গাড়ি। আমরা মানুষ ছিলাম ৩১ জন। স্বাভাবিক ভাবেই এত মানুষ জায়গা হবে না গাড়িতে। কষ্ট করে আমরা ২৪ জনকে গাড়িতে করে গোলাপ-গ্রাম পাঠিয়ে দিই। বাকি রইলাম ৭ জন (আমি, মাহবুব ভাই, নাঈম ভাই, আর্টিস্ট মিলি, মেকআপ আর্টিস্ট ২ জন) । আমরা কেউই গোলাপ-গ্রাম কোথায় তা জানি না, কখনও যাওয়া হয় নাই। আমাদের মধ্যে মাহবুব ভাই বলল পঞ্চবটি পর্যন্ত যেতে হবে আগে এরপর গোলাপ-গ্রাম যাওয়া যাবে। উনি আবার সাভার থাকেন তবে স্থানীয় নয়। তার কথা মতো আমরা একটা রিকশা ঠিক করে রওনা হলাম পঞ্চবটির পথে। যাত্রাপথে আমরা বাকি টিমের সাথে যোগাযোগ করি তারা জানায় পঞ্চবটি আসলে আমাদের জন্য গাড়ি পাঠানো হবে। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। প্রায় ১ ঘণ্টা যাত্রার পরে আমরা পৌঁছালাম পঞ্চবটি। আমার জন্য একদম নতুন জায়গা। রিকশা ভাড়া দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন গাড়ি আসবে। ২০ মিনিট পরে আবার ফোন করলাম তারা জানালো গাড়ি পাঠানো সম্ভব না এখন। আমরা যেন রিকশা দিয়ে চলে আসি। কি আর করার। রিকশা নিলাম। আবার যাত্রা শুরু করলাম গোলাপ-গ্রাম এর দিকে। আমরা এখনও জানিনা সঠিক ঠিকানাটা কোথায়। রিকশাওয়ালা মামা কে বললাম ‘মামা আমরা গোলাপ-গ্রাম শুটিং হাউজে যাবো। উনি বললেন, ‘এইদিক তো শুটিং হাউজ কয়েকটা আছে। একদম সঠিক ঠিকানাটা নেন তাদের থেকে। আমি তৎক্ষণাৎ টিমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু তারা কেউ ফোন ধরছে না। আমরা আশেপাশের মানুষদের বলে বলে সামনে এগোতে থাকি। ৪০ মিনিট ঘুরার পর হঠাৎ রাস্তার পাশে অনিক দা’ কে দেখতে পাই। মনে হলো প্রাণ ফিরে পেলাম। আমরা ওখানেই নেমে যাই। রিকশাওয়ালা মামাকে ভাড়া দিলাম ৪০০ টাকা। যদিও পরে জানতে পারি রিজার্ভ ভাড়া ৩০০ টাকা। তাও উনি অনেকটা পথ চালিয়েছেন সেই হিসাব করলে ৪০০ টাকা মন্দ নয়। ঠিকঠাক মতো এসে পৌঁছেছি এটাই অনেক। তখন ঘড়িতে বাজে ৩’ টা। আমি ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে ফেলি তাড়াতাড়ি কারণ কিছুক্ষন পরেই আমার শুট।
বাহিরে কিছু ২/৩ টা শুট হয় এরপর সবাই হাউজে চলে আসে। এখন হাউজের ভিতর শুট হবে। শুট শেষ হতে হতে রাত প্রায় ১’ টা বেজে গেছে। এর মধ্যে আমার বাসা থেকে মা কয়েকবার ফোন করেছিল কথাও হয়েছে। মাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম আজ রাতে বাড়ি ফিরব না। একদম সকালে ফিরব।
শুট শেষ, সবার বিল পরিশোধ করাও শেষ। আস্তে আস্তে সবাই গাড়িতে উঠতে থাকে। আমি, শারাফাত ভাই, অনিক দা, মাহবুব ভাই বাদে সবাই গাড়িতে উঠে পড়ে। গাড়িতে আর জায়গা নেই। কি করার সবাই কে বিদায় দিয়ে আমরা হাটা শুরু করে দিলাম। তখন ঘড়িতে সময় রাত ২’ টা ৩০ । মেইন রোডে গাড়ি পাওয়া যায়। মেইন রোডে আমাদের লোকেশন থেকে প্রায় ৫ কিলো দূরে। কোনো কিছু না ভেবে হাটা ধরলাম। আগেই বলেছিলাম এই এলাকায় মানুষ খুব কম । আসে পাশে ঘরবাড়ি তেমন নেই বললে চলে । চারপাশে জঙ্গল আর জঙ্গল আর মাঝখানে সরু পাকা রাস্তা। একদম নিস্তব্ধ। অনেকটা পথ হাঁটার পর আমাদের দেখে কিছু কুকুর খুব জোরে জোরে ডাকা শুরু করলো। আমরা শান্তভাবে হাঁটতে থাকি। কুকুরের সামনে দৌড় দিলে কুকুরও দৌড়ে কামড় বসাবে। খানেক দূরে যাওয়ার পর হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমার শরীর ভারী হচ্ছে।
আমি কাউকে কিছু না বলে হাঁটতে থাকি। একটু পর শারাফাত ভাই বলে, ‘কি ব্যাপার আমার শরীর হঠাৎ করে কেমন যেন ভারী মনে হচ্ছে’ । আমিও সাথে সাথে বলেলাম আমারও হচ্ছে ভাই। অনিক দা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল ভাই তাড়াতাড়ি আমরা এই জায়গাটা পার হই। মনে হচ্ছে অশরীরী কিছু আছে। আমার একহাত পিছনেই ছিল শারাফাত ভাই। অনিক দা পিছনে তাকানোর পরে খুব জোর গলায় বলে উঠল শারাফাত ভাই আমার সমানে হাটেন। ২ বার বলার পরেও শারাফাত ভাই পিছনেই ছিলো। হঠাৎ করে অনিক দা ধমক দিয়ে বলল ‘আপনারে সামনে হাঁটতে বলছি না’। সাথে সাথে সে সামনে চলে আসে। অনিক দা পিছনে ফিরতে মানা করলো আমাদের। আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে ভাই?। উনি আমাকে থামায় দিয়ে বলল কোনো কথা নাই সামনে হাটেন। অনিক দার ধমক খেয়ে শরাফত ভাই মাথা নিচু করে সুবোধ বালকের মতো সামনে চলে এলেন। আমি, মাহবুব ভাই আর অনিক দা সবাই একদম নিশ্চুপ। শুধু আমাদের দ্রুত ছন্দের পায়ের আওয়াজ আর মাঝে মাঝে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ ছাড়া চারপাশটা শ্মশানের মতো শান্ত। আমার বুকের ভেতর তখন হাতুড়ি পেটার মতো শব্দ হচ্ছে। শরীরটা আগের চেয়েও বেশি ভারী লাগছে, যেন কাঁধের ওপর কেউ ভর করে আছে।
এভাবে মিনিট দশেক হাঁটার পর হঠাৎ পিছনের সেই ঘুটঘুটে অন্ধকার জঙ্গল থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
"অনিক দা... তানভীর... আমার পা ব্যথা করছে, আমাকে ফেলে কোথায় যাচ্ছেন আপনারা?"
কথাটা শুনে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। আমি আড়চোখে সামনে তাকালাম। শরাফত ভাই তো ঠিক আমার সামনেই হাঁটছেন! তাহলে পিছন থেকে কে ডাকল?
মাহবুব ভাই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতে যাবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে অনিক দা খপ করে উনার হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। ফিসফিস করে, কিন্তু বেশ কড়া গলায় বললেন, "খবরদার! কেউ পিছনে তাকাবেন না। যা শোনার শুনবেন, কিন্তু কোনো উত্তর দেবেন না।"
সামনে হাঁটা শরাফত ভাইয়ের দিকে তাকালাম। লোকটা অদ্ভুতভাবে হাঁটছেন। মাথাটা একদম বুকের সাথে ঝুলে আছে, হাত দুটো নিস্তেজ, আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো—উনার পায়ের কোনো আওয়াজ হচ্ছে না! পিচঢালা রাস্তায় জুতো পড়ে হাঁটলে একটা শব্দ হওয়ার কথা, কিন্তু উনি যেন বাতাসে ভাসছেন।
পিছন থেকে আবারও সেই কণ্ঠস্বর, এবার আরও করুণ, আরও কাছে—
"ভাই, আমাকে একা ফেলে যাইয়েন না... আমার খুব ভয় করতেছে!"
ঠিক শরাফত ভাইয়ের গলা। একটুও এদিক-ওদিক নেই। আমার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। সামনে যে হাঁটছে, সে কে? আর পিছনেই বা কে ডাকছে? অনিক দা বিড়বিড় করে কী যেন পড়া শুরু করেছেন। আমি সাহস করে সামনের শরাফত ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলাম। উনার শরীরটা বরফের মতো ঠাণ্ডা!
হঠাৎ সামনের শরাফত ভাই হাঁটা থামিয়ে দিলেন। আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। অন্ধকারে উনার মুখটা ফ্যাকাসে, চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। উনি কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললেন, "তানভীর... আমার গলা নকল করে পিছন থেকে কে ডাকতেছে রে?"
তার মানে সামনের জনই আসল শরাফত ভাই! ভয় আর আতঙ্কে তিনি রীতিমতো জমে গেছেন, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আর পিছনের অশরীরী জিনিসটা আমাদের ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করছিল যাতে আমরা পিছনে তাকাই।
ঠিক তখনই দূরে মেইন রোডের একটা সোডিয়াম লাইটের ম্লান আলো চোখে পড়ল। অনিক দা চিৎকার করে উঠলেন, "দৌড় দে সবাই!"
আর কোনো দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে আমরা চারজন জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম। পিছনের সেই কণ্ঠস্বর তখন আর শরাফত ভাইয়ের মতো নেই, সেটা পরিণত হয়েছে এক অদ্ভুত, অমানুষিক গোঙানিতে। আলোতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সেই বিকট আওয়াজ আমাদের তাড়া করে বেড়াল। মেইন রোডে এসে যখন দাঁড়ালাম, চারজনই হাঁপাচ্ছি। পিছনে ফিরে দেখি, সেই সরু অন্ধকার রাস্তাটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। সেখানে কেউ নেই, কিচ্ছু নেই।
ভোরের আজান ভেসে আসছিল দূরের কোনো মসজিদ থেকে। গোলাপ গ্রামের সেই রাতের কথা মনে পড়লে আজও রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।