মেডিকেল কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহ হলো ইন্টার্নশিপ শুরু করেছি। ডিউটি পড়েছে শহরের পুরোনো এক সরকারি হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে। রাতের শিফট এমনিতেই বেশ ক্লান্তিকর। রাত তখন বাজে ৩টা। পুরো হাসপাতাল অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। চারপাশের বাতাসে ফিনাইল আর ওষুধের ভারী গন্ধ।
ওয়ার্ডের কাজে আমাকে চারতলার স্টোররুম থেকে কিছু স্যালাইন আনতে পাঠানো হলো। চারতলার একটা অংশ বেশ কয়েক বছর ধরে পুরোপুরি পরিত্যক্ত। বছর পাঁচেক আগে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে চিলড্রেনস ওয়ার্ড পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, সেই রাতে ধোঁয়ায় দম আটকে ইনকিউবেটরে থাকা কয়েকটা নবজাতক আর তাদের বাঁচাতে যাওয়া একজন ডিউটি নার্স জীবন্ত পুড়ে মারা যায়। এরপর থেকে ওই করিডোরটায় কেউ যায় না। বড় একটা লোহার কোলাপসিবল গেট দিয়ে জায়গাটা তালাবদ্ধ থাকে। ওয়ার্ডবয় রফিক চাচা আমাকে আগেই সাবধান করেছিল, "রাইত-বিরাইতে চারতলার ওই পোড়া ওয়ার্ডের দিকে যাইয়েন না স্যার। ওইখানে রাইতে এখনো পোড়া গন্ধ পাওয়া যায়।"
স্টোররুমের দিকে যাওয়ার সময় করিডোরের টিউবলাইটটা টিপটিপ করে জ্বলতে আর নিভতে শুরু করল। হঠাৎ আমার পা আটকে গেল। পরিত্যক্ত সেই চিলড্রেনস ওয়ার্ডের দিক থেকে খুব ক্ষীণ একটা আওয়াজ ভেসে আসছে। আমি কান পাতলাম। ভুল শুনছি না তো? না, কোনো ভুল নেই। একটা নবজাতক শিশু একটানা ফুঁপিয়ে কাঁদছে!
রাত ৩টায় বন্ধ, পোড়া একটা ওয়ার্ডের ভেতর নবজাতক এল কোথা থেকে? আমার ডাক্তার সত্তা আর ভেতরের তীব্র কৌতূহল ভয়কে ছাপিয়ে গেল। আমি মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে তালাবদ্ধ গেটটার কাছে গেলাম। দেখলাম, বহু বছরের পুরোনো মরচে পড়া তালাটা ঠিকমতো আটকানো নেই, আমার হাতের সামান্য চাপেই খুলে গেল। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ভারী গেটটা সরিয়ে আমি ভেতরে পা রাখলাম।
ভেতরে পা রাখতেই পোড়া কাঠ, স্যাঁতস্যাঁতে ফাঙ্গাস আর পোড়া মাংসের এক অদ্ভুত বোটকা গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারল। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় দেখলাম চারপাশের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কালো হয়ে আছে চারপাশ। আধপোড়া ছোট ছোট বিছানা আর গলে যাওয়া প্লাস্টিকের খেলনাগুলো আবছায়া অন্ধকারের মধ্যে ভূতুড়ে দেখাচ্ছে। কান্নার আওয়াজটা এখন আরও স্পষ্ট। ওয়ার্ডের একদম শেষ মাথার একটা অন্ধকার কোণা থেকে আসছে।
শুধু কান্না নয়, আমি যেন শুনতে পেলাম ভাঙা গলায় কেউ একজন গুনগুন করে ঘুমপাড়ানি গান গাইছে। আমি পা টিপে টিপে সেদিকে এগোলাম। বুকের ভেতরটা তখন হাতুড়ির মতো পিটছে। কাছে গিয়ে দেখলাম, একটা আধপোড়া ইনকিউবেটরের ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজটা আসছে!
ইনকিউবেটরের কাঁচটা ধোঁয়ায় আর ময়লায় কালো হয়ে আছে। আমি কাঁপা হাতে কাঁচের ওপর থেকে পোড়া ঝুল আর ধুলো মুছে ফেললাম। মোবাইলের আলোটা ফেললাম ঠিক ভেতরে।
ভেতরে কোনো শিশু নেই! একদম ফাঁকা! কিন্তু ওই ফাঁকা ইনকিউবেটর থেকেই কান্নার আওয়াজটা তীব্র হয়ে আমার কানে বাজতে লাগল। আমি যখন আতঙ্কে এক পা পিছিয়ে আসব, তখনই কাঁচের গায়ের দিকে আমার চোখ পড়ল। আমার শিরদাঁড়া দিয়ে এক শীতল স্রোত নেমে গেল।
ইনকিউবেটরের কাঁচের গায়ে ভেতর দিক থেকে ছোট ছোট তাজা রক্তের ছাপ! যেন কোনো নবজাতকের রক্তাক্ত হাতের থাবা। আর সেই ছোট ছোট থাবার ছাপ দিয়ে কাঁচের গায়ে কেউ ভেতর থেকে লিখে রেখেছে—"আমাকে বের করো!"
লেখাটা পড়ার সাথে সাথে ইনকিউবেটরের ভেতরের সেই গগনবিদারী কান্না হঠাৎ থেমে গেল। এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা নীরবতা নেমে এল পুরো ওয়ার্ডে। আমার নিশ্বাস আটকে আসছে। হঠাৎ, ভেতর থেকে একটা ছোট, ঝলসানো কালো হাত সজোরে কাঁচের গায়ে থাবা মারল! ঠিক আমার চোখের সামনে!
ঠক!
আমি আতঙ্কে ছিটকে পেছনে পড়ে গেলাম। আমার হাতের মোবাইলটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকারের ভেতর আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, ইনকিউবেটরের ছোট কাঁচের দরজাটা ক্যাঁচ করে খুলে গেল। আর তারপর... পোড়া মেঝের ওপর ছোট ছোট হাত-পা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কিছু একটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। খসখস... খসখস...
আমি মেঝেতে হাতড়ে মোবাইলটা খোঁজার চেষ্টা করছি, কিন্তু হামাগুড়ি দেওয়ার আওয়াজটা ক্রমশ আমার পায়ের কাছে চলে আসছে। হঠাৎ আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে তীব্র এক জ্বালাপোড়া অনুভূতি হলো। মনে হলো জ্বলন্ত কয়লার মতো কিছু একটা আমার গোড়ালি শক্ত করে খামচে ধরেছে! কোনো বরফশীতল হাতের স্পর্শ নয়, বরং ফুটন্ত আগুনের মতো উত্তপ্ত ছোট ছোট আঙুল।
তীব্র ব্যথায় আমি চিৎকার করে উঠলাম। অন্ধকারের মধ্যেই আমি পা ছুঁড়ে মারলাম। কিছু একটা ছিটকে গিয়ে পাশের একটা লোহার বিছানায় আছড়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার হাত মোবাইলে ঠেকল। আমি কাঁপা হাতে ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালালাম।
আলোটা সামনে পড়তেই আমার মস্তিষ্কের শিরাগুলো যেন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
আমার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে, একটা গলে যাওয়া লোহার বিছানার ওপর বসে আছে একটা ছোট্ট, কয়লার মতো কালো আর আধপোড়া মানবদেহ! তার চোখ দুটো কোটরাগত, আর সেখান থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটা ছিল তার ঠিক পেছনে।
বিছানার ঠিক পেছনে অন্ধকারের ভেতর থেকে উঠে দাঁড়াল দীর্ঘদেহী এক নারী। তার পরনের নার্সিং ইউনিফর্মটা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। তার মুখের অর্ধেকটা গলে বীভৎস হয়ে গেছে। সে তার ঝলসানো হাত দুটো আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। গলার ভেতর থেকে ঘড়ঘড়ে, যান্ত্রিক একটা আওয়াজ বের হলো—
"ডাক্তারবাবু... আগুন... আমার বাচ্চাগুলো পুড়তাছে... ওদের একটা ইনজেকশন দেন... ঘুম পাড়ায়ে দেন..."
নার্সটা এক পা সামনে এগোতেই তার গায়ের পোড়া চামড়া খসে খসে মেঝের ওপর পড়তে লাগল। আর সেই সাথে মেঝেতে হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করল আরও চার-পাঁচটা আধপোড়া নবজাতকের কঙ্কাল! তারা সবাই আমার দিকে তেড়ে আসছে।
আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। যন্ত্রণায় অবশ হয়ে আসা পা নিয়ে আমি অন্ধের মতো দৌড় লাগালাম দরজার দিকে। পেছন থেকে নার্সের সেই হাহাকার আর ছোট ছোট হাতগুলোর মেঝেতে ঘষটে ঘষটে আসার খসখস শব্দ আমাকে তাড়া করে ফিরতে লাগল। আমি কোলাপসিবল গেট পার হয়ে এক টানে গেটটা টেনে বন্ধ করে দিলাম।
দৌড়াতে দৌড়াতে আমি সোজা নিচে ডিউটি রুমে এসে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
পরদিন সকালে ডিউটি ডাক্তারকে বিষয়টা জানালে তিনি হেসে উড়িয়ে দেন। বলেন, টানা নাইট শিফটের ক্লান্তির কারণে আমার হ্যালুসিনেশন হয়েছে। আমি নিজেও হয়তো সেটাই বিশ্বাস করতাম। কিন্তু যখন ডিউটি শেষে হোস্টেলে ফিরে আমার ডান পায়ের প্যান্টটা গুটিয়ে ওপরের দিকে তুললাম, আমার হৃৎপিণ্ডটা আরেকবার যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
আমার পায়ের গোড়ালিতে স্পষ্ট পাঁচটা আঙুলের ফোস্কা পড়া পোড়া দাগ! ঠিক যেখানে রাতের অন্ধকারে জ্বলন্ত সেই ছোট হাতটা আমাকে খামচে ধরেছিল। শুধু তা-ই নয়, আমার সাদা অ্যাপ্রনের একদম নিচের দিকেও স্পষ্ট লেগে আছে দুটো ছোট, পোড়া হাতের কালো ছাপ।
হাসপাতালের সেই পোড়া চিলড্রেনস ওয়ার্ড থেকে আমি বেঁচে ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু আমার বিভীষিকা শেষ হয়নি। আজও রাতের বেলা নিজের ঘরে একা ঘুমাতে গেলে আমার কানে ভেসে আসে সেই ভাঙা গলার ঘুমপাড়ানি গান... আর মাঝে মাঝেই মনে হয়, আমার খাটের নিচ থেকে ছোট ছোট হাত-পা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কিছু একটা বেরিয়ে আসছে!