পুরোনো বইয়ের গন্ধ আমার সবসময়ই ভালো লাগে। নীলক্ষেতের এক পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে গত সপ্তাহে একটা চামড়ায় বাঁধাই করা ডায়েরি কিনেছিলাম। পাতাগুলো হলদেটে হয়ে যাওয়া ডায়েরিটা অন্তত পঞ্চাশ-ষাট বছরের পুরোনো। ডায়েরির ভেতর একটা অদ্ভুত গ্রামের খুব নিখুঁত বর্ণনা ছিল—নাম 'ছায়াদহ'।
ডায়েরির লেখকের দাবি, এই গ্রামে নাকি এমন কিছু মানুষ বাস করে যারা শত বছর ধরে একই রকম আছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গ্রামটার অবস্থান যেখানে বলা আছে, আমি স্যাটেলাইট ভিউ বা ডিজিটাল ম্যাপ তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেখানে কোনো জনবসতির চিহ্ন পেলাম না। ম্যাপে নতুন জায়গা বা রাস্তার আপডেট করা আমার একটা শখ। তাই ম্যাপে ওই জায়গাটা শুধুই একটা বিস্তীর্ণ ফাঁকা জঙ্গল দেখাচ্ছে দেখে আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। ম্যাপে যে গ্রামের অস্তিত্ব নেই, ডায়েরিতে তার এত নিখুঁত বর্ণনা এল কীভাবে?
রহস্যের খোঁজে গত শুক্রবার আমি একাই বেরিয়ে পড়ি ছায়াদহের উদ্দেশ্যে।
লোকাল বাস, ভ্যান আর সবশেষে দীর্ঘ পাহাড়ি মেঠোপথ পেরিয়ে যখন গ্রামটায় পৌঁছালাম, সূর্য তখন ডুবুডুবু। গ্রামটা দেখে একটু অবাকই হলাম। ছনের চাল আর মাটির ঘর, আধুনিকতার কোনো ছোঁয়াই যেন এখানে পৌঁছায়নি। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গোধূলির আলো ম্লান হওয়ার সাথে সাথে গ্রামের মানুষের আচরণ পাল্টে গেল। সবাই কেমন যেন তটস্থ হয়ে তাড়াহুড়ো করে ঘরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।
আমি একটা ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলাম, "চাচা, আমি তো অনেক দূর থেকে আসছি। এখানে কি রাতে থাকার কোনো ব্যবস্থা হবে?"
বৃদ্ধ আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী বা সাক্ষাৎ যমদূত। তিনি কোনো কথা না বলে দ্রুত আমার হাত ধরে টান দিয়ে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন এবং ভারী কাঠের দরজাটার খিল আটকে দিলেন।
"তুমি কোত্থেকে আসছ বাবা? জানো না এই গ্রামে সূর্য ডোবার পর বাইরে থাকা বারণ?" কুপি বাতির আলোয় দেখলাম বৃদ্ধের গলা কাঁপছে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, "কেন? বন্য পশুর ভয় আছে নাকি?"
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "পশু তো রক্তমাংসের হয়, তাদের মারা যায়। কিন্তু যাদের ছায়া নাই, তাদের তুমি কীভাবে মারবা? রাইতে এই গ্রামে যারা হাঁটে, তারা এই দুনিয়ার কেউ না। মনে রাখবা বাবা, রাইতে যাই ঘটুক, ভুলেও জানালার ফাঁক দিয়া বাইরে তাকাইবা না।"
দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তিতে রাতের খাবার খেয়ে আমি বৃদ্ধের মাটির ঘরের এক কোণায় তোশকের ওপর শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম আসছিল না। রাত তখন হয়তো এগারোটা কি বারোটা। পুরো গ্রামে পিনপতন নীরবতা। সাধারণত গ্রামে রাতে কুকুরের ডাক বা ঝিঁঝিঁপোকার শব্দ থাকে, কিন্তু এখানে সেটাও নেই। এক অশুভ, দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা!
হঠাৎ আমার মনে হলো, জানালার ওপাশ দিয়ে কেউ যেন হেঁটে যাচ্ছে। শুকনো পাতার ওপর পায়ের আওয়াজ। সাথে ফিসফিস করে কথা বলার শব্দ। বৃদ্ধের বারণ সত্ত্বেও আমার ভেতরের প্রবল কৌতূহল আমি দমাতে পারলাম না। পা টিপে টিপে জানালার কাছে গেলাম। কাঠের জানালার একটা ছোট ফাটল দিয়ে বাইরে তাকালাম।
পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় চারপাশটা একদম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দেখলাম, মাটির রাস্তা দিয়ে জনা দশেক মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। তাদের পরনে সাধারণ গ্রামের মানুষের মতোই পোশাক। কেউ কথা বলছে, কেউ হাসছে।
কিন্তু একটু ভালো করে খেয়াল করতেই আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।
চাঁদের আলো এত উজ্জ্বল, সবার অবয়ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, অথচ মাটিতে তাদের কারোরই কোনো ছায়া পড়ছে না! যেন তারা বাতাসে ভাসছে, কিন্তু তাদের পা ঠিকই মাটি ছুঁয়ে আছে। আমি আতঙ্কে পিছিয়ে আসব, ঠিক তখনই ঘটল সেই ভয়ংকর ঘটনাটা।
ছায়াহীন দলটির একেবারে পেছনে হাঁটতে থাকা লোকটা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। আমার মনে হলো আমার হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য স্পন্দন থামিয়ে দিয়েছে। লোকটা খুব ধীরে ধীরে তার ঘাড় ঘোরাল। চাঁদের আলোয় তার ফ্যাকাশে মুখটা স্পষ্ট। তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক, হিমশীতল হাসি।
সে সরাসরি জানালার সেই সরু ফাটলটার দিকে তাকাল, যেন ওই বিন্দুমাত্র ফাঁক দিয়েও সে আমার চোখের মণি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। এরপর রাতের সেই দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা চিরে তার ফিসফিসানি আমার কানে ভেসে এল, একদম স্পষ্ট—
"তানভীর... ভেতরে কী করিস? বাইরে আয়!"
আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুতের শক লাগল। লোকটা আমার নাম জানল কীভাবে? আমি তো এই গ্রামে জীবনে প্রথমবার এসেছি!
আমি ছিটকে পেছন দিকে সরে আসতে চাইলাম, কিন্তু ভয়ে আমার পা দুটো মেঝেতে যেন জমে গেছে। লোকটা এবার জানালার দিকে পা বাড়াল। তার সাথে সাথে সামনের দিকে হাঁটতে থাকা বাকি মানুষগুলোও একসাথে থমকে দাঁড়াল এবং রোবটের মতো একসাথে ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। সবার মুখে সেই একই রকম বিকৃত হাসি।
"আয়... আমাদের সাথে আয়..." ফিসফিস করে বলে উঠল তারা একসাথে।
হঠাৎ জানালার পাল্লায় প্রচণ্ড জোরে একটা থাবা পড়ল। কাঠের পাল্লাটা মড়মড় করে উঠল। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে যাব, ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা রুক্ষ হাত শক্ত করে আমার মুখ চেপে ধরল।
বৃদ্ধ! তিনি আমাকে এক ঝটকায় জানালার পাশ থেকে টেনে ঘরের মেঝের ঠিক মাঝখানে নিয়ে এলেন। আমার কানে ফিসফিস করে বললেন, "শব্দ করবা না! ওরা তোমারে দেইখা ফেলছে। এখন যদি ঘরের দরজা খোলে, কেউ তোমারে বাঁচাইতে পারব না।"
বাইরে তখন শুরু হয়েছে এক নারকীয় তাণ্ডব। মাটির ঘরের নড়বড়ে কাঠের দরজায় আর জানালায় খামচে ধরার শব্দ। মনে হচ্ছে অসংখ্য নখ দিয়ে কেউ কাঠ আঁচড়াচ্ছে। আর সেই সাথে একটানা ফিসফিসানি—"দরজাটা খোল তানভীর... আমরা জানি তুই ভেতরে আছিস।"
আমি বৃদ্ধের হাত খামচে ধরে মেঝেতে শুয়ে কাঁপতে লাগলাম। ঘরের ভেতরে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা কুপি বাতিটা হঠাৎ দপ করে নিভে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমরা দুজন শুধু দরজার দিকে তাকিয়ে আছি। প্রতিটা সেকেন্ড যেন এক একটা যুগ। আমার মনে হচ্ছিল এই বুঝি দরজাটা ভেঙে পড়বে আর ছায়াহীন ওই মানুষগুলো আমাকে টেনে নিয়ে যাবে ওদের সেই অদেখা জগতে।
এভাবে কতক্ষণ কেটেছে আমার জানা নেই। একসময় বাইরের আঁচড়ানোর শব্দ আর ফিসফিসানি থেমে গেল। ফজরের আজানের কোনো শব্দ নেই, তবে ভোরের ম্লান আলো জানালার ফাটল দিয়ে ঘরে এসে পড়ল।
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার মুখ থেকে হাত সরালেন। "যাও বাবা, এই গ্রাম ছাইড়া এহনই চইলা যাও। আর কোনোদিন এই পথ মাড়াইবা না।"
আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে পাগলের মতো ছুট লাগালাম মেঠোপথ ধরে। পেছনে একবারের জন্যও ফিরে তাকাইনি।
লোকাল বাস আর ট্রেন পাল্টে যখন ঢাকায় নিজের রুমে এসে পৌঁছালাম, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। মনে হলো এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন থেকে বেঁচে ফিরেছি।
ব্যাগ থেকে জিনিসপত্র বের করতে গিয়ে সেই পুরোনো ডায়েরিটা হাতে ঠেকল। অদ্ভুত এক ঘোরে আমি ডায়েরিটা খুললাম। যে পাতা পর্যন্ত আমি পড়েছিলাম, তার পরের পাতাটা একদম সাদা ছিল। কিন্তু আজ সেখানে লাল কালিতে স্পষ্ট অক্ষরে একটা নতুন লাইন লেখা—
"তুই চলে গেলি তানভীর? সমস্যা নেই, আজ রাতে আমরাই আসছি তোর ছায়া নিতে!"
লাইনটা পড়ার সাথে সাথে আমার ঘরের লাইটটা দপ করে নিভে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, আমার বন্ধ ঘরের দরজার ওপাশ থেকে কেউ একজন ফিসফিস করে ডাক দিল—
"তানভীর... ভেতরে কী করিস? দরজা খোল!"
আমি আতঙ্কে পাথর হয়ে গেলাম। ঢাকা শহরের চারতলার এই ফ্ল্যাটে ওরা কীভাবে এল? কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালালাম।
দরজার দিকে এগোব, নাকি জানালা দিয়ে চিৎকার করে রাস্তার কাউকে ডাকব—ভাবতে ভাবতেই আমি জানালার পর্দাটা এক টানে সরিয়ে দিলাম। আর তখনই আমার মস্তিষ্কের শিরাগুলো যেন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
আমার ফ্ল্যাটের জানালার ওপাশে ঢাকার চেনা রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট আর দালানকোঠা থাকার কথা। কিন্তু সেখানে কী দেখছি আমি?
ঘন জঙ্গল! আর সেই জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ছনের চালের কয়েকটা মাটির ঘর। আকাশে সেই গোল ফ্যাকাশে চাঁদ। আমি তো ঢাকায় নেই! আমি এখনো সেই ছায়াদহ গ্রামেই আটকে আছি!
তার মানে সকালবেলার সেই পালানো, লোকাল বাস, ট্রেন, নিজের ফ্ল্যাট—সবটাই ছিল ওদের তৈরি করা একটা ঘোর, একটা ভয়ংকর মানসিক বিভ্রম!
হঠাৎ দরজার ভারী ছিটকিনিটা আপনাআপনি খুলে গেল। ক্যাঁচ করে একটা শব্দ করে দরজাটা খুলতেই আমি দেখলাম সেই বৃদ্ধ রসিদ চাচা দাঁড়িয়ে আছেন। তবে উনার চোখেমুখে কোনো পৈশাচিক হাসি নেই, বরং এক সীমাহীন ক্লান্তি আর দুঃখ।
"চাচা! আপনি?" আমি চিৎকার করে উঠলাম, "আপনারাও আমাকে ধোঁকা দিলেন?"
বৃদ্ধ ঘরের ভেতর ঢুকে দরজাটা আবার আটকে দিলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ধোঁকা তোমারে আমি দিই নাই বাবা, দিছে তোমার কৌতূহল আর ওই অভিশপ্ত ডায়েরি। আমি গত রাইতে তোমারে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তুমি জানালার বাইরে তাকাইয়া ওদের সাথে চোখ মেলাইছো। এখন ওরা তোমার ছায়ার গন্ধ পাইয়া গেছে।"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "কিন্তু ওরা আমার ছায়া দিয়ে কী করবে? কারা এরা?"
বৃদ্ধের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। "এরা কোনো রাক্ষস বা ভূত না বাবা। এরা অভিশপ্ত আত্মা। শত বছর আগে এক মহামারীতে এই গ্রামের সবাই মারা গেছিল। কিন্তু তাদের আত্মা মুক্তি পায় নাই। তারা এই গ্রামে আটকা পইড়া আছে। তাদের কোনো ছায়া নাই, তাই তারা আলোতে যাইতে পারে না। ওই ডায়েরিটা হলো এই গ্রামের একমাত্র প্রবেশদ্বার। যে ওইটা পড়ে, সে এই গ্রামের মায়াজালে আটকা পড়ে। ওরা চায় তোমার জ্যান্ত ছায়াটা নিতে, যেন সেই ছায়া ভর করে ওরা অনন্তকালের এই খাঁচা থেকে মুক্তি পায়।"
ঠিক তখনই দরজার বাইরে শুরু হলো নারকীয় তাণ্ডব। অসংখ্য হাত যেন দরজাটা ভেঙে ফেলার জন্য আঁচড়াচ্ছে। সেই সাথে শত শত মানুষের ফিসফিসানি—"ছায়া... আমাদের একটা ছায়া দে তানভীর... আমরা আর এই অন্ধকারে থাকতে চাই না!"
দরজার কাঠ মড়মড় করে ভাঙতে শুরু করেছে। আমি বুঝতে পারলাম, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ওরা ভেতরে ঢুকে পড়বে।
আমি মরিয়া হয়ে বললাম, "চাচা, বাঁচার কি কোনো উপায় নেই? আমি তো মরতে চাই না!"
বৃদ্ধ আমার হাতের ডায়েরিটার দিকে তাকালেন। "উপায় একটাই বাবা। যে ডায়েরি তোমারে এইখানে আনছে, সেই ডায়েরি চিরতরে শেষ কইরা দেওয়া। এই মায়াজালের শিকড় হলো ওই বইটা। আগুন লাগাও বাবা! পুড়াইয়া দাও এই অভিশপ্ত অতীত!"
বাইরের ছায়াহীন মানুষগুলো যেন বৃদ্ধের কথা শুনতে পেল। তাদের ফিসফিসানি মুহূর্তেই গগনবিদারী চিৎকারে রূপ নিল। হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল কাঠের দরজাটা। চাঁদের আলোয় দেখলাম, জনা পঞ্চাশেক ফ্যাকাশে মানুষ ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছে। তাদের চোখগুলো কোটরাগত, শূন্য দৃষ্টি। সবার হাত আমার দিকে প্রসারিত।
আমি আর এক মুহূর্তও ভাবলাম না। পকেট থেকে আমার লাইটারটা বের করে এক ঝটকায় ডায়েরির পাতাগুলোর ঠিক মাঝখানে আগুন ধরিয়ে দিলাম।
বহু বছরের পুরোনো শুকনো পাতাগুলো মুহূর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। ডায়েরিটা পোড়ার সাথে সাথে ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল। আমার মনে হলো, একটা দমকা হাওয়া যেন পুরো ঘরটাকে কাঁপিয়ে দিল। ছায়াহীন মানুষগুলো যারা আমার দিকে তেড়ে আসছিল, তারা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।
আগুনের লেলিহান শিখা যত বাড়ছে, মানুষগুলোর বীভৎস চেহারা ততটাই শান্ত হতে শুরু করেছে। তাদের আর্তনাদ বদলে যাচ্ছে স্বস্তির দীর্ঘশ্বাসে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ডায়েরিটা পুড়ে ছাই হওয়ার সাথে সাথে মানুষগুলোর শরীর থেকে একটা সোনালি আলোর আভা বের হতে লাগল।
সবচেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লোকটা—যে আমাকে জানালা দিয়ে ডাক দিয়েছিল, সে আমার দিকে তাকিয়ে একটা স্নিগ্ধ হাসি হাসল। তার সেই পৈশাচিক রূপ আর নেই। সে ফিসফিস করে বলল, "ধন্যবাদ তানভীর... তুই আমাদের ছায়া দিসনি ঠিকই, কিন্তু শত বছরের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়েছিস।"
লোকটার শরীরটা ধীরে ধীরে জোনাকি পোকার আলোর মতো বিন্দু বিন্দু হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যেতে লাগল। তার সাথে সাথে গ্রামের বাকি মানুষগুলোও শান্তিতে চোখ বন্ধ করে হাওয়ায় বিলীন হয়ে গেল।
বৃদ্ধ রসিদ চাচা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। "ভালো থাইকো বাবা। তোমার নিজের আলোতেই তুমি ছায়া পাইবা।" কথাটি বলেই তিনিও ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় মিলিয়ে গেলেন।
আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। ধোঁয়ায় আর ক্লান্তিতে আমি মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়লাম।
যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দুপুরের কড়া রোদ আমার মুখে এসে পড়ছে। আমি চোখ পিটপিট করে তাকালাম। আমি কোনো মাটির ঘরে নেই। একটা বিশাল সবুজ প্রান্তরের মাঝখানে একটা বড় বটগাছের নিচে শুয়ে আছি। দূরে একটা পিচঢালা রাস্তা দেখা যাচ্ছে, যেখান দিয়ে দুই-একটা বাস আর সিএনজি চলছে।
আমি উঠে বসলাম। চারপাশের পরিবেশ একদম স্বাভাবিক। পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ। আমার ঠিক পাশেই পড়ে আছে এক মুঠো কালো ছাই। সেই ডায়েরির ছাই।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকালাম। কড়া রোদে মাটিতে আমার স্পষ্ট, গাঢ় একটা ছায়া পড়েছে। ছায়াটা দেখে আমার মুখে একটা স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
আমি জানি না ছায়াদহ গ্রামটা আসলেও ছিল কি না, নাকি পুরোটাই ওই ডায়েরির কোনো জাদু ছিল। তবে আমি এটা জানি, কিছু কিছু নিস্তব্ধতা আর অন্ধকার শুধু ভয় দেখায় না; কখনো কখনো তারা শত বছর ধরে শুধু একটু মুক্তির অপেক্ষায় থাকে।
আমি ছাইগুলো বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে মেইন রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার পেছনে শুধু পড়ে রইল এক অসীম, সুন্দর নৈঃশব্দ্য।