বিশাল ধানী মাঠ। মাঝখানে এক প্রতিবেশী ভদ্রলোক জমি ভরাট করেছেন, বাড়ি বানাবেন বলে। বাউন্ডারি দেয়ালের ভেতরে উঁচু সেই জমিটায় মাঝেমাঝেই গিয়ে বসি। প্রচুর সবুজ ঘাস। বিকেলবেলা বসে বসে সবুজ ফসলী জমিতে বাতাসের ঢেউ দেখতে ভালোই লাগে।
বহুদিন ধরে তাঁর বাড়ি ওঠে না দেখে আমি একদিন দরজায় নাড়া দিলাম। চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম- "কী বিষয়, বেশ ক'বছর তো হয়ে গেল, বাড়ি তোলার কদ্দূর?" বললেন- "আরে ওটা বছর কুড়ি পরের প্রজেক্ট, নাতিপুতিরা বড় হলে ও-বাড়ি বানাবার কথা ভাববো। আপাতত এভাবেই থাকবে। সামনের বর্ষায় কিছু বনজ গাছপালা লাগিয়ে রেখে দেবো।"
আমি বললাম- "তাহলে এক কাজ করেন, বছর দশেকের জন্য আমারে লিজ দিয়া দেন। আমি স্বল্পকালীন ফলমূল চাষ করি, বছর বছর আপনি টাকাটাও পাইলেন, আর ফলমূল যা খাইতে পারেন..."
ভদ্রলোক দ্বিরুক্তি করলেন না। দুদিনেই কাগজপত্র হয়ে গেলো। আমি তারপর ভাবতে বসলাম, দশ বছরের তরে কী করা যায়!
দেখতে দেখতে বোশেখ মাস চলে এলো। মৈমনসিংহে এক প্রফেসর বন্ধু ছিলো, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। তারে চেপে ধরার সপ্তাহখানিক যেতে না যেতেই ভালো একটা ব্যবস্থা হয়ে গেলো। অত্যুত্তম কলা আর হাইব্রিড পেঁপের বীজ পাঠিয়ে দিলো। একরোজের তিন কামলা লাগিয়ে জমি প্রস্তুত করে বীজ বপন করা হলো।
মাসকয়েক পার হতে না হতেই অনেকগুলো গাছে কলার মোচা দেখা দিলো। অত্যন্ত বাড়ন্ত জাতের বৃক্ষ। প্রচুর মোচা খাইলাম, বউরেও খাওয়াইলাম। কিন্তু বউ একপর্যায়ে ত্যাক্ত হয়ে গেলো। বলে কী, আর খাবে না।
তখন লোভ দেখালাম- "শোনো, কলার মোচায় প্রচুর পরিমাণে লৌহ আছে। লৌহ খেলে প্রচুর উপকার। বিশেষ করে মেয়েরা খেলে তো.. প্রতি মাসে তোমাদের স্রাবের সাথে যেসব লৌহ উপাদান বের হয়ে যায়, সেটার ক্ষয়পূরণ হয়।"
বউ শুনে ওষুদ বানিয়ে খেতে শুরু করলো। অবস্থা এমন যে, এখন আমারেও আর ভাগ দিতে চায় না!
বউয়ের যৌবন দীর্ঘস্থায়ী হইলে আমার লাভ-লস দুটিই হতে পারে; আপাতত লাভটাই চক্ষুষ্মাণ রেখে আমি মোচাপর্ব উপভোগ করতে লাগলাম।
এবার কলাগাছ পাহারা দেওয়া দরকার।
কিছুদিন পর যখন প্রথম ফলন আসলো, বাগান দেখে যারপরনাই আনন্দ হলো। আমি কঞ্জুস নই। আত্মীয়-স্বজন সবাইকে কয়েক কাঁদি করে কলা পাঠালাম, একলা একলা আমার তো বাপ-মাও কোনোদিন খান নাই, আমি কেন পেট খারাপের ঝুঁকি নেবো?
প্রথম ফলন তোলার মাঝামাঝি পর্যায়ে একটা সময় আত্মীয়-স্বজনপর্ব শেষ হয়ে গেলো। এবার ভাবনা এলো, একটা ব্যতিক্রম বাজার তৈরি করা যায় কিনা?
বউয়ের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার শহরবাসী বুদ্ধিজীবী বন্ধুদেরকে দু'তিন কাঁদি করে কলা উপহার দেবো। এরা কার্বাইড দিয়ে পাকানো কলা খেয়ে খেয়ে নাড়িভূড়ির দৈর্ঘপ্রস্থ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে; আমার গাছপাকনা কলার স্বাদ একবার পেয়ে গেলে নিশ্চিত পরেরবার আর বলতে হবে না।
কাস্টমার তৈরির এই মহান মিশন নিয়ে প্রথমে গেলাম আমার এক শিক্ষক বন্ধুর বাসায়। দুই কাঁদি কলা পেয়ে বন্ধুপত্নীর যে আনন্দ, দেখে কিঞ্চিত সন্দেহ হলো, বন্ধুটা কোনো মাথাখারাপ মেয়েছেলে বিয়ে করেছে কিনা! আমার নিজের বউ তো সোনার গয়না পেয়েও এতো খুশদিল কখনো হয় নি।
যাইহোক, চা-টা খেয়ে গেলাম এক ডাক্তার বন্ধুর বাসায়। সে তো পারলে তখনই আমার বাসায় চলে আসে। তার সবকটি কলা চাই। বেচারা ডাক্তার হয়েও পেটখারাপে ভুগে.. সব দোষ দেয় ভেজাল খাদ্যাদ্যির ওপর। আরে বাবা, এইদেশে কী মানুষ খেয়ে বাঁচে না? তাঁর কথা শুনলে দেশটা ছেড়ে আজকেই উত্তর কোরিয়া চলে যেতে মন চায়।
যাজ্ঞে, আমার ধরা দরকার কাস্টমার। গলা খাকারি দিয়ে বললাম- "বন্ধু, এটা তো আমার বিজনেস। তুমি বন্ধুর লাইগা বড়জোর দাম কম রাখতে পারি, কিন্তু লিজ নেওয়া জমি তো, তুমি বুঝই সবকিছু।"
বন্ধু আমার হাতে নগদ টাকা ধরিয়ে দিলো। লজ্জার বিষয়! বললাম- "এইগুলা তো গিফট।" সে বললে- "এইটা আগামী মাসের অগ্রিম!"
খুশদিলে বের হয়ে রওয়ানা দিলাম কলেজ জীবনের এক রাজনীতিবিদ বন্ধুর বাসায়। সে এখন আমার বিরোধী শিবিরে রাজনীতি করে, সরকারিদলে আছে। টেন্ডারবাজী করে মোটামুটি কোটিপতি হয়ে গেছে।
কলা হাতে দিয়ে বললাম- "আমার বাগানের কলা, একেবারে গাছপাকনা। নো ফর্মালিন, কার্বাইড এটসেট্রা..."
বন্ধু কলা হাতে নিয়া ভেতরঘরে পাঠিয়ে দিলো। চা-টা খেয়ে কলেজজীবনের বহু গল্পসল্প হইলো। বন্ধুর মুখটা দেখে ক্যামন চিন্তিত মনে হলো, মস্করাও করলাম, কিন্তু কারণ কিছু বোঝা গেল না।
বিদায়বেলায় বন্ধু আমারে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসলো। তার আন্তরিকতার বহর দেখে আশ্চর্যান্বিত হলাম। হঠাৎ বলে উঠলো- "আমারে কলা দ্যাখাইলা বন্ধু? কিছু বুঝলাম না। তবে আমি যে কে, তার হিসাবটা যেন তোমার মাথায় থাকে।"
আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গাড়িতে বসে থাকলাম। গাড়ি চলছিলো এক কবি বন্ধুর বাসায়। ড্রাইভারকে বললাম- "থামো, গাড়ি ঘুরাও। কলা বিতরণ আজকের মতো সমাপ্ত।"
"রাজনীতিবিদের শেষ হিসাব তবু অনুমান করা যায়, বড়োজোর মুসোলিনী, হিটলার, বুশ কিংবা লাদেন হবে। কিন্তু কবির ব্যাপারে অনুমান নাই। ওই শালা কী করবে নিজেও জানে না।"
২১-০৩-২০১৯