Fiction

ঈগল থাবা ও রাঘব বোয়াল

September 11, 2026

9
View

মেয়েটা হামাগুড়ি দিয়ে ছোট্ট মাঠটা পাড় হতে থাকলে ঝড় হাওয়ায় পাশের ঝাউ গাছ দুটি থেকে শন শণ শব্দ ওঠে। চমকে ওদিকে তাকিয়েছিলাম আমি, সাথে সাথে বেলাও।

-          এই, ঝড় আসবে না তো? চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল ও।

-          না, তা তো হবার নয়, ফোনের ওয়েদার চ্যনেল তো তাইই দেখাচ্ছে।

হটাত ওঠা দমকা হাওয়া সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যায়। আমি নরম সবুজ ঘাসে চাদর বিছিয়ে বরফ সহ বালতিতে ভাব ক্লিকো খুশে দিচ্ছি, বেলা বনভোজন-ঝুড়ি থেকে একটি থালায় সাজাচ্ছে তিন রকমের চিজ, হাঁসের মাইটার পাতে, কিছু আঙুর, শুঁকনো খেজুরের মত আরও অনেক কিছু। ঠিক তখনই একটু দূর থেকে ডাক ভেসে এলঃ

-          কামিলা… কামিলা…

ঝাউয়ের তলায় মাঠের ধারে বসা বুড়োর গলায় উৎকণ্ঠ স্পষ্ট। বুড়ো বসে থাকলেও লম্বায় আমার সমান, দাঁড়ালে না জানি কেমন হবে। এত লম্বা বলেই কেন যেন সমীহের সঙ্গে  একটু দূরত্ব বজায় রেখে এ জায়গাটা বেছে নিয়েছিলাম। খুব সম্ভবত হামাগুড়ি দেয়া মেয়েটার নাম হবে কামিলা। বুড়োর নাতনি তাটনি হবে টবে। এতে উৎকণ্ঠার কি আছে। মেয়েটা যাচ্ছিল তো নানি বা দাদির দিকে। মহিলা বসে আছেন আমাদের ছাড়িয়ে অনেকটা দূরে। মেয়েটা ওদিকেই যাচ্ছিল। বুড়োর গলা শুনে ঘাড় ফেরালে কামিলা চোখে পরে না, মহিলাকে ছাড়িয়েও না। হটাত উবে গিয়েছে, মা ধরণি গিলে খেয়েছে। গেল কোথায় মেয়েটা! হামাগুড়ি দিয়ে চোখের আড়াল, অসম্ভব। এছাড়া মাঠে আর কেউ তো নেই। তবে…, চোখের কোন দিয়ে রন আমিচির মত কাউকে কি…? নাহ্‌, অসম্ভব। রন আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে তেইশ বছর আগে।

গ্রামের নাম শেরউইন উইলিয়ামস। স্টেশনে নামার দুই মিনিট আগে ঘোষণা শুনে অবাক হয়েছিলাম, শেরউইন উইলিয়ামস- আমেরিকান বিখ্যাত রঙের কোম্পানি। এই নামের কোন গ্রাম আছে বলে জানা ছিল না।   সেই কৌতূহল থেকেই আমরা নেমে স্টেশনের পাশেই এক হোটেলে উঠি। এমন নয় যে বিশ্বের সব গ্রামগুলোর নামই আমার জানা বা আমরা এই অঞ্চলে থাকি। ব্যাপারটা অন্যরকম। গ্রাম হিসেবে নামটাই গোলমেলে, কিন্তু কেন যে গোলমেলে, নিজের কাছেও তা স্পষ্ট নয়।

আমরা থাকি সুদুর ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোতে। অর্ধ-অবসর নেবার পর থেকে গত সাত বছর যাবত প্রতি বারই ইউরোপ আসা হয়। আসি সাধারনত অফ সিজনের একটু আগে। এতে করে টিকেট পাওয়া যায় সস্তায়, টুরিস্টের ভিড় থাকে কম, এছাড়া কড়ি সাশ্রয়ের জন্য টিকিটও কিনে রাখি অনেক আগে থেকে। প্লেনের ও ট্রেনের , দুটোই। সাধারনত এসে নামই হিথরো বা চার্লস দ্য গাল-য়ে। ট্রেনের টিকিটের মেয়াদ একমাস, বাইশ বার ওঠা নামা করা যাবে। এভাবেই প্রতি বছর আমরা একমাস ইউরোপ দেখি, ট্রেন থামার আগ মুহূর্তে কোন অচেনা জায়গায় নেমে পড়ি। সঙ্গে দুটো ব্যাকপ্যাক ছাড়া কিছুই থাকে না। মোটামুটি দেখা হয়ে যায় দুএকদিনের মধ্যেই। আবার ট্রেন উঠি নতুন কোন গন্তব্যের খোঁজে। তবে মনে হয় না দুএকদিনের মধ্যে জায়গাটাকে আবিষ্কার করতে পারব। ছোট হলেও গ্রামটা ভীষণভাবে অন্যরকম। টারকয়েজ নীল গাছপালার রঙ থেকেই এটাকে আলাদা করা যায়। তাছাড়া ট্রেন থেকে নেমেই দেখেছি এখানের বাসিন্দারা সব যুদ্ধ ফেরত সৈনিক এবং তাদের পরিবার; ২য় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সব বড় বড় যুদ্ধ ফেরত পশ্চিমারা এখানে বাসা বেঁধেছে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে অংশগ্রহনকারি শেষ জন মারা গিয়েছে অল্প কয়েক বছর আগে। গ্রামে ওরা ফলায় প্রচুর মাছ মাংশ ও কৃষি জাত দ্রব্য। নিজেদের প্রয়জন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পাঠায় অন্যান্য জায়গায়, আর আমদানি করে অন্যসব নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। বলা হয়ে থাকে এটম বোমা হামলা না হলে ইংল্যান্ডের ওপর এই একটা গ্রামই ঠেকিয়ে দিতে পারবে যে কোন বড় ধরনের আক্রমণ।

আজ সকালে হোটেল থেকে বেরুলে চোখে পড়ছিল প্রচুর পুকুর। হোটেলের জানলা দিয়ে দেখেছিলাম ন-দশ বছরের এক মেয়ে বড়শিতে গেথেছে এক রাঘব বোয়াল। একা টেনে তুলতে পারছিল না। ‘দাদা দাদা’ ডাকে সাহায্যর জন্য চিৎকার করছিল। ঠিক পাশেই লম্বা তাল গাছের ওপরের ঈগলটা ঠোঁট দিয়ে নখর ধারাচ্ছিল আর ঘাড় কাত করে তাকাচ্ছিল। তবে অবাক হয়েছিলাম অন্য এক দৃশ্য দেখে; খুব ভোরে প্রায় শ’ ছয়েক গাড় রঙের, প্রায় আমারই মত চামড়ার নারী পুরুষ এসে নামল কয়েক ডজন বাস থেকে। সব চলে গেল খেত খামারে কিন্তু গ্রামের বিশাল কারখানা তিনটির দিকে কেউ এগুলো না। জিজ্ঞাসা করে জানতে পেরেছিলাম লাভজনক নয় বলে অনেক বছর যাবত ওগুলো বন্ধ আছে।

বেলা আর আমি মেয়েটাকে খুঁজতে বৃদ্ধের সঙ্গে যোগ দিই। যোগ দেয় বৃদ্ধাও যাকে আমি মেয়েটার দাদী বা নানি বলে ভেবেছিলাম। মেয়েটাকে নাকি বই পড়তে পড়তে লক্ষ্যই করেননি, জানিয়েছিলেন উনি। ধীরে ধীরে গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রায় সকলে, যোগ দিয়েছে আমাদের সঙ্গে, কারও কারও হাতে কে নাইন কুকুরের চেইন। কুকুরগুলো ওদের আগে আগে হাঁটছে, এদিক ওদিক অনিশ্চিতভাবে গন্ধ শুঁকছে, কিন্তু কামিলা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। বিকেল তিনটের পরপরই চলে গিয়েছে সবগুলো বাস। গ্রামের অধিকাংশেরই সন্দেহ ওদের কেউ একজন কামিলাকে চুরি করেছে। আমি যতই বলতে চাই যে শেষবারের মত যখন কামিলাকে দেখেছি তখন বাজে চারটে সাতচল্লিশ, কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না, উল্টো সন্দেহের চোখে দেখে। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে, দমকা হাওয়ার কারনে মুঠো ফোন দেখেছিলাম আর তখন লেখা উঠেছিল ৪:৪৫। তাছাড়া স্টেশনের পাশের দোকানটাতে কেনাকাটার রশিদে রয়েছে ৪:২৩ এর ছাপ।

সন্ধ্যে সাতটায় মেয়রের অফিসে জরুরী সভার ডাক পরে। বেলা আর আমি দাঁড়িয়ে শুনছিলাম সকলের পেছনে। সকলেই মেয়রের সঙ্গে একমত, বাহির থেকে আসা কেউ একজন এই অপকর্মটি করেছে। আগামীকাল থেকে আর বাইরের কাউকে ঢুকতে দেয়া হবে না।

-          তাহলে খামার, কৃষিকাজ, পরিষ্কার এগুলো কে করবে? সভার অনেকেই প্রশ্ন করে মেয়রকে।

-          আমরাই- জবাব দেয় মেয়র- বড় বড় যুদ্ধ করে আসা প্রাক্তন সৈনিক এই সামান্য কাজ করতে পারবে না!

-          তাছাড়া জিনিসপত্র বিক্রি করতেও তো অনেকে গ্রামে আসে, আবার প্রশ্ন আসে ভিড়ের মধ্য থেকে।

-          আগামীকাল থেকে বাইরের কিছু আর গ্রামে ঢুকবে না। আমাদের জিনিস আমরাই গড়ে নেব। কারখানা তিনটি আবার চালু হবে, আমাদের বেকার লোকদের কর্মসংস্থান হবে। কেউ বাইরের কিছু আনলে শতকরা ৫৭ ভাগ শুল্ক আদায় করব। উত্তর দেয় উস্কো খুস্কো সাদা চুলের মেয়র।

আমি আশে পাশের কোথাও বৃদ্ধকে দেখতে পাই না। নিশ্চয়ই বনবাদাড়ে খুঁজছে। সে ভাল করেই জানে ক’টার সময় মেয়েটা নাই হয়ে গেছে।

-          চল আমরাই ওকে সাহায্য করি।

 বেলা প্রস্তাব দিলে ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম মেয়রের অফিস থেকে।

রন আমিচি, অদ্ভুত এক চরিত্র। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় কর্মসূত্রে, মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। রনের সঙ্গে ছিল বব, বব সেরনা। দুজনেই আমাদের কাস্টমার, রেইনবার্ড কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার। রনের নামে রয়েছে সতেরটি আমেরিকান পেটেন্ট, যদিও সবগুলোর মালিকই হচ্ছে কোম্পানি। রন ও বব হরিহর আত্মা। সেই ভিয়েতনামের সময় থেকে। রন তিন তিনবার ববের জীবন বাঁচিয়েছে। দুজনেই ডেকরেটেড, রন মেরিন, বব আর্মি। রনের বাপ দাদা দুজনেই মেরিনে ছিলেন। দুজনেই ইতালির হয়ে যুদ্ধ করেছেন। তবে রনের জন্ম আমেরিকায়। কিভাবে সেটা সম্ভব হল তা জিজ্ঞেস করেও কোন সদুত্তর পাইনি রনের কাছ থেকে। আমাদের ভেতরে খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেলেও একই ভাবে ভিয়েতনাম প্রশ্নে কোন জবাব পেতাম না। শুধু জমা হওয়া সমস্ত ক্রোধ এসে ফর্সা মানুষটার মুখ লাল করে দিত। মাঝে মাঝে এমন সব কাজ করত যে ওকে পুলিশ এসে ধরে থানায় নিয়ে যেত। একবার পুরনো ইঞ্জেকশন মোল্ডিং মেশিনের ব্যারেল দিয়ে কামান বানিয়ে ভেতরে বিশাল বিশাল আস্ত আলু ঢুকিয়ে ফায়ার করে কাঁপিয়ে দিয়েছিল চুলা ভিস্তা শহরের চৌঠা জুলাইয়ের সন্ধ্যে। পুলিশ এসে ওকে ধরে নেয়ার সময় অট্টহাসি দিচ্ছিল। থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে আর উত্তরে ও হো হো করে হাসে। শেষ পর্যন্ত ওকে ভি এ হসপিটালে পাঠানো হয়। পিটিএসটি বলে দেয়া ডাক্তারের ওষুধগুলো ও আমাকে দেখিয়ে নর্দমায় ফেলে দিয়েছিল আর হাসছিল। খুব ভাল পেনে রাঁধত ও। রাধলেই ডাক পড়ত ববের আর আমার। রনের বাড়িতে শুধু ইয়াং, একটি মিলিটারি ম্যাকাও, ভীষণ সুন্দর একটি বিশাল টিয়া। বাড়িতে ঢোকার আগে থেকেই শুনতে পেতাম, চিৎকার করছে, এই রন, অতিথি, অতিথি। কেন যেন ওর কথা খুব করে মনে পড়ছিল। ওকেই কি চোখের কোন দিয়ে দেখতে পেয়েছিলাম? না কিভাবে? কিন্তু এরাও তো প্রাক্তন যোদ্ধা, হয়ত কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, মাঠে আসলে হয় বৃদ্ধার সঙ্গে নয়ত বৃদ্ধের সঙ্গে, জিজ্ঞেস করতে হবে।

হেনরিকে পেয়েছিলাম মাঠ বা পার্কটির পাশের এক পুকুরে। ততক্ষনে বৃদ্ধের নাম জেনে গেছি। পিঠে অক্সিজেন নিয়ে ডুব দিয়েছিল। সমস্ত তলা ওলটপালট করেও কিছু পায় নি। জানিয়েছিল ও।  এখন তার একটু দুরের আরেক পুকুরে যাবে।

-          শোন, তুমি কি রন আমিচিকে চেন? হটাত আমার প্রশ্নে চমকে ওঠে বৃদ্ধ।

-          তুমি, ওকে চেন! এই তো আজ বিকেলেও এসছিল। খুব ভাল ফ্রগম্যান।

-           তাহলে সেই হবে, ওকেই দেখেছি। আর তাই বুঝি তুমি শুধু পুকুরগুলোতেই শুধু খুঁজছ? কিন্তু ওর দ্বারা কি ছোট্ট একটি বাচ্চার কোন ক্ষতি সম্ভব?

-          আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে আমরা মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যাই, বোধ বুদ্ধি তখন সব লোপ পায়।

-          বাড়তি স্কুবা সরঞ্জাম আছে? জিজ্ঞেস করেছিলাম।

-          কেন? জান নাকি?

-          হ্যাঁ, একটু আধটু। এতটুকু গভীরতায় অসুবিধে হবে না।

-          মেনিয়েরস-এর কারনে ডাক্তার না তোমাকে ডুব দিতে বারণ… আমাকে থামানো যাবে না বুঝতে পেরে বেলা কথা শেষ না করে থেমে গিয়ে আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

গাড়ির পেছনে করে আর একটি সরঞ্জাম আসলে দ্রুত ওর সঙ্গে বিশাল পুকুরটিতে নেমে তলিয়ে যাই। সূর্যের আলো তখনও সম্পূর্ণ নিভে যায় নি। হেনরি নেমেছিল পশ্চিম পাড় দিয়ে আর আমি পূর্বের। গাড় মশারির মত তাঁবু দিয়ে ঢাকা ছোট্ট চারপেয়ে একটি খাট, পুকুরের তলায় স্থির। একটি পায়ার সঙ্গে অক্সিজেন ট্যাংক, ওপর দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে অক্সিজেন টিউব। যতদুর সম্ভব দ্রুত সাঁতার কেটে দুজনে ধরে খাটটা ওপরে নিয়ে আসতে আসতে গোধূলি পার হয় হয়। চারিদিকে লোকজন ঘিরে ধরেছে। বেলা আর মেয়র দাঁড়িয়েছে পাশাপাশি। ভেতর থেকে কামিলার হাত পা ছোঁড়ার স্পষ্ট শব্দ পাচ্ছি। সকলে সেল ফোনে ভিডিও তুলছে। হেনরি খুব ধীরে ধীরে সতর্কতার সঙ্গে মশারির একটা অংশ তুলে ভেতরে মাথা ঢোকায়।

একই রকম সতর্কতার সঙ্গে বের করে নিয়ে আসে কামিলার আকৃতির এক পুতুল, মুখে অক্সিজেনের নল গোঁজা। গলায় একটি নেকলেস। ভিড়ের কারও মুখে কোন শব্দ নেই, কিন্তু সকলের দীর্ঘশ্বাস একত্রে মিলে ঝড় হাওয়ায় রূপ নেয়। তাল গাছটার মাথা থেকে ঈগলটা উড়াল মারে। হেনরি গলার নেকলেস খুলে ভেতর থেকে অভিজ্ঞ মেরিনের মত বের করে একটি চিরকুটঃ ‘তাল গাছে ওঠ। ঈগলটা পঞ্চাশটি ডিম পেরেছে। আমি ওর সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড থেকে আনা একেবারে অন্যগুলির মত একই রকম আরেকটি নকল ডিম রেখেছি। ওটি চিনে নিয়ে খুললে ভেতরে পাবে পরবর্তী নির্দেশ। অন্য কোনটা ছোঁয়া চলবে না।

মাথা নেড়ে দুহাত উল্টো করে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে হেনরি। আমি কাছে থাকায় হাতের লেখাটা চিনতে পেরেছিলাম; রন আমিচি। আমাদের চোখে চোখে কথা হয়ে যায়। ছোট্ট বেলা থেকে আমি গাছে চড়ায় ওস্তাদ। কাপড় চোপড় খুলে তৈরি হতে শুরু করলে মাথা নেড়ে বলে হেনরি, ‘দেখছ না এখানে কি লেখা আছে? আমাকেই উঠতে হবে, ওর নির্দেশ পরিষ্কার। তা ছাড়া না ছুঁয়ে একান্নটি ডিম থেকে সঠিকটি চিনে নেয়া… আমি ছাড়া আর কারও কম্ম নয়। বুড়ো হয়েছি, কিন্তু কোনে হয় এখনও পারব, শেষবার গাছে উঠেছিলাম তা-ও বছর তিরিশেক তো হবেই। বলতে বলতে কাপড় চোপড় ছেড়ে  হাতে এক টুকরো রশি নিয়ে এগিয়ে যায় তাল গাছের দিকে। কোমরে গোঁজা কমব্যাট নাইফ। আমি আকাশের দিকে তাকাই চক্কর দেয়া ঈগলের খোঁজে।

তড়তড়িয়ে বারো বছরের শিশুর মত উঠে যাচ্ছে তালগাছ বেয়ে, হাতের রশিটা দিয়ে যেভাবে ওপরে উঠছে, মনে হচ্ছে প্রতিদিনই সে গাছটায় চড়ে ঈগলের সঙ্গে গল্প করার জন্য। ওপরে উঠলে ওর শরীরের অর্ধেকটুকু ঢাকা পরে যায় তালপাতার আড়ালে। ঈগলটাকে আশে পাশের কোথাও দেখা যায় না। যেভাবে উঠেছিল তারও বেশী গতিতে নেমে এসে আমার হাতে ধরিয়ে দেয় আরেকটি চিরকুটঃ তোমার ড্রয়িং রুমে দেখা হবে। হাতের ছোরা বাগিয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে এগোয় হেনরি। ওর পিছু নিয়ে পথ আগলে ধরে ছোরা কেড়ে নিই।

-          ঠিক আছে, খালি হাতেই ওর সঙ্গে আজ হবে একহাত। হয় ও মরবে নয় আমি।

বলতে বলতে লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যায়। ওর সঙ্গে পা মেলাতে আমাদের দৌড়াতে হয়। বাড়ির সদর হা করে খোলা। ড্রয়িং রুমের দরজা প্রায় প্রচণ্ড ধাক্কায় খুলে যায়। সামনে কামিলা, দোলনায় নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। একটু থেমে কামিলাকে পরখ করে হেনরি, মেয়েটার বিন্দুমাত্র ক্ষতিও হয় নি। এক লাফে এগিয়ে যায় হেনরি, জড়িয়ে ধরে রনকে।

-          আজ শোধবোধ হল।

মেয়র চিৎকার করে পুলিশ ডাকতে বলে।

-          ওঁর বিরুদ্ধে আমার কোন অনুযোগ নেই। বাদী কে হবে? বলে হেনরি।

Comments

    Please login to post comment. Login