Story

শেষ মেসেজটা আমার জন্য ছিল না

September 14, 2026

Jk Rimon

17
View

রাত ২টা ১৭ মিনিট।

ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠতেই ঘুম ভেঙে গেল আমার।

স্ক্রিনে একটা মেসেজ।

“তুমি যদি এটা পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি আর ফিরব না।”

মেসেজটা এসেছে এমন একজনের নম্বর থেকে, যাকে আমি গত তিন বছর ধরে চিনি না।

কারণ—

ওই মানুষটা তিন বছর আগেই মারা গেছে।

---

আমি কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

মনে হলো, হয়তো ভুল দেখছি।

চোখ কচলে আবার তাকালাম।

নম্বরটা ঠিকই আছে।

০১৭********

এই নম্বরটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।

কারণ এটা ছিল আমার বড় ভাই রাফির নম্বর।

তিন বছর আগে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় রাফি মারা গিয়েছিল।

তারপর থেকে নম্বরটা বন্ধ।

আমি নিজেই একসময় সিমটা রেখে দিয়েছিলাম। পরে সিমটি আর ব্যবহার করা হয়নি।

তাহলে আজ রাতে মেসেজটা এলো কীভাবে?

আমি কাঁপা হাতে রিপ্লাই দিলাম—

“কে?”

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এলো।

“তুই সত্যিই আমাকে ভুলে গেছিস?”

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।

আমি লিখলাম—

“রাফি ভাই?”

কোনো উত্তর নেই।

এক মিনিট।

দুই মিনিট।

তারপর আবার মেসেজ।

“কাল সকাল ৮টায় পুরোনো বাসস্ট্যান্ডে আসিস। কাউকে বলবি না।”

তারপর আর কোনো মেসেজ আসেনি।

---

সারারাত আমি ঘুমাতে পারিনি।

মনে হচ্ছিল, কেউ হয়তো আমার সঙ্গে মজা করছে।

কিন্তু একটা বিষয় আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল।

রাফি মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটা কথা বলেছিল—

“একদিন যদি আমার ফোন থেকে মেসেজ আসে, সেটা পড়বি। কিন্তু কাউকে দেখাবি না।”

তখন কথাটা শুনে আমি হেসেছিলাম।

ভেবেছিলাম, ভাই হয়তো কোনো অদ্ভুত রসিকতা করছে।

আজ বুঝলাম, সে রসিকতা করেনি।

--

সকাল ৭টা ৪৫।

আমি পুরোনো বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালাম।

জায়গাটা প্রায় ফাঁকা।

কিছুক্ষণ পর দূরে একটা বৃদ্ধ লোককে দেখতে পেলাম।

লোকটা ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলো।

আমার সামনে এসে বলল,

“তুমি কি রাফির ভাই?”

আমি অবাক হয়ে বললাম,

“জি।”

লোকটা একটা ছোট কালো ব্যাগ আমার হাতে দিয়ে বলল,

“এটা তোমার জন্য রেখে গিয়েছিল।”

“কে?”

লোকটা উত্তর দিল না।

শুধু বলল,

“রাফি বলেছিল, তুমি যখন একুশ বছর বয়সে পৌঁছাবে, তখন এটা দিতে।”

আমার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

ব্যাগটা খুললাম।

ভেতরে একটা পুরোনো মোবাইল ফোন।

আর একটা চিঠি

চিঠির ওপরে লেখা—

“শিমুলের জন্য।”

---

আমি কাঁপা হাতে চিঠিটা খুললাম।

ভেতরে মাত্র কয়েকটা লাইন।

«“ভাই,

যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তার মানে আমি আর তোর পাশে নেই।

কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—আমার মৃত্যুটা দুর্ঘটনা ছিল না।”»

আমি আর পড়তে পারছিলাম না।

চিঠির নিচে আরও একটা লাইন ছিল।

“যে মানুষটাকে তুই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করিস, তার কাছ থেকেই সাবধান থাকিস।”

আমার মাথায় প্রথমেই বাবার কথা এল।

না।

বাবা কেন?

তারপর মায়ের কথা।

বন্ধুদের কথা।

কাউকেই সন্দেহ করার কারণ নেই।

হঠাৎ আমার চোখ গেল পুরোনো ফোনটার দিকে।

ফোনটা চালু করতেই দেখলাম—

মাত্র একটি ভিডিও ফাইল।

তারিখ —

রাফির মৃত্যুর আগের রাত।

ভিডিও চালু করলাম।

স্ক্রিনে রাফি।

চোখেমুখে ভয়।

সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল,

“শিমুল, যদি তুই এটা দেখিস, তাহলে বুঝবি আমি যেটা ভয় করেছিলাম সেটা সত্যি হয়েছে।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলল,

“আমাকে যে গাড়িটা ধাক্কা দিয়েছিল, সেটা দুর্ঘটনা ছিল না।”

আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

রাফি আবার বলল,

“আমি কিছু একটা দেখে ফেলেছিলাম। এমন কিছু, যেটা আমার দেখা উচিত ছিল না।”

ভিডিওটা হঠাৎ থেমে গেল।

তারপর আবার শুরু হলো।

এবার রাফি খুব নিচু গলায় বলল—

“আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো…”

সে কয়েক সেকেন্ড ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকল।

তারপর বলল—

“আমাদের বাড়ির একজন মানুষ সব জানে।”

ভিডিও শেষ।

---

আমি ফোনটা নামিয়ে রাখলাম।

মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

“বাড়ির একজন মানুষ সব জানে।”

ঠিক তখনই আমার নিজের ফোনে একটা নতুন মেসেজ এলো।

অচেনা নম্বর।

“ভিডিওটা দেখেছিস?”

আমি লিখলাম—

“কে আপনি?”

উত্তর এলো—

“যার জন্য রাফি মারা গিয়েছিল।”

আমি আর কিছু লিখতে পারলাম না।

পরের মেসেজটা আসতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।

তারপর—

“এখন তোর পালা।”

আমি দ্রুত চারপাশে তাকালাম।

বাসস্ট্যান্ডে তখনও কেউ ছিল না।

কিন্তু দূরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।

গাড়িটার জানালা ধীরে ধীরে নামল।

ভেতর থেকে একজন আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

আমি তাকে চিনতে পারলাম।

আমার বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল।

কারণ গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষটা—

আমার বাবা।

আর ঠিক তখনই আমার ফোনে শেষ একটা মেসেজ এলো।

“এবার বুঝলি কেন বলেছিলাম, কাউকে বলবি না?”

আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তারপর বাবার দিকে।

আর প্রথমবারের মতো মনে হলো—

তিন বছর আগে যে মানুষটা মারা গিয়েছিল, সে হয়তো আমার ভাই ছিল।

কিন্তু যে সত্যিটা সে রেখে গেছে—

সেটা হয়তো তার মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর।

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login