আমরা যদি মৃত্যুকে কেবল একটি দুর্ঘটনা, একটি আইন-শৃঙ্খলা জনিত বিচ্যুতি বা একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা ভুল করবো। প্রতিটি মৃত্যুই তার নিজের মধ্যে একটি রাজনৈতিক পাঠ্য বহন করে। অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের সামনে সেই পাঠ্যটিকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হাজির করেছে।
প্রশ্নটি তাই অপ্রতিম কীভাবে মারা গেল, সেটি নয়। প্রশ্নটি হলো, অপ্রতিম যে কাঠামোর মধ্যে বেঁচে ছিল, সেই কাঠামোটি তাকে কীভাবে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।
রাষ্ট্রের কাজ কী? রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মৌলিক শর্ত কী?
আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের একেবারে গোড়ার কথাটি হলো, নাগরিক তার আত্মরক্ষার অধিকার, তার সহিংসতার অধিকার রাষ্ট্রের হাতে সমর্পণ করে। এর বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দেয়। এই যে চুক্তি, যাকে আমরা সামাজিক চুক্তি বলি, সেই চুক্তির প্রথম এবং প্রধান শর্তই হলো নিরাপত্তা। যখন রাষ্ট্র সেই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্র তার বৈধতার সংকটে পড়ে। অপ্রতিমের মৃত্যু সেই বৈধতার সংকটেরই একটি উদাহরণ।
টমাস হবস বলেছিলেন, রাষ্ট্র ছাড়া মানুষের জীবন হলো solitary, poor, nasty, brutish and short. মানুষ সেই ভয়াবহ প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে বাঁচতে লেভিয়াথানের জন্ম দেয়। লেভিয়াথান, অর্থাৎ রাষ্ট্র, তাকে নিরাপত্তা দেবে।
কিন্তু আমরা কোন রাষ্ট্রের কথা বলছি? আমরা যে রাষ্ট্রে বাস করি, সেই রাষ্ট্র নিরাপত্তা বলতে কী বোঝে? আমাদের রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তার ধারণাটি অত্যন্ত সংকীর্ণ, অত্যন্ত ক্ষমতা-কেন্দ্রিক। রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা মানে হলো, রাষ্ট্রের নিজের নিরাপত্তা। সরকারের নিরাপত্তা। ক্ষমতা কাঠামোর নিরাপত্তা। গদির নিরাপত্তা।
আর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা? সেটি এই রাষ্ট্রের চিন্তার পরিধির বাইরে চলে গেছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মানে তো কেবল পুলিশের পাহারা নয়। নিরাপত্তা একটি বহুমাত্রিক ধারণা।
প্রথমত, জীবনের নিরাপত্তা। রাস্তায় বের হলে আমি ঘরে ফিরতে পারবো কি না, সেই নিশ্চয়তা। দ্বিতীয়ত, জীবিকার নিরাপত্তা। আমার কাজটি থাকবে কি না, আমার শ্রমের মূল্য আমি পাবো কি না। তৃতীয়ত, মত প্রকাশের নিরাপত্তা। আমি যা ভাবি, তা বলতে পারবো কি না, বিনা ভয়ে। চতুর্থত, বিচার পাওয়ার নিরাপত্তা। আমার উপর অন্যায় হলে, আমি কোথাও যেতে পারবো কি না। অপ্রতিমের মৃত্যু এই চারটি স্তরেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে উন্মোচিত করে দিয়েছে।
রাষ্ট্র চলে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জনগণের সেবক না হয়ে ক্ষমতার সেবকে পরিণত হয়, তখনই ব্যর্থতার শুরু।
আজকে পুলিশ কার জন্য কাজ করে? ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ থানায় গেলে কী অভিজ্ঞতা হয়? একটি জিডি করতে গেলেও তাকে কেন দালাল ধরতে হয়? কেন তাকে শুনতে হয়, "এটা আমাদের বিষয় না"? পুলিশের এই যে জনবিচ্ছিন্নতা, এই যে ক্ষমতার লাঠিয়ালে পরিণত হওয়া, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। পুলিশ যখন প্রটোকল দেয়, যখন মিছিল ঠেকায়, যখন বিরোধী দমন করে, তখন তার দক্ষতা দেখা যায়। কিন্তু যখন অপ্রতিমের মতো একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন বাঁচানোর প্রশ্ন আসে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ অক্ষম, অনীহ, এবং অনেক সময় অনুপস্থিত।
বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও একই কথা। বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, বিচার পাওয়ার ব্যয়, এবং বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে যে ক্ষমতার অসম বিন্যাস, তা সাধারণ মানুষকে বিচার-বিমুখ করে তুলেছে। মানুষ জানে, বিচার পাওয়া তার অধিকার, কিন্তু সেই অধিকার অর্জন করার সামর্থ্য তার নেই। এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, এটাই অপরাধীকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। অপরাধী জানে, রাষ্ট্র তাকে ধরবে না, ধরলেও শাস্তি দেবে না।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা। রাষ্ট্র তার নাগরিকের কাছে জবাবদিহি করবে। কিন্তু আমাদের এখানে উল্টো চিত্র। নাগরিককে সারাক্ষণ রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র ঠিক আছে কি না, আপনার কর দেওয়া হয়েছে কি না, আপনার ফেসবুক প্রোফাইলে কী লিখেছেন, আপনার গ্যালারিতে এই ছবি, সেই ছবি কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি...
কিন্তু রাষ্ট্র যখন ব্যর্থ হয়, তখন কে জবাবদিহি করে? অপ্রতিমের মৃত্যুর পর কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছেন? কোন তদন্ত কমিটি হয়েছে যে কমিটি সত্য উদঘাটন করবে, দায়ীদের চিহ্নিত করবে? আমরা দেখি, প্রতিটি ব্যর্থতার পর রাষ্ট্রের ভাষ্য হলো, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটি নিয়ে রাজনীতি করবেন না। তদন্ত চলছে। এই যে দায় এড়ানোর ভাষা, এই যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি, এটাই রাষ্ট্রকে আরও ব্যর্থ করে তোলে। কারণ যে রাষ্ট্র তার ভুল স্বীকার করে না, সে রাষ্ট্র তার ভুল শোধরায় না। এটি সবচেয়ে গভীর সংকট। আমাদের রাষ্ট্র নাগরিককে নাগরিক হিসেবে দেখে না, প্রজা হিসেবে দেখে। নাগরিকের অধিকার আছে, প্রজার আছে করুণা প্রার্থনা।
রাষ্ট্রের উন্নয়নের যে গল্প আমরা শুনি, সেই গল্পে সাধারণ মানুষ অনুপস্থিত। সেখানে আছে ফ্লাইওভার, মেগা প্রজেক্ট, জিডিপির প্রবৃদ্ধি। কিন্তু সেই ফ্লাইওভারের নিচে যে মানুষটি রাতে ঘুমায়, তার নিরাপত্তার গল্পটি কোথাও নেই। উন্নয়ন যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়, যখন উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামো, তখন মানবিক নিরাপত্তা গৌণ হয়ে পড়ে।
অপ্রতিমরা এই উন্নয়নের গল্পের বাইরের মানুষ। তাদের জীবন, তাদের মৃত্যু, রাষ্ট্রের পরিসংখ্যানে একটি সংখ্যা মাত্র। এই যে অ-গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা, এই যে disposable করে তোলা, এটাই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম রূপ। রাষ্ট্র সরাসরি অপ্রতিমকে হত্যা করেনি, কিন্তু রাষ্ট্র এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে অপ্রতিমের মৃত্যু অবধারিত ছিল। এটাকে আমরা বলতে পারি structural violence, কাঠামোগত সহিংসতা।
আজ অপ্রতিম মারা গেছে, কাল আমি মারা যেতে পারি। কারণ যে কাঠামো অপ্রতিমকে রক্ষা করতে পারেনি, সেই কাঠামো আমাকেও রক্ষা করবে না।
এই উপলব্ধিটাই রাষ্ট্র চায় না। রাষ্ট্র চায় আমরা অপ্রতিমের মৃত্যুকে একটি ব্যক্তিগত শোক হিসেবে দেখি, একটি সামষ্টিক ক্ষোভ হিসেবে নয়। রাষ্ট্র চায় আমরা বিচ্ছিন্ন থাকি, ভয়ে থাকি, এবং নিজেদেরকে অসহায় ভাবি। কারণ সম্মিলিত নাগরিকই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নাফিউল হক
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬