Story

মুরগী চোর

September 21, 2026

7
View

একঃ

প্রাচীনকালের রাজতন্ত্রে একটা বিষয় খুব কমন ছিল-রাজ্যে রাজ্যে যুদ্ধ। একজন রাজার পরাজয়বরণ বা আত্নসমর্পন বিপরীত রাজাকে শক্তিশালী করে তুলত। আর যখন যুদ্ধ করার জন্য কোন প্রতিপক্ষ খুজে পাওয়া যেতো না তখন রাজারা নিজের রাজ্যের প্রতি মনোযোগী হতেন। নিজের রাজ্যের দস্যু ধরে ধরে হয় কতল করতেন অথবা অন্ধ কারাগারে কয়েদ করতেন।
প্রাচীনকালের মতো এখন আর রাজা মন্ত্রী বা উজির খুজে পাওয়া যায় না। তবে দেশে দেশে আজও দস্যুদের খুজে পাওয়া যায়। আমাদের চোখের সামনেই তারা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে।তাদের খোলস আর কর্ম প্রক্রিয়া পরিবর্তন হলেও কার্যক্রম একই আছে। পরিবর্তন হয়েছে শুধু নামে। আগে ওদের নাম ছিল দস্যু,এখন নাম হয়েছে বহু।যেমন, চোর,বাটপার, ডাকাত, সন্ত্রাস ইত্যাদি। এদের মধ্যে আবার কোয়ালিটিরও অভাব নেই। যেমন চোরের মধ্যে আছে সিঁধেলচোর, গাঁটকাটা চোর, পকেটমার, ছ্যাঁচড়া চোর, গরু চোর, মুরগী চোর ইত্যাদ ইত্যাদি!

দুইঃ
শফিকুল ইসলাম খান আমার নিজ গ্রামের সীমান্তের কাছেই বসবাস করেন। সে আমার নিজ গ্রামের বাসিন্দা না হলেও আশেপাশের সব গ্রামের সব কিছুতেই তার সশরীরে উপস্থিত হওয়া চাই-ই চাই, তা সে বিচার শালিস হোক কিংবা বিয়ে-শাদীর দাওয়াতই হোক। সে মনে করে তার মতো নেতা দুটো হয় না। তিনি প্রকাশ্যে তা বলেও বেড়ান, তাতে লোকে নাক সিটকাক বা গায়ে পরে দুটো কথা বলে যাক; তাতে শফিকুল ইসলাম খানের ইজ্জতে কোন ভাটা পরে না।
জন্মগত নাম শফি হলেও তার নামের পিছনে খান কোথা থেকে এসেছে তা কেউই বলতে পারে না। সম্ভবত তার এস, এস,সি পাশের সার্টিফিকেট এর মতো কোথাও না কোথাও থেকে যোগাড় হয়েছে!

সেই বিখ্যাত শফিকুল ইসলাম খান এখন আমার সামনে বসে আছে। চকচকে জুতোর সাথে মানানসই প্যান্ট আর এই প্রচণ্ড গরমে খুব দামী একটা ফুলহাতা শার্ট পরে চেয়ারে রাজকীয় ভঙ্গিতে পা তুলে বসে আছে। তাকে কেউ ডাকেনি তারপরও এসেছে। উনি আমার উপকার করতে এসেছেন- একটা চাকরী দেবেন-এখানে আসার এটাই তার উদ্দেশ্য।
এইরকম লোকের সামনে আমি বরাবর-ই অস্বস্তি অনুভব করি। এই সংকটের বাজারে যেচে চাকরী সাধার মাঝে "কিন্তু" আছে।
"কিন্তু" পরিষ্কার করছি। শফি সাহেব একটা প্রাইভেট ইন্সিওরেন্স কোম্পানিতে আমাকে চাকরী দেবেন কিছু বিনিময়ের মাধ্যমে। তার সাথে যারা এ পর্যন্ত বিনিময় করেছে তারা সব কিছু খুইয়েছেন, যদিও শফি সাহেব তা ঝেড়ে মুছে অস্বীকার করেন বরাবর।
শফি সাহেব কিছুকাল সিংগাপুর ছিলেন, তাই ইংরাজি মোটামুটি আয়ত্বে এনেছেন যদিও একাডেমীক ইংরাজির সাথে তার ইংরাজির কোন মিল নেই।
তিনি আমাকে ইংরাজিতে প্রশ্ন করেছেন।মোটামুটি ভাইবা বলা যায় আরকি। ইংরাজি প্রশ্নে কোনভাবে আটকাতে না পেরে গাম্ভীর্যপূর্ণ চোখে জিজ্ঞেস করলেন,"তুমি মাস্টার্স করোনি কেন, তোমার বাবা এতো কষ্ট করে তোমাকে পড়িয়েছে আর তুমি পড়াশুনা বাদ দিয়ে ঘড়ে বসে আছো! খুব খারাপ কাজ করেছো।"
আমি চুপ করে আছি দেখে আবার জিজ্ঞেস করলো,
"তোমার সাবজেক্ট কী?"
"দর্শন"
"এইটা আবার কী?"-শফি সাহেবের বিরক্তিসূচক জিজ্ঞাসা।
আমি টানা সাড়ে চার বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পড়েছি, তাও বুঝতে পারিনি দর্শন কী, এখন এক কথায় কি করে বোঝাই দর্শন কী!
তাই চুপ করে রইলাম। চুপ করে আছি দেখে উনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,"এটা কী কমার্সের সাবজেক্ট? "
আমি বললাম, "না।"
শফি সাহেব বিস্ময়ের সাথে বললেন, "না? এক জীবনে এতো ভুল মানুষ করে কীভাবে! তুমি জান, তোমার সাবজেক্ট যদি কমার্সের বিষয় হতো তবে আমার মুখের কথায় তোমার চাকরী হয়ে যেতো। অন্যজনের কাছে যেখানে সাত আট লাখ টাকা নেই সেখানে তোমার জন্য বিশ পঁচিশ হাজার টাকায় কাজটা করে দিতাম।"
ইন্সিওরেন্স কোম্পানিতে চাকরী পেতে সাত আট লাখ লাগে, কথাটা ভেবেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। সাত আট লাখ টাকা দিয়ে ইন্সিওরেন্স কোম্পানির চাকরী করলে সেটা আর লাইফ ইন্সিওরেন্স হবে না, হবে "লাইফ ইন হেল!"

কথা এড়িয়ে গিয়ে ছোট্ট করে জবাব দিলাম,"ভাই আমি বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিক্ষা দিয়েছি, সেখানে সাবজেক্ট কোন সমস্যা করেনি।"
যারা নিজেদের নেতা মনে করে তারা এতো সহজে দমবার পাত্র নয়। সে নতুন উদ্দমে আবার গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রশ্ন করা শুরু করলো,"তুমি ঘরে বসে আছো কেন? চাকরীর জন্য চেষ্টা করতে হবে তো, তোমাকে কী কেউ বাড়িতে এসে চাকরী দিয়ে যাবে? বাপ মা'র দিকে তাকাও না?"
আর চুপ করে থাকা যায় না। আমি কিছুটা রাগত স্বরে বললাম,"এক বছরে সতেরোটা পরিক্ষা দিয়েছি, আপনাকে কে বলেছে আমি ঘরে বসে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করছি?"
"শুনলাম, তুমি নাকি বাজারে এখন দোকানদারী করো, আরেকটু ভাল কিছু করতে পারতে।"
খুব কৌশলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন হয়ে গেল, ধূর্ত লোকের এটা একটা বৈশিষ্ট্য,তারা কৌশল বোঝে।
বিশ্ববিখ্যাত সারভাইবাল এক্সপার্ট বেয়ার গ্রীলস একটা কথা বলেছেন,"কোন কিছু না করার চাইতে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া ভাল।"- আমি যদি একথা আমার সামনে বসা আহাম্মককে বলি তবে কী প্রত্যুত্তর আসতে পারে সেই চিন্তা করে চুপ করে রইলাম।
আরো কিছুক্ষন উল্টাপাল্টা কথা বলার পর অবশেষে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। বারান্দায় এসে যখন দুজনে দাঁড়ালাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। একটা মোড়গ কর্কশ কন্ঠে ডেকে উঠলো। শব্দ এতো জোড়ে হলো যে মনে হচ্ছে কানের ইঞ্চি দুই সামনে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলো! শফি মিয়াকে আতকে উঠতে দেখলাম।

এটা আমার মায়ের খুব শখের মোড়গ। যেমন দশাসই সাইজ তেমনি তার রং। বড়বড় ধবধবে সাদা পালকের সাথে গলায় টকটকে লাল বলয়।এখন রাজকীয় ভঙ্গীতে বসে আছে বারান্দার রেলিং-এ।
শফি মিয়া বলল, "এখানে মোড়গটা দেখতে ভাল লাগছে না।"
আমি ঘাড় বাকা করে জিজ্ঞেস করলাম, "কোথায় ভাল লাগবে?"
"গরম ভাতের প্লেটে।"-বলে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে লাগলো।
রাগে গাঁ জ্বলে গেল আমার, কিন্তু মুখে কিছু বললাম না। ভাগ্যিস ঐ সময় মা বাড়িতে ছিল না, থাকলে শফি মিয়ার খবর ছিল।
মা এই মোড়গটাকে খুব ভালবাসে, মরে গেলেও কাউকে ছুতে দেবে না।
যাহোক শফি মিয়া ভালয় ভালয় বিদায় হয়েছে।

তিনঃ
হঠাৎ করে রাতের ঘুম ভেঙে গেল। মোবাইলে দেখলাম রাত এখন দুইটা সাতচল্লিশ। ঘুম ভাঙা কোন সমস্যা না, সব মানুষেরই কোন না কোন সময় হঠাৎ করেই ঘুম ভাঙে। কিন্তু আমার ঘুম ভেঙেছে কিছু একটার শব্দে। শব্দের উৎস খুজে পাচ্ছি না। টর্চ নিয়ে সন্তর্পণে বাইরে বেড়িয়ে এলাম। আজকাল চোরের উপদ্রব খুব বেড়ে গেছে তাই টর্চ জ্বালালাম না। অন্ধকারে চোখ সয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। সয়ে যেতেই হালকা চাঁদের আলোয় দেখলাম কেউ একজন খোঁয়াড়ের ভিতর থেকে মা'র খুব সখের মোড়গ বের করছে। ধবধবে সাদা রঙের কারনে আবছা জ্যোৎস্নাতেও দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি।
তার মানে হচ্ছে আমার ঘুম ভেঙেছে মোড়গের কর্কশ শব্দে। মুরগী চোর ধরার জন্য মানুষ ডাকতে হবে না, আমি একাই যথেষ্ট। আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে চোরের ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চোর একহাতে মোড়গের গলা চেপে ধরেছে, কিন্তু সুবিধা করতে পারছে না।নখের আচড়ে লোকটার দফারফা। গায়ে কিছু নেই,লুঙ্গিখানি গামছা দিয়ে খুব আটো করে বাধা।
লোকটা যেই ঘুরেছে ওমনি তার মুখের উপর টর্চ জ্বেলে দিলাম। টর্চের আলো মুখের উপর পড়তে যা দেড়ি, মোড়গ ছেড়ে দিয়ে লোকটা একেবারে স্থির হয়ে গেছে। আকস্মিকতার চোটে নড়তে পর্যন্ত পারছে না। চোর যেমন স্থির হয়ে গেছে আমিও তেমনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছি। আমার সামনে হাত পা ছেড়ে দিয়ে যে ভদ্র লোক দাঁড়িয়ে আছে তিনি আর কেউ নন, আজ সন্ধাতেই আমার বাড়িতে তশরিফ আনা গুণী নেতা শফিকুল ইসলাম খান!
মোড়গটা গলা ছেড়ে ডাকছে কিন্তু আমি কী করবো?
মোড়গের মতো গলা ছেড়ে মানুষ ডাকবো নাকি মিনার কার্টুনের মতো গলা ছেড়ে চিৎকার করে বলবো, "একটা চোর আমাগো মুরগী লইয়া গেছে,চোর ধর,ধর চোর............।

Comments

    Please login to post comment. Login