Story

একজনের গল্প অথবা অনেকের.......

September 26, 2026

13 views

লোকজন ভর্তি একটি অফিসের ওয়েটিংরুম। আজকে এখানে চাকরির জন্যে ইন্টারভিউ হবার কথা। শুরু হবার কথা ছিল সকাল ৯ টায় এখন ১০ টা বাজে। সবাই কিঞ্চিৎ বিরক্ত। এই বিরক্ত জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য সৈকত, সে ও এসেছে ইন্টারভিউ দিতে।

সৈকত বিরক্ত, ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত। কোন পরীক্ষা জাতীয় ঘটনার দিন সে সকালে নাস্তা করতে পারে না। ছোটবেলার অভ্যেস। এখন মনে হচ্ছে খেয়ে আসা উচিৎ ছিল। ক্ষুধা এমন এক ধরনের অনুভূতি যা কাউকে স্বস্তি দেয় না, কখনও। "আর কতক্ষণ লাগবো? কাকা"। সৈকত জিজ্ঞেস করলো অফিসের বয়স্ক পিয়নকে। পিয়ন বললেন, " জানিনা, ম্যাডামের তো এত্ত দেরী কুন দিন অয় না।" কিছু কি খেয়ে আসবে নিচে গিয়ে? নাকি পড়ালেখা করবে সামান্য?? ভাবলো সৈকত। স্বীদ্ধান্ত নিল নিচে নেমে চা খেয়ে আসবে। কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, ছাতা নিয়ে আসেনি সে। ওর ছাতা নিয়ে হাটতে ভাল লাগে না। বোঝা মনে হয়।

নিচে নামেনি সৈকত অফিস কর্তৃপক্ষ সবাইকে কফি খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কফি…. সৈকত খুব একটা কফি খায় না। ওর ভাল লাগে না।

শুধুমাত্র অঞ্জনার সাথে কফি খেত সৈকত। অঞ্জনা ওর ভার্সিটি ব্যাচমেট ছিল। সিরিয়াস টাইপের স্টুডেন্ট ক্লাস, পরীক্ষা, ক্যারিয়ার এগুলো নিয়ে থাকতো সব সময়। অঞ্জনার 'অঞ্জনা' নামটি রেখেছিলো ওর দাদা। মনীর খানের গানের ভক্ত ছিলেন তিনি। মনীর খানের গান ছিল 'অঞ্জনা' নামে। ভার্সিটির সবাই অঞ্জনাকে খেপাতো মনীর খানের এক্স বলে। সৈকত ডাকতো 'অজানা' বলে। অঞ্জনা জিজ্ঞেস করেছিল অজানা নামে ডাকার কারণ। সৈকত বলেছিল "তোমাকে আমি বুঝি না, তাই তুমি অজানা"।

সৈকত ভালবাসতো অঞ্জনাকে। কোনদিন বলা হয়নি যদিও। একদিন চিন্তা করেছিল, অঞ্জনাকে নিয়ে কোথাও চা খেতে যাবে তখন বলবে। অঞ্জনাকে চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিল একদিন। অঞ্জনা যাবে বলেছিল, কবে?? সেটা আর বলে নি। চাও খাওয়া হয় নি।

ভার্সিটি শেষ হবার কয়েকদিন পর সৈকতের মোবাইল চুরি হয়ে যায় সবার নাম্বার হারিয়ে যায় জানা অজানা সবার। আগের নাম্বারের সিমই তুলেছিল ভেবেছিল অঞ্জনা হয়তো ফোন দেবে। বন্ধুরা ফোন দিয়েছিল অঞ্জনা নয়। অঞ্জনার খবর কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারে নি সৈকত, আর যাদের জিজ্ঞেস করছিল তারা জানতো না অঞ্জনার খবর। পরে শুনেছিলো বিদেশে গিয়েছে পড়তে। অঞ্জনা কি বিদেশেই সেটেল হয়েছে?? নাকি দেশে ফিরেছে?? আর ফিরলেই বা কি?? অঞ্জনাকে কি আবার খুজবে সৈকত? বলবে, চা খাওয়া হয়নি তাদের?? দু'কোটি লোক থাকে এই ঢাকা শহরে, এখানে কে কাকে খুজে পায়??? নিজের মনেই হাসলো সৈকত।

অফিসের পিয়ন খবর দিয়ে গেলেন যে, ইন্টারভিউ শুরু হতে হতে সাড়ে ১১ টা / ১২ টা। "ম্যাডামের শ্বাশুড়ীর শরীর খারাপ তাই আইতে দেরী হইবো" বললেন তিনি। চাপা একটা গুঞ্জন শোনা গেল। অনেকের কাজ আছে ইন্টারভিউ দেয়ার পর। কাজ আটকে গেল তাহলে। সৈকতের যদিও কোন কাজ নেই চাকরি করেছে আগেও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ, শপিং মলের ম্যানেজার, প্রাইভেট টিউশনি অনেক কিছু। এখন আপাতত বেকার। এর আগে একটি গার্মেন্টসের একাউন্ট সেকশনে ছিল সে। গার্মেন্টসটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরিটা আর থাকে নি। এখন সে এক বন্ধুর কোচিং সেন্টারে পড়ায়। এই চাকরিটা হচ্ছে একাউন্টেটের। স্যালারী ভাল।

চাকরি না থাকাতে অবশ্য তেমন কোন সমস্যা হয় নি ওর। সৈকতের বড় ভাই বিশাল বড় ব্যবসায়ী, ওর খরচ সব ওর ভাই ই চালায়। বয়সে সৈকতের চাইতে ১২ বছরের বড়। খুব ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গিয়েছিল সৈকতের। মায়ের চেহারা তার খানিক মনে পড়লেও বাবার চেহারা মনে নেই ওর। যদিও ও ওর বড় ভাইয়ের সাথে থাকে না।

সৈকতের বড় ভাই সাগর। তিনি ঢাকাতেই থাকেন নিজের ফ্ল্যাট। সৈকত বড় হয়েছে তার কাছেই। ওর বড় ভাইয়ের শ্বাশুড়ি ওকে বড় করেছেন, মায়ের স্নেহ দিয়ে। নিজের ছেলের মতই দেখতেন তিনি সৈকতকে। মায়ের অভাব বুঝতে দেন নি তিনি সৈকতকে। তিনি যখন মারা যান মা হারানোর বেদনা টের পেয়েছিল সৈকত। প্রকৃতি মানুষের সুখ অপূর্ণ রাখলেও বেদনা তেমন অপূর্ণ রাখে না।

সৈকত আগে ভাইয়ের বাসাতেই থাকতো। ভাইয়ের এক ছেলে এক মেয়ে, ওরা বড় হয়ে যাবার পর, সে বাসা ছেড়ে দিয়ে এক মেস বাসায় ওঠে।

মেস বলতে সৈকতের ভাবীর মামার বাসার নীচতলায় বিশাল দু'টি ফ্ল্যাট, যেটা তিনি ব্যাচেলরদের ভাড়া দেবার জন্য রেখেছেন।

তার স্ত্রী যদিও আপত্তি করেছিলেন কিন্তু ঢাকায় প্রথম অবস্থায় তিনি ব্যাচেলর এই কারণে বাড়ি ভাড়া না পেয়ে বেশ বিপদে পড়েছিলেন। তাই তিনি তার স্ত্রীর আপত্তি গ্রাহ্য করেন নি। নুরু মামা বেশ মানুষ। সারাক্ষণ হাসি খুশী থাকেন। মামীও বেশ মানুষ।

বাসা ছেড়ে যাবার সময় ভাবী খুব কান্নাকাটি করেছিলেন। সৈকত কে একদমই যেতে দিতে চান নি। শেষে নিজের মামা কে বলে তার ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থা করে দেন তিনি। ভাড়া অবশ্য সৈকতের ভাই ই দেন। সৈকত নিতে চায় নি। কিন্তু ভাবী রাগারাগি করায় অগত্যা।

এখানেই আছে সৈকত পাচ বছর হল। ভাই-ভাবী ওকে নিজের সন্তানের মত করে খেয়াল রাখতেন তার এত্ত আদর যত্নে বন্দী বন্দী মনে হত। মেসে থাকতে পারায় সে অনেকটা হাপ ছেড়ে বাঁচে।

এই ফ্ল্যাটে সৈকত এর সাথে আরো অনেকেই থাকে। বিচিত্র সব মানুষ। প্রত্যেকটি মানুষের মাঝেই আলাদা বৈচিত্র্য থাকে, এই ফ্ল্যাটে থেকে সৈকত সেটা বুঝেছে।

এই ফ্ল্যাটে সবচাইতে পুরনো মেম্বার মনসুর ভাই। বয়সে সৈকতের অনেক বড়। বোধহয় এই বাসার ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে প্রথম দিককার ভাড়াটে তিনি। তার ব্যাপারে অন্যান্য মেম্বাররা খুব বেশি একটা জানে না। সবাই আসে কয়েকদিন থাকে তারপর চলে যায়। রয়ে যান কেবল মনসুর। প্রথম যেদিন দেখা হয় তিনি সৈকত কে বলেছিলেন, " Young man May be I'm looking old but always call me ভাই" বয়সে যদিও নুরু মামার সমান তাও মনসুর কে সবাই ভাই বলেই ডাকে। নুরু মামাও ভাই ডাকেন।

অদ্ভুত রকমের মানুষ মনসুর ভাই। প্রতিদিন সকালে উঠে ৫০ বার কান ধরে উঠবস করেন। বলেন "প্রত্যেকেই পাপী, আমিও, তাই কান ধরে উঠবস করি, আল্লাহ যদি কিছুটা মাফ করেন।" তার ফিলসফি হল "পৃথিবীর সবারই প্রত্যেকদিন ৫০ বার কান ধরে উঠবস করা উচিৎ।" এতে করে নাকি দু'টো কাজ হবে এক ব্যায়াম দুই পাপের প্রায়শ্চিত্ত। অবশ্য কেউই তার ফিলোসফি খুব একটা পাত্তা দেয় না।

মনসুরের সাথে তার বন্ধু কামরান দেখা করতে আসেন মাঝে মধ্যে, তার কাছ থেকে শোনা যায়, কারো প্রেমে পড়েছিলেন মনসুর। বিয়ের কথাবার্তা পর্যন্ত গড়িয়েছিল ব্যাপারটা। মেয়ের বাবা রাজী হন নি। মেয়েও বাবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে, বিয়ে করতে চায়নি মনসুরকে। এরপর থেকে মনসুর ভবঘুরে হয়ে যান। বাসা থেকে বেড়িয়ে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে শুরু করেন। প্রেমিকার বিয়ের খবর শুনে মনসুর বলেছিলেন, "বিবাহ করা ভাল, মন ভালো থাকে" কিন্তু নিজের মন ভাল রাখার কোন চেষ্টাই তিনি করেন নি। এই ঘটনার পর আর বিয়ে টিয়ে করেন নি…….

অফিসের পিয়ন এসে বললেন, ইন্টারভিউ শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই, ম্যাডাম এসেছেন। এতক্ষণে সৈকত নজর দিল অফিসের দিকে থাই গ্লাস আর টাইলসে মোড়া। টবে কয়েক রকমের বাহারী গাছ। এসি পুরোটাই। সৈকত অনুভব করলো শীত করছে ওর সকালে খায় নি, তার উপর বৃষ্টি। অফিসের পিয়ন কে দেখলো ও। অনেকটা ওর স্কুলের অংকের স্যারের মত। খুব কড়া টিচার ছিলেন। একদিন প্রচন্ড মেরেছিলেন সৈকত কে। বাড়ীর কাজ করেনি বলে। জ্বর এসে গিয়েছিল। ক্রনিক ধূমপায়ী। গা থেকে সিগারেটের গন্ধ আসতো। জ্বর আসায় ভাবী খুব বিরক্ত হয়েছিলেন, "ক্যামন মাস্টার, বাচ্চাদের এভাবে কেউ মারে" ভাবী স্কুলে গিয়ে দেখা করতে চেয়েছিলেন। স্কুলে আর যাওয়া হয়নি। স্যার এসেছিলেন সৈকত কে দেখতে। অপরাধীর মত মুখ করে বসেছিলেন অনেক্ষণ সৈকতের মাথার কাছে।

মনীলাল ভট্টাচার্য সৈকতের অংকের টিচার। ঐ ঘটনার পর আর কখনো ছাত্রদের মারতেন না তিনি। সৈকতকে অনেক বার তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের ছেলে প্রণব দা বউ সহ ভারতে থাকতেন। বছরে আসতেন দু'এক বার স্ত্রী-সন্তান সাথে নিয়ে অথবা একাই । স্যার তার স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন দেশে। কত্ত মিষ্টি, পিঠা খেয়েছে সৈকত স্যারদের বাসায় হিসাব করা যাবে না। ক্যান্সার হয়েছিল স্যারের, ছেলে ইন্ডিয়াতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তিনি যান নি বলেছিলেন "মৃত্যু হলে যে কোন জায়গায় হবে, অসুস্থ্য শরীর নিয়ে জার্নির ধকল না পোহালেই ভাল।" বেশী দিন বাচেন নি তারপর। ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেহে। প্রণব দা, তার বাবা মারা যাবার পর, তার মাকে একরকম জোর করেই নিয়ে গিয়েছিলেন ভারতে। যাবার দিন সৈকত তার ভাইয়ের সাথে তাদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। সৈকতকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেদেছিলেন তিনি। আর তেমন কোন যোগাযোগ হয়নি তারপর। ক্যামন আছেন তিনি? বেঁচে আছেন? এখন দেখলে চিনতে পারবেন? ভাবলো সৈকত........

এসির বাতাসে শীত শীত করায় ঘুমিয়ে গিয়েছিল সৈকত। ঘুম ভাঙ্গলো এক লোকের চিৎকারে। ফোনে তার স্ত্রীকে ঝাড়ছিলেন, অনেকক্ষণ ধরে ফোন দিচ্ছিলেন, কেউ ফোন ধরছিলো না। দুশ্চিন্তায় রাগের বহিঃপ্রকাশ।

সৈকতের হঠাৎ সাজু ভাইয়ের কথা মনে পড়লো, ওর চাচাতো ভাই। গ্রামে থাকতো। ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন। কঠিন ভালবাসা। বিয়ে দিতে রাজী হন নি বলে সাজু ভাইয়ের বউ নিজের হাত টাত কেটে কি বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।

অবশেষে মেয়ের এহেন কর্মকাণ্ডে, তার বাবা রাজী হয়েছিলেন। সাজু পরে বিদেশ চলে গিয়েছিল বিয়ে করে, এক কোম্পানিতে চাকরী হয়েছিল, ভাল চাকরী। শর্ত ছিল ৫ বছরের আগে ছুটি চলবে না। বিদেশে যাবার দিন সাজুর বউ অনেক কেঁদেছিল। মূর্ছা যাচ্ছিল বারবার।

সাজু ফিরেছিল দু'বছর পরই। তার বউ আরেক জনের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। মানুষের অনুপস্থিতি ভালবাসা বিবর্ণ করে তোলে। সাজু দেশে ফিরেছিল। বিরহ বেশীদিন সহ্য হয় নি ওর। এরকম এক বৃষ্টির দিনে গলায় দড়ি দিয়েছিল সে। ভুল ভালবাসার শোকে সবার ভালবাসা ত্যাগ করে, সবাইকে শোকাচ্ছন্ন করে চলে যাওয়া। গ্রামে আর যাওয়া হয়নি সৈকতের। সাজুর ঘরে আর ঢোকে নি কেউ কোনদিন।

চাকরী হয়ে গেল সৈকতের। ইন্টারভিউ নিয়েছেন যে ম্যাডাম, সে ছিল অঞ্জনা। না আজও চা খাওয়া হয়নি সৈকতের। কফি খেয়েছে। পূর্ব পরিচিত বলে সহজেই চাকরি টা হয়ে গেল ওর। এটা অঞ্জনার হাজবেন্ডের ফার্ম। পরের সপ্তাহেই জয়েন করতে বলেছে সৈকতকে।

ইন্টারভিউ শেষ করে রিকশায় করে বাসায় ফিরছে সৈকত। হাতে মিষ্টির প্যাকেট আর কফির জার। মিষ্টিটা এমনিতেই কেনা, কফির জার মনসুর ভাইয়ের জন্য, হঠাৎ লোকটার জন্য হঠাৎ প্রচন্ড মায়া হচ্ছে ওর। এখন থেকে ভাবলো প্রতি সকালে সেও তার সাথে ৫০ বার কান ধরে উঠবস করবে।

তবে চাকরি টা করবে না সৈকত, স্বীদ্ধান্ত নিল । নাহ্ বিরহ বেদনায় নয়। চেনা জানা হওয়ায় চাকরীটা হয়ে গেছে। এরকম চাকরী করতে চাচ্ছে না সে। ওকে না পেলে অন্য কারো চাকরীটা হয়ে যাবে। ওর যেহেতু চাকরীটা না হলেও চলে।

ভাবলো বড় ভাইয়ের ব্যবসাতেই সাহায্য করবে এখন থেকে। ভাই - ভাবী অনেকদিন ধরেই পীড়াপীড়ি করছিলেন।

……. আর অঞ্জনা, যে একদিন হারিয়ে গিয়েছিল হঠাৎ করে। ফিরে এসেছিল, কিন্তু অজানা অচেনা হয়ে। কিছু অজানা, অজানা থাকাই ভালো।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login