Article

বই ধ্বংস, জ্ঞান সংরক্ষণ এবং কর্পোরেট ক্ষমতার ভয়

September 28, 2026

3 views

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত জ্ঞান সংরক্ষণ ও এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে তা হস্তান্তরের ইতিহাস। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ পাথরের ফলক, প্যাপিরাস, তালপাতা, পাণ্ডুলিপি এবং পরবর্তীতে মুদ্রিত বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞানকে সংরক্ষণ করেছে। একটি বই তাই কেবল কাগজের কয়েকটি পৃষ্ঠা নয়; এটি একটি সময়ের চিন্তা, সংস্কৃতি, গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও সভ্যতার স্মারক।

এই কারণেই কোনো দুর্লভ বা ঐতিহাসিক বই ধ্বংসের খবর নিছক একটি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সম্প্রতি AI প্রযুক্তির প্রশিক্ষণের জন্য পুরোনো ও দুর্লভ বই সংগ্রহ, স্ক্যান এবং কিছু ক্ষেত্রে স্ক্যানের পর বইয়ের ভৌত কপি নষ্ট করার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি সত্য হলে এটি নিঃসন্দেহে জ্ঞান সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি জ্ঞানকে মানুষের কাছে অভূতপূর্বভাবে সহজলভ্য করেছে। একটি বই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। একটি PDF-এর অসংখ্য কপি তৈরি করা সম্ভব। AI-ও কোটি কোটি পৃষ্ঠার তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে ডিজিটালাইজেশনকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু ডিজিটাল কপি কখনোই সব ক্ষেত্রে মূল বইয়ের পূর্ণ বিকল্প নয়। একটি ঐতিহাসিক বইয়ের কাগজ, মুদ্রণপ্রক্রিয়া, বাঁধাই, লেখকের স্বাক্ষর, প্রকাশনার সংস্করণ কিংবা বইটির শারীরিক অবস্থা—এসবও ইতিহাসের অংশ। একটি ডিজিটাল স্ক্যান সেই বস্তুগত ইতিহাসের সবকিছু সংরক্ষণ করতে পারে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিজিটাল জ্ঞান প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। একটি অনলাইন বই কোনো সার্ভারে সংরক্ষিত থাকতে পারে, কিন্তু সার্ভার বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কোনো প্ল্যাটফর্ম তার নীতি পরিবর্তন করতে পারে, কোনো কনটেন্ট কপিরাইটের কারণে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে অথবা ব্যবহারকারীর প্রবেশাধিকার সীমিত হতে পারে। ফলে জ্ঞান সংরক্ষণের সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো একাধিক মাধ্যম ব্যবহার করা—ডিজিটাল সংরক্ষণ যেমন থাকবে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের ভৌত কপিও সংরক্ষিত থাকবে।

এখানে আরেকটি গভীর প্রশ্ন সামনে আসে—জ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ কতটা গ্রহণযোগ্য?

আধুনিক বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ তথ্য, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। তাদের উদ্ভাবন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তথ্যের প্রবাহ ও প্রবেশাধিকারের ওপর তাদের প্রভাবও বেড়েছে। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান যদি বিপুল পরিমাণ জ্ঞান সংগ্রহ করে এবং সেই জ্ঞান ব্যবহারের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে ভবিষ্যতে জ্ঞান ও তথ্যের ক্ষমতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইতিহাসে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতায় পরিণত হওয়ার উদাহরণও রয়েছে। British East India Company তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরবর্তীতে সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্জন করে ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—কোনো প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিচয় শুধু তার ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে না। অর্থনৈতিক ক্ষমতা কখনো কখনো রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতাতেও রূপ নিতে পারে।

তবে AI কোম্পানি বা আধুনিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি East India Company-এর সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। সময়, আইন, প্রযুক্তি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু ইতিহাসের উদাহরণটি একটি সাধারণ নীতির কথা মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতা যখন অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তার ওপর জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি।

তাই AI-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং AI-এর বিকাশকে দায়িত্বশীল ও মানবকল্যাণমুখী করার দাবি জানানোই যুক্তিসঙ্গত। বই স্ক্যান করা যেতে পারে, ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা যেতে পারে, AI-কে জ্ঞান বিশ্লেষণে ব্যবহার করা যেতে পারে—কিন্তু এর পাশাপাশি দুর্লভ ও গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মূল কপিগুলোও সংরক্ষণ করতে হবে।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও বইয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। অনলাইন PDF ও মোবাইল স্ক্রিন দ্রুত তথ্য পাওয়ার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পড়াশোনা, গবেষণা এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনেক পাঠক এখনো মুদ্রিত বইকে বেশি কার্যকর মনে করেন। তাই ডিজিটাল মাধ্যমকে বাদ দেওয়ার পরিবর্তে আমাদের উচিত দুই মাধ্যমের শক্তিকে কাজে লাগানো।

দিনশেষে প্রশ্নটি প্রযুক্তি বনাম বইয়ের নয়। প্রশ্নটি হলো—মানবজাতির জ্ঞান কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা সেই জ্ঞান কীভাবে সংরক্ষণ করব?

একটি বইয়ের ডিজিটাল কপি তৈরি করা যায়; কিন্তু একটি হারিয়ে যাওয়া মূল বই ফিরিয়ে আনা সবসময় সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তির যুগেও লাইব্রেরি, আর্কাইভ এবং মুদ্রিত বইয়ের গুরুত্ব অটুট রাখতে হবে।

কারণ জ্ঞান শুধু ব্যবহার করার বিষয় নয়—জ্ঞান সংরক্ষণ করারও বিষয়।

আজ আমরা যে বইটিকে অপ্রয়োজনীয় কাগজ মনে করে ধ্বংস করছি, কয়েকশ বছর পরে সেটিই হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login