নেহাল বলল, দেখো। চারিদিকে আশেপাশে কোন মানুষও নাই। আমরা হয়তো গ্রামের অনেক গভীরে এসে পড়ছি।
তারপর নেহাল চায়ের দোকানদার চাচাকে বলল, চাচা। এখন কোন গ্রাম? আমরা কি ঢাকা থেকে অনেক দূরে এসে পড়ছি?
কিছুক্ষণ চুপ রইলো নেহাল দোকানদার এর উত্তর শোনার জন্য। আশেপাশে চাইলো নেহাল। তার সাদা ৪সিটের গাড়িটা মাটির রাস্তার ওপর গর্ব করে দাড়িয়ে আছে। আশেপাশে কুয়াশায় কিছু দেখা যায় না। তবে যতদূর ড্রাইব করেছে আশেপাশে অনেক দূরে দূরে কিছু টিনের বাড়িঘর ও লাইট জ্বলতে দেখেছে নেহাল ও তার স্ত্রী শেয়া।
এই যে এখন গাড়ি থামিয়ে নেহাল ও শেয়া চা খেল। তবে তাদের লোকেশন কোথায় তা বুঝতে পারছে না। এদিকে নেটওয়ার্ক নাই এখানে তাই লোকেশন ও দেখা যাচ্ছে না।
দোকানদার ইশারায় বলল, টাকা দেন। আমি কানে শুনি না।
মানিব্যাগ বের করে টাকা দিল নেহাল। একবার তাকালো শেয়ার দিকে। কেমন হাসিখুশি সে। শেয়া চা খেয়ে চায়ের কাপ এগিয়ে ধরেছিল তার দিকে। নেহাল নিল না। সে চা খেয়েছে নিজেরটা।
আসলে বিয়ের পর কাজের চাপে বাইরে বের হওয়া হয় না নেহাল আর শেয়ার। এইতো ৩মাস হলো। নেহাল ফ্রিল্যন্সিং করে। সারাদিন একই ঘরের নিচে থাকলেও ঘুরতে না যাওয়ায় সময় না দেওয়ায় বিরক্ত শেয়া। এটা বুঝেই রাত ১২টায় বের হয়েছিল নেহাল ও শেয়া। তবে এখন বাজে ২টা। আর গাড়ি চালিয়ে ঢাকা থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছে। এখানে গ্রাম আর গ্রাম। রিমোট এলাকা। কখনও তো পুরো আশেপাশে বাড়িঘরও দেখা যায় না।
নেহাল হাত বাড়িয়ে দিল শেয়ার দিকে।
নেহাল বলল, চলো যাওয়া যাক।
হাসিমুখে হাত ধরলো শেয়া। যেন ঘুরতে এসে বহুদিন পর সে খুব খুশি। তবে খুশি নয় নেহাল। তার অনেক কাজ বাকি পড়ে আছে। সেগুলো আগামীকাল ক্লাইনকে জমা না দিলে ডিলটা ক্যনসেল হবে তাও ৫০০ডলারে প্রজেক্ট। তবুও নিজের টেনসন ঢেকে যথেষ্ট হাসিমুখে ঢাকার চেষ্টা করছে নেহাল।
নেহাল ও শেয়া গাড়িতে উঠে গাড়িটা স্টার্ট দিল।
নেহাল গাড়ি চালাতে লাগলো। শেয়া তার পাশেই তার কাধে হেলান দিয়ে আছে। এভাবে গাড়ি চালাতে বিরক্ত লাগলেও বললো না কিছু নেহাল।
শেয়া খানিকটা চুপচাপ টাইপের মেয়ে। এই যে বিয়ে হয়েছে তাও নিজের মতো একা থাকে। নেহাল চেষ্টা করে গল্প করার জন্য। তবে শেয়া ঘুরতে পছন্দ করে। গল্প করতে না। নেহাল শেয়াকে বোঝার চেষ্টা করছে।
এই যে এখন শেয়া নেহালে গালে স্পর্শ করছে খোচা দাড়িগুলো ছুয়ে দিচ্ছে।
নেহাল বলল, তোমার ক্লিন সেভ পছন্দ?
শেয়া বলল, না তোমাকে দাড়িতেই ভালো মানায়।
কথাটা বলেই শেয়া নেহালের গালে একটা চুমু খেল।
চারিদিকে শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা। হঠাৎ নেহাল লক্ষ্য করলো শেয়া তার কাধেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
মোবাইল চেক করলো নেহাল। ৩টা ৩০বাজে। হ্যা। রাত হয়েছে অনেক। এখনও নেটওয়ার্ক নাই। যাক মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়াই ভালো। ঢাকার বাইরে এর আগে এভাবে আশা হয়নি নেহালের। সবসময় গুলসান ক্লাব আর বাড়ি এভাবেই চলছিল। তাছাড়া কাজে ব্যাস্ত থাকা পছন্দ নেহালের।
নেহাল ঘুমন্ত শেয়ার কপালে আলতো চুমু খেলো। শেয়া একটু নড়ে উঠলো। তবে পুরোপুরি জেগে উঠলো না।
নেহাল একা একাই গাড়ি চালায়। গাড়ির লাইটের সামনের পথ শুধু মাটির রাস্তা। আশেপাশে বাড়িঘরও নাই। একটা আবার কোথায় কে জানে? ঢাকা থেকে কতদূরে সে? এটাও জানা নাই।
হঠাৎ নেহাল দেখলো একটা টিনের ঢং দোকান। এই রাতের বেলা ও খোলা। যাক নেহালের একটু স্মোক করতে মন চাইছিল। তাই নেহাল গাড়ি থামিয়ে ফেলল।
কাধের থেকে আলতো করে শেয়ার মাথাটা নামিয়ে নিল। তারপর শেয়াকে কোলে করে পেছনের সিটে শুইয়ে দিল নেহাল। গাড়ির দরজা বন্ধ করে নেহাল দেখলো বাইরে তো ঠান্ডা লাগছে। তবে গাড়ির ভেতর উষ্ণতা ছিল।
গাড়ি থেকে কালো জ্যকেট টা পড়ে নিল নেহাল। একবার চোখ খুলে পেছনের সিট থেকে শেয়া ঘুম ঘুম চোখে বলল, কই যাও?
নেহাল বলল, ঘুমাও। সমস্যা নাই।
শেয়া আবার শুয়ে পড়লো।
নেহাল বাইরে বের হলো। একটা ১০বছরের বালক চা বানাচ্ছে। আশেপাশে কোন মানুষ নাই।
নেহাল বলল, এই ১টা চা দে তো। আর মারবোরো আছে?
বালকটি বলল, দুধ চা নাকি রং চা? আর মারবোরো নাইকা। আপনি কি হলিউড খাইবেন না ডার্বি?
নেহাল বুঝলো লোকেলয় থেকে অনেক দূরে এখানে সব কমদামি সিগারেট।
নেহাল বলল, এটা বাংলাদেশ এর কোন জেলা?
বালক চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, জেলা কারে কয় বুঝি না।
নেহাল চায়ের কাপ টা ধরলো। চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেট খেতে মন চাইলো।
নেহাল বলল, পড়াশোনা করিস না? আর এতো রাতে একা দোকানদারি করিস? তোর বাবা কই?
বালক বলল, বাবা মইরা গেছে। আর পড়ালেখা করুম কেমনে চায়ের দোকান কইরা ভাত খাই আমি আর মা।
নেহালের খারাপ লাগলো।
তাই চা শেষ করে মানিব্যাগ থেকে ৫০০টাকার নোট দিয়ে বলল, এটা রেখে দে। আর ২টা ডার্বি ই দে। কি করব এগুলাই খাই।
বালক ডার্বি এগিয়ে দিল আর টাকাও নিল। গরীব পোলাপান টাকা পেয়েও ভাব নিল যেন কিছু যায় আসে না। ঠোঁটে কোন হাসি নাই। নেহাল বুঝলো ৫০০টাকায় তার ঠোঁটের হাসি কেন যাবে না।
একটা ডার্বি সিগারেট পকেটে রেখে আরেকটা ধরালো নেহাল।
নেহাল বলল, এই কাচা রাস্তা শেষ হবে কখন? আর মেইন রাস্তাটা কই বলতে পারিস?
বালক বলল, এইহান থেকা সোজা যাইবেন ৫মিনিটে মেইন রাস্তা। তয় এতো রাইতে ওই রাস্তা ভালো না।
নেহাল কৌতুহল হয়ে বলল, ভালো না কেন? জ্বীন ভুত আছে?
বালক বলল, না। ওইখানে ডাকাতি হয়।
একটু ভয় পেল নেহাল তাও বলল, কোন ব্যপারটা না। ভালো থাকিস।
নেহাল বালকের চুলে হাত রেখে আদর করে গাড়ির কাছে আসলো। সিগারেট শেষ করলো। কি গন্ধ। বাজে অনেক। তবুও কি করবে দামি সিগারেট নাই এখানে।
গাড়িতে উঠে আবার স্টার্ট দিল নেহাল। পেছনের সিটে ঘুমাচ্ছে শেয়া। শিষ বাজাচ্ছে নেহাল। আর গাড়ি চলছে। চারিদিকে গাছপালা জঙ্গলের মতো। এই জঙ্গল পেরোলেই হয়তো মেইন রাস্তা। কে জানে?
ওয়ান ওয়ে রোড বলা চলে। গাছের মাঝখানে মাটির রাস্তা। গাড়ি ঘুরানোর উপায় নাই এতো ছোট। হঠাৎ নেহাল দেখলো কয়েকটা কলা গাছ দিয়ে রাস্তা আটকানো। নেহালের সন্দেহ হলো। বালকের কথা কানে বাজলো, ওখানে ডাকাতি হয়।
ভয়ে ভয়ে নেহাল গাড়ি থেকে নামলো। আশেপাশে তাকালো শুধু কুয়াশা। আকাশ ঘন নীল হয়ে আছে। চারপাশে পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে।
নেহাল হাত দিয়ে কলাগাছ একটার পর একটা ফেলতে লাগলো। ১২টার মতো কলাগাছ রাখা। কে রেখেছে?
এমন সময় একটা লোক হাতে চাপাতি নিয়ে এগিয়ে আসলো নেহালের পেছন দিকে। নেহাল খেয়ালও করেনি। লোকটা এসেই নেহালের পিঠে একটা কোপ দিল।
" ও আল্লাহ " বলেই নেহাল তীব্র ব্যথা চেচিয়ে উঠলো। আর পিঠে হাত দিয়ে ঘুরে তাকালো। পুরো মাথা ঢাকা মুখ ঢাকা শুধু চোখ দুটো খোলা ডাকাত।
ডাকাতটা আবার কোপ দিয়ে যাবে নেহাল ভয়ে দৌড় দিল।
" ও আল্লাহ বাচাও। বাচাও আমাকে"। নেহাল এসব বলে দৌড়াতে লাগলো। আশেপাশে কেউ নাই। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে আসছে। অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর নেহাল পেছনে তাকালো না ডাকাতটা আসছে না তাকে ধরতে।
নেহাল ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের ওপর বসলো। ওই যে দূরে কুয়াশার মাঝে তার গাড়ির লাইট দেখা যাচ্ছে। তবে ডাকাত টা কই?
পিঠে হাত দিয়ে নেহাল দেখলো রক্ত চুব চুব হয়ে আছে তার পিঠ। জ্যকেটকটা খুলে ফেলল নেহাল।
নেহাল বলল, আল্লাহ কোন বিপদে ফেললা আমাকে আমি কি মারা যাবো?
নেহাল ভেতরের গেন্জি দিয়ে পেচিয়ে নিল পিঠ বুকের কাছে গেন্জি এনে গিট্টু মারলো। তার ওপর জ্যকেটটা পরিহিত করলো।
নেহালের হঠাৎ মনে পড়লো শেয়া। তার স্ত্রী। সে তো গাড়িতে ঘুমাচ্ছে। ডাকাত কি ওর কোন ক্ষতি করছে?
এটা ভাবতেই নেহালের পাগলের মতো গাড়ির দিকে দৌড়াতে লাগলো। যেন পথ শেষ ই হয় না।
এদিকে শেয়া গাড়ির ভেতরে ঘুৃমাচ্ছে। হঠাৎ পায়ের কাছে হাতের স্পর্শ পেল সে। শেয়া ভাবলো হয়তো নেহাল। তবে নেহাল তো এভাবে টাচ করে না। ভয়ে চোখ খুলে বসে পড়লো শেয়া। এটা আবার কে? গামছাপড়া একলোক। নেহাল কোথায়?
ডাকাতটা চাপাতি দেখিয়ে শেয়া বলল, এনে তোরে কাইয়ালামু। জামা খুল নয়তো কারাপ ওইবো।
নেহাল গাড়ির কাছে আসতেই দেখলো গাড়ির পেছনের দরজা খোলা। সেখানে পা দেখা যাচ্ছে জুতা দেখে বুঝলো এটাই ডাকাতের জুতো। ভেতরে কি হচ্ছে তা নেহাল দেখতে পেল না।
আশেপাশে তাকালো নেহাল। একটা পাথর দেখলো। হাতে তুলে নিল নেহাল। তারপর আস্তে করে গাড়ির কাছে আসলো।
গাড়ির নিচে দেখলো শেয়ার জামা কাপড় ছিড়ে পড়ে আছে। নেহাল দৌড়ে গাড়ির পেছনের দরজার কাছে এসেই কোন কথা নাই। নেহাল দেখলো ডাকাতটা শুয়ে আছে শেয়ার ওপর শেয়া কাদছে। ডাকাতের মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করতে লাগলো নেহাল।
মাথায় হাত দিয়ে শেয়ার ওপর থেকে উঠে পড়লো ডাকাত। রক্ত বের হয়ে গাড়ি পুরো ভরে যাচ্ছে। কিছু রক্ত ছিটকে পড়লো শেয়ার মুখে।
শেয়া দেখলো নেহালের মুখ। মুহুর্তে কান্না মুছে বলল, তুমি তুমি আসছো নেহাল। এতোক্ষন কই কই ছিলা? এতো আস্তে বললো কথাগুলো যে নেহাল শুনলো ও না।
নেহাল এক হাত দিয়ে ডাকাতের ঘাড়ে ধরে গাড়ি থেকে বের করলো তারপর লাথি মেরে ডোবার ফেলে দিল। মাথার পেছনে হাত দিয়ে ডোবার পড়ে রইলো ডাকাত। মাটিতে কিছুক্ষণ বুদবুদ হলো। তারপর সব নীরব। গাড়ির পেছন সিট থেকে শেয়ার সামনে থেকে চাপাতি টা নিয়ে ছুড়ে ফেলল দূরে নেহাল।
নিজের জ্যকেট ও প্যন্ট খুলে দিল নেহাল। এগুলো পড়ে নিচ্ছে শেয়া। শেয়া নিজেকে তীব্র অপরাধী ভাবছে আর কাদছে।
রাস্তা থেকে কলাগাছগুলো সড়িয়ে গাড়ি স্টাট দিল নেহাল৷
পেছনে সিট থেকে শেয়া কাদতে কাদতে বলল, বিশ্বাস করো আমার কোন দোষ ছিল না। আমি আসলে ইচ্ছে করে কিছু করিনি।
নেহাল বলল, এগুলো একটা দুর্ঘটনায় যত রিপিট করবা ততো খারাপ লাগবে। সো ভুলে যাও।
হঠাৎ শেয়া দেখলো নেহালের শরীরের সাদা গেন্জি পেচানো ওখানে লাল লাল রক্তের ছাপ।
শেয়া বলল, তোমার পিঠে কি হইসে?
নেহাল বলল, ওটা ওমন কিছু না।
মেইন রাস্তায় গাড়ি উঠলো ফাইনালি। পাকা রাস্তায় গাড়ি চলছে এখন।
সাইডে গাড়ি থামিয়ে নেহাল বলল, আমার জ্যকেটে দেখো একটা ডার্বি সিগারেট ও লাইটার টা দাও।
শেয়া তার পরিহিত জ্যকেট থেকে গ্যাসলাইটার ও সিগারেট তা দিল।
নেহাল গাড়ির গেট খুলে সিগারেট ধরালো।
শেয়া বলল, বিশ্বাস করো আমার কোন দোষ নাই। তুমি আমাকে ছেড়ে দিবা নেহাল?
নেহাল বলল, বাজে কথা বলো কেন? আমি জানি তেমার দোষ নাই। আসলে হঠাৎ সব হয়ে গেছে। আমার কন্ট্রোলে ছিল না কিছু।
সিগারেটে টান দিয়ে নেহাল জোরে জোরে ধোয়া নেয় ভেতরে। তার মাথা ঘুরায়।
নেহাল বলল, কমদামি সিগারেট তাই ধোয়া ও দুর্গন্ধ বেশি। কিভাবে টানে কে জানে?
তারপর সিগারেট শেষ করে আবার গাড়ি ড্রাইব করতে থাকে। কিছুদূর যাওয়ার পরই হঠাৎ চেকপোস্ট দেখে পুলিশের গাড়ি থামায় নেহাল।
নিজের গাড়ির জানালা খুলে দেয় নেহাল।
পুলিশ গাড়ির ভেতরে উকি মেরে বলে, কিভাবে স্যার। জামা কাপড় পড়েননি কেন? আর শুধু জাহিঙা পড়ে আছেন?
নেহাল বলল, কেন জাহিঙ্গা পড়া নিষেধ নাকি?
পুলিশ বলল, পেছনের সিটে মেয়েটা কে? চুপচাপ ভয় পেয়ে আছে।
নেহাল বলল, আমার ওয়াইফ।
পুলিশ বলল, গাড়ির লাইসেন্স কাগজপত্র দেখান। আর এভাবে ন্যংটা হয়ে গাড়ি চালাবেন না।
এতো কষ্টের মাঝেও হেসে ফেলল নেহাল।
গাড়ির লাইসেন্স দেখাতেই পুলিশ ছেড়ে দিল তাদের।
#এক_রাতের_গল্প
#রুদ্র_সিয়াম