এক ছিল ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের নাম ছিল শালবন। নামের মতোই গ্রামটির চারপাশে ছিল বিশাল বিশাল শালগাছের বন। সকালে পাখির ডাক, দুপুরে পাতার ফাঁক দিয়ে রোদের খেলা আর সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে পুরো গ্রামটা যেন গল্পের বইয়ের মতো হয়ে থাকত।
এই গ্রামেই থাকত দশ বছরের একটি ছেলে। তার নাম রাফি।
রাফি ছিল খুব কৌতূহলী। কোনো কিছু দেখলেই সে জানতে চাইত—“এটা কেন?”, “ওটা কীভাবে?”, “এর ভেতরে কী আছে?”
তার মা প্রায়ই বলতেন,
— “রাফি, সবকিছু জানতে যাওয়ার দরকার নেই। বেশি কৌতূহল কখনো কখনো বিপদ ডেকে আনে।”
রাফি হেসে বলত,
— “কিন্তু মা, না জানলে জানব কীভাবে?”
রাফির সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল মিতু। মিতু রাফির চেয়ে এক বছরের ছোট। সে সাহসী, বুদ্ধিমান এবং গাছপালা সম্পর্কে অনেক কিছু জানত।
একদিন বিকেলে রাফি ও মিতু গ্রামের পাশের মাঠে খেলছিল। হঠাৎ তারা দেখল, গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ করিম দাদু হাতে একটি লাঠি নিয়ে বনের দিকে যাচ্ছেন।
মিতু বলল,
— “দাদু প্রতিদিন তো এদিকে যান না। আজ কোথায় যাচ্ছেন?”
রাফি বলল,
— “চলো, দেখে আসি।”
দুজন দাদুর পেছনে পেছনে কিছুদূর গেল। কিন্তু বনের কাছে পৌঁছাতেই করিম দাদু পিছনে তাকালেন।
— “তোমরা এখানে কেন?”
রাফি একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
— “দাদু, আপনি কোথায় যাচ্ছেন দেখতে এসেছি।”
করিম দাদু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
— “বনের ভেতরে একটা পুরোনো পুকুর আছে। পুকুরটার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি দেখতে যাচ্ছি।”
মিতু অবাক হয়ে বলল,
— “পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে কেন?”
দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— “আমি জানি না। কিন্তু এই পুকুরটা আমাদের গ্রামের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর ধরে এই পুকুর থেকেই বনের প্রাণীরা পানি খায়।”
রাফির চোখ বড় হয়ে গেল।
— “আমরা কি দেখতে যেতে পারি?”
দাদু একটু ভেবে বললেন,
— “ঠিক আছে। কিন্তু আমার কাছ থেকে দূরে যাবে না।”
তিনজন বনের ভেতরে ঢুকলেন।
বনের ভেতরটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর। বড় বড় গাছের ডালপালা একে অপরের সঙ্গে মিশে যেন সবুজ ছাদ তৈরি করেছে। কোথাও সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাচ্ছে, আবার কোথাও অন্ধকার হয়ে আছে।
কিছুদূর যাওয়ার পর তারা পুকুরটির কাছে পৌঁছাল।
রাফি অবাক হয়ে দেখল, সত্যিই পুকুরের পানি অনেক কমে গেছে।
পুকুরের পাশে কাদায় অনেক প্রাণীর পায়ের ছাপ।
হরিণ, বুনো শূকর, খরগোশ—অনেক প্রাণী এখানে পানি খেতে আসে।
মিতু বলল,
— “দেখো! পানির পাশে সব প্রাণীর পায়ের ছাপ।”
হঠাৎ রাফি একটি অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল।
টুপ... টুপ... টুপ...
মনে হলো কোথাও পানি পড়ছে।
রাফি বলল,
— “দাদু, শুনছেন?”
করিম দাদু কান পেতে শুনলেন।
— “হ্যাঁ। শব্দটা ওইদিকে থেকে আসছে।”
তারা শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।
কিছুদূর গিয়ে তারা একটি পাথরের দেয়াল দেখতে পেল। দেয়ালের নিচ দিয়ে সামান্য পানি বের হচ্ছে।
মিতু চিৎকার করে বলল,
— “এখানে পানি আটকে আছে!”
রাফি পাথরের দেয়ালটা ভালো করে দেখল।
— “কিন্তু এই দেয়াল এখানে এল কীভাবে?”
করিম দাদু বললেন,
— “অনেক বছর আগে এখানে একটা পুরোনো সেচের পথ ছিল। হয়তো মাটি আর পাথর জমে পথটা বন্ধ হয়ে গেছে।”
রাফি মাটিতে বসে পাথরগুলো দেখতে লাগল।
হঠাৎ সে একটি ছোট ধাতব বাক্স দেখতে পেল।
— “দাদু! এটা কী?”
বাক্সটি ছিল পুরোনো। তার ওপর মরিচা পড়ে গেছে।
তিনজন মিলে বাক্সটি খুলল।
ভেতরে ছিল একটি পুরোনো কাগজ।
কাগজে লেখা—
“যে এই পথ খুঁজে পাবে, সে মনে রাখবে—বনের পানি শুধু বনের নয়, গ্রামেরও জীবন।”
তার নিচে একটি ছোট মানচিত্র আঁকা ছিল।
মানচিত্রে পুকুর থেকে একটি সরু পথ পাহাড়ের দিকে গেছে।
মিতু বলল,
— “এটা নিশ্চয়ই পানির পুরোনো পথ।”
রাফি উত্তেজিত হয়ে বলল,
— “আমরা পথটা খুঁজে বের করব!”
করিম দাদু বললেন,
— “কাল গ্রামের বড়দের নিয়ে আসব।”
কিন্তু রাফি বলল,
— “দাদু, আমরা একটু দেখে নিতে পারি না?”
দাদু কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন,
— “বেশি দূরে যাবে না।”
পরদিন সকালে রাফি ও মিতু আবার বনে গেল।
তারা মানচিত্র দেখে এগোতে লাগল।
একসময় তারা একটি বড় পাথরের সামনে এসে দাঁড়াল।
পাথরের নিচে মাটির ভেতর দিয়ে পানির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
রাফি বলল,
— “পানি এখান দিয়ে যাচ্ছে!”
তারা মাটি সরাতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর একটি সরু নালা বেরিয়ে এল।
কিন্তু নালার মুখে বড় একটি গাছের শিকড় আটকে আছে।
মিতু বলল,
— “এটা সরানো দরকার।”
রাফি শিকড় টানতে লাগল। মিতুও সাহায্য করল।
অনেক চেষ্টা করেও তারা পারল না।
হঠাৎ রাফি বলল,
— “আমরা শক্তি দিয়ে পারছি না। বুদ্ধি দিয়ে চেষ্টা করি।”
সে একটি শক্ত কাঠের ডাল এনে শিকড়ের নিচে ঢুকিয়ে দিল।
— “এটা লিভারের মতো কাজ করবে।”
মিতু বলল,
— “তুমি এসব কোথায় শিখলে?”
রাফি হেসে বলল,
— “বাবার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে।”
দুজন একসঙ্গে চাপ দিতেই শিকড়টি একটু নড়ল।
আর সঙ্গে সঙ্গে—
ঝরররর!
পানি বেরিয়ে এলো।
প্রথমে অল্প, তারপর আরও বেশি।
পানি নালার ভেতর দিয়ে পুকুরের দিকে ছুটতে লাগল।
রাফি আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
— “হয়ে গেছে!”
কিন্তু ঠিক তখনই একটি বড় সমস্যা দেখা দিল।
পানির স্রোত এত দ্রুত ছিল যে নালার একটি অংশ ভেঙে যেতে শুরু করল।
মিতু চিৎকার করল,
— “রাফি! নালাটা ভেঙে গেলে সব পানি অন্যদিকে চলে যাবে!”
রাফি চারপাশে তাকাল।
কিছু বাঁশ পড়ে ছিল।
সে বলল,
— “বাঁশ দিয়ে পথটা শক্ত করতে হবে।”
দুজন মিলে বাঁশ, পাথর ও মাটি দিয়ে নালার দুর্বল অংশটি শক্ত করার চেষ্টা করল।
অনেকক্ষণ পর কাজ শেষ হলো।
পানি এবার সুন্দরভাবে নালার ভেতর দিয়ে পুকুরের দিকে যেতে লাগল।
কিন্তু তারা জানত না, এই সময় তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন করিম দাদু।
দাদু সবকিছু দেখেছেন।
তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
— “তোমরা দুজন আজ বড় একটা কাজ করে ফেলেছ।”
রাফি লজ্জা পেয়ে বলল,
— “দাদু, আমরা শুধু চেষ্টা করেছি।”
দাদু বললেন,
— “সাহসী হওয়া মানে বিপদের মধ্যে ঝাঁপ দেওয়া নয়। সাহসী হওয়া মানে সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে বুদ্ধি দিয়ে সমাধান খোঁজা।”
তারা গ্রামে ফিরে সব কথা জানাল।
গ্রামের মানুষ বনের পুকুরের কাছে গেল।
কয়েকদিনের মধ্যেই পুকুরে আবার পানি জমতে শুরু করল।
হরিণেরা ফিরে এল।
খরগোশেরা পানির ধারে দৌড়াতে লাগল।
পাখিরা গাছের ডালে বসে গান গাইতে লাগল।
গ্রামের মানুষ রাফি ও মিতুকে ধন্যবাদ দিল।
কিন্তু রাফি বলল,
— “আমাদের একার কাজ নয়। সবাই মিলে বনটাকে রক্ষা করতে হবে।”
সেদিন গ্রামের মানুষ একটি সিদ্ধান্ত নিল।
কেউ আর বনে অকারণে গাছ কাটবে না।
পুকুরে ময়লা ফেলবে না।
প্রতিবছর নতুন গাছ লাগাবে।
করিম দাদু রাফির মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “আজ তোমরা একটা জিনিস প্রমাণ করেছ।”
রাফি জিজ্ঞেস করল,
— “কী?”
দাদু বললেন,
— “প্রকৃতি আমাদের অনেক কিছু দেয়। কিন্তু প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের।”
রাফি পুকুরের দিকে তাকাল।
সূর্যের আলো পানির ওপর ঝিকমিক করছিল।
দূরে একটি হরিণ পানি খাচ্ছিল।
মিতু ধীরে বলল,
— “রাফি, জানো? এই বনটা আসলেই জাদুর বন।”
রাফি হাসল।
— “হ্যাঁ। তবে জাদুটা গাছের মধ্যে নয়।”
— “তাহলে কোথায়?”
রাফি নিজের বুকের দিকে হাত রেখে বলল,
— “মানুষের ভালো কাজে।”
সেদিন সন্ধ্যায় তারা যখন বাড়ি ফিরছিল, বনের ওপর দিয়ে একঝাঁক পাখি উড়ে গেল।
আকাশ তখন কমলা রঙের।
রাফি মনে মনে বলল—
“যে পৃথিবী আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, তাকে বাঁচিয়ে রাখাও আমাদের কাজ।”
আর সেই দিন থেকেই শালবনের শিশুরা প্রতি সপ্তাহে একদিন করে বন পরিষ্কার করতে শুরু করল।
কেউ গাছ লাগাত, কেউ পুকুর পরিষ্কার করত, কেউ পাখিদের জন্য পানি রাখত।
কয়েক বছর পর শালবন গ্রামের মানুষ গর্ব করে বলত—
“আমাদের গ্রামের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, আমাদের বন।”
আর গ্রামের শিশুরা যখন নতুন কোনো গাছ লাগাত, তখন রাফি তাদের একটি কথা বলত—
“আজ যে গাছ লাগালে, তার ছায়ায় হয়তো একদিন তুমি বসবে না। কিন্তু তোমার পরের প্রজন্ম বসবে। ভালো কাজের আসল সৌন্দর্য এখানেই।”
শিক্ষণীয় কথা
সাহস মানে শুধু শক্তি নয়; বুদ্ধি, সহযোগিতা ও ভালো উদ্দেশ্যও সাহসের অংশ। আর প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে নিজের ভবিষ্যৎকে ভালোবাসা।