৪ হিজরির দিকে মদিনার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তর আরবের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন, যা গাজওয়ায়ে দাওমাতুল জান্দাল নামে পরিচিত। দাওমাতুল জান্দাল ছিল মদিনা থেকে বহু দূরে, উত্তর আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অঞ্চল। এই অঞ্চলের গোত্রগুলো মদিনার বাণিজ্যপথে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন সংবাদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায় এক হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে উত্তর দিকে অগ্রসর হন বলে ইবন সাদের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রা ছিল সহজ নয়। মদিনা থেকে দাওমাতুল জান্দাল ছিল অনেক দূরের পথ এবং মরুভূমির কঠিন পরিবেশ অতিক্রম করতে হতো। এত দূরবর্তী অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বার্তা ছিল—মুসলিম রাষ্ট্র শুধু মদিনার আশপাশের অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজনে বহুদূরের সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।
মুসলিম বাহিনী দাওমাতুল জান্দালের কাছাকাছি পৌঁছালে সেখানে অবস্থানকারী লোকজন মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতির সংবাদ পেয়ে সরে যায় বলে সীরাতের বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ফলে বড় কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে কিছু সময় অবস্থান করার পর মদিনায় ফিরে আসেন। কিছু বর্ণনায় স্থানীয় একটি গোত্রের নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সম্পর্ক স্থাপনের কথাও এসেছে, তবে এসব অতিরিক্ত বিবরণের সনদের শক্তি সব ক্ষেত্রে সমান নয়।
দাওমাতুল জান্দালের অভিযানকে তাই একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের চেয়ে প্রতিরোধমূলক সামরিক অভিযান হিসেবে বোঝা বেশি সঠিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্ভাব্য হুমকির সংবাদ পেয়ে অপেক্ষা করেননি; বরং নিজ বাহিনী নিয়ে সেই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়েছেন। মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতির সংবাদ পাওয়ার পর সম্ভাব্য শত্রুরা সংঘর্ষে না গিয়ে সরে যাওয়ায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছাড়াই অভিযানটির প্রধান উদ্দেশ্য পূরণ হয়।
এই অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল উত্তর আরবের বাণিজ্যপথ ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর নজরদারি। মদিনা ছিল আরব উপদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র এবং উত্তর দিকে সিরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। ফলে দাওমাতুল জান্দালের মতো কৌশলগত অঞ্চলে কোনো শক্তি মুসলিমদের বিরুদ্ধে জোট গঠন করলে তা ভবিষ্যতে মদিনার নিরাপত্তার জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অভিযান সেই সম্ভাবনাকে শুরুতেই গুরুত্ব দেওয়ার প্রমাণ।
তবে দাওমাতুল জান্দালকে নিয়ে পরবর্তী কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় স্থানীয় গোত্রগুলোর শক্তি, তাদের সংখ্যা এবং তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্যের সবগুলো সমানভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় এমন বিষয় হলো—রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তর আরবের দাওমাতুল জান্দালের দিকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন এবং সেখানে বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত না হয়েই মুসলিম বাহিনী ফিরে আসে।
দাওমাতুল জান্দালের অভিযান ইসলামের সামরিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বদর ও উহুদের মতো সংঘর্ষের পাশাপাশি মুসলিম রাষ্ট্র তখন দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছিল। এটি ছিল মদিনাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের কৌশলগত পরিসর বিস্তারের একটি নিদর্শন। মুসলিম বাহিনী যখন এত দূরের অঞ্চলে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, তখন আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছেও মদিনার সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন ধারণা তৈরি হয়।
এই অভিযানের মাধ্যমে আরও একটি শিক্ষা পাওয়া যায়—প্রতিরোধমূলক কৌশল অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। শত্রুর সম্ভাব্য আক্রমণের অপেক্ষা না করে তার প্রস্তুতির কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হওয়া এবং তাকে সংঘর্ষের সুযোগ না দেওয়া ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। দাওমাতুল জান্দালে বড় যুদ্ধ না হওয়াই তাই এই অভিযানের ব্যর্থতা নয়; বরং সম্ভাব্য সংঘাত এড়িয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল এর অন্যতম ফলাফল।
দাওমাতুল জান্দালের ঘটনা পরবর্তী ইসলামী ইতিহাসের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। পরবর্তী যুগে উত্তর আরব ও সিরিয়ামুখী অঞ্চলগুলো মুসলিম রাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দাওমাতুল জান্দাল সেই বৃহত্তর উত্তরমুখী কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রাথমিক পর্যায়ের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তথ্যসূত্র: ইবন সাদের আত-তাবাকাত আল-কুবরা; ইবন হিশামের আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ; ইবন কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া; আল-ওয়াকিদির আল-মাগাজি। দাওমাতুল জান্দালের তারিখ, বাহিনীর সংখ্যা এবং কিছু স্থানীয় ঘটনার বিবরণে ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। তাই যেসব তথ্যের শক্তিশালী সমর্থন নেই, সেগুলোকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।