গাজওয়ায়ে বনু কুরাইযা ইসলামের প্রাথমিক মদিনা-পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘটনা। এটি ৫ হিজরিতে গাজওয়ায়ে খন্দক বা আহযাবের যুদ্ধের পরপরই সংঘটিত হয়। মদিনার প্রতিরক্ষা সংকটের সময় বনু কুরাইযার সঙ্গে মুসলিমদের পূর্ববর্তী চুক্তি ও তাদের অবস্থান নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ২৬–২৭ নম্বর আয়াতে আহযাবের সহযোগী হিসেবে ‘আহলে কিতাবের’ একটি দলের ওপর আল্লাহর সাহায্যের মাধ্যমে মুসলিমদের বিজয় এবং তাদের দুর্গসমূহের পতনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্র ও সহিহ হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, খন্দকের যুদ্ধের সময় বনু কুরাইযার সঙ্গে মদিনার চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগটি পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ করে তুলেছিল।
খন্দকের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিমদের বনু কুরাইযার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনায় এসেছে, তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তারা বনু কুরাইযার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত আসরের নামাজ যেন কেউ না পড়ে। সাহাবিদের একটি দল নির্দেশটি আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে পথেই নামাজ বিলম্বিত করেন, আর অন্য একটি দল নির্দেশের উদ্দেশ্য হিসেবে দ্রুত অগ্রসর হওয়াকে বুঝে সময়ের মধ্যেই নামাজ আদায় করেন। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো পক্ষকেই দোষারোপ করেননি। এই ঘটনা ইসলামী ফিকহ ও নির্দেশের উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে সাহাবিদের ইজতিহাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
বনু কুরাইযার দুর্গগুলো অবরোধ করা হয়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় অবরোধের সময়কাল প্রায় পঁচিশ রাত বলা হয়েছে; তবে এই নির্দিষ্ট সময়ের তথ্যের উৎস সহিহ হাদিসের পর্যায়ে নয়, বরং সীরাত ও ইতিহাসের বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ অবরোধের পর বনু কুরাইযা আত্মসমর্পণ করে এবং তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আওস গোত্রের নেতা সাদ ইবন মুআয (রা.)-কে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সাদ ইবন মুআয (রা.) খন্দকের যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন এবং তাঁর গুরুতর আঘাত তখনও ছিল।
সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে সাদ ইবন মুআয (রা.) বনু কুরাইযার ব্যাপারে এমন একটি রায় দেন, যাতে তাদের যুদ্ধক্ষম পুরুষদের মৃত্যুদণ্ড এবং নারী ও শিশুদের বন্দিত্বের কথা ছিল। এই রায়ের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন যে সাদ (রা.) আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন—এমন বর্ণনা সহিহ হাদিসে এসেছে। তবে পরবর্তী ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে নিহত ব্যক্তিদের যে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং সেগুলোকে সহিহ হাদিসের নিশ্চিত সংখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। তাই বনু কুরাইযার নিহত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত দাবি করা ঐতিহাসিকভাবে সতর্কতাহীন হবে।
এই ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে খন্দকের যুদ্ধের পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। মদিনা তখন বহিরাগত বিশাল সামরিক জোটের আক্রমণের মুখে ছিল। শহরের প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়লে ভেতর থেকে কোনো চুক্তিবদ্ধ গোষ্ঠীর বিদ্রোহ বা শত্রুপক্ষের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা মদিনার জন্য অত্যন্ত গুরুতর বিপদ সৃষ্টি করতে পারত। ইসলামী ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে বনু কুরাইযার সঙ্গে সংঘাতকে এই সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে, পরবর্তী যুগের বিভিন্ন বর্ণনায় অতিরিক্ত বিবরণ যুক্ত হয়েছে; সেগুলোর সবকিছুকে একই মাত্রায় নির্ভরযোগ্য মনে করা যায় না।
বনু কুরাইযার ঘটনার পর সাদ ইবন মুআয (রা.)-এর পুরোনো যুদ্ধের ক্ষত গুরুতর হয়ে ওঠে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করেন। সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিমে তাঁর মর্যাদা এবং তাঁর ইন্তেকালের ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর মৃত্যুতে গভীরভাবে শোক প্রকাশ করেন। সাদ (রা.) ছিলেন মদিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহাবি এবং ইসলাম গ্রহণের পর মদিনার সমাজে ইসলামের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গাজওয়ায়ে বনু কুরাইযা তাই শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি খন্দকের যুদ্ধের পর মদিনার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সংকটের একটি সরাসরি পরিণতি। একই সঙ্গে এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামের প্রাথমিক মদিনা রাষ্ট্রে চুক্তি, সামরিক নিরাপত্তা, গোত্রীয় সম্পর্ক এবং যুদ্ধকালীন আনুগত্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এই ঘটনার বর্ণনা করতে হলে কুরআন ও সহিহ হাদিসে প্রতিষ্ঠিত তথ্যকে পরবর্তী সীরাত ও ইতিহাসের অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা বিতর্কিত বর্ণনা থেকে পৃথক রাখা জরুরি।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কুরআন, সূরা আল-আহযাব ২৬–২৭; সহিহ আল-বুখারি; সহিহ মুসলিম; ইবন ইসহাকের সীরাত, ইবন হিশামের সংকলিত রূপ; ইবন সাদের আত-তাবাকাত আল-কুবরা; ইবন কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া।