গাজওয়ায়ে বনু লিহইয়ান ৬ হিজরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান, যা খন্দক ও বনু কুরাইযার ঘটনার পর মদিনার নিরাপত্তা ও আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতার মধ্যে সংঘটিত হয়। অধিকাংশ সীরাত-ভিত্তিক বর্ণনায় এ অভিযান ৬ হিজরির রবিউল আউয়াল অথবা জমাদিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে তারিখ নিয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। বনু লিহইয়ান ছিল হুযাইল গোত্রের একটি শাখা। তাদের সঙ্গে মুসলিমদের সংঘাতের পেছনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজি‘-এর ঘটনা, যেখানে মুসলিমদের একটি ছোট দল প্রতারণার শিকার হয়ে নিহত বা বন্দি হয়েছিল। সহিহ আল-বুখারির একটি বর্ণনায় বনু লিহইয়ানের লোকদের এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দশজন মুসলিম অনুসন্ধানকারীকে অনুসরণ করে প্রায় একশত তীরন্দাজের এগিয়ে আসার কথাও বর্ণিত হয়েছে। এই পূর্ববর্তী ঘটনার পর বনু লিহইয়ানের বিরুদ্ধে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু লিহইয়ানকে আকস্মিকভাবে মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে সরাসরি তাদের বসতির দিকে না গিয়ে প্রথমে এমন পথে অগ্রসর হন, যাতে শত্রুপক্ষ তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য বুঝতে না পারে। প্রচলিত সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি মদিনা থেকে প্রায় ২০০ জন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে বের হন। কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই বাহিনীর সঙ্গে প্রায় ২০টি ঘোড়ার কথাও পাওয়া যায়, তবে ঘোড়ার নির্দিষ্ট সংখ্যা সব সূত্রে একইভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই ২০০ জনের বাহিনীর তথ্যটি প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবে গ্রহণ করা যায়, কিন্তু এর প্রতিটি সামরিক উপাদানকে সহিহ হাদিসের পর্যায়ের নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
এই অভিযানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে থাকা সাহাবিদের মধ্যে সবার নাম নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষিত হয়নি। সীরাতের বর্ণনায় ২০০ জন সাহাবির কথা পাওয়া গেলেও তাঁদের পূর্ণ তালিকা আমাদের কাছে নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে মদিনার দায়িত্বে আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা.)-কে রেখে যাওয়ার কথা ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী অগ্রযাত্রায় সাহাবিদের কয়েকটি ছোট দল বিভিন্ন দিকে পাঠানো হয়েছিল বলেও কিছু সীরাত-ভিত্তিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে। এসব বর্ণনায় আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি দল পাঠানোর কথাও পাওয়া যায়; তবে এ ধরনের উপ-বাহিনীর বিস্তারিত তথ্য সব প্রাচীন সূত্রে সমানভাবে সংরক্ষিত নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। এই অভিযানে আসিম ইবন সাবিত (রা.) বনু লিহইয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অংশ নিয়েছিলেন—এমন ধারণা সঠিক নয়। আসিম ইবন সাবিত (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীরা এর আগের রাজি‘-এর ঘটনায় শহীদ হয়েছিলেন। বনু লিহইয়ানের অভিযানের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের শাহাদাতের স্থান দিয়ে অতিক্রম করেন এবং তাঁদের স্মরণ করেন ও তাঁদের জন্য দোয়া করেন—এমন বর্ণনা সীরাতের গ্রন্থগুলোতে এসেছে। ফলে আসিম ইবন সাবিত (রা.) এই পরবর্তী অভিযানের অংশগ্রহণকারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন পূর্ববর্তী রাজি‘ ঘটনার শহীদ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে উত্তর দিকে যাওয়ার মতো গতিপথ গ্রহণ করেন, যদিও বনু লিহইয়ানের অবস্থান ছিল মক্কার দিকের হিজাজ অঞ্চলে। এরপর তিনি দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করে গুরান উপত্যকার দিকে অগ্রসর হন। উদ্দেশ্য ছিল বনু লিহইয়ানকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পাওয়া। কিন্তু বনু লিহইয়ান মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে যায় এবং তারা পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেয়। ফলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সঙ্গে সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধ করতে পারেননি। তাবারি ও অন্যান্য ঐতিহাসিক বর্ণনায়ও উল্লেখ রয়েছে যে বনু লিহইয়ানের লোকেরা পাহাড়ের ওপর নিরাপদ অবস্থান গ্রহণ করেছিল।
মুসলিম বাহিনী গুরান উপত্যকায় পৌঁছালে রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে পূর্বে নিহত সাহাবিদের স্মরণ করেন। এই স্থানটি মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল, কারণ এর সঙ্গেই রাজি‘-এর হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি যুক্ত ছিল। এরপর তিনি উসফান অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। উসফান মক্কার নিকটবর্তী হওয়ায় এই অভিযান কুরাইশদের কাছেও মুসলিমদের সামরিক সক্ষমতার একটি বার্তা বহন করেছিল। কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখান থেকে আরও অগ্রসর হয়ে কুরা আল-গামিমের দিকে দুইজন অশ্বারোহীকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা সংবাদ সংগ্রহ করে ফিরে আসেন। এর ফলে কুরাইশদের ওপরও মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতির রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে।
এই অভিযানে বনু লিহইয়ানের পক্ষের যোদ্ধাদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ভরযোগ্যভাবে জানা যায় না। তাদের কোনো নির্দিষ্ট সেনাপতির নামও সহিহ সূত্রে সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষিত নেই। কিছু পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাদের পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কতজন যোদ্ধা সেখানে ছিল বা তাদের সামরিক সংগঠন ঠিক কেমন ছিল—এ বিষয়ে নিশ্চিত সংখ্যা দেওয়া কঠিন। তাই এই অভিযানের ক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর ২০০ জনের প্রচলিত সংখ্যা উল্লেখ করা গেলেও বনু লিহইয়ানের বাহিনীর সংখ্যা অনুমান করে লেখা উচিত নয়।
অভিযানের শেষ পর্যায়ে কোনো বড় আকারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। বনু লিহইয়ানের লোকেরা সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়ায় মুসলিম বাহিনী তাদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ করতে পারেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েকদিন অবস্থান করার পর মদিনায় ফিরে আসেন। ঐতিহাসিক বর্ণনায় প্রায় চৌদ্দ রাত পর তাঁর মদিনায় প্রত্যাবর্তনের কথা পাওয়া যায়। সামরিক বিজয় বলতে এখানে কোনো বড় যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুবাহিনী পরাজিত হওয়াকে বোঝানো যায় না; বরং দ্রুত ও অপ্রত্যাশিত সামরিক অভিযান, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং মদিনার নিরাপত্তার জন্য মুসলিম বাহিনীর সক্ষমতা প্রদর্শন ছিল এর প্রধান ফলাফল।
এই অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বাধীন প্রায় ২০০ সাহাবির কথা উল্লেখ করা যায়। আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা.) মদিনায় তাঁর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.)-এর একটি অগ্রবর্তী দলের নেতৃত্বের কথা পাওয়া যায়। তবে ২০০ জন সাহাবির পূর্ণ নামের তালিকা প্রামাণ্যভাবে সংরক্ষিত না থাকায় কল্পনা করে তাঁদের নাম যুক্ত করা উচিত নয়। অন্যদিকে বনু লিহইয়ানের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ যোদ্ধা-তালিকা বা সুনির্দিষ্ট বাহিনীর সংখ্যা পাওয়া যায় না।
গাজওয়ায়ে বনু লিহইয়ান থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু বড় যুদ্ধের মাধ্যমে মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি; বরং প্রয়োজনে দ্রুত সামরিক অভিযান, কৌশলগত গতিপথ পরিবর্তন, গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রতিপক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমেও নিরাপত্তা বজায় রেখেছেন। একই সঙ্গে রাজি‘-এর মতো বেদনাদায়ক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রেও তিনি সামরিক বাস্তবতা বিবেচনা করেছেন। এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি একটি সামরিক অভিযান হলেও বড় আকারের সরাসরি যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কুরআন; সহিহ আল-বুখারি, বিশেষত রাজি‘ ও বনু লিহইয়ান-সম্পর্কিত বর্ণনা; সহিহ মুসলিম; ইবন হিশামের আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ; ইবন সাদের আত-তাবাকাত আল-কুবরা; ইমাম তাবারির তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক; ইবন কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া। বনু লিহইয়ান অভিযানের তারিখ, বাহিনীর কিছু উপাদান এবং কয়েকজন উপ-নেতার বিবরণে সীরাত ও ইতিহাসের সূত্রভেদ রয়েছে; তাই নিশ্চিত তথ্য ও পরবর্তী বর্ণনাকে পৃথক করে উপস্থাপন করা হয়েছে।