শীতের শুরুতেই ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ক্যাম্পাসে সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অষ্টম শ্রেণির ছাত্র জাবির আল রাইয়ানের মন তখন ঢাকার চারদেয়ালে আটকা পড়ে নেই। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হতেই তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মেঘনা নদীর কোল ঘেঁষা এক প্রাচীন জনপদ, সোনারগাঁ। জাবিরের নানা বাড়ি সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়ার কাছেই প্রাচীন পানাম নগরের একেবারে সীমানা ঘেঁষে। নানার নাম শামসুল হক মাস্টার, অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাসের শিক্ষক। চশমার পুরু কাচের আড়াল থেকে তিনি যখন বারো ভূঁইয়াদের বীরত্ব, ঈশা খাঁ আর সুবেদার ইসলাম খাঁর গল্প শোনাতেন, জাবিরের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত। স্কুলের ডিবেটিং ক্লাবের যুক্তিবাদী ছেলে জাবির, আর সাধারণ জ্ঞানে তার জুড়ি মেলা ভার। ফেলুদা আর তিন গোয়েন্দা পড়ে বড় হওয়া এই চৌকস কিশোরের রক্তের ভেতর অ্যাডভেঞ্চারের এক তীব্র নেশা ছিল।
ডিসেম্বরের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে বাসে চেপে কাঁচপুর ব্রিজ পেরিয়ে জাবির পৌঁছে গেল নানার বাড়ি। বড় বড় আম-কাঁঠালের বাগান ঘেরা পুরোনো আমলের লাল ইটের দালান। বাড়িতে পা রাখতেই জাবিরের খালাতো ভাই তৌকির ছুটে এলো। তৌকির বয়সে জাবিরের সমান হলেও কিছুটা শান্ত প্রকৃতির, তবে জাবিরের যেকোনো অভিযানের নীরব সহযোগী।
"কী রে জাবির, তুই তো ব্যাগ নামানোর আগেই চারপাশ মাপতে শুরু করলি!" তৌকির হেসে বলল।
জাবির কাঁধের ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেলে বলল, "সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই, তৌকির। পানাম সিটির পেছনের সেই জঙ্গলটায় যাব আজকেই। এবার আমার কাছে একটা বিশেষ জিনিস আছে।"
জাবির তার জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে পুরোনো একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস আর কম্পাস বের করল। স্কুলে স্কাউটিং করার সুবাদে কম্পাস আর ম্যাপের ব্যবহারে সে দারুণ পারদর্শী।
বিকেলের দিকে হালকা কুয়াশা নামতেই দুই ভাই বের হয়ে পড়ল। পানাম নগরের নির্জন, ধ্বংসপ্রায় নীলরঙা আর লাল ইটের কারুকাজ করা বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে হেঁটে গেল তারা। ঊনবিংশ শতাব্দীর ধনী হিন্দু বণিকদের তৈরি এই নগরী এখন দিনের আলোতেই এক অদ্ভুত গা ছমছমে নীরবতায় ডুবে থাকে। পর্যটকরা সাধারণত মূল সড়কের আশপাশেই ঘোরাঘুরি করে, কিন্তু জাবিরের গন্তব্য ছিল আরও পেছনে,যেখানে গভীর জঙ্গল শুরু হয়েছে এবং একসময় শীতলক্ষ্যা ও মেঘনার সংযোগ খাল বয়ে যেত। ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে এগোতেই এক জায়গায় জাবির থমকে দাঁড়াল। পুরোনো একটি বটগাছের শেকড় চারপাশ থেকে আঁকড়ে ধরেছে একটি খসে পড়া দেওয়ালকে। সেই দেওয়ালের ইটগুলো পানাম নগরের সাধারণ ইটের চেয়ে অনেক বেশি পাতলা,একেবারে খাঁটি মোগল আমলের চুন-সুরকির 'জাফরি' ইট।
"দেখ তৌকির, এটা সাধারণ বাড়ি নয়," জাবির উবু হয়ে বসে বলল। "এই ইটের বাঁধুনি দেখেছিস? এটা নিশ্চিত সুলতানি বা মোগল আমলের কোনো তোরণ বা পাহারাদারদের চৌকি ছিল।"
বটগাছের শেকড়ের ভেতর নজর দিতেই জাবিরের চোখে পড়ল একটি ফাঁক। সেখানে মাটি কিছুটা দেবে গেছে। জাবির তার পকেট নাইফ বের করে মাটির ঢিবিটা সরাতে লাগল। তৌকির কিছুটা ভয় পেয়ে বলল, "জাবির, কী করছিস? সাপখোপ থাকতে পারে, ছাড় ওসব!"
"ভয় পাস না, শুধু একটু দেখতে দে," বলেই জাবির হাত বাড়িয়ে দিল সেই অন্ধকারের ভেতর। তার আঙুল শক্ত কোনো ধাতব বস্তুর ছোঁয়া পেল। সাবধানে টেনে বের করতেই দেখা গেল, জং ধরা একটি অষ্টধাতুর ছোট কৌটো। ওপরে ফারসি লিপির মতো কিছু আঁকিবুঁকি কাটা, যা কালের নিয়মে ক্ষয়ে গেছে।
কৌটোটি জং ধরে আটকে ছিল। জাবির তার নাইফের ফলা ঢুকিয়ে সাবধানে চাপ দিতেই একটা ধাতব শব্দ করে ঢাকনাটা খুলে গেল। ভেতরে কোনো হিরে-জহরত ছিল না। ছিল তামার পাতলা একটি পাত, আর তার ওপর পোকা-খাওয়া পাতলা হরিণের চামড়ার এক টুকরো কাগজ। তামার পাতের ওপর খোদাই করা ছিল কিছু সংকেত:
“যেখানে সপ্তরথীর ছায়া পড়ে পশ্চিমে,
তিন খিলানের মাঝের পাথর কেঁপে ওঠে ত্রাসে।
সিংহদ্বারের পদতলে লুক্কায়িত সুরতহাল,
সোনার মোহর জাগবে যবে ভাঙিবে মায়াজাল।”
নিচে একটা উল্টো সাপের মতো প্রতীক আঁকা। তৌকিরের চোখ গোল গোল হয়ে গেল, "এ তো... এ তো গুপ্তধনের নকশা!" জাবির গভীর মনোযোগ দিয়ে প্রতীকটা দেখল। সে দ্রুত তার ফোনে ছবি তুলে নিল তামার পাতটির। তারপর বলল, "সপ্তরথী... তার মানে সাতটি স্তম্ভ বা সাতটি পুরোনো গাছ। আর তিন খিলান মানে প্রাচীন কোনো মসজিদ বা বারোদুয়ারি। কিন্তু সুরতহাল আর সোনার মোহর... তার মানে এটা নিছক কোনো গল্প নয়!"
হঠাৎ পেছনে শুকনো পাতার মটমট শব্দ হলো। জাবির পলকে কৌটোটি পকেটে লুকিয়ে ফেলল। দুজন ঘুরে তাকাতেই দেখল, জঙ্গলের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে দুজন কর্কশ চেহারার লোক। তাদের একজনের মুখে কাটা দাগ, অন্যজনের চোখে সানগ্লাস, পরনে চামড়ার জ্যাকেট। লোক দুটোর চলন-বলন কোনোভাবেই স্থানীয় নিরীহ মানুষের মতো নয়।
"এই ছোকরারা! এখানে কী করছিস?" কাটা দাগওয়ালা লোকটি ভারী গলায় হুংকার দিল।
জাবির মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নিষ্পাপ গলায় বলল, "আমরা প্রজাপতি খুঁজছিলাম আঙ্কেল। স্কুলের বিজ্ঞান প্রজেক্টের জন্য।"
লোকটি সন্দিগ্ধ চোখে তাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখল। "জঙ্গল ভালো জায়গা না। ভূত-প্রেত আর বিষাক্ত সাপ আছে। ভাগ এখান থেকে, আর কোনোদিন এদিকে পা দিবি না!"
জাবির আর তৌকির কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পা চালিয়ে বেরিয়ে এলো। কিন্তু জাবির লক্ষ্য করল, জঙ্গলের ভেতরের দিকে মাটির ওপর ভারী বুটের দাগ এবং কাছেই কোনো শক্তিশালী জেনারেটরের হালকা ভনভন আওয়াজ ভেসে আসছে। সাধারণ কোনো জঙ্গল হলে সেখানে জেনারেটর চলার কথা নয়।
বাড়ি ফিরে জাবির ঘরের দরজা বন্ধ করে বসল। তামার পাতের সেই কবিতার অর্থ উদ্ধারে মগ্ন হলো সে। রাতের খাবারের টেবিলে সে খুব কৌশলে নানা ভাইকে জিজ্ঞেস করল, "নানাভাই, পানাম নগরের আশপাশে এমন কোনো জায়গা আছে যেখানে সাতটা বড় থাম বা সাতটি খিলান ছিল?" নানা চশমা ঠিক করে বললেন, "সাতটা খিলান? হুম... প্রাচীন সময়ে বারো ভূঁইয়াদের আমলে একটা বিশেষ তোরণ ছিল, যেটাকে সপ্তরথী তোরণ বলা হতো। ওটা এখনকার সেই পরিত্যক্ত নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষের পেছনে মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। ইংরেজ আমলে নীলকরেরা ওটার ওপর তাদের আস্তাবল বানিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তুই এসব জানতে চাইছিস কেন?"
"এমনি নানাভাই, ইতিহাসে পড়ছিলাম তো," জাবির মিষ্টি করে হাসল।
রাত তখন বারোটা। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। তৌকির পাশেই ঘুমে অচেতন। কিন্তু জাবিরের চোখে ঘুম নেই। সে বিছানা ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দূরের জঙ্গলটার ওপর আকাশটা যেন অস্বাভাবিক লালচে হয়ে আছে। হ্যালোজেন বাতির মতো জোরালো আলো জ্বলছে সেখানে।
জাবির বুঝল, সেই লোক দুটো সাধারণ কোনো পথচারী নয়। ওরা প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাচারকারী দল,চোরাকারবারী! এরা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ লুট করার চেষ্টা করছে। আর তাদের সেই গুপ্তধনের নকশাই হয়তো অজান্তে জাবিরের হাতে চলে এসেছে। পরদিন সকালে জাবির একাই বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু তৌকির কোনোমতেই তাকে একা ছাড়বে না। অগত্যা দুই ভাই আবার রওনা দিল, তবে এবার সতর্ক হয়ে। জাবির সঙ্গে নিল একটা শক্তিশালী টর্চলাইট, মোবাইল ফোন এবং নানার ড্রয়ার থেকে নেওয়া একটা পুরোনো হুইসল। নীলকুঠির পেছনের অংশটা একেবারে জনমানবহীন। ঘন বাঁশঝাড় আর বুনো লতায় ঢাকা। জাবির কম্পাস দেখে দিক নির্ণয় করল। কবিতা অনুযায়ী, পশ্চিম দিকে সপ্তরথীর ছায়া যেখানে পড়ে, সেখানেই কিছু একটা আছে।
বেলা তখন ঠিক সাড়ে এগারোটা। সূর্যের আলো যখন বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে পড়ল, জাবির দেখল সাতটি প্রাচীন ভাঙা ইটের স্তম্ভের ছায়া দীর্ঘ হয়ে গিয়ে মিশেছে মাটির নিচে ঢালু হয়ে যাওয়া এক সুড়ঙ্গের মুখে। সুড়ঙ্গের মুখটা শুকনো ডালপালা দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে।
"জাবির, ভেতরে যাওয়া কি ঠিক হবে?" তৌকিরের গলা কাঁপছিল।
"তৌকির, আমরা ভেতরে বেশি দূর যাব না। শুধু দেখব ওরা কী করছে। কোনো বিপদ দেখলে আমরা পুলিশকে খবর দেব," জাবির আশ্বস্ত করল।
সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে গলে তারা ভেতরে ঢুকল। ভেতরটা স্যাঁতসেঁতে এবং ঠান্ডা। তবে মাটির নিচে নামতেই তারা অবাক হয়ে দেখল, সুড়ঙ্গের দেওয়ালে নতুন ব্যাটারিচালিত এলইডি লাইট লাগানো রয়েছে। তার মানে চোরাকারবারীরা এখানে নিয়মিত কাজ করছে! অনেকটা পথ হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়ার পর তারা একটা বিশাল ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠে এসে পৌঁছাল। প্রাচীন মেসোপটেমীয় বা সুলতানি আমলের মতো গম্বুজাকৃতির ছাদ। আর সেই ঘরের একপাশে তিনটি পাথরের খিলান,কবিতার সেই 'তিন খিলান'!
মাঝের খিলানের নিচে মাটি খোঁড়া হয়েছে। সেখানে পড়ে আছে আধুনিক শাবল, গাঁইতি আর মাটির নিচে দেখার বিশেষ ডিটেক্টর মেশিন। আর ঠিক সেই গর্তের মাঝখানে দেখা যাচ্ছে কালো পাথরের একটি বিশাল সিন্দুক! সিন্দুকের ডালায় প্রাচীন হরফে খোদাই করা নকশা।
"ওরে বাবা! সত্যিই গুপ্তধন!" তৌকির ফিসফিস করে উঠল।
জাবির সাবধানে এগিয়ে গেল। সিন্দুকের ঢাকনাটা কিছুটা সরানো। ভেতরে টর্চের আলো ফেলতেই তাদের চোখ ঝলসে উঠল। প্রাচীন খাঁটি সোনার মোহর, পান্না আর রত্নখচিত তলোয়ারের হাতল, এবং একটি দুর্লভ অষ্টধাতুর শিবমূর্তি! এ কোনো সাধারণ সম্পদ নয়, এ বাংলার কয়েকশত বছরের অমূল্য জাতীয় ঐতিহ্য।
ঠিক তখনই পেছনে কর্কশ হাসির শব্দ শোনা গেল।
"বাহ্! শিকার তো নিজেই ফাঁদে এসে ধরা দিয়েছে!"
জাবির আর তৌকির বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়াল। সামনে সেই কাটা দাগওয়ালা লোকটা, আর তার পেছনে আরও তিনজন অস্ত্রধারী ষণ্ডামার্কা লোক। দলের সর্দার বলে মনে হওয়া একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে এলো, তার চোখে মুখে ধূর্ততার ছাপ।
"ছোট্ট পণ্ডিত, কালকে জঙ্গলে তো বেশ প্রজাপতির গল্প ফাঁদলে! কিন্তু আমাদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়। তামার পাতটা কোথায়?" সর্দার ঠান্ডা গলায় বলল। জাবির ভয় পাওয়ার বদলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। "কোন তামার পাত? আমরা তো এখানে ঘুরতে ঘুরতে ঢুকে পড়েছি।"
"মিথ্যা বলবি না!" কাটা দাগওয়ালা এগিয়ে এসে জাবিরের কলার চেপে ধরল। তার অন্য হাতে চকচক করে উঠল ধারালো এক রামদা। "তুই যদি পাতটা না বের করিস, তোদের দুজনকে এই মাটির নিচেই জীবন্ত পুঁতে ফেলব। কেউ কোনোদিন তোদের হাড়গোড়েরও সন্ধান পাবে না!"
তৌকির ভয়ে কাঁপতে শুরু করল। কিন্তু জাবিরের মস্তিষ্ক তখন কম্পিউটারের মতো দ্রুত কাজ করছিল। সে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের স্কাউট ট্রুপের লিডার; উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহস হারানো তার স্বভাব নয়। সে বুঝতে পারল, এই লোকগুলোর সাথে শক্তিতে পেরে ওঠা অসম্ভব, এদের হারাতে হবে বুদ্ধিতে।
"ঠিক আছে, মারবেন না! আমি বলছি," জাবির কিছুটা দুর্বল হওয়ার ভান করল। "পাতটা আমার পকেটেই আছে।"
জাবির তার জ্যাকেটের পকেটে হাত দিল। কিন্তু হাত বের করার সময় সে শুধু তামার পাত বের করল না, সঙ্গে বের করল তার মোবাইল ফোনটিও, যার স্পিকার আর স্ক্রিন সে পকেটের ভেতর থেকেই একটি নির্দিষ্ট বাটনে চাপ দিয়ে রেখেছিল,একটি প্রি-সেট এসওএস অ্যালার্ম, যা সরাসরি স্থানীয় থানার নম্বরে এবং তার বাবার ফোনে জরুরি বার্তা পাঠায়। জাবির তামার পাতটা মাটিতে ফেলে দিল। "এই নিন। কিন্তু এই সিন্দুক আপনারা খুলতে পারবেন না। কবিতার শেষ লাইনটা আপনারা জানেন না।"
সর্দার কৌতূহলী হয়ে উঠল, "কীসের শেষ লাইন?"
"শেষ লাইনে মায়াজালের কথা বলা আছে। সিন্দুকের ভেতরের তলায় বিষাক্ত গ্যাসের ফাঁদ পাতা আছে। যদি ভুলভাবে বাক্সটা নাড়ানো হয়, পুরো সুড়ঙ্গ বিষাক্ত গ্যাসে ভরে যাবে এবং ছাদ ধসে পড়বে!" জাবির অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বানিয়ে বলল। চোরাকারবারীরা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। প্রাচীন কবরে বা গুপ্তধনের স্থানে এমন বিষাক্ত ফাঁদ থাকার গল্প তারা আগেও শুনেছে।
"তুই বানিয়ে বলছিস না তো?" সর্দার গর্জে উঠল।
"বিশ্বাস না হলে হাত দিয়ে দেখুন," জাবির এক পা পিছিয়ে এলো। "আমি প্রাচীন ইতিহাস পড়ি। এই সিন্দুক খোলার বিশেষ নিয়ম আছে।"
কাটা দাগওয়ালা লোভ সামলাতে না পেরে সিন্দুকের দিকে এগোতেই জাবির সুযোগ বুঝে পকেট থেকে বের করল নানার সেই তীক্ষ্ণ ধাতব হুইসল। সে সর্বশক্তিতে হুইসলে ফুঁ দিল,পীইইইইইইইইই!
ভূগর্ভস্থ বদ্ধ প্রকোষ্ঠে সেই তীব্র, তীক্ষ্ণ শব্দ হাজার গুণে প্রতিধ্বনিত হয়ে কানের পর্দা ফাটানোর মতো আওয়াজ তৈরি করল। চোরাকারবারীরা এমন আকস্মিক আক্রমণে হতভম্ব হয়ে কানে হাত দিয়ে বসে পড়ল। সেই ভগ্নাংশ সেকেন্ডের বিভ্রান্তির সুযোগে জাবির চিৎকার করে উঠল, "তৌকির, ছোটো!" দুই ভাই চোখের পলকে পাশের একটি সরু পাথরের খিলানের আড়ালে ঢুকে পড়ল।
"ধর! ওদের শেষ করে দে!" সর্দারের বিকট চিৎকার শোনা গেল।
পেছন থেকে গুলি চলল,গুড়ুম! পাথরের গায়ে লেগে স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠল। কিন্তু মাটির নিচের সুড়ঙ্গের জটিল গোলকধাঁধা জাবিরের কম্পাস আর স্মৃতিতে স্পষ্ট ছিল। তারা পাগলের মতো দৌড়াতে লাগল। সুড়ঙ্গের নির্গমন মুখের কাছাকাছি পৌঁছাতেই জাবিরের পা একটা আলগা পাথরে আটকে গেল। সে আছড়ে পড়ল মাটিতে। তৌকির তাকে তুলতে গেল, কিন্তু ততক্ষণে কাটা দাগওয়ালা তাদের একেবারে কাছে চলে এসেছে, হাতে উদ্যত রামদা।
"অনেক দৌড়েছিস বাঁদরের দল! এবার তোদের শেষ সময়!" লোকটি অস্ত্র তুলে এগিয়ে এলো। মৃত্যু যখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে, ঠিক তখনই বাইরের আলো ফুঁড়ে বজ্রনির্ঘোষে এক আওয়াজ ভেসে এলো:
"হাত ওপরে তোলো! পুলিশ চারপাশ ঘিরে ফেলেছে! একটুও নড়াচড়া করলে গুলি চালানো হবে!"
পর মুহূর্তেই সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করল সশস্ত্র পুলিশের একটি দল। সামনে স্বয়ং সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। তাদের পেছনে জাবিরের নানা শামসুল হক মাস্টার এবং স্থানীয় কিছু গ্রামবাসী। কাটা দাগওয়ালা পালানোর চেষ্টা করতেই পুলিশের এক চৌকস কনস্টেবল লাথি মেরে তার হাতের রামদা ফেলে দিল এবং ক্ষিপ্র গতিতে তাকে মাটিতে চেপে ধরল। পেছনে বাকি চোরাকারবারীরাও একে একে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেল। তাদের হাতকড়া পরিয়ে যখন বাইরে আনা হলো, তখন তাদের অহংকার ধুলোয় মিশে গেছে।
ওসি সাহেব জাবিরের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, "সাবাশ ছেলে! তোমার ফোনের জিপিএস ট্র্যাকিং আর এসওএস সিগন্যাল পেয়েই আমরা দ্রুত লোকেশন ট্র্যাক করতে পেরেছি। আর তোমার নানাও ঠিক সময়ে থানায় খবর দিয়েছিলেন।" নানা শামসুল হক জাবির আর তৌকিরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর চোখ দিয়ে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ছিল। "তোরা ঠিক আছিস তো? আমি তো ভয়ে মরেই গিয়েছিলাম!"
"আমরা একদম ঠিক আছি নানাভাই," জাবির হেসে বলল। "আর শুধু ঠিক নই, আপনাদের ইতিহাসের সেই অমূল্য রত্নও রক্ষা পেয়েছে।"
বিকেলের মধ্যে পুরো সোনারগাঁয়ে খবরটি রাষ্ট্র হয়ে গেল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ছুটে এলেন ঘটনাস্থলে। সিন্দুকটি পরীক্ষা করে তারা নিশ্চিত করলেন, এটি মোগল সুবেদারদের আমলের এক অবিশ্বাস্য প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার, যার আন্তর্জাতিক মূল্য কোটি কোটি টাকা,আর ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। সোনারগাঁ থানা প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল। রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র জাবির আল রাইয়ান এখন জাতীয় বীর। পরদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর প্রথম পাতায় বড় করে ছাপা হলো:
"কিশোর জাবিরের অসীম সাহসিকতা: সোনারগাঁয়ে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারী চক্র গ্রেপ্তার, কোটি টাকার ঐতিহাসিক গুপ্তধন উদ্ধার!"
সন্ধ্যায় যখন মেঘনা নদীর বুকে রক্তিম সূর্য ডুবছিল, জাবির নানার বাড়ির বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। তৌকির এসে তার পাশে বসল, হাতে রেসিডেনসিয়াল স্কুলের বিজ্ঞান সাময়িকী।
"কী রে গোয়েন্দা প্রবর, পরের মিশন কবে?" তৌকির চোখ মটকে জিজ্ঞেস করল।
জাবির দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রহস্যের হাসি হাসল। "সামনে তো গরমের ছুটি আছে। শুনলাম লালবাগ কেল্লার নিচেও নাকি অনেক না-জানা সুড়ঙ্গ আছে..." দুই ভাইয়ের হাসির শব্দে শীতের মিষ্টি সন্ধ্যাটা মুখরিত হয়ে উঠল। রক্তে যার অ্যাডভেঞ্চারের নেশা, তার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি প্রাচীন দেওয়ালই যে এক একটি রোমাঞ্চকর রহস্যের হাতছানি!