রাত তখন আড়াইটা। অক্টোবর মাসের হিমেল বাতাস ঢাকার রাজপথগুলোকে অনেকটাই নিস্তব্ধ করে এনেছে। কিন্তু মিন্টো রোডের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের ওয়ার-রুমে কোনো নিস্তব্ধতা নেই। সেখানে প্রতিটি সেকেন্ড কাটছে যেন এক-একটি তীব্র স্নায়ুচাপের ভেতর দিয়ে। রুমের কেন্দ্রীয় ডিসপ্লে জুড়ে জ্বলজ্বল করছিল বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং সুইফট (SWIFT) গেটওয়ের রিয়েল-টাইম ট্রাফিক মনিটর। হঠাৎ সেই সবুজ গ্রাফগুলো উন্মাদের মতো লাল হয়ে উঠতে শুরু করল। বড় স্ক্রিনে সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ ডেটা প্যাকেট আছড়ে পড়ার দৃশ্য ফুটে উঠল, এক চরম বিধ্বংসী ডিডস (DDoS) ও জিরো-ডে এক্সপ্লয়েট আক্রমণ। স্ক্রিনের ঠিক মাঝখানে পপ-আপ হয়ে ভেসে উঠল একটি বিদ্রূপাত্মক অ্যানিমেশন, একটি সোনার মুকুট পরা রক্তচক্ষু মানুষের খুলি।তার নিচে খাঁটি ইংরেজিতে সবুজ টার্মিনাল ফন্টে লেখা:
[SYSTEM BREACHED BY: KING-HACKER] "Dhaka will sleep in the dark at 04:00 AM. Pay 50000 USDto the cold wallet, or watch the national grid burn."Countdown: 01:28:45Pay 50000 USD to the cold wallet, or watch the national gridCountdown: 01:28:45
কন্ট্রোল রুমের প্রধান টেবিলে দুই হাত চেপে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আশরাফ চৌধুরী। বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ইউনিটের অন্যতম ক্ষুরধার অফিসার হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। গত তিন মাসে এই অদৃশ্য ছায়া অন্তত চারটি রাষ্ট্রীয় সাইবার অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে। সে নিজেকে দাবি করে ‘হ্যাকার রাজা’। ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকা সত্ত্বেও কেউ তার আসল আইপি বা শারীরিক অবস্থান বের করতে পারেনি। সে কখনো ভিয়েতনাম, কখনো রোমানিয়া, আবার কখনো লুক্সেমবার্গের স্যাটেলাইট প্রক্সি ব্যবহার করে মিলিয়ে যায়।
"স্যার! ন্যাশনাল পাওয়ার লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের আশুগঞ্জ ও ঘোড়াশাল সাব-স্টেশনের এসসিএডিএ (SCADA) সিস্টেম রিমোটলি ওভাররাইড হয়ে যাচ্ছে!" ইউনিটের প্রধান সিস্টেম আর্কিটেক্ট কাঁপতে কাঁপতে বললেন। "অ্যাটাকার একটা ডাইনামিক বটনেট ব্যবহার করছে, যা প্রতি সেকেন্ডে নোড পরিবর্তন করছে। আমরা ফায়ারওয়াল দিয়ে ট্রাফিক ড্রপ করতে পারছি না!"
আশরাফ চৌধুরী তাঁর ব্লুটুথ হেডসেট খুলে ছুড়ে মারলেন টেবিলে। ঠিক তখনই ওয়ার-রুমের কাচের স্লাইডিং দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল একটি কিশোর। তার কাঁধে জলপাই রঙের একটি টেক-ব্যাকপ্যাক, চোখে পাতলা মেটাল ফ্রেমের অ্যান্টি-গ্লেয়ার চশমা, পরনে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নেভি ব্লু হুডি। তার নাম জাবির আল রাইয়ান। বয়স মাত্র পনেরো পেরিয়েছে, কিন্তু কম্পিউটার আর্কিটেকচার, অ্যাসেম্বলি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তার দখল দেশের বহু অভিজ্ঞ সিকিউরিটি গবেষককেও হার মানায়। আশরাফ চৌধুরী জাবিরের আপন মামা। জাবিরের অদ্ভুত গাণিতিক মস্তিষ্ক ও সাইবার প্যাটার্ন চেনার সহজাত ক্ষমতার ওপর আশরাফের বিশ্বাস অগাধ।
"দেরি হয়ে গেল মামা," জাবির দ্রুত পায়ে রুমে ঢুকে সোজা সাইড টেবিলে গিয়ে নিজের কাস্টমাইজড থিঙ্কপ্যাড ল্যাপটপটি বের করল।
"দেরি মানে সর্বনাশ হয়ে গেছে জাবির!" আশরাফ চৌধুরী হতাশা নিয়ে স্ক্রিনের দিকে ইশারা করলেন। "রাজা এবার ন্যাশনাল গ্রিড লক করে দিয়েছে। দেড় ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা শহর ব্ল্যাকআউট হয়ে যাবে। তারপর ব্যাংকের মূল সার্ভারের ডেটা ওয়াইপ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। আমাদের গোটা টিম ট্র্যাকিং করতে গিয়ে একের পর এক ভিপিএন আর টর (Tor) নেটওয়ার্কের মায়াজালে আটকে পড়ছে।" জাবির কোনো উত্তর দিল না। সে ল্যাপটপের থান্ডারবোল্ট পোর্ট দিয়ে মূল সার্ভারের মনিটরিং ইন্টারফেসে একটি ফিজিক্যাল হার্ডওয়্যার ট্যাপ জুড়ে দিল। তার টার্মিনালে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে সবুজ কোড স্ক্রোল হতে লাগল ঝড়ের গতিতে।
"মামা, সাধারণ আইপি বা রাউটিং টেবিল দেখে রাজাকে ট্র্যাকিং করা অসম্ভব," জাবির কি-বোর্ডে দ্রুত আঙুল চালাতে চালাতে বলল। "যে হ্যাকার জিরো-ডে রিমোট কোড এক্সিকিউশন করতে পারে, সে নিশ্চয়ই সাধারণ কমার্শিয়াল ভিপিএন ব্যবহার করবে না। সে ব্যবহার করছে 'বোটনেট জাম্পিং'। অর্থাৎ সে পৃথিবীর শত শত ইনফেক্টেড আইওটি (IoT) ডিভাইস, যেমন স্মার্ট টিভি, রাউটার, সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে একটা কৃত্রিম আবরণ তৈরি করেছে।"
"তাহলে উপায়?" আশরাফ চৌধুরী ঝুঁকে এলেন।
"উপায় হলো হার্ডওয়্যার সিগনেচার আর লেটেন্সি ফ্ল্যাকচুয়েশন," জাবিরের চোখে চশমার কাঁচে কোডের প্রতিফলন নাচছিল। "যেখান থেকেই সে এই ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট চালাক না কেন, এই বিপুল পরিমাণ ট্রাফিক পুশ করার জন্য তার প্রয়োজন অন্তত দশ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ডের আন-থ্রটলড ফাইবার অপটিক্যাল ব্যান্ডউইথ। মামা, আশুগঞ্জ সাব-স্টেশনের দিকে আসা ডেটা প্যাকেটগুলোর টাইম-টু-লাইভ (TTL) আর প্যাকেট সাইজের মাইক্রো-সেকেন্ড ডিলেগুলো একটু দেখুন।"
জাবির কি-বোর্ডে কয়েকটি পাইথন স্ক্রিপ্ট রান করল। স্ক্রিনে একটি ত্রিমাত্রিক নোড-গ্রাফ ভেসে উঠল।
হঠাৎ একটি লাল বিন্দু বারবার অন্যান্য প্রক্সি নোডের মাঝখানে একটি নিখুঁত জ্যামিতিক বিরতিতে কাঁপতে লাগল।
"পেয়েছি!" জাবিরের কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। "সে যত বিদেশি ভুয়া আইপি-ই দেখাক না কেন, তার প্যাকেটগুলোতে একটা বিশেষ প্যাডিং বাইট রয়েছে, 0x52 0x41 0x4A 0x41। হেক্সাডেসিমেল ভাষায় এর অর্থ 'RAJA'। এই হ্যাকার প্রচণ্ড অহংকারী। সে তার প্রতিটা ম্যালওয়্যার প্যাকেটে নিজের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছে!"
আশরাফ চৌধুরী চোখ বড় বড় করলেন। "তার মানে ও আন্তর্জাতিক কোনো দেশ থেকে এটা করছে না?"
"না মামা!" জাবির স্ক্রিনটা আশরাফের দিকে ঘুরিয়ে দিল। "প্যাকেটের লেটেন্সি মাত্র চার মিলি-সেকেন্ড! ফিজিক্স মিথ্যা বলতে পারে না। ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে সংকেত আসতে হলেও আলোর গতির সীমাবদ্ধতার কারণে অন্তত দেড়শো মিলি-সেকেন্ড সময় লাগবে। চার মিলি-সেকেন্ডের অর্থ-এই দানবীয় ট্রাফিকের মূল মাস্টার মাইন্ড বসে আছে এই ঢাকা শহরেরই কোথাও!"ওয়ার-রুমে উপস্থিত প্রতিটি পুলিশ অফিসারের মেরুদণ্ড সোজা হয়ে গেল। পুরো টিম যেন বিদ্যুতের শক খেল। যে ভয়ংকর হ্যাকারকে ইন্টারপোল ইউরোপ আর রাশিয়ান বর্ডারে খুঁজছে, সে আসলে ঢাকার বুকেই বসে কলকাঠি নাড়ছে! "চার মিলি-সেকেন্ডের ব্যাসার্ধ কতটুকু জাবির?" আশরাফ চৌধুরী দ্রুত ওয়াকিটকি হাতে নিলেন।
"পুরো ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা এই রেঞ্জে পড়ে," জাবির ভাবে বলল। "তবে আমাদের হাতে সময় মাত্র এক ঘণ্টা বিশ মিনিট। আমাদের রিয়েল-টাইম প্যাকেট ডাইভারশন করতে হবে। ওকে একটা ফাঁদে ফেলতে হবে, মামা।"
"কীসের ফাঁদে?"
"হানিপট (Honeypot)," জাবিরের মুখে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। "হ্যাকার রাজা আত্মগর্বী। সে নিজেকে অজেয় মনে করে। যদি আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ডামি ব্যাকআপ সার্ভার উন্মুক্ত করে দিই এবং সেখানে একটি কৃত্রিম ত্রুটি রেখে দিই, সে লোভ সামলাতে পারবে না। পাওয়ার গ্রিড বন্ধ করার আগে সে চাইবে সেই ব্যাকআপ থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের এনক্রিপশন কি (Key) চুরি করতে।" আশরাফ চৌধুরী এক মুহূর্তও দ্বিধা করলেন না। "টিম! জাবির যা বলছে সেই অনুযায়ী সেকেন্ডারি গেটওয়ে 'মিরর-৭' ওপেন কর। সমস্ত ফায়ারওয়াল রুলস শিথিল করার অভিনয় করো, যেন মনে হয় সিস্টেম ধসে পড়ছে!"
পরের দশ মিনিট ছিল রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার। কাউন্টডাউন তখন নেমে এসেছে পঞ্চাশ মিনিটে: ০০:৫০:১২।
হঠাৎ স্ক্রিনের ডামি সার্ভারে লাল আলোর সাইরেন জ্বলে উঠল। হানিপটের জালে শিকার পা দিয়েছে! হ্যাকার রাজা তার মূল প্রাইভেট ট্রোজান এক্সিকিউটেবল ফাইল পুশ করেছে ডামি সার্ভারে।
"ও ঢুকেছে!" জাবির চেঁচিয়ে উঠল। "এখনই রিভার্স ট্রেসিং শুরু করছি!"
জাবির তার টার্মিনালে তার নিজের তৈরি কার্নেল-লেভেল ট্রেসার 'সাইবার-বাজপাখি' সক্রিয় করে দিল। স্ক্রিনের মানচিত্রে দেখা গেল, সিগন্যালটি ধানমন্ডি থেকে তেজগাঁও, সেখান থেকে বাড্ডা হয়ে গুলশানের একটি লোকাল ফাইবার অপটিক হাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
"আইএসপি (ISP) ট্র্যাক করো!" আশরাফ চৌধুরী গর্জে উঠলেন।
"আইএসপি হলো অপটিক্যাল ফাইবার জোন-৪," স্ক্রিন দেখে কনফার্ম করলেন এসআই তানভীর। "কিন্তু আইপি দেখাচ্ছে একটি ডায়নামিক ক্লাউড প্রক্সি!"
"ক্লাউড প্রক্সি দিয়ে লাভ হবে না," জাবির দ্রুত আঙুল চালাল। "আমি হানিপটের স্ক্রিপ্টের ভেতরে একটি বিশেষ ট্রোজান পেলোড পাঠিয়েছি যা সরাসরি তার লোকাল মেশিনের নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস কার্ডের (NIC) ফিজিক্যাল ম্যাক (MAC) অ্যাড্রেস এবং জিপিএস ক্লক রিড করে নিবে।" মুহূর্তের মধ্যে জাবিরের ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটি সুনির্দিষ্ট ম্যাক অ্যাড্রেস এবং লোকাল সাব-স্টেশনের কোড নম্বর ফুটে উঠল:
[MAC: 00:1A:2B:3C:4D:5E]
[ROUTER NODE: HATIRJHEEL-SOUTH-HUB-09]
[TARGET AREA: OLD TEJGAON INDUSTRIAL BELT]
Plaintext
[MAC: 00:1A:2B:3C:4D:5E]
[ROUTER NODE: HATIRJHEEL-SOUTH-HUB-09]RGET AREA: OLD TEJGAON INDUSTRIAL BELT]
"তেজগাঁও পুরনো শিল্প এলাকা!" আশরাফ চৌধুরী এক সেকেন্ডও নষ্ট করলেন না। তিনি কোমরের গ্লক-১৭ পিস্তলটি চেক করে হোলস্টারে ঢোকালেন। "সোয়াত টিম ও সিআইডি সাইবার পেট্রোল ইউনিটকে মুভ করতে বলো! জাবির, তুমি এখানে কন্ট্রোল রুমে থাকবে।"
"না মামা!" জাবির তার ল্যাপটপটি দ্রুত ব্যাগে ঢুকিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। "সে কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। সে তার সার্ভারে 'ডেড ম্যানস সুইচ' (Dead Man's Switch) বসিয়ে রাখতে পারে। ফিজিক্যাল রেড হলে সে এক ক্লিকে গোটা দেশের পাওয়ার গ্রিড ড্রাইভ ফরম্যাট করে দেবে। ঘটনাস্থলে নেটওয়ার্ক ফিজিক্যালি কাট করার জন্য আমাকে লাগবেই।"
আশরাফ চৌধুরী ভাগ্নের চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে কোনো কিশোরের ভীতি নেই, বরং এক নির্ভীক প্রতিভার দৃঢ় সংকল্প। "গাড়িতে ওঠো!" আশরাফ চৌধুরী নির্দেশ দিলেন। সাইরেন বন্ধ করে পুলিশের তিনটি কালো মাইক্রোবাস এবং দুটি সোয়াত ভ্যান হাতিরঝিল লিংক রোড দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলল। রাত তখন সাড়ে তিনটা। আকাশে একফালি ম্লান চাঁদ মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। কুয়াশার পাতলা চাদরে তেজগাঁওয়ের পুরনো শিল্প এলাকাকে দেখাচ্ছিল কোনো ভৌতিক শহরের মতো।
বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরনো টেক্সটাইল মিল, মরিচা ধরা বড় বড় গুদামঘর আর অব্যবহৃত সাইলোর মাঝে এলাকাটি নিঝুম। গাড়ির পেছনের সিটে বসে জাবির তার ল্যাপটপে সংযুক্ত হাই-গেইন ডিরেকশনাল ওয়াই-ফাই ও আরএফ (RF) অ্যান্টেনা নিয়ে কাজ করছিল। গাড়ি যখন একটি পরিত্যক্ত চারতলা কেমিক্যাল ফ্যাক্টরির সামনে দিয়ে গেল, অ্যান্টেনার সিগন্যাল মিটারে লাল বাতি তীব্র শব্দে বিপ-বিপ করে উঠল।
"মামা, গাড়ি থামান!" জাবির নিচু গলায় বলল। "সিগন্যাল স্ট্রেন্থ মাইনাস চল্লিশ ডিবিএম (dBm)! এই কারখানার ভেতর থেকে অন্তত দশটি হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ওয়্যারলেস বিম আকাশে অ্যান্টেনার মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে।"
আশরাফ চৌধুরী হাত তুলে কনভয় থামানোর নির্দেশ দিলেন। কালো পোশাকে সজ্জিত সোয়াত সদস্যরা গাড়ি থেকে নিঃশব্দে নেমে এলেন। তাঁদের হাতে অত্যাধুনিক কারবাইন, চোখে নাইট-ভিশন গগলস।
"কোনো আলো জ্বলবে না," আশরাফ চৌধুরী নির্দেশ দিলেন। "টার্গেট যেন টের না পায়। জাবির, তুমি আমার ঠিক পেছনে থাকবে।"
কারখানার প্রাঙ্গণটি আগাছা আর ভাঙা ড্রামে ভরা। প্রধান ফটকে একটি প্রকাণ্ড লোহার তালা ঝুলছিল, কিন্তু জাবির লক্ষ করল তালার ওপর কোনো ধুলো নেই, সম্প্রতি এতে তেল দেওয়া হয়েছে। সোয়াতের এক সদস্য হাইড্রলিক কাটার দিয়ে সেকেন্ডের মধ্যে তালাটি নিঃশব্দে কেটে ফেললেন। ভেতরে ঢুকতেই নাকে এলো স্যাঁতসেঁতে ভেজা রাসায়নিক এবং ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়ার ওজোন গ্যাসের কড়া গন্ধ। নিচতলা সম্পূর্ণ ফাঁকা, কেবল ভাঙা যন্ত্রপাতি আর কংক্রিটের জঞ্জাল। কিন্তু ওপরের তলা থেকে একটি অতি ক্ষীণ, একটানা গুঞ্জন ভেসে আসছিল, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার ফ্যান আর এসি ইউনিটের পরিচিত শব্দ!
সিঁড়ি বেয়ে পা টিপে টিপে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা পার হয়ে দলটি যখন চতুর্থ তলার একটি ভারী লোহার সাউন্ডপ্রুফ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, জাবিরের ল্যাপটপের স্ক্রিনে কাউন্টডাউন তখন দেখাচ্ছিল: ০০:১৫:২
আর মাত্র পনেরো মিনিট! দরজার ওপাশে স্পষ্ট আলোর রেখা দেখা যাচ্ছিল। আশরাফ চৌধুরী সোয়াত টিম লিডারকে আঙুল দিয়ে তিন থেকে এক পর্যন্ত গণনা করে ইশারা করলেন। এক... দুই... তিন! দড়াম!
হাইড্রলিক র্যামের এক প্রচণ্ড আঘাতে সাউন্ডপ্রুফ দরজাটি ফ্রেম ভেঙে ভেতরের দিকে আছড়ে পড়ল! "বাংলাদেশ পুলিশ! হ্যান্ডস আপ! কেউ নড়বেন না!"
সোয়াত সদস্যরা বিদ্যুৎবেগে অস্ত্র উঁচিয়ে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়লেন। ঘরের ভেতরের দৃশ্যটি দেখে পুলিশের অভিজ্ঞ অফিসাররাও এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এটি কোনো পরিত্যক্ত কারখানার ঘর নয়; এটি একটি অত্যাধুনিক হাই-টেক বাঙ্কার! চারপাশের দেওয়ালে সাউন্ডপ্রুফ অ্যাকোস্টিক ফোম লাগানো। মেঝের ওপর সারিবদ্ধভাবে বসানো অন্তত বিশটি হাই-এন্ড ওয়াটার-কুলড সার্ভার রেক, যেগুলোর নীল আর সবুজ এলইডি আলো অন্ধকারের ভেতর নাচছিল। ছাদ থেকে ঝুলছে অন্তত ছয়টি বড় কার্ভড ওলেড মনিটর। আর সেই সার্ভারগুলোর ঠিক মাঝখানে, একটি এরগনোমিক গেমিং চেয়ারে আয়েশ করে বসে ছিল এক যুবক। বয়স বড়জোর পঁচিশ বা ছাব্বিশ। গায়ে একটি ঢিলেঢালা কালো হুডি, কানে বড় স্টুডিও হেডফোন, আর মুখে একটি অদ্ভুত ব্যঙ্গাত্মক হাসি। তার সামনে জ্বলজ্বল করছিল সেই খুলির অ্যানিমেশন আর আশুগঞ্জ সাব-স্টেশনের টার্বাইন কন্ট্রোল প্যানেল।
সে চমকাল না, ভয় পেল না। এমনকি সোয়াত কমান্ডোদের লেজার সাইট তার বুকের ওপর স্থির হওয়া সত্ত্বেও সে তার চেয়ার থেকে এক ইঞ্চিও নড়ল না।
"ওয়েলকাম, ইন্সপেক্টর," যুবকটির কণ্ঠস্বর ছিল বরফশীতল ও আত্মবিশ্বাসী। "পুলিশের সাইবার ইউনিট তেজগাঁও পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে, তা আমি ভাবিনি। তবে আপনারা খুব দেরি করে ফেলেছেন।"
"হাত মাথার ওপর তোলো, রাজা!" আশরাফ চৌধুরী পিস্তল সোজা করে এগিয়ে গেলেন। "তোমার খেলা শেষ। সার্ভার টার্মিনাল থেকে দূরে সরে যাও!"
রাজা এক বিকৃত অট্টহাসি দিয়ে উঠল। সে তার ডান হাতের তর্জনী একটি লাল মেকানিক্যাল সুইচের ওপর রাখল, যেটি তার প্রধান কি-বোর্ডের সাথে তার দিয়ে যুক্ত ছিল।
"খেলা শেষ?" রাজা উপহাসের সুরে বলল। "আপনারা ভুলে যাচ্ছেন কার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। এই সুইচটা দেখছেন? এটা হলো এনক্রিপ্টেড রিমোট ডেটোনেটর। আমি আঙুল তুললেই বা চাপ দিলেই আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল আর রামপালের সেন্ট্রাল ফ্রিকোয়েন্সি রিলেতে এমন এক ফল্ট কারেন্ট ইনজেক্ট হবে যা গোটা দেশের দশটি প্রধান সাব-স্টেশনের ট্রান্সফরমার একযোগে বিস্ফোরিত করবে! শুধু অন্ধকার নয়, কয়েক হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ সেকেন্ডে ছাই হয়ে যাবে। আমাকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা আপনাদের নেই!"
সোয়াত সদস্যরা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। পরিস্থিতি এক চুল পরিমাণ ভুল হলে দেশ এক মহাবিপর্যয়ে পড়বে। কাউন্টডাউন স্ক্রিনে কাঁপছিল: ০০:০৫:০০। পাঁচ মিনিট!
আশরাফ চৌধুরীর কপালে আবার ঘামের ধারা নেমে এলো। তিনি ভালো করেই জানেন, সাইকো হ্যাকারদের হুমকি ফাঁকা বুলি হয় না। এই দূরত্ব থেকে গুলি চালালেও পেশির শেষ স্পন্দনে সে সুইচে চাপ দিয়ে দিতে পারে। ঠিক তখনই আশরাফের পেছনের ছায়া থেকে শান্ত পায়ে সামনে এগিয়ে এলো জাবির। তার মুখে কোনো ভীতি নেই। সে তার কাঁধ থেকে ব্যাকপ্যাকটি ধীরে ধীরে নামিয়ে মেঝের ওপর রাখল। "তুমি ট্রান্সফরমার ব্লাস্ট করাতে পারবে না, রাজা," জাবিরের কণ্ঠস্বর ঘরের ভারী বাতাসে খুব স্বাভাবিক ও স্পষ্ট শোনাল। যুবকটি ভ্রু কুঁচকে জাবিরের দিকে তাকাল। একজন কিশোরের এমন আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি সে আশা করেনি। "তুমি কে হে খোকা? পুলিশের সাথে কোনো বাচ্চার খেলার জায়গা এটা নয়। যাও, বাড়ি গিয়ে ভিডিও গেম খেলো!"
"তোমার মূল কোডের নাম Sovereign_Worm_v4 তাই তো?" জাবির এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখ মনিটরের টার্মিনাল কোডের ওপর স্থির। "তুমি ভাবছ তুমি এসসিএডিএ (SCADA) সিস্টেমের পিএলসি (PLC) কন্ট্রোলারের মডবাস (Modbus) প্রোটোকল হাইজ্যাক করেছ। কিন্তু তুমি একটা মৌলিক ভুল করেছ।" রাজার মুখের সেই দাম্ভিক হাসি সামান্য ম্লান হলো। তার চোখের মণি একটু কেঁপে উঠল। "কীসের ভুল? আমার কোড ফ্ললেস!"
"তোমার কোড ফ্ললেস হতো, যদি তুমি বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিডের নতুন আপগ্রেডেড আইইসি-৬১৮৫০ (IEC-61850) আর্কিটেকচার খেয়াল করতে," জাবির অবজ্ঞার ভঙ্গিতে হাসল। "তুমি যে ডেটা প্যাকেটগুলো পাঠাচ্ছ, সেগুলো এখন পাওয়ার গ্রিডের ফিজিক্যাল লেয়ারে যাচ্ছেই না। তুমি যখন পনেরো মিনিট আগে আমাদের হানিপটে আঘাত করেছিলে, তখন তোমার পুরো ট্রাফিক ডাইভার্ট করে দেওয়া হয়েছিল একটি কৃত্রিম আইসোলেটেড ভার্চুয়াল স্যান্ডবক্সে! তুমি গত পনেরো মিনিট ধরে যে ট্রান্সফরমারগুলোতে ফল্ট তৈরি করছ, সেগুলো আসলে আমাদের সার্ভারের ভার্চুয়াল মেমোরিতে চলছে। তোমার স্ক্রিনের ওই গ্রাফগুলো ফেক!""মিথ্যা! বাজে কথা!" রাজা হিংস্রভাবে চিৎকার করে উঠল। সে দ্রুত তার বাঁ হাত দিয়ে অন্য একটি কন্সোলে কোড চেক করতে গেল। আর ঠিক এই এক সেকেন্ডের বিভ্রান্তিই ছিল জাবিরের নিখুঁত ফাঁদ! একজন হ্যাকার যখন তার নিজের সিস্টেমের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, তখন তার স্বাভাবিক রিফ্লেক্স হলো স্ক্রিনে লগ চেক করা। রাজা যখন বাঁ হাত বাড়িয়ে কন্সোলে তাকাল, জাবির তার পকেট থেকে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বের করল তার সাথে আনা একটি বিশেষ সামরিক-গ্রেডের ইউএসবি ডিভাইস,একটি 'ইউএসবি কিলার' ও 'ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস ইমিটার'। জাবির বিদ্যুৎগতিতে সামনে ঝুঁকে পড়ে সেই ডিভাইসটি সরাসরি প্রধান সার্ভার রেকের উন্মুক্ত ফ্রন্ট প্যানেলের অপটিক্যাল পোর্টে গুঁজে দিয়ে সুইচ অন করে দিল! ফটাস! হিসসসস!
একটি ক্ষুদ্র নীল আলোর স্ফুলিঙ্গ আছড়ে পড়ল সার্ভারের মূল মাদারবোর্ডে। দশ হাজার ভোল্টের একটি বিপরীতমুখী ডিসি কারেন্ট মুহূর্তের মধ্যে প্রধান সার্ভারের সমস্ত ক্যাবল, নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস এবং ওই লাল ডেটোনেটর সুইচের ডেটা লাইন পুড়িয়ে কয়লা করে দিল! ঘরের সব মনিটর একযোগে নিভে গেল। কেবল ইমার্জেন্সি লাল বাতি টিমটিম করে জ্বলতে লাগল। "নাআআআ!" রাজা উন্মত্তের মতো চিৎকার করে সেই লাল সুইচে বারবার চাপ দিতে লাগল, কিন্তু কোনো সংকেত আর সার্ভার পর্যন্ত পৌঁছাল না। তার সাম্রাজ্য চোখের পলকে এক টুকরো পোড়া প্লাস্টিক আর সিলিকনের জঞ্জালে পরিণত হলো। "হ্যান্ডস আপ!"
আশরাফ চৌধুরী এক সেকেন্ডও নষ্ট করলেন না। তিনি ক্ষিপ্র গতিতে টেবিলের ওপর দিয়ে লাফিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় রাজাকে তার চেয়ার থেকে টেনে মেঝেতে আছড়ে ফেললেন। সোয়াতের দুজন কমান্ডো এসে তার দুই হাত মুচড়ে ধরে পিঠের ওপর চেপে ধরল। ক্লিক!
ঠান্ডা ইস্পাতের হ্যান্ডকাফ আটকে গেল হ্যাকার রাজার দুই কবজিতে। ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে তখন কেবল শোনা যাচ্ছিল পরাজিত হ্যাকারের ভারী ও ক্ষ্যাপাটে নিঃশ্বাসের শব্দ। কাউন্টডাউনের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ঢাকার পাওয়ার গ্রিডের সমস্ত রিয়েল-টাইম কন্ট্রোল তখনো পুলিশের সাইবার টিমের নিরাপদ ফায়ারওয়ালের পেছনে সুরক্ষিত।
ইমার্জেন্সি লাইটের আলোয় আশরাফ চৌধুরী হ্যাকার রাজার হুডি এক টানে পেছনে সরিয়ে দিলেন। তার আসল মুখাবয়ব বেরিয়ে এলো। ফ্যাকাশে চামড়া, চোখের নিচে দীর্ঘদিনের নির্ঘুম রাতের কালচে দাগ। আশরাফ চৌধুরী তাঁর পকেট থেকে একটি ফোল্ডার বের করলেন। "সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজা। চার বছর আগে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ড্রপ-আউট। একটি বেসরকারি সফটওয়্যার ফার্মের ডেটাবেজ চুরির দায়ে বহিষ্কৃত। তারপর থেকে ডার্ক ওয়েবের আন্তর্জাতিক আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভাড়াটে হ্যাকার হিসেবে কাজ করছিলে।"
রাজা মেঝেতে মুখ থেবড়ে পড়ে বিষাক্ত চোখে জাবিরের দিকে তাকাল। "তুমি... তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছিলে! আমার ট্রাফিক কোনো ভার্চুয়াল স্যান্ডবক্সে ছিল না! আমার স্ক্রিপ্ট আসল সিস্টেমে যাচ্ছিল! তুমি শুধু আমার মনোযোগ নষ্ট করার জন্য ব্ল্যাকআউট মিথ্যা বলেছিলে!" জাবির শান্ত চোখে রাজার দিকে তাকাল। সে তার চশমাটা নাক থেকে সামান্য উঁচিয়ে ঠিক করে নিল।
"হ্যাঁ, আমি মিথ্যা বলেছিলাম," জাবিরের কণ্ঠে ছিল বরফশীতল যুক্তি। "সাইবার সিকিউরিটির প্রথম পাঠ হলো—হ্যাকিং শুধু মেশিনের দুর্বলতা খোঁজা নয়, হ্যাকিং হলো মানুষের মনের দুর্বলতা নিয়ে খেলা করা। যাকে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বলে। তুমি তোমার কোড নিয়ে এতটাই অন্ধ অহংকারী ছিলে যে, তোমার অহংকারই ছিল তোমার সিস্টেমের সবচেয়ে বড় সিকিউরিটি হোল (Security Hole)। আমি শুধু সেই গর্তে আঘাত করেছি।" রাজার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না। তার দাম্ভিকতা ধুলোয় মিশে গেছে।
কমান্ডোরা রাজাকে টেনে তুলে ঘরের বাইরে নিয়ে যেতে শুরু করল। যাওয়ার আগে সে শেষবারের মতো তার স্বপ্নের সেই সার্ভার বাঙ্কারের দিকে তাকাল, যা এখন এক অন্ধকার ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। সিআইডির ফরেনসিক দল এসে পৌঁছাল কয়েক মিনিটের মধ্যে। তারা প্রতিটি সার্ভার, হার্ডডিস্ক এবং রাজার ব্যক্তিগত এনক্রিপ্টেড ফোন সিলগালা করতে শুরু করল। সেখান থেকে উদ্ধার হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি পাচার, ব্যাংক ডাকাতির ছক এবং ব্ল্যাকমেইলের হাজার হাজার ডিজিটাল প্রমাণ। আশরাফ চৌধুরী কারখানার ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে তেজগাঁওয়ের আকাশে। রাতের কুয়াশা কেটে গিয়ে একটি পরিষ্কার, উজ্জ্বল সকাল উঁকি দিচ্ছে। চারপাশের রাস্তায় তখন শুরু হয়েছে সাধারণ মানুষের চেনা ব্যস্ততা। দুধের ভ্যান চলছে, সকালে বের হওয়া মানুষের পদশব্দ শোনা যাচ্ছে। ঢাকা শহরের কোটি কোটি মানুষ টেরও পেল না, আজ রাতে তারা কতটা ভয়ংকর এক অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে ফিরে এসেছে।
আশরাফ জাবিরের কাঁধে একটি ভারী, স্নেহমাখা হাত রাখলেন। তাঁর চোখ ভিজে উঠেছিল এক গভীর গর্বে।
"তুমি আজ যা করলে জাবির, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার হয়তো কোনোদিন তোমাকে সবার সামনে দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের গোপনীয়তার স্বার্থে এই যুদ্ধের ইতিহাস হয়তো কোনো ফাইলে আজীবন সিলগালা হয়ে থাকবে।" জাবির জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসল। সে তার ল্যাপটপটি জিপার টেনে ব্যাগে ভরে নিল।
"পুরস্কারের কোনো প্রয়োজন নেই মামা," জাবির বলল। "রাস্তার ওই লাইটপোস্টের আলোগুলো যে এখনো জ্বলছে, আর সকালের ওই মানুষগুলো যে নিশ্চিন্তে কাজে বের হতে পারছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রুফ-অব-ওয়ার্ক (Proof-of-Work)।"
আশরাফ চৌধুরী হেসে উঠলেন। তিনি ভাগ্নের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, "চলো এবার। সকালের নাস্তায় তোমার প্রিয় বকশীবাজারের বাকরখানি আর গরম চা না খাওয়ালে এই মামার ঋণ কোনোদিনই শোধ হবে না!"
পুলিশের গাড়িগুলো যখন নীল বাতি নিভিয়ে শান্ত গতিতে রাজপথ ধরে চলতে শুরু করল, ভোরের সোনালি রোদ তখন জাবিরের চশমার কাঁচে প্রতিফলিত হয়ে এক উজ্জ্বল আলোকবিন্দু তৈরি করছিল। সাইবার জগতের এক ভয়ংকর দানবকে পরাস্ত করে একটি সাধারণ কিশোর তখন ঘরে ফিরছে, তার পরিচয় কেবলই একজন নিঃশব্দ দেশপ্রেমিক যোদ্ধা হিসেবে।