অল্টারনেটিভ রক: সংগীতে মূলধারার বাইরে এক বিদ্রোহী সুর
তারিক হোসেন
সঙ্গীত জগতে ‘অল্টারনেটিভ রক’ (Alternative Rock) কেবল একটি সাধারণ জেনার বা উপশাখা নয়; এটি একটি মানসিকতা, একটি আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠিত মূলধারার (Mainstream) বাণিজ্যিক সঙ্গীতের প্রতি এক ধরনের শৈল্পিক বিদ্রোহ। ১৯৮০-এর দশকের আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক সিন থেকে উঠে আসা এই ধারাটি নব্বইয়ের দশকে এসে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছায়। গ্ল্যাম রক এবং পপ সঙ্গীতের বাণিজ্যিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে, অল্টারনেটিভ রক শিল্পীরা এমন এক সঙ্গীত তৈরি করেছিলেন, যা ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিগত, আবেগময় এবং প্রথামুক্ত।
অল্টারনেটিভ রক কী?
‘অল্টারনেটিভ’ বা ‘বিকল্প’ শব্দটি মূলত বোঝায় মূলধারার বাইরের কিছুকে। ১৯৮০-এর দশকে যখন পপ এবং হেভি মেটাল মিউজিকের জাঁকজমকপূর্ণ বাণিজ্যিকীকরণ চলছিল, তখন কিছু ব্যান্ড নিজেদের মতো করে, স্বাধীন লেবেলে (Independent label) সঙ্গীত চর্চা শুরু করে। তাদের সঙ্গীতে পাঙ্ক রকের (Punk Rock) ক্ষিপ্রতা, নতুন ধরনের সুর এবং গিটার ডিস্টর্শনের ব্যবহার ছিল। এই ব্যান্ডগুলো রেডিও বা এমটিভি (MTV)-তে বাজানোর উদ্দেশ্যে গান বানাত না; তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের হতাশা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং নিজস্ব দর্শনকে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করা।
আশির দশক: আন্ডারগ্রাউন্ড এবং কলেজ রক:
অল্টারনেটিভ রকের বীজ বপন হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকের পাঙ্ক রক আন্দোলনের মাধ্যমে। তবে এটি একটি সুনির্দিষ্ট রূপ পায় ১৯৮০-এর দশকে। এই সময় আমেরিকায় একে বলা হতো ‘কলেজ রক’ (College Rock), কারণ এই ব্যান্ডগুলোর গান মূলত কলেজ রেডিও স্টেশনগুলোতে বাজানো হতো।
এই দশকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল R.E.M., Sonic Youth, এবং Pixies। R.E.M. তাদের জ্যাংলি গিটার সাউন্ড এবং অস্পষ্ট লিরিক্সের মাধ্যমে অল্টারনেটিভ রককে একটি নতুন পরিচিতি দেয়। অন্যদিকে, Sonic Youth গিটারের নয়েজ এবং ডিস্টর্শন নিয়ে নানা ধরনের নিরীক্ষা চালায়। যুক্তরাজ্যে তখন The Smiths, The Cure, এবং Joy Division-এর মতো ব্যান্ডগুলো পোস্ট-পাঙ্ক (Post-punk) এবং গথিক রকের (Gothic Rock) মাধ্যমে অল্টারনেটিভ মিউজিককে সমৃদ্ধ করছিল।
এই দশকের ব্যান্ডগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ‘DIY’ (Do It Yourself) বা ‘নিজে করো’ নীতি। তারা নিজেরাই নিজেদের রেকর্ড প্রযোজনা করত এবং ছোট ছোট ভেন্যুতে লাইভ শো করত।
নব্বইয়ের দশক: গ্রাঞ্জ এবং মূলধারায় বিস্ফোরণ:
নব্বইয়ের দশক ছিল অল্টারনেটিভ রকের স্বর্ণযুগ। এই সময়ে অল্টারনেটিভ রক আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বব্যাপী মূলধারার সঙ্গীতে পরিণত হয়। আর এই বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আমেরিকার সিয়াটল (Seattle) শহর এবং সেখান থেকে উঠে আসা গ্রাঞ্জ (Grunge) মিউজিক।
১৯৯১ সালে Nirvana ব্যান্ডের Nevermind অ্যালবাম এবং এর লিড সিঙ্গেল "Smells Like Teen Spirit" রিলিজ হওয়ার পর পুরো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির দৃশ্যপট বদলে যায়। কার্ট কোবেইনের (Kurt Cobain) তীব্র আবেগপূর্ণ কণ্ঠ, ডিস্টর্টেড গিটার এবং তরুণ প্রজন্মের হতাশার কথা বলা লিরিক্স রাতারাতি অল্টারনেটিভ রককে জনপ্রিয়তার চূড়ায় নিয়ে যায়।
Nirvana-র পাশাপাশি সিয়াটল থেকে উঠে আসা আরও তিনটি ব্যান্ড—Pearl Jam, Soundgarden, এবং Alice in Chains গ্রাঞ্জ আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেয়। তাদের গানগুলোতে বিষণ্ণতা, রাগ এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার সুর স্পষ্টভাবে ফুটে উঠত।
একই সময়ে যুক্তরাজ্যে জন্ম নেয় ব্রিটপপ (Britpop)। গ্রাঞ্জের গাঢ় এবং বিষণ্ণ সুরের বিপরীতে ব্রিটপপ ছিল কিছুটা উজ্জ্বল এবং ব্রিটিশ পপ সংস্কৃতির উদযাপনে মুখর। Oasis, Blur, এবং Pulp-এর মতো ব্যান্ডগুলো এই ধারায় তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। নব্বইয়ের দশকের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অল্টারনেটিভ রক ব্যান্ডের মধ্যে Radiohead, Smashing Pumpkins, এবং Red Hot Chili Peppers-এর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।
২০০০ দশক থেকে বর্তমান: নতুন রূপ ও বিবর্তন:
২০০০-এর দশকে অল্টারনেটিভ রক নতুন কিছু উপশাখায় বিভক্ত হতে শুরু করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:
ইন্ডি রক রিভাইভাল (Indie Rock Revival): The Strokes, Arctic Monkeys, এবং The White
Stripes-এর মতো ব্যান্ডগুলো গ্যারেজ রক এবং পুরোনো দিনের রকের স্বাদ নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনে।
ইমো (Emo): আবেগময় লিরিক্স এবং মেলোডিক রকের সংমিশ্রণে My Chemical Romance, Fall Out Boy, এবং Paramore-এর মতো ব্যান্ডগুলো তরুণদের মাঝে বিশাল ফ্যানবেস তৈরি করে।
নিউ মেটাল ও অল্টারনেটিভ মেটাল: Linkin Park, System of a Down বা Deftones-এর মতো ব্যান্ডগুলো হেভি মেটাল, র্যাপ এবং অল্টারনেটিভ রকের সংমিশ্রণে সম্পূর্ণ নতুন একটি সাউন্ড তৈরি করে।
বর্তমানের অল্টারনেটিভ রক অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। Imagine Dragons, Twenty One Pilots, বা The 1975-এর মতো আধুনিক ব্যান্ডগুলো তাদের সঙ্গীতে ইলেকট্রনিক, পপ এবং হিপ-হপের উপাদান মিশিয়ে অল্টারনেটিভ রকের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে।
গীতি ও সাউন্ডের বৈশিষ্ট্য:
অল্টারনেটিভ রকের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর বৈচিত্র্যে। তবে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য এই ধারাটিকে আলাদা করে তোলে:
লিরিক্স বা গীতিকবিতা: অল্টারনেটিভ রকের লিরিক্স সাধারণত পপ গানের মতো কেবল প্রেম বা আনন্দ নিয়ে হয় না। এখানে মানসিক অবসাদ, সামাজিক অবিচার, রাজনৈতিক প্রতিবাদ, এবং অস্তিত্বের সংকটের মতো বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পায়।
সাউন্ড স্ট্রাকচার: ডিস্টর্শন পেডালের প্রচুর ব্যবহার, 'লাউড-কোয়াইট-লাউড' ডায়নামিক্স (অর্থাৎ গানের এক অংশ খুব শান্ত এবং পরের অংশেই প্রচণ্ড জোরে গিটার ও ড্রামস বাজানো), এবং প্রথাগত পপ গানের কাঠামো ভেঙে নতুন কিছু করার চেষ্টা।
ফ্যাশন ও কালচার: ফ্লানেল শার্ট, ছেঁড়া জিন্স, এলোমেলো চুল এবং চাক টেলর জুতো—নব্বইয়ের দশকে গ্রাঞ্জ মিউজিকের হাত ধরে এটি একটি বৈশ্বিক ফ্যাশন ট্রেন্ডে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতে অল্টারনেটিভ রকের প্রভাব:
বিশ্ব সঙ্গীতের এই ধারাটি বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এবং ২০০০-এর দশকে বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড দৃশ্যপটে অল্টারনেটিভ রকের বিশাল জোয়ার আসে। Black, Nemesis, Artcell, এবং Arbovirus-এর মতো ব্যান্ডগুলো তাদের গানে অল্টারনেটিভ রক এবং মেটালের দারুণ সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে। বিশেষ করে Black ব্যান্ডের প্রথম দিকের অ্যালবামগুলোতে অল্টারনেটিভ রক এবং গ্রাঞ্জের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, যা বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছিল।
বাংলা ব্যান্ড সংগীতে অল্টারনেটিভ রকের এক বিশাল এবং প্রভাবশালী অধ্যায় রয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের সফল অল্টারনেটিভ রক গানের গীতিকার হিসাবে তারিক হোসেনের নাম উল্লেখযোগ্য। তার লেখা গানগুলিতে অল্টারনেটিভ রক গানের সম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্য উপলক্ষিত হয়। ডিস্টর্টেড ইলেকট্রিক গিটার, রিদমিক বেসলাইন, শক্তিশালী ড্রাম বিট এবং ডায়নামিক ভোকালের সমন্বয়ে তৈরি এই ধারার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ও কালজয়ী গানের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
মিথ্যা
কেন যে কাদাও
কবে
হারিয়ে যাও
স্বপ্নডানা
অন্য সময়
অভিমান
বোকা মানুষটা
কেন বদলে গেলে
অদ্ভুত সেই ছেলেটি
প্রতিশোধ
ধূসর সময়
হানি ট্র্যাপ
উৎসবের উৎসাহে
কাকাতুয়া মন
একা
প্রতিষ্ঠিত এই গানগুলোর পাশাপাশি "দুঃখ বিলাস", "সুখ", "ভগ্ন প্রতিচ্ছবি", বা "প্রশ্ন"-এর মতো সৃষ্টিগুলোও অল্টারনেটিভ এবং হার্ড রকের এই ডায়নামিক ও আবেগময় ধারাটিকে দারুণভাবে তুলে ধরে।
উপসংহার
অল্টারনেটিভ রক প্রমাণ করেছে যে, নিখুঁত সুর বা জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশনার চেয়ে শিল্পীর ভেতরের সত্য এবং আবেগের প্রকাশ অনেক বেশি শক্তিশালী। দশকের পর দশক ধরে এটি বিবর্তিত হয়েছে, নানা ধারায় ভেঙেছে এবং নতুন রূপ নিয়েছে। মূলধারার বাণিজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে সঙ্গীতের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা নিজেই আজ ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী সঙ্গীত ধারায় পরিণত হয়েছে।
রেফারেন্স ও আরও পড়ার জন্য:
Our Band Could Be Your Life: Scenes from the American Indie Underground, 1981-1991 - Michael Azerrad (অল্টারনেটিভ রকের শুরুর দিকের ইতিহাস নিয়ে লেখা অন্যতম সেরা বই)।
Everybody Loves Our Town: An Oral History of Grunge - Mark Yarm।
ডকুমেন্টারি: Hype! (1996) - সিয়াটলের গ্রাঞ্জ মিউজিক সিন নিয়ে নির্মিত।
Rolling Stone ম্যাগাজিনের "The 100 Greatest Alternative Songs of All Time" আর্কাইভ।