Story

প্রেম দরদী

October 19, 2026

17 views

ইনানী কিংবা লাবণী পয়েন্টের যে পরিচিত গর্জন, সেন্ট মার্টিনের নীল জলে সেই উন্মাদনা নেই। এখানে সমুদ্র শান্ত, গভীর এবং রহস্যময় এক আত্মনিবেদনে স্থির। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে যখন প্রথম প্রবালের সেই চুনকাম করা ছাইরঙা রেখাটা চোখে পড়ে, অবচেতন মনেই বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্লান্তি এক লহমায় খসে পড়ে। অদিতি ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাসের বেগ তার খোলা চুলে ঢেউ তুলছিল। পরনে ঘিয়ে রঙের সাধারণ একটা লিনেন কুর্তি, চোখে বড় ফ্রেমের চশমা। এই ট্রিপটা তার কোনো পরিকল্পনাতেই ছিল না। কিন্তু রাজধানীর কর্পোরেট হাসপাতালের আইসিইউতে একটানা তিন বছর মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে লড়তে নিজের ভেতরের সংবেদনশীল মনটা কেমন যেন জমাট পাথরের মতো ভারী হয়ে গিয়েছিল। পেশায় সে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট। মানুষের ব্যথা কমানোই তার কাজ, কিন্তু নিজের ভেতরের যে শূন্যতা, তার ওষুধ কোনো ফার্মাকোপিয়ায় লেখা থাকে না। এক অদ্ভুত অবসাদ যখন তার হাসিকে পুরোপুরি শুষে নিল, তখন সিনিয়র প্রফেসর একপ্রকার জোর করেই তাকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিলেন—"যাও মেয়ে, বঙ্গোপসাগরের শেষ বিন্দুতে যেখানে প্রবাল জন্ম নেয়, সেখান থেকে নতুন করে বাঁচতে শেখো।"

জাহাজ যখন সেন্ট মার্টিনের জেটিঘাটে ভিড়ল, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁইছুঁই। ট্রলার, কাঠের তক্তা, কচি ডাবের স্তূপ আর স্থানীয় মানুষের হাঁকডাকে ঘাট মুখর। অদিতির ভারী ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে ঝুলিয়ে ঘাটে নামতেই রোদের ঝাঁঝাল রূপটা যেন হঠাৎ নরম হয়ে এল। দ্বীপের মাটি নয়, যেন একখণ্ড আদিম শান্তি তাকে অভ্যর্থনা জানাল। তার থাকার জায়গা ঠিক হয়েছিল পশ্চিম সৈকতের একদম শেষ মাথায় সমুদ্র বিলাস’ নামের এক নিরিবিলি কটেজে। সেখানে ইটের কোনো দেয়াল নেই, গোলপাতার ছাউনি আর বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি একেকটি ছোট ছোট কুটির। অদিতির ঘরের ঠিক সামনেই নারকেল গাছের সারি, আর তার ওপারেই নীলের অনন্ত বিস্তার।

ব্যাগটা রেখে ফ্রেশ হয়ে ও যখন কটেজের বারান্দায় কাঠের ডেকে এসে দাঁড়াল, তখনই তার নজর গেল সৈকতের দিকে। ভাটার টান শুরু হয়েছে। প্রবাল পাথরের কালো রূপগুলো ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। আর সেই রুক্ষ, ধারালো পাথরের খাঁজে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক যুবক। পরনে হালকা নীল রঙের সুতির শার্ট আর খাকি ট্রাউজার, দুই হাত কনুই পর্যন্ত গোটানো। অদিতির অভিজ্ঞ চোখ দূর থেকেই লক্ষ্য করল—যুবকটি খুব সন্তর্পণে কিছু একটা পাথর থেকে আলাদা করার চেষ্টা করছে। কোনো ট্যুরিস্ট নয় নিশ্চয়ই, কারণ তার হাতের নড়াচড়ায় পর্যটকের চপলতা নেই, বরং আছে একজন সার্জনের মতো নিখুঁত সতর্কতা।

কৌতূহল সংবরণ করতে পারল না অদিতি। পা থেকে স্যান্ডেল খুলে খালি পায়ে নরম বালির ওপর দিয়ে সে হেঁটে গেল সাগরের কিনারে।

কাছে গিয়ে যা দেখল, তাতে অদিতির চোখের পাতা স্থির হয়ে গেল। একটা বড়সড় সামুদ্রিক কচ্ছপ পাথরের ভাঁজে আটকে থাকা নাইলনের পুরোনো মাছধরা জালে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে ধারালো সুতো তার নরম ডানার মাংস কেটে রক্ত বের করে দিয়েছে। কচ্ছপটি যন্ত্রণায় নিষ্ফল ডানা ঝাপটাচ্ছে, আর প্রতিটা নড়াচড়ায় জালটা আরও শক্ত হয়ে বসে যাচ্ছে ক্ষতবস্থানে।

যুবকটি পকেট থেকে একটা ছোট সার্জিক্যাল কাঁচি বের করে নিখুঁত হাতে সুতোগুলো একটার পর একটা কাটছিল। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে, কিন্তু চোখে কোনো বিরক্তি নেই, কেবল অগাধ মায়ায় ভরা এক তীব্র মনোযোগ।

"পা নাড়ালে ও ব্যথা আরও বেশি পাবে। ডানাটা একটু চেপে ধরবেন?"

যুবকটি অদিতির দিকে না তাকিয়েই যেন তার উপস্থিতি টের পেয়ে বলে উঠল। তার কণ্ঠস্বর অদ্ভুত রকম খাদে নামা, ভারী অথচ নরম।

অদিতি এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। চিকিৎসকের সহজাত তাড়নায় সে হাঁটু গেড়ে ভেজা বালিতে বসল। কচ্ছপটির শক্ত খোলস আর পেছনের অংশে হাত রেখে হালকা চাপ দিল, যাতে সে ছটফট না করতে পারে।

"একদম ঠিক," যুবকটি ফিসফিস করে বলল, যেন কচ্ছপটিকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, "আর একটু... ব্যস, মুক্ত।"

শেষ সুতোটি কেটে জালটা সরিয়ে নিতেই ক্ষতস্থান থেকে কালচে লাল রক্ত চুইয়ে পড়ল। যুবকটি তার কাঁধের ঝুলন্ত ব্যাগ থেকে একটা কাচের শিশি বের করল। লিকুইড অ্যান্টিসেপ্টিক আর প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ তেলের একটা মিশ্রণ। সে তুলো দিয়ে ক্ষতটা মুছে দিয়ে আলতো করে ডানাটা স্পর্শ করল। কচ্ছপটি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। হয়তো সে বোঝার চেষ্টা করছিল, বন্ধন সত্যি কেটেছে কি না। তারপর ধীরে ধীরে এক পা, দুই পা করে ভেজা বালির ওপর দিয়ে গড়িয়ে চলা ঢেউয়ের দিকে এগিয়ে গেল। শেষ বিকেলে নামা প্রথম জোয়ারের জল তাকে ছুঁতেই সে ডানা মেলে গভীর জলের গভীরে মিলিয়ে গেল।

যুবকটি সোজা হয়ে দাঁড়াল। ভেজা হাত দুটো সাগরের জলেই ধুয়ে অদিতির দিকে তাকাল। মুখে ক্লান্তির কোনো চিহ্ন নেই, বরং সূর্যাস্তের শেষ লালচে আলোয় তার মুখে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি।

"ধন্যবাদ। একা একা বেশ কষ্ট হচ্ছিল," হাসল সে। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই।

"আপনি সার্জন?" অদিতি কৌতূহল সামলাতে না পেরে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল।

যুবকটি শব্দ করে হেসে উঠল, "না, আমি সমুদ্রবিজ্ঞানী। নাম নির্বাণ। প্রবাল আর সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম নিয়ে গবেষণা করছি গত তিন বছর ধরে এই দ্বীপে।"

"আর আমি অদিতি। অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট। ঢাকা থেকে এসেছি।"

"বাহ্, তাহলে তো ব্যথা উপশমের কারিগর আপনি!" নির্বাণের চোখে আলো খেলে গেল, "মানুষের যন্ত্রণা কমানোর মানুষ তো শহরে অনেক আছে ডা. অদিতি, কিন্তু এই অবলা সমুদ্রচরদের দেখার কেউ নেই। পর্যটকদের ফেলা প্লাস্টিক আর জেলেদের ফেলে যাওয়া জাল এদের কাছে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত।"

অদিতি নির্বাণের দিকে তাকাল। বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি হবে না। কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে যেন সাগরের মতোই গভীর কোনো ব্যথার বাস, আবার একই সাথে সেই সাগরকে আগলে রাখার এক দুর্নিবার পণ। প্রথম দর্শনেই কোনো পুরুষকে দেখে অদিতির বুকের ভেতর এমন আলোড়িত হয়নি কখনো।

সেন্ট মার্টিনের রাত নেমে আসে জাদুকরী নিস্তব্ধতা নিয়ে। জেনারেটর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যখন শুধু বাতাসের শনশন আর ঢেউ ভাঙার শব্দ থাকে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা কেবল এই ক্ষুদ্র দ্বীপটুকুর ভেতরেই সীমাবদ্ধ। পরদিন ভোরে অদিতির ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে নয়, সাগরের জলছলছল শব্দে। কটেজের বাইরে আসতেই দেখল নির্বাণ সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে।

"সুপ্রভাত, ডাক্তার। ছেঁড়াদ্বীপের দিকে যাবেন? ভাটার সময় পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে যাওয়া যায়। ট্রলারের শব্দ ছাড়া দ্বীপের আসল রূপ দেখতে পাবেন।"

অদিতি কোনো ভনিতা ছাড়াই রাজি হয়ে গেল। যেন এই ডাকটার অপেক্ষাতেই ছিল সে।

দুইজনে সাইকেল নিয়ে চলল দক্ষিণ সৈকত ধরে। সেন্ট মার্টিনের এই অংশটা অদ্ভুত নির্জন। নারকেল বীথির ছায়া পেরিয়ে যখন তারা কোরাল বিচ দিয়ে এগোচ্ছিল, নির্বাণ একের পর এক প্রবালের গল্প শোনাচ্ছিল।

"জানেন অদিতি, প্রবাল কিন্তু পাথর নয়। এরা জীবন্ত প্রাণী। একেকটা পলিপ হাজার বছর ধরে ক্যালসিয়াম কার্বনেট ক্ষরণ করে এই সুবিশাল প্রাচীর গড়ে তোলে। অথচ একটা মোটরচালিত নৌকার নোঙর কিংবা পর্যটকের একটা অসাবধান পায়ের চাপ কয়েক সেকেন্ডে ভেঙে দেয় শতবর্ষের সাধনা।"

অদিতি নির্বাণের কথা শুনছিল। মানুষটা যখন কথা বলে, তার কণ্ঠের ভেতরে যেন সমুদ্রের সুর বাজে। কোনো অহংকার নেই, কোনো পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের তাড়া নেই; আছে কেবল নিঃশর্ত ভালোবাসা।

"আপনি একা একা এত বড় দ্বীপে থাকেন? একঘেয়ে লাগে না?" অদিতি জিজ্ঞেস করল।

নির্বাণ সাইকেলের প্যাডেল থামাল। ছেঁড়াদ্বীপের সংযোগস্থলে এসে তারা দাঁড়িয়েছে। সামনে কাচের মতো স্বচ্ছ সবুজ জল, যার নিচে রঙিন মাছ আর জীবন্ত কোরাল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

"একাকিত্বের চেয়ে বড় শিক্ষক আর কেউ নেই অদিতি," নির্বাণ সমুদ্রের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বলল, "শহরের ভিড়ে আমরা সবাই একেকটা মুখোশ পরে ঘুরি। সেখানে সম্পর্কগুলো লেনদেনের, আবেগগুলো সাজানো। এখানে সাগর আমাকে শিখিয়েছে—দিতে হয় নিঃস্বার্থভাবে। সাগর তো মেঘকে জল দেয়, কিন্তু কোনোদিন মেঘের কাছে প্রতিদান চায় না।"

অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিজের ভেতরের না-বলা দীর্ঘশ্বাসটা বাতাসে ভাসিয়ে দিল, "আর যদি সেই দিতে দিতে নিজের সবটুকু ফুরিয়ে যায়?" নির্বাণ অদিতির চোখের দিকে তাকাল। প্রখর রোদেও অদিতির চোখ দুটোতে যেন শ্রাবণের মেঘ জমে ছিল। নির্বাণ তার অভিজ্ঞতায় মানুষের ভেতরের ভাঙচুর পড়তে জানে।

"যা ফুরিয়ে যায়, তা হয়তো খাঁটি ছিল না," নির্বাণ খুব শান্ত সুরে বলল, "অথবা যার কাছে দিয়েছেন, সে তার মূল্য জানত না। দরদী হতে গেলে বুকের পাটা লাগে অদিতি। আঘাত পাওয়ার ভয় পেলে তো আর বুক পেতে ভালোবাসা যায় না।"

‘দরদী’ শব্দটা অদিতির মনের গভীরতম কোনো তারে গিয়ে আঘাত করল। তার প্রাক্তন বাগদত্তা, যে একটি সফল ক্যারিয়ার আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার লোভে তাকে পেছনে ফেলে লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছিল, সে কোনোদিন অদিতির এই নিঃস্বার্থ সেবাকে সম্মান জানাতে পারেনি। সে বলত, "তুমি বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ, প্র্যাকটিক্যাল নও।" আজ এই প্রত্যন্ত প্রবাল দ্বীপে দাঁড়িয়ে এক সম্পূর্ণ অপরিচিত যুবকের মুখে সেই আবেগের স্বীকৃতি পেয়ে অদিতির চোখ ভিজে উঠতে চাইল। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল সাগরের দিকে, পাছে নির্বাণ তার দুর্বলতা দেখে ফেলে।

কিন্তু নির্বাণ দেখেও না দেখার ভান করল। সে শুধু ব্যাগ থেকে ডাব বের করে একটা নারকেলের মালায় ঢেলে অদিতির হাতে তুলে দিল। সেই ঠাণ্ডা জলের মিষ্টি স্বাদে অদিতির বুক জুড়িয়ে গেল।

পরের চারটে দিন যেন এক ঘোরের মধ্য দিয়ে কেটে গেল। সেন্ট মার্টিনের প্রতিটি কোণা অদিতির কাছে রূপকথার মতো মনে হতে লাগল নির্বাণের উপস্থিতিতে। নির্বাণ তাকে নিয়ে গিয়েছিল দ্বীপের স্থানীয় পল্লীতে। সেখানে জেলেদের ভাঙা নৌকার গলুইতে বসে তারা বৃদ্ধ মাঝিদের রূপকথা শুনল। দেখল কীভাবে নির্বাণ স্থানীয় স্কুলের শিশুদের ডেকে এনে প্লাস্টিক কুড়ানোর খেলা শেখায়। যে শিশু সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক সৈকত থেকে কুড়িয়ে আনবে, তাকে সে বই উপহার দেয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নির্বাণকে ঘিরে ধরে বলে—"বড় ভাই, আইজক্যা আমনের লগে সাগরে যামু!"

অদিতি অবাক হয়ে দেখল, এই মানুষটা শুধু সমুদ্রের নয়, এই মাটির প্রতিটি মানুষের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছে। একদিন বিকেলে তারা দ্বীপের পূর্ব সৈকতে বসেছিল। আকাশ জুড়ে মেঘের খেলা। কালবৈশাখীর আগের মতো একটা গুমোট আবহাওয়া। হঠাৎ করেই বাতাস এলোমেলো হয়ে বইতে শুরু করল।

"ঝড় আসছে," নির্বাণ আকাশের রঙ দেখে বলল, "চলুন, ফিরতে হবে।"

কিন্তু ফেরার আগেই আকাশ ভেঙে নামল বৃষ্টি। সেন্ট মার্টিনের বৃষ্টি এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। সাগরের নোনা জলের ওপর যখন আকাশের মিষ্টি জল ঝরে পড়ে, তখন দূর দিগন্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। গর্জন করতে থাকা ঢেউগুলোর মাথা বৃষ্টির ফোঁটায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে এক মায়াবী কুয়াশা তৈরি করে।

তারা আশ্রয় নিল সৈকতের ধারের একটি পরিত্যক্ত কাঠের মাচায়। গোলপাতার ছাউনি থাকলেও চারপাশ দিয়ে ছাঁট আসছিল। অদিতি শীতে কাঁপছিল। তার ভেজা কুর্তি শরীরে লেপ্টে গেছে, চশমার কাচ ভিজে অস্পষ্ট। নির্বাণ নিজের পরনের সুতির চাদরটা খুলে অদিতির কাঁধের ওপর মেলে দিল। তার হাতের স্পর্শ লেগে গেল অদিতির খোলা গলায়। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল অদিতি। সেই স্পর্শে কামনার কোনো দাগ ছিল না, ছিল নিখাদ যত্ন আর সুরক্ষা। নির্বাণ নিজের শরীরের উষ্ণতা দিয়ে আড়াল করে দাঁড়াল, যাতে বৃষ্টির ছাঁট অদিতির গায়ে না লাগে।

ঝড়ের গর্জনে চারপাশ যখন কাঁপছে, অদিতি নির্বাণের মুখের খুব কাছে ছিল। সে দেখতে পাচ্ছিল নির্বাণের চোখের মণি গাঢ় বাদামি, যার ভেতর এক অদ্ভুত আশ্রয় লুকিয়ে আছে।

"আপনি এমন কেন, নির্বাণ?" অদিতির কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের মধ্যেও স্পষ্ট শোনাল।

"কেমন?" নির্বাণ হাসল, তার ঠোঁটের কোণে বৃষ্টির জল।

"এত মায়া কেন আপনার? এই পাথর, এই কচ্ছপ, এই দ্বীপ, মানুষ... সবার জন্য এত দরদ আপনি কোথায় পেলেন? কেউ কি আপনাকে কষ্ট দেয়নি কখনো?"

নির্বাণের হাসির রেখাটা একটু ম্লান হয়ে গেল। সে আকাশের দিকে তাকাল। বৃষ্টির জল তার মুখ ধুয়ে দিচ্ছিল।

"দিয়েছিল," নির্বাণ শান্ত কণ্ঠে বলল, "আমার মা যখন ক্যান্সারে মারা যান, তখন আমি মেডিকেলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। টাকার অভাবে, সঠিক যত্নের অভাবে আমি তাঁকে বাঁচাতে পারিনি। সেদিন বুঝেছিলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব সম্পদের নয়, দরদের। সবাই বিচার করতে আসে, দখল করতে আসে, আগলে রাখতে কেউ আসে না। তারপর থেকে আমি ঠিক করলাম, আমি মালিক হব না, আমি পাহারাদার হব। যে ভালোবাসায় কোনো দাবি নেই, সেই ভালোবাসাই চিরন্তন।"

অদিতির বুক ভেঙে কান্না উঠে এল। নিজের ব্যর্থ প্রেমের জন্য সে এতকাল যে ক্ষোভ বুকে পুষে রেখেছিল, তা নির্বাণের এই ত্যাগের তুলনায় কত ক্ষুদ্র! সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক পা এগিয়ে এসে নির্বাণের বুকের মধ্যে মাথা রাখল।

নির্বাণ স্তব্ধ হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তার হাত দুটো বাতাসে জমে রইল। কিন্তু পরক্ষণেই, এক গভীর মমতায় সে অদিতিকে জড়িয়ে ধরল। বৃষ্টির ধারাপাত, সাগরের উদ্দাম ঢেউ আর প্রবাল প্রাচীরের আদিম গন্ধের মাঝে দুটি নিঃসঙ্গ আত্মা এক হয়ে গেল। কোনো প্রতিশ্রুতির কথা হলো না, কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ছক কাটা হলো না; কেবল বর্তমানের এই পবিত্র মুহূর্তে তারা অনুভব করল—ভালোবাসা মানে কোনো পিছুটান নয়, ভালোবাসা হলো একজনের নিঃশ্বাসে অন্যজনের প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া।

ঝড় থেমে যাওয়ার পর সেন্ট মার্টিন যেন স্নান সেরে নতুন রূপ নিল। আকাশে ধোয়া চাঁদের আলো। প্রবালের বুকে জমে থাকা বৃষ্টির জল মুক্তোর মতো চকচক করছিল। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম বড় নির্মম। জোয়ারের পরেই যেমন ভাটা আসে, মিলনের পরেই তেমনি বিচ্ছেদের ঘণ্টাধ্বনি বাজে। অদিতির ছুটির মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। পরদিন দুপুরেই তাকে ফেরার জাহাজে উঠতে হবে।

সে রাতে ঘুম হলো না কারও। মধ্যরাতে কটেজ থেকে বেরিয়ে অদিতি সৈকতে গিয়ে দেখল, নির্বাণ বালির ওপর একা বসে আছে। তার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ছে ফসফরাস মেশানো উজ্জ্বল ঢেউ। সমুদ্রের ভাষায় একে বলে ‘বায়োলুমিনেসেন্স’। মনে হচ্ছে যেন জল নয়, নীলাভ আলো খেলা করছে বালির ওপর। অদিতি গিয়ে নিঃশব্দে তার পাশে বসল। নির্বাণ কোনো কথা বলল না, শুধু তার ডান হাতটা নিজের মুঠোয় তুলে নিল। নির্বাণের হাতের তালু খসখসে, কিন্তু সেই স্পর্শে এক অসীম নির্ভরতা।

"কাল চলে যাবেন?" নির্বাণ জিজ্ঞেস করল।

"যেতেই হবে। আমার রোগীরা অপেক্ষা করছে।"

"হুম। ব্যথা কমানোর কাজ তো ফেলে রাখা যায় না।" নির্বাণ আলতো হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে গভীর বিষাদ লুকানো ছিল।

"তুমি আমাকে থাকতে বলবে না, নির্বাণ?" অদিতি প্রথমবার ‘তুমি’ করে সম্বোধন করল। তার কণ্ঠে অনুনয়, এক শেষ আকুলতা। নির্বাণ সাগরের দিকে তাকাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "আমি যদি বলি থেকে যাও, তবে সেটা হবে আমার স্বার্থপরতা অদিতি। তোমার জগৎ বিশাল। হাজার হাজার মানুষ তোমার অপেক্ষায় থাকে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য। আর আমি? আমি তো এই বালুচর, এই পাথরের সঙ্গে বাঁধা পড়ে গেছি। আমি নদীর মোহনার মতো, যেখানে এসে জল মেশে, কিন্তু নদীকে আবার সাগরে ফিরতেই হয়।"

"কিন্তু আমি যে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারছি না! এই চার দিনে তুমি আমার পুরো অস্তিত্ব বদলে দিয়েছ। আমি কীভাবে সেই যান্ত্রিক হাসপাতালে ফিরে যাব?" অদিতির চোখের জল নির্বাণের হাতের ওপর ঝরে পড়ল।

নির্বাণ তার অন্য হাত দিয়ে অদিতির চিবুক তুলে ধরল। তার চোখের দিকে গভীর আবেগে তাকিয়ে বলল, "দূরত্ব দিয়ে কি ভালোবাসা মাপা যায়, অদিতি? সেন্ট মার্টিন তো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক টুকরো মাটি, কিন্তু সাগরের তলদেশ দিয়ে কি সে বাংলার মাটির সাথে যুক্ত নয়? তুমি যখন কোনো রোগীর মাথায় হাত বুলিয়ে তার ব্যথা কমাবে, জানবে সেই হাতের ভেতর আমার ছোঁয়া আছে। তুমি যখন কোনো সংকটে ক্লান্ত হয়ে পড়বে, চোখ বন্ধ করে সেন্ট মার্টিনের এই বাতাসের শব্দ শুনবে। আমি সবসময় তোমার সঙ্গেই থাকব, দরদী হয়ে।"

অদিতি নির্বাণের বুকে মুখ লুকাল। চাঁদের আলোয়, সাগরের নীল দ্যুতির মাঝে তাদের ঠোঁট একে অপরকে খুঁজে নিল। প্রথম এবং হয়তো শেষবারের মতো এক অমলিন, পবিত্র চুম্বনে তারা নিজেদের অস্তিত্বকে চিরতরে একে অপরের নামে লিখে দিল। সেখানে কোনো দাবি ছিল না, কোনো শর্ত ছিল না; ছিল কেবল মহাকালের পাতায় এক অমর অনুভূতির স্বাক্ষর।

পরদিন দুপুর বারোটা।

জেটিঘাটে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। পর্যটকদের কোলাহল, লাগেজ টানাটানি, জাহাজের সাইরেন। বাস্তব পৃথিবী তার সমস্ত কর্কশতা নিয়ে আবার ফিরে এসেছে। অদিতি জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ছোট কাচের বোতল। সকালে কটেজ ছাড়ার সময় নির্বাণ এটি তার হাতে দিয়ে বলেছিল—"এতে ছেঁড়াদ্বীপের সাদা বালি আর সামান্য সমুদ্রের জল আছে। যখনই মন খারাপ হবে, এটা দেখবে। মনে করবে, পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও তোমার একজন আপন মানুষ আছে।"

জাহাজ ভেঁপু বাজিয়ে ধীরে ধীরে জেটিঘাট ছেড়ে দিল। জল কেটে জাহাজ এগোচ্ছে উত্তর দিকে।

অদিতি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দূরে সৈকতের দিকে তাকাল।

জেটিঘাটের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, সেই চুনকাম করা ছাইরঙা প্রবাল পাথরের ওপর একা দাঁড়িয়ে আছে একটা অবয়ব। গায়ে সেই হালকা নীল রঙের সুতির শার্ট। বাতাস তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে হাত নাড়ছে না, কোনো নাটকীয় বিদায় জানাচ্ছে না; কেবল পাথরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে জাহাজের দিকে।

অদিতি চোখের জল মুছল না। সে আজ আর পরাজিত নয়। তার বুক আজ শূন্য নয়, বরং ভালোবাসার পূর্ণতায় ভরপুর। সে চশমাটা খুলে আঁচল দিয়ে মুছল। জাহাজ যত দূরে যাচ্ছে, সেন্ট মার্টিন তত ছোট হয়ে আসছে। নারকেল গাছের সবুজ রেখাটা একসময় বিলীন হয়ে গেল দিগন্তে। কিন্তু অদিতির অন্তরে তখন জেগে উঠেছে এক নতুন দ্বীপ—যেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো স্বার্থপরতা নেই; কেবল একজন দরদীর নিঃশব্দ, অতন্দ্র পাহারা।

অদিতি কাচের বোতলটা বুকের কাছে চেপে ধরল। সে জানে, এই জীবনে সে যেখানেই যাক, যে অন্ধকারের মুখোমুখিই হোক না কেন, বঙ্গোপসাগরের নীল জলের ওপারে তার জন্য একটি প্রদীপ চিরকাল জ্বলবে। প্রেম তো পাওয়ার নাম নয়, প্রেম হলো নিজের অস্তিত্বের শ্রেষ্ঠ অংশটুকু দিয়ে অন্যজনকে ভালোবেসে যাওয়ার নাম। সেই প্রেমের নাম. দরদ।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login