Travel

ঘুরে এলাম কক্সবাজার

October 21, 2026

18 views

রাজধানী ঢাকা যেন এক অদ্ভুত জাদুকরী খাঁচা। এখানে ঘড়ির কাঁটা কারো জন্য থেমে থাকে না। সকালের অ্যালার্মের ভোঁতা চিৎকার থেকে শুরু করে অফিসের ফাইলের স্তূপ, ক্লায়েন্টের টানাটানি, ট্রাফিকের দীর্ঘ কালো অজগর আর ইট-কাঠের ধুসরতায় কখন যে মাস ঘুরে বছর হয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারের সবার মুখেই এক নিঃশব্দ ক্লান্তি জমেছিল। মেয়েটার স্কুলের পড়ার টেবিলে ঝুঁকে থাকা মুখ, গিন্নির একঘেয়ে রান্নাঘর আর আমার কপালে জমে থাকা প্রজেক্ট ডেডলাইনের ভাঁজ, সব মিলিয়ে যেন একটা মুক্ত বাতাসের জন্য হাহাকার চলছিল। ঠিক তখনই মাথায় এলো, এবার আর কোনো অজুহাত নয়, এবার নীল জলরাশির দেশে পাড়ি জমাতেই হবে। আর গন্তব্য যদি হয় পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, তবে মনের ভেতর আগে থেকেই ঢেউ ভাঙার গর্জন শুরু হয়ে যায়।

কিন্তু ভ্রমণের স্বপ্ন দেখা যত সহজ, টিকিট পাওয়ার যুদ্ধটা ঠিক ততটাই রোমহর্ষক। রেলে সরাসরি কক্সবাজার যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের আগে ছিল না। ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ আর ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ চালু হওয়ার পর থেকেই রেলে ভ্রমণের ঝোঁক বেড়েছে সবার। কিন্তু অনলাইনে টিকিট কাটার সেই যুদ্ধ যেন যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সকাল আটটায় রেলওয়ের অ্যাপ আর ওয়েবসাইটে আঙুল ঠুকে বসে থাকা, সার্ভার লোডিংয়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সব টিকিট ‘জিরো’ হয়ে যাওয়া, এ এক পরিচিত মানসিক ট্রমা। প্রথম দুই দিন ব্যর্থ হয়ে যখন আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, তৃতীয় দিন সকালের শেষ লগ্নে বহু সাধ্য-সাধনা ও চোখের পলক না ফেলে রিফ্রেশ মেরে অবশেষে চারখানা শোভন চেয়ার কনফার্ম করতে পারলাম। মোবাইল স্ক্রিনে টিকিটের পিডিএফ ভেসে উঠতেই মনে হলো যেন কোনো বিশ্বজয়ের পদক হাতে পেলাম!

যাত্রার দিন রাতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে যখন পৌঁছালাম, তখন ঘড়িতে রাত দশটা। রাতের কমলাপুর এক অন্য রূপ ধারণ করে। লাল ইটের বিশাল গম্বুজের নিচে কুলিদের হাঁকডাক, দূরপাল্লার যাত্রীদের ব্যাগের খটখট শব্দ আর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের ইঞ্জিনের মৃদু হিসহিস আওয়াজ, সবকিছুতেই যেন এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণের গন্ধ। মেয়েটার চোখের ঘুম ততক্ষণে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। তার ছোট পিঠের ব্যাগটা নিয়ে সে নিজেই প্ল্যাটফর্মের ওপর তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাগল।

ট্রেন যখন ঠিক সময়ে তার হুইসেল বাজিয়ে ধীরে ধীরে ঢাকার প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে অন্ধকার চিরে দক্ষিণ-পূর্ব পানে ছুটতে শুরু করল, তখন জানালার কাচে মাথা ঠেকিয়ে মনে হলো, ধুলোমাখা ব্যস্ত শহর, তোমাকে কিছুদিনের জন্য ছুটি দিয়ে আমরা চলেছি অনন্ত নীলের আহ্বানে। ট্রেনের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে রাতের অন্ধকার কেটে যেতে লাগল। কুমিল্লা, ফেনী পার হয়ে ট্রেন যখন ভোরের আলোয় চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ি বাঁকগুলোতে ঢুকছিল, তখন ভোরের নরম রোদ এসে পড়ল জানালার কাচে। দোহাজারী পেরিয়ে নতুন তৈরি রেললাইন দিয়ে পাহাড় আর বনের বুক চিরে যখন ট্রেনটি এগোচ্ছিল, সেই দৃশ্য যে কাউকেই মন্ত্রমুগ্ধ করতে বাধ্য।

সকাল সাড়ে সাতটায় ট্রেন যখন আইকনিক শামুক আকৃতির কক্সবাজার ঝিনুক রেলওয়ে স্টেশনে এসে থামল, তখন চারপাশের স্থাপত্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক প্ল্যাটফর্ম, পরিচ্ছন্ন চত্বর আর সাগরের হাওয়া, সব মিলিয়ে শুরুতেই ক্লান্তি উধাও। স্টেশন থেকে বের হতেই স্থানীয় সিএনজি আর অটোরিকশাচালকদের একচোট হাঁকডাক সামলে আমরা একটা রিজার্ভ সিএনজি নিয়ে সোজা রওনা হলাম কলাতলী বিচ সংলগ্ন হোটেলের উদ্দেশ্যে।

হোটেলে পৌঁছাতেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক চিলতে শান্তির ছোঁয়া। রুমের জানালার পর্দা সরাতেই দূর সাগরের রূপালী জলরেখা চোখে পড়ল। ভ্রমণক্লান্তি দূর করতে এক পশলা হালকা গরম পানির গোসল আর নাশতায় গরম পরোটা, ডিম ভাজি আর ঘন ডালের তৃপ্তি নিয়ে আমরা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না। সময় কম, অথচ সৈকতের রূপ দেখার লোভ অগাধ।

প্রথমেই পা রাখলাম আমাদের হোটেলের সবচেয়ে কাছের সৈকত,কলাতলী বিচ-এ। দুপুরের আগেই সাগরের রোদ বেশ চড়া হতে শুরু করেছে। সৈকতের বালুতে পা রাখতেই ভেজা নোনা মাটির নরম স্পর্শ যেন পা ছুঁয়ে গেল। দূর থেকে ভেসে আসা গর্জন কানে আসতেই মেয়েটা আমার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল , একপাশে ভয়, অন্যপাশে সীমাহীন বিস্ময়। এই প্রথম সে এত বিশাল জলরাশি দেখছে, যেখানে চোখ মেললে কোনো বাড়িঘর নেই, কোনো দেয়াল নেই, কেবল আকাশ আর জলের অনন্ত মিতালী।

কলাতলী সৈকত সবসময়ই কিছুটা জমজমাট ও কোলাহলপূর্ণ। এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি, বিচ বাইকের ভোঁ-ভোঁ শব্দ আর ঘোড়সওয়ারদের হাঁকডাক। তবে সমুদ্রের আসল সৌন্দর্য তো মানুষের কোলাহলের ভেতর দিয়েও নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। বিশাল এক ঢেউ এসে যখন গোড়ালির ওপর দিয়ে ভেঙে পড়ল, তখন এক তীব্র নোনা ঠান্ডায় সারা শরীর শিউরে উঠল। গিন্নি প্রথমে শাড়ির কুঁচি বাঁচাতে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সমুদ্রের ঢেউয়ের এমন এক মায়া আছে,যে একবার গোড়ালি ভেজায়, সে নিজেকে আর শুকনো ডাঙায় আটকে রাখতে পারে না। দেখতে দেখতে আমরা সবাই সাগরের নোনা জলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করে, বালুর ভেতর পা ডুবিয়ে ভেসে থাকার সেই আনন্দ কোনো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল, কারও কোনো খেয়াল রইল না। পেট যখন জানান দিতে লাগল যে দুপুরের সময় পার হয়ে গেছে, তখন আমরা একরকম বাধ্য হয়েই জল থেকে ডাঙায় উঠলাম।

দুপুরের খাবারের জন্য চলে গেলাম সুগন্ধা পয়েন্টের কাছে এক নামকরা স্থানীয় রেস্তোরাঁয়। কক্সবাজারে এসে সামুদ্রিক মাছের স্বাদ না নিলে তো ভ্রমণই অপূর্ণ থেকে যায়। সাদা গরম ভাতের সাথে রূপচাঁদা ফ্রাই, লইট্টা শুঁটকির ভুনা, রূপালী কোরাল মাছের ঝাল তরকারি আর ঘন মসুর ডাল। ক্ষিধের পেটে সেই খাবারের স্বাদ যেন অমৃতের মতো লাগল। বিশেষ করে কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে কড়া ভাজা মুচমুচে লইট্টা ফ্রাইয়ের স্বাদ অনেকদিন মুখে লেগে থাকার মতো।

খাওয়া-দাওয়া সেরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে বিকেলের নরম রোদে পা বাড়ালাম সুগন্ধা বিচ-এর দিকে। সুগন্ধা বিচ হলো কক্সবাজারের সবচেয়ে প্রাণবন্ত আর বাণিজ্যিক কেন্দ্র। চারদিকে নানা রঙের বিচ ছাতা পাতা, পর্যটকদের আড্ডা আর ক্যামেরাম্যানদের হাঁকডাক,"স্যার, একশো ছবি মাত্র দুইশো টাকা!" এখানে এসে ডাবওয়ালার কাছ থেকে মিষ্টি ডাবের পানিতে চুমুক দিতে দিতে আমরা সৈকতের রঙিন পরিবেশ উপভোগ করতে লাগলাম।

বিকেল যখন গোধূলির রূপ নিল, তখন সুগন্ধার বালুকাবেলায় শুরু হলো প্রকৃতির এক মহাকাব্যিক রঙের খেলা। পশ্চিমের দিগন্তে আকাশটা ধীরে ধীরে সোনালি থেকে গাঢ় কমলা, তারপর সিঁদুরে লাল রঙে রূপ নিল। সূর্যটা যখন ধীরে ধীরে সাগরের কালো জলের ভেতর ডুব দিতে লাগল, তখন পুরো সৈকত যেন এক নিস্তব্ধ মায়ায় থমকে গেল। হাজার হাজার পর্যটক সাগরের কিনারায় দাঁড়িয়ে সেই রূপ দেখছিল। সাগরের জলে তখন সূর্যের রক্তিম আলোর ঝিলিক। এই সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে মনে হলো,জীবনের যত ক্লান্তি, যত হিসাব-নিকাশ, এই বিশাল পৃথিবীর সামনে তা কত ক্ষুদ্র!

সন্ধ্যা নামতেই সুগন্ধা পয়েন্টের পেছনের মার্কেটগুলো জেগে উঠল রঙিন আলোর বন্যায়। বার্মিজ মার্কেটগুলোতে শামুক-ঝিনুকের তৈরি গৃহসজ্জার সামগ্রী, আচার, শুকনো ফল আর বার্মিজ চাদরের দোকানে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। গিন্নি আর মেয়ে ঝিনুকের তৈরি গয়না আর আচার কেনার জন্য দোকানে দোকানে ঢুঁ মারতে লাগল, আর আমি উপভোগ করছিলাম স্থানীয় মানুষের ব্যস্ততা আর চরের বাতাসে মিশে থাকা ভাজা শুঁটকি ও সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউয়ের ঝাঁঝালো সুবাস।

ভ্রমণে এসে অলস ঘুম দিয়ে সকাল নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তাই দ্বিতীয় দিন ঘড়ির কাঁটা ভোর সাড়ে পাঁচটা ছোঁয়ার আগেই সবাইকে ঘুম থেকে টেনে তুললাম। সকালের সাগর এক অন্যরকম শান্ত, স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসে।

আমরা চলে গেলাম কক্সবাজারের প্রাচীনতম এবং ঐতিহ্যবাহী সৈকত লাবনী পয়েন্ট-এ। ভোরের লাবনী বিচে পর্যটকদের ভিড় একেবারেই কম থাকে। কেবল কিছু শরীরচর্চাকারী প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন, আর সাগরের কিনারায় জাল গুটিয়ে আনছেন স্থানীয় জেলেরা। ভোরের মিষ্টি বাতাসে যখন সৈকতে পা রাখলাম, তখন এক অপার্থিব প্রশান্তি চারপাশকে ঘিরে রেখেছিল। আমরা জেলেদের জাল টানার দৃশ্য দেখতে দেখতে দাঁড়িয়ে রইলাম। রূপালী ইলিশ, ছোট পোয়া আর নাম না জানা সামুদ্রিক মাছ লাফাচ্ছে জালের ভেতর। মেয়েটা পরম বিস্ময়ে বালুর ওপর হেঁটে চলা ছোট ছোট সাগর-পোকা আর শামুক কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সকালের জোয়ারের জল তখন ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে, রেখে যাচ্ছে মসৃণ, কাচের মতো চকচকে ভেজা বালুকারাশি। সেই বালুর ওপর ভোরের সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী আলো তৈরি করছিল। লাবনী বিচের পুরোনো ঝাউবনের ছায়ায় বসে সকালের চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার অনুভূতিটা ছিল এই সফরের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি।

সকালের নাশতা শেষ করেই শুরু হলো আমাদের সফরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত রোমাঞ্চ,মেরিন ড্রাইভ রোড ধরে এক উন্মুক্ত চাঁদের গাড়ি (খোলা জিপ) নিয়ে যাত্রা।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত এই আশি কিলোমিটারের মেরিন ড্রাইভ রোড যেন পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর এক ক্যানভাস। যার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়ের সারি, আর অন্যপাশে গর্জন করে বয়ে চলেছে নীল বঙ্গোপসাগর। আমাদের খোলা চাঁদের গাড়ি যখন সমুদ্রের হাওয়া চিরে গর্জন করে চলতে শুরু করল, তখন বাতাসের ঝাপটায় চুল এলোমেলো হয়ে গেল, বুক ভরে এলো পাহাড়ি পাতার সুবাস আর নোনা জলের সুগন্ধে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে নেমে আসা ছোট ছোট ঝরনা আর সাগরের ঢেউয়ের এই সহাবস্থান দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছালাম হিমছড়ি।

হিমছড়িতে গাড়ি থামিয়ে আমরা টিকিট কেটে পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম পাহাড়ের চূড়ার দিকে। প্রায় আড়াইশো খাড়া সিঁড়ি ভেঙে যখন চূড়ায় পৌঁছালাম, তখন ক্লান্তি যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। সেখান থেকে নিচের দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। দিগন্তজোড়া নীলের মেলা, সাগরের তীরে আছড়ে পড়া সাদা ফেনার রেখা আর ছোট ছোট বিন্দুর মতো ছুটে চলা কাঠের ট্রলার। উপর থেকে মেরিন ড্রাইভ রোডটাকে মনে হচ্ছিল যেন পাহাড় আর সাগরের মধ্যবর্তী এক সরু কালো ফিতা। হিমছড়ি থেকে আরও সামনে এগোতেই আমরা এসে পৌঁছালাম এক নির্জন, মায়াবী সৈকতে,যার নাম কাঁকড়া বিচ (Crab Beach)।

এখানে এসে আমরা সত্যিই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কলাতলী বা সুগন্ধার কোনো কোলাহল এখানে নেই। যতদূর চোখ যায়, ধূসর বালুর ওপর যেন লাল রঙের এক বিশাল গালিচা পাতা রয়েছে! কাছে গিয়ে দেখা গেল, সেগুলো কোনো ফুল বা পাথর নয়,লক্ষ লক্ষ লাল কাঁকড়ার (Red Ghost Crab) দল! তারা বালুর ভেতর থেকে মাথা বের করে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষের পায়ের আওয়াজ বা সামান্য ছায়া পড়লেই তারা এক নিমেষে বালুর সুড়ঙ্গে ঢুকে উধাও হয়ে যায়, আবার নিস্তব্ধতা ফিরে এলে ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে আসে। মেয়েটা হাততালি দিয়ে সেই কাঁকড়াদের লুকোচুরি খেলা দেখতে লাগল। প্রকৃতির এমন নিখুঁত ও অদ্ভুত কারুকাজ শহরের চার দেয়ালে বসে কল্পনাও করা যায় না।

কাঁকড়া বিচের মুগ্ধতা বুকে নিয়ে আমাদের চাঁদের গাড়ি আবার ছুটে চলল আরও দক্ষিণে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা এসে পৌঁছালাম বিখ্যাত ইনানী বিচ-এ। ইনানী সৈকতের চরিত্র কক্সবাজারের অন্য সৈকতগুলো থেকে একদম আলাদা। এখানে বালুর পাশাপাশি রয়েছে সেন্টমার্টিনের মতো প্রাচীন প্রবালের বিস্তার। সাগরের কিনারায় স্তূপ হয়ে পড়ে আছে ধারালো ও মসৃণ প্রবাল পাথর। জোয়ারের সময় এই পাথরগুলো জলের নিচে ডুবে থাকে, আর ভাটার সময় জেগে ওঠে তাদের রুক্ষ, প্রাচীন রূপ নিয়ে।

ইনানীর জল যেন শহরের বিচের চেয়েও অনেক বেশি স্বচ্ছ ও গাঢ় নীল। এখানে ঢেউগুলো যখন এসে প্রবাল পাথরের গায়ে সজোরে আছড়ে পড়ে, তখন ফেনিল জলরাশি বাতাসে দুধসাদা কুয়াশার মতো ছড়িয়ে যায়। আমরা জুতো খুলে সাবধানে পাথরের ওপর পা ফেলে ফেলে এগোতে লাগলাম। পাথরের খাঁজে খাঁজে ছোট ছোট গর্তে আটকে থাকা স্বচ্ছ জলে কিলবিল করছে ছোট্ট রঙিন মাছ আর শ্যাওলা।

প্রবালের ওপর বসে সাগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের ঝাপটা খাওয়ার রোমাঞ্চই আলাদা। এখানে এসে আমরা স্থানীয় রূপচাঁদা আর কোরাল মাছের বারবিকিউয়ের অর্ডার দিলাম সৈকতের এক ছাতার নিচে। খোলা আকাশের নিচে সাগরের গর্জন শুনতে শুনতে গরম কয়লায় ঝলসানো মসলাদার মাছের স্বাদ নেওয়ার স্মৃতি কোনোদিন ভোলার নয়। ইনানী ছাড়িয়ে আমরা আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলাম পাটুয়ারটেক বিচ-এর দিকে।

পাটুয়ারটেককে বলা যায় মেরিন ড্রাইভের এক গোপন রত্ন। এখানকার সৈকতে পাথরের বিস্তার আরও বেশি, আর তার সাথে যোগ হয়েছে সৈকত ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সুপারি বাগান আর ঝাউবনের নিবিড় ছায়া। এখানে সাগরের রূপ যেন আরও গম্ভীর, আরও বুনো। ভাটার সময় সাগরের বুকে জেগে ওঠা বিশাল প্রবাল স্ল্যাবের ওপর দাঁড়িয়ে যখন আমরা ছবি তুলছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল কোনো এক দূর অচিন দ্বীপে এসে পৌঁছেছি।

বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামার সময় হলো, তখন আমাদের চাঁদের গাড়ি আবার ফিরে চলল শহরের দিকে। ফেরার পথে গোধূলির আলোয় মেরিন ড্রাইভের রূপ যেন আরও রূপকথার মতো হয়ে উঠেছিল। একপাশে পাহাড়ের গায়ে জ্বলে ওঠা জোনাকির মতো পাহাড়ি গ্রামের বাতি, আর অন্যপাশে চাঁদের ম্লান আলোয় সাগরের জলে রূপালী চাদর। গাড়ির খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা হাওয়া খেতে খেতে আমরা সবাই যেন কিছুক্ষণের জন্য বোবা হয়ে গিয়েছিলাম,প্রকৃতির এই রূপের সামনে মানুষের সব ভাষাই যেন বড্ড অর্থহীন।

ভ্রমণের শেষ দিনটি সবসময়ই এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আসে। একদিকে ঘরে ফেরার তাগিদ, অন্যদিকে ফেলে যাওয়ার এক তীব্র মনখারাপ। মনে হয়, মাত্র তো এলাম, আর এখনই শেষ হয়ে গেল? তৃতীয় দিন সকালে আমরা ঠিক করলাম কোনো দীর্ঘ সফরে যাব না। সকালটা কাটাব কক্সবাজার শহরের ভেতরের কিছু স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি দেখে। নাশতা সেরেই আমরা একটি অটো নিয়ে চলে গেলাম রামু উপজেলার দিকে, দেখার উদ্দেশ্যে শতবর্ষী বৌদ্ধ বিহার আর কাঠের তৈরি অপূর্ব প্যাগোডা। রামুর শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ এবং শান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকা বিশালাকার বুদ্ধমূর্তি আমাদের মনকে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শান্তিতে ভরিয়ে দিল। পাহাড়ি জনপদের এই সম্প্রীতি আর কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ সত্যিই দেখার মতো।

দুপুরে শহরে ফিরে আমরা গেলাম স্থানীয় রাখাইন পাড়ায়। কাঠের দোতলা বাড়িগুলোর নিচে তাঁত বোনার দৃশ্য আর রাখাইন নারীদের নিপুণ হাতে তৈরি চাদর ও থামি দেখা এক দারুণ অভিজ্ঞতা। সেখান থেকে আমরা সোজা চলে গেলাম বড় বাজারে,শহরের মূল শুঁটকি মার্কেটে।

কক্সবাজারে এসে শুঁটকি না কিনে বাড়ি ফেরা যেন এক সামাজিক অপরাধ! বাজারের গলিতে ঢুকতেই শুঁটকির তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে নাক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো বটে, তবে স্বাদের সন্ধানে সেই গন্ধকে খুব একটা পাত্তা দিলাম না। রূপচাঁদা, লইট্টা, ছুরি, চ্যাপা আর কাঁচকি শুঁটকির দোকানগুলোতে শুরু হলো দরাদরি। গিন্নি তার সমস্ত দরদামের দক্ষতা খাটিয়ে ভালো মানের ছুরি আর লইট্টা শুঁটকি কিনে ব্যাগে পুরলেন। সাথে কেনা হলো স্থানীয় পাহাড়ি কলা আর তাজা সামুদ্রিক মাছের ফ্রোজেন প্যাক।

দুপুরের খাবারের জন্য আমরা এবার বেছে নিলাম শহরের এক পুরোনো ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ, যেখানে পাওয়া যায় খাঁটি সামুদ্রিক স্বাদের কাচ্চি বিরিয়ানি ও স্পেশাল রূপচাঁদা কারি। ভ্রমণের শেষ ভোজটা ছিল জমকালো এবং পরিতৃপ্তিদায়ক।

বিকেলটা আমরা তুলে রেখেছিলাম একদম ব্যক্তিগতভাবে সৈকতের সাথে একান্তে বিদায় জানানোর জন্য। আমরা আবার ফিরে গেলাম সুগন্ধা বিচের সেই পরিচিত বালুকাবেলায়। তবে এবার আর জলে নামলাম না। সৈকতের এক কোণে কাঠের ইজিচেয়ার ভাড়া করে পাশাপাশি বসলাম আমরা তিনজন। সূর্য তখন তার দিনের শেষ আলোটুকু সাগরের বুকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মেয়েটা বালুর ওপর কাঠি দিয়ে একটা ছোট বাড়ি বানাল, আর লিখে রাখল তার নিজের নাম। কিন্তু সাগরের এক বিশাল ঢেউ এসে নিমিষেই সেই বালুর ঘর আর নাম ভাসিয়ে নিয়ে গেল। মেয়েটা মন খারাপ করতে গিয়েও হেসে ফেলল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, "সমুদ্র আমাদের শেখায় মা,কোনো কিছু ধরে রাখতে নেই। যা চলে যায়, তাকে হাসিমুখে ছেড়ে দিতে হয়।"

বাতাস ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে এলো। সাগরের গর্জন যেন সন্ধ্যার অন্ধকারে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সাগরের এই ঢেউ হাজার বছর ধরে এভাবে এসে ভেঙে পড়ছে, আর হাজার বছর ধরে এভাবেই পড়বে। আমরা মানুষরা আসি, ক্ষণিকের জন্য দাঁড়াই, জীবনের ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে আবার ফিরে যাই নিজেদের কংক্রিটের খাঁচায়।

রাত আটটায় আমাদের ফিরতি ট্রেনের সময়। হোটেল থেকে চেক-আউট করে ব্যাগপত্র গুছিয়ে যখন শামুক স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন সবার শরীর ক্লান্ত হলেও মনটা ছিল এক অদ্ভুত সতেজতায় ভরপুর।

 ট্রেন যখন বাঁশি বাজিয়ে ধীরে ধীরে কক্সবাজার স্টেশন ছাড়তে শুরু করল, মেয়েটা জানালার কাচে হাত রেখে বলল, "বাই বাই সাগর! আমরা আবার আসব কিন্তু!"

আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম। দূরে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে ঝাউবনের সারি আর সাগরের অদৃশ্য গর্জন। ট্রেনের দোলায় শরীর যখন এলিয়ে পড়ছিল, তখন চোখের পাতায় ভেসে উঠছিল লাল কাঁকড়ার লুকোচুরি, ইনানীর প্রবাল পাথরে আছড়ে পড়া ফেনিল ঢেউ আর মেরিন ড্রাইভের সেই মাতাল করা হাওয়া।

ব্যস্ততার খাঁচায় বন্দি জীবনে এই তিনটে দিন যেন ছিল এক সঞ্জীবনী সুধা। সাগরের এই নোনা জল আমাদের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি আর মলিনতা ধুয়ে দিয়ে একরাশ নতুন প্রাণশক্তি দিয়ে গেল,যা নিয়ে আবার হাসিমুখে ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে নাগরিক জীবনের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।

 

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • Kunjo Dairy 5 hours ago

    দারুণ ভ্রমণ কাহিনি। ভালো লেগেছে।