Story

হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে

October 21, 2026

15 views

শরতের শান্ত বিকেলে আড়িয়াল খাঁ নদের জলে যখন কাঁচের মতো স্বচ্ছ রোদ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে, তখন কাজিরচর গ্রামের সবুজ বুক চিরে এক মিষ্টি উদাস হাওয়া বয়ে যায়। নদীর কূল ঘেঁষে বাতাসে দোলে দুধসাদা কাশফুল। মেঠোপথের ধারে ঘন বাঁশঝাড়, সুপারি বাগান আর প্রাচীন বটের ছায়ায় ঘেরা এই গ্রামখানা যেন শত বছর ধরে নিজের ভেতর এক কঠোর, নিস্তরঙ্গ নিয়মকানুন আগলে বসে আছে। এই গ্রামের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন ‘বড় মৌলভী বাড়ি’। চুনকাম খসা লাল ইটের তিনতলা বৈঠকখানা, ভেতরে বিশাল আঙিনা আর চারপাশ জুড়ে চওড়া বারান্দার টিনের ঘর। এই বংশের ভিত্তিপ্রস্তর ছিল কঠোর শরিয়তি অনুশাসন ও আভিজাত্য। অন্দরমহলে নারীদের জন্য পর্দা এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক রীতি নয়, বরং অলঙ্ঘনীয় এক লোহার প্রাচীর। বাড়ির পুরুষরা ছাড়া বাইরের কোনো বেগানা মানুষের ছায়াও যেখানে মাড়ানো নিষেধ।

এই মৌলভী বাড়ির সবচেয়ে ছোট মেয়ে মরিয়ম। মরিয়মের বয়স এই উনিশ কি কুড়ি। শান্ত, নম্র আর গভীর তার স্বভাব। গায়ের রঙ দুধে-আলতায় মেশানো, মুখখানি যেন প্রথম রাতের চাঁদের ফালি। টানা টানা কাজলবিহীন কালো চোখে সবসময় এক মায়াবী আরণ্যক স্তব্ধতা লেগে থাকে। পরনে তার সবসময় ঢিলেঢালা সুতি জামা আর মাথায় ঘন কালো ওড়না বুক অবধি টানা। বাড়ির সবাই জানে,মরিয়ম অত্যন্ত পরহেজগার, ঘরের কাজ আর কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া দুনিয়ার কোনো কোলাহলে তার আগ্রহ নেই।

কিন্তু মানুষের বাইরের এই শান্ত খোলসটির নিচে যে এক অতলান্ত মহাসমুদ্রের মতো অনুভূতি লুকানো থাকতে পারে, তা মৌলভী বাড়ির কঠোর দেওয়ালগুলো কোনোদিন টের পায়নি।

সেই মহাসমুদ্রের একমাত্র নাবিক ছিল আরিফ। আরিফ মরিয়মদের সরাসরি রক্তের কেউ নয়, তবে রক্তসম্পর্কের চেয়েও বড় আশ্রয়ের মানুষ। আরিফের বাবা ছিলেন এই মৌলভী বাড়িরই দূরসম্পর্কের এক নিঃস্ব চাচাতো ভাই, যিনি যৌবনেই মারা যান। মরিয়মের বাবা, গ্রামের প্রধান মুরুব্বি ও মসজিদের প্রধান মুতাওয়াল্লি আলহাজ্ব বোরহান উদ্দিন খন্দকার আরিফকে নিজের আশ্রয়ে এনে বড় করেছিলেন।

আরিফ অত্যন্ত বিনম্র, ভদ্র এবং মেধাবী এক যুবক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে সে এখন বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায় আছে। দীর্ঘদেহী, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের আরিফের চেহারায় এক ধরনের দৃঢ় আভিজাত্য ফুটে থাকে। সে যখন অন্দরমহলের সীমানায় পা রাখত, তখনো তার চোখ থাকত মাটির দিকে নিবদ্ধ। মৌলভী বাড়ির কঠোর পর্দা ও শৃঙ্খলার কারণে মরিয়মের সাথে তার সরাসরি কথা বলার সুযোগ ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।

তবুও, বছরের পর বছর ধরে একই উঠোনের বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে নিতে, দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি চঞ্চল চোখের নীরব ভাষায় কখন যে এক নিঃশব্দ সুর বেজে উঠেছিল,তা কেবল জানত এই বাড়ির পুরোনো কাঠগোলাপের গাছটি।

মৌলভী বাড়ির এক অলিখিত নিয়ম ছিল,পুরুষরা যখন সকালের নাশতা সেরে বৈঠকখানায় চলে যেতেন, তখন অন্দরমহলের মেয়েরা খাবার পাঠাতেন ছোট ছেলেমেলে বা বিশ্বস্ত বয়োবৃদ্ধ কাজের খালা আমেনার হাত দিয়ে। কিন্তু আরিফের চা আর নাশতার ট্রে সাজানোর দায়িত্বটা কোনো এক অদৃশ্য নিয়মে মরিয়মের হাতেই এসে পড়ত। সেদিন সকালে আকাশটা ছিল শরতের স্নিগ্ধ মেঘে ঢাকা। আরিফ বৈঠকখানার পাশের ছোট লাইব্রেরি ঘরে বসে বই পড়ছিল। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সে নিমগ্ন। দরজায় কাঠের ওপর মৃদু আওয়াজ হলো,ঠক... ঠক...আরিফ মুখ তুলে তাকাল। দরজার পর্দা সামান্য সরে গেছে। সেখানে আমেনা খালা দাঁড়িয়ে নেই; দাঁড়িয়ে আছে মরিয়ম। মরিয়ম ঘরে ঢুকল না। সে দরজার কাঠের চৌকাঠের ওপারে, পর্দার আড়াল থেকে শুধু নিজের মেহেদিরাঙা ডানহাত বাড়িয়ে পেতলের ট্রে-টি সাইড টেবিলে নামিয়ে রাখল। তার সারা শরীর ওড়নায় ঢাকা, মুখের কেবল চোখ দুটি এক মুহূর্তের জন্য পর্দার ফাঁক গলে আরিফের দিকে তাকাল।

সেই চোখে কোনো ভাষা ছিল না, অথচ ছিল হাজার বছরের না-বলা কাব্যের ব্যাকুলতা।

"আরিফ ভাই..." অত্যন্ত মৃদু, কম্পিত কণ্ঠে ডাকল মরিয়ম। তার গলার আওয়াজ এতই মিহি যে ঘরের দেয়ালে লেগে থাকা টিকটিকিটাও হয়তো শুনতে পেল না।

আরিফ সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে নিজের চোখ নামিয়ে নিল। "বলো মরিয়ম। কিছু বলবে?"

মরিয়ম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার হাতের আঙুলগুলো ওড়নার পাড় খামচে ধরল।

"আপনার টেবিলে একখানা বই রেখেছিলাম কাল রাতে। মাওলানা রুমির মসনবী শরীফের বাংলা অনুবাদ। বইয়ের ভেতর একটা শুকনো শিউলি ফুল রাখা আছে... ফুলটা কি পেয়েছেন?"

আরিফের বুকের ভেতর এক অচেনা তোলপাড় শুরু হলো। রক্তের প্রতিটি শিরায় যেন হাজারটা বেহালা একযোগে কেঁদে উঠল। কাল রাতে বইয়ের পাতায় সেই শুকনো শিউলি আর তার নিচে এক টুকরো সাদা কাগজে লেখা সুরা আর-রহমানের একটি আয়াতের অনুবাদ সে পেয়েছিল,‘তিনিই স্থাপন করেছেন প্রেম ও করুণা।’আরিফ হাত বাড়িয়ে টেবিলের সেই পুরোনো কিতাবখানা স্পর্শ করল। সে মরিয়মের মুখের দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস পেল না, কারণ সে জানে এই পরিবারের নিয়ম আর ধর্মীয় অনুশাসনের মর্যাদা।

 "ফুলটা আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি মরিয়ম," আরিফের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো। "শিউলি তো ঝরে যায়, কিন্তু তার সুবাস তো আত্মায় থেকে যায়।"

পর্দার ওপারে মরিয়মের চোখ দুটি জলে ভিজে একাকার হয়ে গেল। সে এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়াল না। পায়ের রূপোর নূপুরহীন নিঃশব্দ পদক্ষেপে সে দ্রুত অন্দরমহলের গভীরে মিলিয়ে গেল।

আরিফ জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। বাইরে তখন রোদের আলোয় কাশবন ঝলমল করছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই রক্ষণশীল পরিবারের প্রাচীর ডিঙিয়ে মরিয়মকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখা যেন মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে মেঘের প্রার্থনা করার মতো দুঃসাহসিক। বড় মৌলভী সাহেব অত্যন্ত কঠোর মানুষ; বংশমর্যাদা, আভিজাত্য আর সামাজিক প্রতিপত্তি ছাড়া তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। আরিফ তাদের আশ্রিত এক এতিম যুবক মাত্র,তার এই ভালোবাসার কথা জানাজানি হলে তা কেবল অসম্মানই ডেকে আনবে না, মরিয়মের ওপর নেমে আসবে আজন্ম বন্দিত্বের অভিশাপ।

কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে মৌলভী বাড়িতে এক অপ্রত্যাশিত আলোড়ন উঠল। মরিয়মের জন্য এক বিরাট প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাব পাঠিয়েছেন পাশের থানার প্রতাপশালী চেয়ারম্যান এবং চালকলের মালিক আলহাজ্ব নিয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া। পাত্র তাঁর বড় ছেলে রফিক ভূঁইয়া,বিশাল ব্যবসায়ী, কয়েকটা ইটভাটা আর গাড়ির শোরুমের মালিক। রফিকের এটা দ্বিতীয় বিয়ে; প্রথম স্ত্রী বছর তিনেক আগে সন্তান প্রসবের সময় মারা গেছেন। রফিকের বয়স চল্লিশের কোঠায়, মরিয়মের চেয়ে অন্তত বিশ বছরের বড়।

কিন্তু মৌলভী বাড়ির বৈঠকখানায় যখন এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা বসল, তখন পাত্রের বয়স বা দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি কোনো ধর্তব্যের মধ্যেই এলো না। বড় মৌলভী বোরহান উদ্দিন খন্দকার গম্ভীর মুখে তসবিহ জপতে জপতে বললেন, "নিয়ামত ভূঁইয়া আমাদের সমকক্ষ ধার্মিক ও ধনী পরিবার। তাদের বংশও নামকরা। পাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি এবং লাখ টাকার কারবারি। এমন ঘরে আমাদের মরিয়ম গেলে সে রানীর মতো থাকবে। শরিয়ত মতে পুরুষের দ্বিতীয় বিয়েতে কোনো বাধা নেই।"

মরিয়মের মেজো ভাই এবং চাচারাও একবাক্যে সায় দিলেন। প্রস্তাব পাকা হয়ে গেল। ধার্য হলো,আগামী অগ্রহায়ণের প্রথম জুমায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। অন্দরমহলে যখন এই খবর পৌঁছাল, তখন মনে হলো একখণ্ড জীবন্ত বজ্রপাত আছড়ে পড়ল মরিয়মের মাথায়।

সে ঘরের কোণে জায়নামাজের ওপর বসে ছিল। মা এসে যখন মিষ্টিমুখ করাতে চাইলেন, মরিয়ম পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে কোনো জল বের হলো না, মুখ দিয়ে কোনো আর্তনাদ বের হলো না। এই পরিবারে মেয়েদের মতামতের কোনো জায়গা কোনোদিন ছিল না। ‘বাবার পছন্দই আল্লাহর হুকুম’,এই ধারণায় বড় হওয়া একটি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে হয়ে সে কীভাবে চিৎকার করে বলবে যে তার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে কেবল একজনেরই নাম খোদাই করা আছে?

মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "কাঁদিস না মা। মেয়েমানুষের জীবন তো নদীর জলের মতো, যে ঘাটে বাঁধে সেখানেই বইতে হয়। তুই খুব সুখে থাকবি।"

মা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই মরিয়ম মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ল। তার চোখের জল জায়নামাজের জমিন ভিজিয়ে দিল। সে সেজদায় মাথা ঠুকে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল,"হে আল্লাহ! তুমি তো অন্তর্যামী। তুমি তো জানো আমার হিয়ার মাঝে কে লুকিয়ে ছিল! আমাকে এমন পরীক্ষায় ফেলো না মাবুদ, যেখানে আমার ঈমান আর ভালোবাসা দুটোই ধুলোয় মিশে যায়!"

বিয়ের আর মাত্র দশ দিন বাকি। পুরো বাড়ি জুড়ে সাজসাজ রব। রঙিন সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে উঠোনে, বাবুর্চিরা বিশাল ডেকচি নিয়ে এসে হাজির হয়েছে। আত্মীয়স্বজনে বাড়ি গিজগিজ করছে। আরিফ নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়েছিল। সে দিনের বেলা লাইব্রেরি ঘরে বসে থাকত, নয়তো নদীর ঘাটে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাথরের মতো বসে থাকত। তার শরীরের অর্ধেক রক্ত যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। চোখের নিচে কালচে ছোপ, চেহারার সেই দীপ্তি সম্পূর্ণ ম্লান। সে চেয়েছিল সবকিছু ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে যেতে, কিন্তু বড় মৌলভী সাহেবের ঋণ আর মরিয়মের মুখ তাকে এই ভিটে থেকে নড়তে দিচ্ছিল না।

সেদিন রাতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। কার্তিকের এই অসময়ের মুষলধারে বৃষ্টিতে গ্রামের সমস্ত মেঠোপথ কাদায় তলিয়ে গেল। রাত তখন আনুমানিক একটা। চারপাশ নিঝুম, কেবল টিনের চালে বৃষ্টির একটানা কানফাটানো গর্জন।

আরিফ তার ঘরে তেলের কুপি জ্বালিয়ে টেবিলে মাথা রেখে বসে ছিল। ঠিক তখনই দরজায় এক মৃদু টোকা পড়ল। আরিফ ভাবল হয়তো কোনো কাজের লোক। সে উঠে গিয়ে দরজা খুলল

আর দরজা খুলতেই তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল!

দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ভেজা এক অবয়ব। বড় একটি কালো চাদরে আপাদমস্তক ঢাকা। চাদরের ঘোমটা সামান্য সরাতেই উন্মোচিত হলো মরিয়মের মুখ। তার চোখ দুটো কান্নায় রক্তজবার মতো লাল হয়ে ফুলে গেছে, ঠোঁট দুটো শীতে ও আতঙ্কে কাঁপছে।

"মরিয়ম! তুমি... এই মাঝরাতে এখানে?" আরিফ আতঙ্কে এক পা পিছিয়ে গেল। "কেউ দেখে ফেললে তোমার জীবন শেষ হয়ে যাবে! জলদি নিজের ঘরে যাও!"

মরিয়ম কোনো কথা না শুনে ঘরের ভেতর এক পা বাড়াল। সে দরজার কপাটটি আলতো করে ভেজিয়ে দিয়ে ধপাস করে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার কান্নার কোনো শব্দ ছিল না, কেবল বুকফাটা এক দমবন্ধ করা হাহাকার।

"আমাকে এক ফোঁটা বিষ এনে দিন আরিফ ভাই," মরিয়ম হাতজোড় করে আরিফের পা ছুঁতে গেল।

আরিফ বিদ্যুৎবেগে পিছিয়ে গিয়ে নিজেকে সামলাল। "এ কী করছ মরিয়ম! নিজেকে শক্ত করো! আল্লাহকে ভয় করো!"

"আমি আল্লাহকে ভয় করি বলেই তো আজ এত বছর ধরে নিজের বুকের আগুনকে চেপে রেখেছি আরিফ ভাই!" মরিয়মের কণ্ঠ দিয়ে যেন লাভা বের হয়ে এলো। "কিন্তু আপনারা পুরুষরা এত নিষ্ঠুর কেন? যে মুখে কোনোদিন বেগানা পুরুষের সামনে একটা শব্দ করিনি, সেই মুখ দিয়ে আজ বলছি,আমি আপনাকে ভালোবাসি! ছোটবেলা থেকে যখন আপনি কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করতেন, তখন ওই জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি শুনতাম। আপনার পদশব্দ শুনলে আমার বুকের রক্ত চলকে উঠত! আর আপনি... আপনি আমাকে ওই চল্লিশ বছরের বুড়ো লোকের হাতে তুলে দিয়ে নিজে শান্তিতে বিসিএস ক্যাডার হবেন?"

আরিফ দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে তখন অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে বসল মরিয়মের সামনে, কিন্তু তবুও তার গায়ে হাত ছোঁয়াল না।

"মরিয়ম... তুমি জানো না আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি," আরিফ ভাঙা গলায় বলল। "এই মৌলভী বাড়ির প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী, আমি কোনোদিন তাহাজ্জুদের নামাজে তোমার নাম ছাড়া নিজের জন্য কিছু চাইনি। কিন্তু আমি তো নিঃস্ব মরিয়ম! বড় আব্বা আমাকে খাইয়ে-পরিয়ে মানুষ করেছেন। আমি যদি আজ তোমার হাত ধরে এই ভিটে থেকে বের হয়ে যাই, তবে লোকে বলবে মৌলভী সাহেব দুধকলা দিয়ে কালসাপ পুষেছিলেন! তোমার বাবার এই আজন্মের সম্মান, পাগড়ি আর ইজ্জত ধুলোয় মিশে যাবে। আমি কি সেই পাপের ভাগীদার হতে পারি?"

"তাহলে আমার কী হবে আরিফ ভাই?" মরিয়ম নিজের বুক চাপড়ে কেঁদে উঠল। "আমার এই শরীরটা হয়তো ওরা জোর করে অন্য কারও ঘরে পাঠিয়ে দেবে, কিন্তু আমার রুহ তো আজন্ম আপনার হয়েই কবরে যাবে! এর চেয়ে আমাকে আপনার নিজের হাতে আড়িয়াল খাঁ নদে ডুবিয়ে দিয়ে আসুন!"

বাইরে তখন বৃষ্টির গর্জন আরও তীব্র হলো। সেই নিঃশব্দ প্রহরে, কুপিবাতির হলুদ আলোর নিচে দাঁড়িয়ে দুটি পবিত্র আত্মা অনুভব করল,পৃথিবীর সমস্ত আইন আর শরিয়তের চেয়েও বড় এক বিধান হলো নিঃশর্ত প্রেম। আরিফ তার পকেট থেকে সেই শুকনো শিউলি ফুল আর আতরের শিশিটা বের করল। সে খুব সাবধানে, কোনো স্পর্শ না করে ফুলটি মরিয়মের অঞ্জলিবদ্ধ হাতের তালুতে নামিয়ে রাখল।

"মরিয়ম, কাল সকালে আমি বড় আব্বার সামনে দাঁড়াব," আরিফের চোখে তখন এক অপার্থিব দৃঢ়তা। "আমি ভিক্ষা চাইব। আমি ওনার পায়ে পড়ে আমার সমস্ত জীবনের শ্রম আর ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে তোমাকে চাইব। যদি উনি না দেন, তবে জেনে রেখো,আরিফ কোনোদিন এই জীবনে অন্য কোনো নারীকে স্পর্শ করবে না। আর যদি নিয়তির এই নির্মম ফয়সালাই মেনে নিতে হয়, তবে সবরের চাদর জড়িয়ে আমাদের এই ভালোবাসাকে আল্লাহর আমানত হিসেবে রেখে দিতে হবে।"

মরিয়ম সেই শুকনো ফুলটি নিজের বুকের কাছে চেপে ধরল। সে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন আর কোনো কান্না ছিল না; ছিল এক পরম শান্তির আলো। যে কথা শোনার জন্য সে এক জনম অপেক্ষা করেছিল, তা সে পেয়ে গেছে। সে আর কোনোদিন নিজেকে নিঃস্ব ভাববে না। সে ঘোমটা টেনে নিঃশব্দে বৃষ্টির আঁধারে নিজের ঘরের দিকে ফিরে গেল।

পরদিন সকালে বৃষ্টি থেমে গিয়ে এক অদ্ভুত থমথমে রোদ উঠল। মৌলভী বাড়ির কাচারি ঘরে বসেছিলেন বোরহান উদ্দিন খন্দকার। তিনি মেহমানদের তালিকা আর বিয়ের খরচের হিসাব দেখছিলেন। পাশে বসে ছিলেন তাঁর দুই ছেলে। আরিফ ধীর পদক্ষেপে কাচারি ঘরে ঢুকল। তার পরনে সাদা পায়জামা আর পাঞ্জাবি। মুখে এক অপার্থিব গাম্ভীর্য।

সে গিয়ে বড় মৌলভী সাহেবের চেয়ারের পাশে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল।

বোরহান সাহেব চমকে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। "কী ব্যাপার আরিফ? মাটিতে বসলে কেন? কিছু বলবে?"

আরিফ দুই হাত জোড় করল। তার মাথা নত, কিন্তু কণ্ঠ ছিল বজ্রের মতো স্পষ্ট ও গভীর।

"বড় আব্বা, আপনি আমাকে এতিম অবস্থা থেকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছিলেন। আপনার ঋণের বোঝা আমার এই এক জীবনে শোধ করা সম্ভব নয়। আজ আমি আপনার কাছে জীবনের প্রথম ও শেষ ভিক্ষা চাইতে এসেছি।"

বোরহান সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। "কীসের ভিক্ষা? টাকার দরকার? বিসিএসের পোস্টিংয়ের জন্য কোনো তদবির লাগবে?"

"না বড় আব্বা," আরিফ বুকভরা সাহস সঞ্চয় করে চোখ তুলে তাকাল মৌলভী সাহেবের চোখের দিকে। "আমি আপনার ছোট মেয়ে মরিয়মের পাণিপ্রার্থী হতে এসেছি। আমি মরিয়মকে বিয়ে করতে চাই।"

মুহূর্তের মধ্যে পুরো কাচারি ঘরে যেন এক প্রলয়ংকরী সুনামি বয়ে গেল! বোরহান সাহেবের হাতের কলম খসে পড়ে গেল টেবিলের ওপর। তাঁর দুই ছেলে এক লাফে দাঁড়িয়ে উঠল।

"কী বললি হারামজাদা!" বড় ছেলে চিৎকার করে উঠল। "বাবার আশ্রয়ে থেকে এত বড় আস্পর্ধা! তুই একজন খন্দকার বাড়ির আশ্রিত হয়ে আমাদের বোনের দিকে নজর দিয়েছিস?"

"চুপ করো!" বোরহান সাহেব গম্ভীর, বজ্রকণ্ঠে ধমক দিয়ে ছেলেকে থামালেন। কিন্তু তাঁর নিজের চেহারায় তখন রক্তের লালিমা ফুটে উঠেছে। অপমানে ও রাগে তাঁর হাত কাঁপছিল।

তিনি আরিফের দিকে ঝুঁকে এলেন।

"আরিফ, তুমি জানো তুমি কী বলছ? তুমি আমাদের ঘরের নিয়ম জানো। মরিয়মের বিয়ের কথা চূড়ান্ত হয়েছে বিত্তবান ভূঁইয়া পরিবারে। আর তুমি... তুমি সামান্য একজন সরকারি চাকুরির প্রার্থী, যার নিজের কোনো জমি নেই, ভিটে নেই! তুমি কোন সাহসে এই প্রস্তাব দিলে?"

আরিফ এক চুলও নড়ল না। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল:

"বড় আব্বা, শরিয়ত সম্পদের প্রাচুর্য দেখে বিয়ের বিধান দেয়নি; শরিয়ত দেখেছে পাত্রের তাকওয়া, দ্বীনদারি এবং চরিত্র। নিয়ামত ভূঁইয়ার ছেলে চল্লিশ বছরের এক ব্যবসায়ী, যার ঘরে মরিয়ম হয়তো সোনা-দানায় মুড়ে থাকবে, কিন্তু সেখানে দ্বীনের চেয়ে অহংকার বেশি। আমি হয়তো আজ নিঃস্ব, কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি,আমার সততা আর মেধা দিয়ে আমি মরিয়মকে এমন সম্মান আর নিরাপত্তা দেব, যা কোনো অর্থ দিয়ে কেনা যায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা,আমাদের এই চাওয়া কোনো পাপের নয়, সম্পূর্ণ হালাল এক বন্ধনের আকুলতা।"

বোরহান সাহেব স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন আরিফের দিকে। তাঁর দীর্ঘ জীবনের সমস্ত ধর্মীয় প্রজ্ঞা আর বংশমর্যাদার অহংকার যেন এই এক যুবকের চোখের নিষ্পাপ সততার সামনে এসে ধাক্কা খেল। তিনি জীবনে বহু মানুষ দেখেছেন, কিন্তু এমন নির্ভীক, বিনম্র অথচ সত্যবাদী মানুষ খুব কম দেখেছেন।

তবুও, বংশের অহংকার বড় কঠিন জিনিস। বোরহান সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করলেন। তিনি বললেন, "আরিফ, তুমি আমার ছেলের মতো। কিন্তু সমাজ বড় নির্মম। আজ যদি আমি ভূঁইয়াদের কথা ফিরিয়ে দিয়ে আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিই, পুরো গ্রাম বলবে বোরহান খন্দকার নিজের আশ্রিত ছেলের লোভের কাছে মাথা নত করেছে। বংশের ইজ্জত আমি ধুলোয় মেশাতে পারব না। তুমি আজই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও। ঢাকায় গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ো।"

আরিফ এক মুহূর্ত মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে উঠে দাঁড়াল। সে কোনো অনুনয় করল না, কোনো প্রতিবাদ করল না।

সে বড় মৌলভী সাহেবের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। "আপনার সিদ্ধান্ত আমি মাথা পেতে নিলাম বড় আব্বা। তবে মনে রাখবেন,যে সমাজ মানুষের মনের পবিত্র ভালোবাসাকে ধুলোয় মিশিয়ে কেবল বংশ আর টাকার হিসাব মেলায়, সেই সমাজ একদিন নিজেই নিজের বোঝায় ভেঙে পড়বে।

আরিফ সোজা হেঁটে কাচারি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে নিজের ঘরের একটি ছোট ট্রাঙ্ক হাতে নিয়ে মেঠোপথ ধরে হাঁটা শুরু করল আড়িয়াল খাঁ নদের খেয়াঘাটের দিকে। দোতলার কাঁচের জানালার নীল পর্দাটা এক পলকের জন্য সরে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া অশ্রুসজল চোখ আরিফের চলে যাওয়া পথের ধূলিকণার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল,যতক্ষণ না সে বাঁশঝাড়ের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
বিয়ের দিন উপস্থিত হলো। পুরো মৌলভী বাড়ি লোকে লোকারণ্য। গেটে সানাইয়ের করুণ সুর বাজছিল। বিশাল ভোজের আয়োজন। কিন্তু আসরের নামাজের ঠিক আগে আগে থানা শহর থেকে এক জরুরি সংবাদ নিয়ে এলো পুলিশের একটি জিপ গাড়ি।

কাচারি ঘরের সামনে গাড়ি থামতেই নামলেন স্বয়ং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। তিনি বোরহান সাহেবের সামনে একটি সরকারি ওয়ারেন্ট বাড়িয়ে দিলেন।

"মৌলভী সাহেব, অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি,আজকের বিয়ের বর রফিক ভূঁইয়া এবং তার পিতা নিয়ামত ভূঁইয়াকে আধা ঘণ্টা আগে র‍্যাব গ্রেফতার করেছে। তারা আন্তর্জাতিক চাল চোরাচালান এবং জাল দলিলের মাধ্যমে কৃষকদের শত শত বিঘা জমি দখলের এক ভয়ংকর মামলার প্রধান আসামি। তাদের সমস্ত গোডাউন ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।"

মুহূর্তের মধ্যে বিয়ের উৎসব এক শ্মশানের নিস্তব্ধতায় রূপ নিল। গ্রামের শত শত মানুষের সামনে বোরহান খন্দকারের আভিজাত্যের অহংকার এক নিমেষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মাটির সাথে মিশে গেল। যে বংশমর্যাদা আর টাকার অহংকারে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, সেই টাকাই আজ তাঁর মুখে চুনকালি লেপে দিল। মেহমানরা একে একে থুথু ফেলে চলে যেতে লাগল। আত্মীয়স্বজনরা মুখ ফিরিয়ে নিল।

বোরহান সাহেব কাচারি ঘরের পাকা মেঝেতে বসে পড়লেন। তাঁর মাথার টুপি খসে পড়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন,আল্লাহর বিচার বড় সূক্ষ্ম। তিনি একজন লোভী, অপরাধী পরিবারের হাতে নিজের নিষ্পাপ মেয়েকে তুলে দিতে যাচ্ছিলেন কেবল লোকদেখানো আভিজাত্যের লোভে! ঠিক সেই সময় অন্দরমহল থেকে খবর এলো,মরিয়ম ঘরের দরজা বন্ধ করে জায়নামাজে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। তার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।

বোরহান সাহেব ছুটে গেলেন অন্দরমহলে। মেয়ের অচেতন মুখের দিকে তাকিয়ে এই কঠোর, পাষাণ মানুষটির চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

"মা রে... আমারে মাফ করে দে মা! আমি অন্ধ ছিলাম রে মা! আমি তোর মনের খবর রাখিনি, আমি সমাজের চোখের ভয়ে আল্লাহর খাঁটি নেয়ামতকে লাথি মারতে চেয়েছিলাম!"
তিন মাস পর। ফাল্গুনের শুরুতে কাজিরচর গ্রামের প্রকৃতি তখন নতুন সাজে সেজেছে। রক্তিম শিমুল আর পলাশের ডালে ডালে কোকিলের ডাক। আড়িয়াল খাঁ নদের বুকে তখন আর কোনো অন্ধকার মেঘ নেই; স্নিগ্ধ মিষ্টি বাতাস বইছে। মৌলভী বাড়িতে আজ কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা নেই, কোনো মাইকের হাঁকডাক নেই। উঠোনে কেবল সাধারণ একটি ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ এবং এতিমখানার বাচ্চাদের জন্য সামান্য তবারকের ব্যবস্থা।

কাচারি ঘরে বসেছেন গ্রামের নতুন সরকারি সার্কেল এএসপি,যিনি সদ্য বিসিএস পরীক্ষায় সারা দেশে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে নিজের কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আগে এক সপ্তাহের ছুটিতে গ্রামে এসেছেন।

পরনে তাঁর সাদা সুতি পায়জামা-পাঞ্জাবি, চোখেমুখে বিনম্র আলোর দীপ্তি। তিনি আর কেউ নন,আরিফ।

আরিফের পাশে বসে আছেন স্বয়ং আলহাজ্ব বোরহান উদ্দিন খন্দকার। আজ মৌলভী সাহেবের চেহারায় কোনো আভিজাত্যের দম্ভ নেই; আছে এক পরম তৃপ্তির প্রশান্তি। তিনি পরম মমতায় আরিফের হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে আছেন।

কাজি সাহেব রেজিস্ট্রি খাতা এগিয়ে দিলেন। "বাবা আরিফ, সই করো," বোরহান সাহেব ভেজা গলায় বললেন। "আজ আমি আমার আশ্রিতকে নয়, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অহংকারকে আমার কলিজার টুকরো সঁপে দিচ্ছি।"

আরিফ পরম শ্রদ্ধায় বিসমিল্লাহ বলে কলম তুলে নিল। অন্দরমহলের সেই পুরোনো বারান্দায়, যেখানে এককালে অলঙ্ঘনীয় পর্দার লোহার দেয়াল ছিল, আজ সেখানে কেবল সুগন্ধি রজনীগন্ধার মালা ঝুলছে। মরিয়ম লাল বেনারসি বা ভারী গয়না পরেনি; তার পরনে একটি সাধারণ অফ-হোয়াইট রঙের জামদানি শাড়ি, মাথায় টেনে দেওয়া পাতলা ওড়না।

আরিফ যখন ধীরে ধীরে অন্দরমহলের সেই ঘরে এসে পা রাখল, তখন ঘরের এক কোণে রাখা মাটির প্রদীপের আলোয় মরিয়মের মুখখানা অপার্থিব দ্যুতিতে জ্বলজ্বল করছিল। আরিফ কাছে এসে দাঁড়াল। সে তার পকেট থেকে বের করল সেই বহু পুরোনো, যত্ন করে রাখা শুকনো শিউলি ফুলের পাপড়িগুলো। সে পরম ভালোবাসায় সেই শুকনো পাপড়িগুলো মরিয়মের খোলা চুলের ওপর আলতো করে ছড়িয়ে দিল।

মরিয়ম চোখ তুলে তাকাল। তার চোখের সেই দীর্ঘদিনের হাহাকার আজ এক মহাসমুদ্র পরিমাণ কৃতজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে। সে আরিফের বুকের ওপর নিজের কপাল ছুঁইয়ে দিল। বাইরে তখন ফাল্গুনের দক্ষিণা বাতাস বাঁশঝাড়ের পাতায় পাতায় সুর তুলছিল। সেই বাতাসের প্রতিটি তরঙ্গে যেন ভেসে আসছিল এক চিরন্তন মহাসত্য,মানুষ সমাজ দিয়ে, প্রাচীর দিয়ে কিংবা আভিজাত্যের অহংকার দিয়ে হয়তো প্রেমকে আটকে রাখতে চায়; কিন্তু যে প্রেম হৃদয়ের অতল গহ্বরে আল্লাহর সন্তুষ্টি আর আত্মত্যাগের আলো নিয়ে বেঁচে থাকে, মহাকালের সমস্ত ঝড় পেরিয়ে অবশেষে সে প্রেম তার পরম গন্তব্যে পৌঁছায়।

হিয়ার মাঝে যে ভালোবাসা এতকাল লুকিয়ে ছিল, আজ সে নিখিল ভুবনের সামনে তার পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াল।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login