কালীদহ গ্রামের উত্তর সীমানায় যেখানে শেওড়া আর বাঁশঝাড়ের অন্ধকার দিনদুপুরেও নেমে থাকে, সেখানেই রহমত কবিরাজের আস্তানা। দরজার ওপর ঝোলানো পিতলের ফলকে খোদাই করা বড় বড় হরফে লেখা,‘মুশকিলে আছান দাওয়াপীঠ’। গ্রামের অভাবী, আধপেটা আর দিনমজুর মানুষের কাছে রহমত স্রেফ কবিরাজ নয়, স্বয়ং ত্রাতা। তার একহাতে থাকে তসবিহ, অন্যহাতে লাল সালু কাপড়ে মোড়ানো তামার মাদুলি। মাথায় জরির টুপি আর চোখে সুরমা আঁকা রহমতের গম্ভীর বাণী গ্রামবাসীর কাছে কোনো দৈববাণীর চেয়ে কম ছিল না। কেউ সর্দি-কাশিতে ভুগুক, কারোর বুক ধড়ফড় করুক কিংবা কোনো প্রসূতি প্রসববেদনায় তিন দিন ধরে গোঙাক,সব কিছুর একমাত্র দাওয়াই রহমতের ওই ছোট কাঠের সিন্দুকে পোরা কালো সুতো আর লোহার কবজ।
গ্রামের মানুষ জানত, শহরের ডাক্তারখানায় গেলে শুধু টাকা যায়, আর রহমতের কাছে গেলে ‘মুশকিল আসান’ হয়। কিন্তু সেই আছানের আড়ালে কত প্রাণ যে নিশুতি রাতে নিঃশব্দে নিভে গেছে, তার হিসাব কেউ কোনোদিন রাখেনি। মানুষ ভাবত, যার আয়ু ফুরিয়েছে সে তো যাবেই; রহমত ফকির তো দোয়াদরূদ পড়ে বাঁচানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।
শ্রাবণ মাসের টানা বৃষ্টিতে কালীদহের নিচু জমিগুলো সব থইথই জলে ডুবে গেছে। ভ্যাপসা গরমে আর স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ঘরে ঘরে রোগবালাইয়ের হানা। দিনমজুর কাশেম আলীর সাত বছরের একমাত্র মেয়ে ফুলবানুর শরীরটা গত তিন দিন ধরে ভালো নেই। ফুটফুটে চঞ্চল মেয়েটি উঠোনে কাদা মেখে লাফিয়ে বেড়াত, আজ সে মাটির দাওয়ায় পাটি বিছিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। তার গায়ের চামড়া আগুনে লাল, পেটটা ফুলে ঢোল হয়ে উঠেছে। সামান্য ছুঁলেই যন্ত্রণায় ডুকরে উঠছে মেয়েটি।
কাশেমের স্ত্রী জমিলা আঁচল দিয়ে মেয়ের কপালের ঘাম মুছিয়ে দিতে দিতে কেঁদে ফেলল, "ও ফুলবানুর বাপ, মাইয়াডার যে নিশ্বাস বন্ধ হইয়া আসতেছে! একবার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার স্যারের কাছে নিয়া যাবা না? শুনছি ছোট ডাক্তার নাকি বিনাপয়সায় ওষুধ দেয়।"
কাশেম ধমক দিয়ে উঠল, "চুপ কর মূর্খ মেয়েমানুষ! আল্লার ওপর ভরসা নাই তোর? স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওই ডাক্তাররা তো খ্রিস্টানদের সুই ফোটায়, রক্ত টানে। কবিরাজ চাচা শুনলে আর পানি পড়া দেবে? এক ফুঁয়ে যে ভূত তাড়ায়, তারে বাদ দিয়া যাবি কাফেরের দরবারে? আমি মুশকিলে আছানে যাই।"
কাশেম দ্রুত পায়ে কাদার পথ ভেঙে রহমত কবিরাজের আস্তানায় গিয়ে পৌঁছাল। আস্তানার ভেতর তখন লোবান আর ধুনোর ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে ওঠে। খাটিয়ায় বসে রহমত কবিরাজ চোখ বুজে বিড়বিড় করছে। সামনে কাঁসার থালায় রাখা চাল, কড়ি আর শুকনো শুকনো কিছু শেকড়-বাকড়। কাশেম পা ছুঁয়ে সালাম করে কাতর কণ্ঠে বলল, "কবিরাজ কাকা, আমার ফুলবানু যে আর বাঁচে না! পেটের ব্যথায় চিল্লায়, চোখ উল্টাইয়া যায়। আপনি দয়া না করলে আমার সংসার ভাইসা যাইব।"
রহমত চোখ পিটপিট করে তাকাল। আঙুলের কড় গুনে একমুঠো সরিষা নিয়ে প্রদীপের ওপর ফেলল। ফটাফট শব্দে সরিষা ফাটতেই গম্ভীর গলায় বলল, "বড় কঠিন গেরো কাশেম! তোর মাইয়ারে বাতাসে ধরছে। ওই যে দক্ষিণের পোড়ো ভিটার কুলগাছ, ওইখান দিয়া আসার সময় অপছায়া ওর পেটের মধ্যে ভর করছে। ডাক্তার-বদ্যির কোনো কাম নাই এখানে। ইঞ্জেকশন দিলেই রক্ত শুকাইয়া মাইয়া পাথর হইয়া যাইব।"
কাশেমের বুকের ভেতরটা আতঙ্কে হিম হয়ে গেল। "কী করতে হইব কাকা? আমার জান গেলেও মাইয়ারে বাঁচান!"
"তিনটা জিনিস লাগবে," কবিরাজ গম্ভীর মুখে ফতোয়া দিল, "কালীসায়রের কালো পাঁঠার রক্ত দিয়া মাখানো তামার তিনটা কবজ। একটা গলায়, একটা কোমরে, আরেকটা ডান হাতে বাঁধতে হইব। আর আমি সাত দিনের চালানিপড়া পানি দিমু। দিনে তিন ফোঁটা করিয়া দিবি। কিন্তু হুশিয়ার,মাইয়ার পেটে এক ঢোক সাধারণ পানিও যেন না যায়! পানি দিলে পেটের জীন খেপিয়া কলজে ছিঁড়িয়া ফেলবে। আর পাঁচশো এক টাকা হাদিয়া বাবদ এই খাটের নিচে রাখ।"
কাশেম তার কোমরের গামছা থেকে ভিটেমাটির খাজনা দেওয়ার জন্য জমানো শেষ টাকা কটা কবিরাজের পায়ের কাছে ঢেলে দিল। লাল সুতোয় মোড়ানো ভারী তামার মাদুলি আর এক বোতল কালচে পড়া পানি নিয়ে কাশেম যখন বাড়ি ফিরল, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে।
ঘরে ফিরেই ফুলবানুর কোমরে আর গলায় মাদুলিগুলো শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হলো। ধারালো তামার কোণগুলো মেয়ের নরম কোমল চামড়ায় বসে রক্ত জমে উঠল, কিন্তু কাশেম হাত সরাল না। কবিরাজের আদেশ,এক চুলও আলগা করা চলবে না।
ফুলবানু তৃষ্ণায় ছটফট করছিল। ফাটা ঠোঁট দুটো মেলে সে বারবার ফিসফিস করে বলছিল, "মাগো... একটু পানি দাও... বুকটা ফাটিয়া গেল মা... পানি..."
জমিলা পানির বদনা নিয়ে এগোতেই কাশেম বাঘের মতো গর্জন করে উঠল, "খবরদার জমিলা! কবিরাজ চাচা পানি দিতে বারণ করছে। পানি দিলে জীন মাইয়ার কলিজা খাবে। এই যে কালচে পড়া পানি, এইটা তিন ফোঁটা দে।"
সেই দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত শেকড় ভেজানো পানি মুখে দিতেই মেয়েটি বমি করে ফেলল। পেটের মোচড় আরও বেড়ে গেল। তার ছোট্ট শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে উঠতে লাগল। মাঝরাতে ঝড়ের গতিতে বৃষ্টি নামল। সঙ্গে শুরু হলো ফুলবানুর প্রলাপ বকা। চোখ দুটো স্থির হয়ে চালের বাতার দিকে তাকিয়ে রইল, হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা। জমিলা আর স্থির থাকতে পারল না। সে কাশেমের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "তোমার আল্লার দোহাই লাগে, আমার মাইয়াডারে আর কষ্ট দিয়ো না! এ তো বাতাসের দোষ না, এ যে অসুখ! ভোর হইলে আমি ওরে কোলে কইরা হাঁসপাতালে নিয়া যাব।"
কাশেম নিজেও ভেতরে ভেতরে কাঁপছিল, কিন্তু বংশপরম্পরায় রক্তের মধ্যে মিশে থাকা অন্ধবিশ্বাস আর কবিরাজের অভিশাপের ভয় তার বিবেককে শিকল পরিয়ে রেখেছিল। সে ভাবল, কবিরাজকে ভোরে আবার ডেকে আনতে হবে, হয়তো কোনো বড় বলিদান দিতে হবে।
পরদিন সকালে রহমত কবিরাজ নিজে হাজির হলো কাশেমের ভিটায়। সঙ্গে তার সাগরেদ, হাতে চিমটা আর লোহার শিক। ফুলবানুর অবস্থা দেখে কবিরাজের চোখ মুহূর্তের জন্য কুঁচকে গেল। সে বুঝতে পারল মেয়েটির আয়ু আর বেশি নেই,নাড়ি ডুবে গেছে, শ্বাস উঠেছে। কিন্তু নিজের ভন্ডামির দায় সে কোনোভাবেই নিজের ঘাড়ে নিতে পারে না।
রহমত গম্ভীর হয়ে বলল, "জিন খুব বেপরোয়া হইয়া উঠছে। শেষ পথ একটাই,দাগ দিতে হইব। লোহার গরম শলাকা দিয়া পেটের উপ্রে তিনডা দাগ দিলে জিন শরীর ছাড়িয়া ভাগবে। কাশেম, কাঠকয়লা জ্বালাও!"
জমিলা আর্তনাদ করে উঠল, "না! ও কবিরাজ, আমার দুধের বাচ্চার পেটে গরম লোহা ছোঁয়াইও না! ও তো মইরা যাইব!"
কিন্তু কবিরাজের সাগরেদ জমিলাকে দাওয়ার এক কোণে চেপে ধরল। কাশেম কাঁপতে কাঁপতে উঠোনে চুলার আগুনে লোহার শিক গরম করতে লাগল। তার চোখের সামনে তখন ধর্মের ভয়, জিন-ভূতের বিভীষিকা আর কবিরাজের অন্ধ আনুগত্য। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন মাসুদ। মাসুদ এই গ্রামেরই ছেলে, ঢাকা থেকে প্যারামেডিকেলের পড়াশোনা শেষ করে সম্প্রতি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। গ্রামের এক রাখাল ছেলের মুখে ফুলবানুর খবর পেয়ে তিনি আর দেরি করেননি।
উঠোনে লাল টকটকে লোহার শিক আর ঘরের ভেতর অবুঝ শিশুর বুকফাটা আর্তনাদ দেখেই মাসুদের রক্ত টগবগ করে উঠল। তিনি এক ঝটকায় কবিরাজের সাগরেদকে সরিয়ে দিয়ে ফুলবানুর কাছে ছুটে গেলেন। মেয়ের পেট পাথরের মতো শক্ত, নাড়ি অত্যন্ত ক্ষীণ, শরীর ডিহাইড্রেশনে কাঠ হয়ে গেছে। মাসুদ চিৎকার করে উঠলেন, "এ কী বর্বরতা চলছে এখানে! কাশেম চাচা, আপনি কি নিজের হাতে নিজের মেয়েকে খুন করতে চান?"
রহমত কবিরাজ রক্তচক্ষু মেলে তাকাল, "এই ছোকরা, মুখ সামলাইয়া কথা কও! মুশকিলে আছানের কামে বাধা দিলে রক্তবমি হইয়া মরবা। এই মাইয়ারে জিনে পাইছে, কবিরাজি দাওয়াই ছাড়া রক্ষা নাই।"
মাসুদ কবিরাজের চোখের দিকে নির্ভীক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, "ভন্ডামির একটা সীমা থাকা দরকার! আপনি চিকিৎসা করছেন না, নরহত্যা করছেন। এর পেটে তীব্র ইনফেকশন হয়েছে,হয় অ্যাপেন্ডিসাইটিস ফেটে গেছে নয়তো পেরিটোনাইটিস। একে এই মুহূর্তে হাসপাতালে নিয়ে স্যালাইন আর অ্যান্টিবায়োটিক না দিলে আর এক ঘণ্টাও বাঁচবে না। আর আপনি কিনা গরম লোহার ছ্যাঁকা দিচ্ছেন?"
"তুই আমারে ভন্ড বলিস?" রহমত কাশেমের দিকে ফিরে বিষ ঢালল, "কাশেম, এই নাস্তিক ছোকরার কথা শুনলে তোর বংশ নির্বংশ হইব। জিন তোরেও ছাড়ব না!"
কাশেম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একপাশে তার আজন্ম লালিত অন্ধবিশ্বাস, অলৌকিক ভীতি আর সমাজের চোখরাঙানি; অন্যপাশে একজন শিক্ষিত তরুণের যুক্তি আর নিজের নাড়িছেঁড়া ধনের নিভে যাওয়া জীবনপ্রদীপ।
কিন্তু তখন আর কাশেমের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কেউ রইল না। মাতৃত্বের তীব্র হাহাকার মুহূর্তের মধ্যে শক্তিতে রূপ নিল। জমিলা এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কবিরাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন জল নেই, জ্বলছে আগ্নেয়গিরি। দাওয়ায় পড়ে থাকা বঁটিটা হাতে তুলে নিয়ে জমিলা চিৎকার করে উঠল, "দূর হ ভন্ড! তোর তাবিজে আমার মাইয়ার জীবন যায়! এতকাল তোরে ভগবান মানছি, আর না! ওরে মাসুদ ভাই, তুই আমার মাইয়াডারে বাঁচা, ওরে হাসপাতালে নিয়া চল!"
জমিলার এই রুদ্রমূর্তি দেখে কবিরাজ হকচকিয়ে পিছিয়ে গেল। মাসুদ আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। তিনি নিজের কাঁধের চাদর দিয়ে ফুলবানুকে সাবধানে জড়িয়ে নিলেন। কাশেমের ভুল ভাঙল জমিলার সেই চিৎকারে। সে নিজের চোখের জল মুছে এক ছুটে নৌকার দিকে দৌড়ালো।
নৌকা যখন উপজেলা সদরের ঘাটে পৌঁছাল, তখন বেলা দ্বিপ্রহর। ফুলবানুর শরীর তখন সম্পূর্ণ নিস্তেজ। মাসুদ আর কাশেম তাকে কোলে করে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলেন। ডাক্তাররা দ্রুত মেয়েটিকে পরীক্ষা করলেন। ডাক্তার রুহুল আমিন কাশেমের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভ আর বিষাদের মিশ্রিত স্বরে বললেন, "এত দেরি করে আনলেন কেন? পেটের ভেতর ইনফেকশন ছড়িয়ে সারা শরীরে বিষ হয়ে গেছে। এই দেখুন তামার মাদুলির ঘষায় ঘা হয়ে গেছে, আর পেটে এই দাগগুলো কিসের? আপনারা কি মানুষ, নাকি কসাই? আর আধা ঘণ্টা দেরি হলে মেয়েটাকে আর কোনোদিন ফিরে পেতেন না।"
ডাক্তাররা কালবিলম্ব না করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। টানা তিন ঘণ্টা ধরে চলল অস্ত্রোপচার। বাইরে বারান্দায় কাশেম দুই হাতে মাথা চেপে মেঝের ওপর বসে ডুকরে কাঁদতে লাগল। তার মনে পড়তে লাগল গত কয়েক বছরের কথা। করিমের ভাইপো কলেরায় রক্ত আমাশয় হয়ে কবিরাজের চালপড়া খেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিল। সামছুর গর্ভবতী বউ রক্তক্ষরণে শেষ হয়ে গিয়েছিল ওই তামার তাবিজের অপেক্ষায়। কত মানুষ এভাবে মরেছে, আর তারা ভেবেছে ‘আল্লার মাল আল্লায় নিয়া গেছে’! আসলে তো তারা সেই মানুষগুলোকে নিজেদের অজ্ঞতা আর ভন্ড কবিরাজের পায়ের তলায় বলি দিয়েছিল। কাশেমের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
বিকেল চারটায় অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা নিভে গেল। ডাক্তার বেরিয়ে এসে মাস্ক খুলে মৃদু হাসলেন, "মেয়েটাকে আমরা আপাতত বিপদমুক্ত করতে পেরেছি। ইনফেকশন পরিষ্কার করা হয়েছে। তবে ওর সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে। আর খবরদার, জীবনে কোনোদিন ওইসব ঝাড়ফুঁক আর তাবিজের পেছনে দৌড়াবেন না। রোগ হলে বিজ্ঞানের কাছে আসবেন, চিকিৎসকের কাছে আসবেন।"
কাশেম মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সেই কান্না কেবল কৃতজ্ঞতার ছিল না, সেই কান্না ছিল নিজের দীর্ঘদিনের অন্ধত্বের জন্য প্রায়শ্চিত্তের।
এদিকে কালীদহে তখন অন্য বাতাস বইছে। ফুলবানু যে হাসপাতালে বেঁচে গেছে এবং কবিরাজের ভুল চিকিৎসার কারণেই তার এই দশা হয়েছিল, সে খবর মাসুদের ফোন মারফত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের তরুণরা আর বসে থাকেনি। তারা রহমত কবিরাজের আস্তানা ঘেরাও করল। পুলিশ এসে পৌঁছানোর আগেই গ্রামবাসী দেখতে পেল সেই তথাকথিত অলৌকিক ‘মুশকিলে আছান’ কবিরাজ পেছনের বাঁশঝাড় দিয়ে লুঙ্গি তুলে পালাচ্ছে। আস্তানার তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া গেল মরা মানুষের হাড়, নিষিদ্ধ বিষাক্ত রাসায়নিক শেকড়, আর সাধারণ নদীর পানি ভরা শত শত বোতল, যেগুলোতে রং মিশিয়ে মানুষকে খাওয়ানো হতো।
সাত দিন পর ফুলবানুকে কোলে নিয়ে যখন কাশেম আর জমিলা গ্রামে ফিরল, তখন কালীদহের বটতলায় দাঁড়িয়ে পুরো গ্রাম তাদের দেখতে এলো। ফুলবানুর মুখটা তখনও কিছুটা ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখে সেই চেনা দীপ্তি ফিরে এসেছে। তার গলায় আর কোমরে কোনো তামার মাদুলি বা কালো সুতো ছিল না, ছিল কেবল পরিচ্ছন্ন সুতির জামা।
কাশেম গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বুকভাঙ্গা গলায় বলল, "ভাই সকল, আমার মতো ভুল আর কেউ কইরেন না। রোগবালাই হইলে কবিরাজের ঘরে না গিয়া হাসপাতালে যান। মুশকিলে আছান কোনো তাবিজ-কবজে হয় না, মুশকিল আছান হয় সঠিক জ্ঞানে আর ডাক্তারের চিকিৎসায়। আমরা এতদিন ভূত-প্রেতের ভয়ে নিজেদের সন্তানদের কসাইয়ের হাতে তুইল্যা দিছি।"
দূর আকাশের মেঘ কেটে তখন কালীদহের বুকে সোনাঝরা রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। শত বছরের কুসংস্কারের জমাট অন্ধকার ভেঙে এক নতুন ভোরের সূচনা হলো সেই লোকালয়ে।