নীলপদ্ম বিলের জলে যখন পৌষের শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদ পিছলে পড়ত, তখন দূর থেকে মনে হতো কে যেন রাশি রাশি গলানো সোনা ঢেলে দিয়েছে শান্ত জলে। ঠিক সেই সময়টাতে বিলের ধারের প্রাচীন শিমুল গাছটার নিচে এসে দাঁড়াত রূপসা। তার গায়ে জড়ানো থাকত বাসন্তী রঙের সুতি চাদর, আর কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়া একঢাল রেশমি কালো চুল। রূপসার গভীর মায়াবী চোখ দুটো যখন অপলক দৃষ্টিতে বিলের ওপারে চেয়ে থাকত, তখন গাঁয়ের রাখাল ছেলেরা গরু নিয়ে ফেরার পথে দূর থেকে থমকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলত,"ঐ দেখ, ডোমনাচরের মায়ার পরী নাইমা আসছে।" রূপসা রূপসী ছিল, কিন্তু তার সেই রূপের চেয়েও বেশি ছিল এক অপ্রতিরোধ্য মায়া। যে মানুষ একবার তার মুখের দিকে তাকিয়েছে, সে আর সহজে সেই মুখ ভুলতে পারেনি। তবে রূপসার কোনো অহংকার ছিল না। সে ছিল শান্ত, অচঞ্চল, বিলের স্থির জলের মতোই গভীর।
সেই নীলপদ্ম বিলেই প্রথম দেখা হয় রিয়াজের সাথে। রিয়াজ শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শেষ বর্ষের ছাত্র। জলরঙে প্রকৃতি আর গ্রামীণ মানুষের মুখ আঁকা তার আজন্মের নেশা। প্রকৃতির খোঁজে সে ক্যামেরা আর ক্যানভাস কাঁধে ঝুলিয়ে উপস্থিত হয়েছিল ডোমনাচরে। নদীর ঘাট আর মেঠোপথ পেরিয়ে সে যখন নীলপদ্ম বিলের পাড়ে এসে দাঁড়াল, তখন বাতাসে ভেসে আসছিল বুনোফুলের মৃদু গন্ধ। হঠাৎই রিয়াজের চোখ আটকে গেল শিমুলতলার সেই চত্বরে। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যার মুখমণ্ডলে অদ্ভুত এক স্বর্গীয় আভা। বাতাস তার চাদরের প্রান্ত উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আর তার পায়ের কাছে জলের ঢেউ এসে আলতো করে আছড়ে পড়ছে। রিয়াজ একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী, জীবনে বহু সুন্দর মুখের ছবি সে ক্যানভাসে এঁকেছে, প্রদর্শনীতে প্রশংসাও কুড়িয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার হাতের তুলি আর মনের সব অহংকার যেন নিমিষেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
সে কোনো কথা খুঁজে পেল না। অজান্তেই তার হাতের ক্যামেরা ক্লিক করে উঠল। শব্দ হতেই রূপসা চমকে পেছনে তাকাল। হরিণীর মতো ভয়ার্ত আর চমকিত দুটো চোখ সরাসরি রিয়াজের চোখের ওপর পড়ল। এক মুহূর্তের সেই দৃষ্টিবিনিময়,রিয়াজের মনে হলো বুকের ভেতর হাজারটা জলতরঙ্গ একসাথে বেজে উঠেছে।
রূপসা এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। বাসন্তী চাদরটা গায়ে শক্ত করে জড়িয়ে সে দ্রুত পায়ে মেঠোপথ ধরে হারিয়ে গেল গ্রামের দিকে। রিয়াজ শুধু নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তার ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপের দিকে তাকিয়ে।
রিয়াজ আশ্রয় নিয়েছিল গ্রামের এক প্রবীণ স্কুলশিক্ষক কাশেম মাস্টারের মাটির দোতলা ঘরের চিলেকোঠায়। রাতে কুপিবাতির আবছা আলোয় বসে রিয়াজের ক্যানভাসে আর কোনো নদীর ঘাট বা শিমুল ফুল এলো না। তার সাদা ক্যানভাস জুড়ে ফুটে উঠল কেবল দুটো চোখ,উদ্বিগ্ন, মায়াবী, অতলান্ত।
পরদিন সকালে চায়ের কাপ হাতে কাশেম মাস্টারকে সে ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, "মাস্টারচাচা, কাল বিকেলে বিলের ধারে বাসন্তী চাদর গায়ে এক মেয়েকে দেখলাম... কে ও?"
মাস্টারচাচা একটু হাসলেন, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ও রূপসা। আমাদের গ্রামের সাবেক সর্দার রইস উদ্দিনের মেয়ে। মেয়েটাকে সবাই এই গাঁয়ে 'মায়ার পরী' বলে ডাকে। ওর মা মারা গেছে ও যখন কোলের শিশু। বাপটাই ওকে আদরে আগলে মানুষ করেছে। বড় ভালো মেয়ে, মাটির মতো শান্ত। কিন্তু ওর ভাগ্যে একটা দুঃখ আছে রিয়াজ।"
রিয়াজের বুকটা কেঁপে উঠল, "কী দুঃখ?"
"রইস উদ্দিনের দূর সম্পর্কের এক চাচাতো ভাই আছে, আজমল। ধূর্ত আর লোভী এক মহাজন। সর্দার সাহেব একবার চিকিৎসার খরচের জন্য তার কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়েছিলেন। সেই ঋণের জালে এখন রইস সর্দার বন্দি। আজমলের নজর পড়েছে রূপসার ওপর। সে রূপসাকে বিয়ে করতে চায়, আর রইস সর্দার ঋণ শোধের কোনো উপায় না দেখে তলে তলে ভেঙে পড়েছেন। গ্রামের মানুষ সব দেখেও কিছু বলতে পারে না, আজমলের বড় জোর।"
কথাগুলো শুনে রিয়াজের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। যে মুখের সারল্য কোনো চিত্রশিল্পীর তুলির সবচেয়ে পবিত্র সৃষ্টি হতে পারে, তার পেছনে এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতার ছায়া? পরের কয়েকটা দিন রিয়াজ আর ক্যামেরার পেছনে লুকিয়ে রইল না। সে প্রতিদিন বিকেলে বিলের ধারে ইজেল বসিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করল। রূপসা প্রথম দিন দূর দিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু রিয়াজের শান্ত ডাক তাকে থামিয়ে দিল।
"রূপসা... একটু দাঁড়াবে?"
রূপসা থমকে দাঁড়াল। গ্রামের কোনো পরপুরুষ তার নাম ধরে এভাবে নরম গলায় কোনোদিন ডাকেনি। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, ভ্রূ কুঁচকে বলল, "আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? আর আমার ছবিই বা কেন আঁকছেন?"
রিয়াজ হাসল। সেই হাসিতে কোনো চাতুর্য ছিল না, ছিল নিখাদ প্রশান্তি। সে ক্যানভাসটা একটু ঘুরিয়ে দেখাল। রূপসা ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে গেল।
রঙে রঙে ফুটে উঠেছে সে নিজেই,তবে শুধু তার শরীরী অবয়ব নয়, তার চোখের গভীরে জমে থাকা একাকীত্ব, তার বিষাদ, আর বিলের জলের প্রতি তার ভালোবাসা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে কাপড়ের ওপর।
"এ... এটা আমি?" রূপসা অস্ফুটে বলল।
"না, এটা আমার দেখা এই পৃথিবীর সবচেয়ে মায়াবী পরী," রিয়াজ মৃদু গলায় উত্তর দিল।
রূপসার ফ্যাকাশে গালে এক চিলতে লাজুক রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু সেদিন সে আর পালিয়ে গেল না। দূরত্বের সীমানা বজায় রেখেই সে বিলের পাড়ে ঘাসের ওপর বসল। রিয়াজ ছবি আঁকার ছলে তার সাথে কথা বলতে লাগল,শহরের কথা, আকাশের রঙের কথা, তার আর্ট কলেজের দিনগুলোর কথা। আর রূপসা মুগ্ধ হয়ে শুনল। সে এতদিন শুধু নদীর গান আর পাখিদের ডাক শুনেছে, মানুষের কথায় যে এত সুধা থাকতে পারে, তা তার জানা ছিল না।
দিন গড়াতে লাগল। বিকেলের সেই ঘণ্টা দুয়েক সময় যেন দুজনের কাছেই পুরো চব্বিশ ঘণ্টার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত হয়ে উঠল। রূপসা আর শুধু মডেল রইল না; সে হয়ে উঠল রিয়াজের ধ্যান, তার অনুপ্রেরণা। রিয়াজ খেয়াল করল, রূপসার হাতের ছোঁয়ায় যখন কোনো শুকনো ডাল নড়ে ওঠে, কিংবা সে যখন বিলের পদ্মফুল ছুঁয়ে আলতো করে হাসে, তখন পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি যেন মুছে যায়।
একদিন রূপসা নিজের হাতে তৈরি চালের গুঁড়োর নাড়ু আর সুপারি পাতার ঠোঙা নিয়ে এলো রিয়াজের জন্য। শিমুল গাছের ছায়ায় বসে রিয়াজ যখন পরম তৃপ্তিতে তা খাচ্ছিল, রূপসা হঠাৎ বিষণ্ণ সুরে বলল, "আপনি তো ছবি আঁকা শেষ হলে শহরে ফিরে যাবেন, তাই না রিয়াজ ভাই?"
রিয়াজ খাওয়া থামিয়ে রূপসার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এক গোপন হাহাকার। রিয়াজ হাত বাড়িয়ে রূপসার কাঁপা কাঁপা হাতটা আলতো করে ছুঁল। রূপসা হাত সরিয়ে নিল না।
"তোমাকে ফেলে আমি কোথাও যাব না রূপসা। তোমাকে দেখার পর থেকে আমার সব রঙ, সব স্বপ্ন তোমাতেই শেষ হয়ে গেছে। তুমি কি আমার সাথে যাবে?"
রূপসা চমকে উঠল। তার চোখের কোণে চকচক করে উঠল জল। সে মাথা নিচু করে বলল, "আমার ভাগ্যে স্বপ্ন দেখতে নেই। আজমল মহাজনের খাঁচায় আমার দম বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এসেছে। বাবা রোজ রাতে কাঁদে। আমি মরলে যদি বাবার মুক্তি হয়, আমি মরতেই রাজি।"
রিয়াজ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "তুমি মরবে কেন? আমি থাকতে কোনো মহাজন তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। রূপসা, আমি তোমাকে ভালোবাসি। এ কোনো ক্ষণিকের মোহ নয়, এ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যি।"
রূপসা রিয়াজের বুকে মুখ লুকিয়ে নীরবে কেঁদে ফেলল। নিঃশব্দে এক পবিত্র প্রেম জন্ম নিল নীলপদ্ম বিলের পাড়ে, যেখানে সাক্ষী রইল কেবল বিকেলের মৃদু হাওয়া আর ফুটে থাকা বুনো শিমুল।কিন্তু প্রেমের পথ কখনোই মসৃণ হয় না। বিশেষ করে যে সমাজে মানুষের প্রাণের চেয়ে টাকার দাম বেশি।
রিয়াজ আর রূপসার বিলের পাড়ে দেখা করার খবর কোনোভাবে পৌঁছে গেল আজমল মহাজনের কানে। টাকার গরমে অন্ধ আজমল রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠল। তার চোখে রূপসা কোনো মানুষ ছিল না, ছিল এক পরম লোভনীয় সম্পদ, যা সে যেকোনো মূল্যে নিজের অধিকারে রাখতে চায়।
মাঘের এক কনকনে শীতের রাতে রইস উদ্দিন সর্দারের উঠোনে এসে দাঁড়াল আজমলের লাঠিয়াল বাহিনী। লণ্ঠনের রক্তিম আলোয় আজমল কুটিল হেসে বলল, "সর্দার, তোমার মেয়াদ ফুরাইয়া গেছে। কাল সকালের মধ্যে সুদে-আসলে পঞ্চাশ হাজার টাকা আমার টেবিলে ফেলবা। নাইলে পরশুদিন কাজী ডাইকা তোমার মাইয়াকে আমার ঘরে তুলব। আর ওই যে শহরের ভিখারি পেইন্টার গাঁয়ে ঘুরঘুর করছে, ওরে যদি কালকের পর গাঁয়ে দেখি, ওর দুই হাত কাইটা বিলে ভাসাইয়া দিমু। ছবি আঁকার শখ আমি চিরতরে মিটাইয়া দেব!"
রইস উদ্দিন আজমলের পা জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, "আজমল ভাই, আমার ভিটেটা লেইখা নেন, তবু আমার বুক খালি কইরেন না। রূপসা আমার চোখের মণি, ওরে আপনি দয়া করেন!"
আজমল এক লাথিতে বৃদ্ধ রইস উদ্দিনকে ফেলে দিয়ে চলে গেল।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল রূপসা। তার বুকের ভেতরটা যেন শত টুকরো হয়ে ভেঙে গেল। সে বুঝতে পারল, রিয়াজ এখানে থাকলে তার জীবন বিপন্ন হবে। আজমলের গুণ্ডারা যেকোনো সময় তাকে খুন করতে পারে।
সে রাতেই চুপিচুপি রূপসা বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। কুয়াশাচ্ছন্ন মেঠোপথ পেরিয়ে সে কাশেম মাস্টারের চিলেকোঠার জানালার নিচে এসে দাঁড়াল।
জানালার শিক ধরে রিয়াজ তখনো রূপসার কথা ভাবছিল। রূপসাকে এভাবে রাতের আঁধারে আসতে দেখে সে শিউরে উঠল, দ্রুত নিচে নেমে এলো।
"রূপসা! এই মাঝরাতে তুমি এখানে? কী হয়েছে?"
রূপসার চোখের জল তখন বরফ হয়ে গেছে। সে শান্ত, কঠোর গলায় বলল, "রিয়াজ ভাই, আপনি এখনই এই গ্রাম ছেড়ে চলে যান। প্রথম ট্রেনে শহরে ফিরে যান।"
রিয়াজ হতবাক হয়ে গেল, "কী বলছ তুমি? আমি তোমাকে ফেলে কোথাও যাব না!"
"যেতেই হবে আপনাকে," রূপসা তার হাতদুটো চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল, "আজমল আপনাকে মেরে ফেলবে! বাবার ঋণের বিনিময়ে আমি কাল ওর ঘরে যাব। আমার জন্য আপনি নিজের জীবন নষ্ট করবেন না। আমি আপনাকে ভালোবাসি বলেই আপনার কোনো ক্ষতি দেখতে পারব না। আপনার পায়ে পড়ি, আপনি চলে যান!"
রিয়াজ রূপসার কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, "তুমি ভাবলে কী করে আমি পালিয়ে যাব? পঞ্চাশ হাজার টাকা তো? আমি কাল সকালেই শহরে যাচ্ছি। আমার পরিবারের জমানো কিছু টাকা আছে, আমার আঁকা ছবি বিক্রি করা টাকা আছে। আমি বিকেলের মধ্যে টাকা নিয়ে ফিরব। তুমি শুধু কাল বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করো রূপসা। আল্লাহর ওপর আর আমার ওপর একটু ভরসা রাখো!"
রূপসা অশ্রুসজল চোখে রিয়াজের দিকে তাকাল। রিয়াজের চোখে যে আগুন আর প্রতিজ্ঞা সে দেখল, তাতে এক মুহূর্তের জন্য তার হতাশ হৃদয়ে আশার প্রদীপ জ্বলে উঠল। রূপসা ফিসফিস করে বলল, "আমি কাল গোধূলিলগ্ন পর্যন্ত শিমুলতলায় আপনার জন্য অপেক্ষা করব রিয়াজ ভাই। যদি আপনি না আসেন... তবে জানবেন, রূপসা আর কারও হবে না, রূপসা নীলপদ্ম বিলের অতল জলেই চিরদিনের মতো হারিয়ে যাবে।"
ভোর হতে না হতেই রিয়াজ প্রথম বাসে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। শীতের ঘন কুয়াশায় বাস চলছিল ধীরগতিতে। প্রতিটি মিনিট যেন একেকটা যুগ বলে মনে হচ্ছিল রিয়াজের কাছে।
শহরে পৌঁছে সে এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। ব্যাংকে গিয়ে তার জমানো সব সঞ্চয় তুলল, বন্ধুদের কাছে হাত পাতল, আর আর্ট গ্যালারির মালিকের কাছে গিয়ে তার সবচেয়ে প্রিয় তিনটি বড় পেইন্টিং পানির দামে বিক্রি করে দিল। সব মিলিয়ে যখন তার ব্যাগে পঞ্চান্ন হাজার টাকা জমা হলো, তখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর বারোটা বেজে গেছে।
কিন্তু আসল পরীক্ষা শুরু হলো ফেরার পথে। উপজেলা সদরে এসে রিয়াজ যখন গ্রামের শেষ লোকাল বাসে উঠতে যাবে, তখন ঝমঝম করে আকাশ ভেঙে নামল অকাল বর্ষণ। শীতের মেঘভাঙা বৃষ্টিতে কাঁচা রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত হয়ে গেল। আধা পথ যাওয়ার পর বিকট শব্দে বাসের এক্সেল ভেঙে গাড়ি থেমে গেল কাদার মধ্যে। চারপাশ জনমানবহীন, নিঝুম মাঠ আর বৃষ্টি।
ঘড়িতে তখন বিকেল চারটা। আর মাত্র এক ঘণ্টা পর সূর্য ডুববে। গোধূলির আলো মিলিয়ে যাবে অন্ধকারে।
রিয়াজ আর বাসের মেরামতের জন্য অপেক্ষা করল না। কাঁধে টাকার ব্যাগটা শক্ত করে বেঁধে সে কাদার ওপর নেমে পড়ল। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির মধ্যে সে পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করল ডোমনাচরের দিকে।
পায়ের জুতো কাদায় আটকে ছিঁড়ে গেল, সে খালি পায়েই ছুটল। কাঁটাঝোপে তার পা রক্তাক্ত হলো, বৃষ্টিতে ভিজে শরীর জমে বরফ হয়ে এলো, তবু সে থামল না। তার চোখের সামনে কেবল ভাসছে রূপসার সেই শেষ আকুল চাহনি,"যদি আপনি না আসেন, রূপসা নীলপদ্ম বিলের অতল জলেই চিরদিনের মতো হারিয়ে যাবে..."
"না! আমি তোমাকে হারাতে দেব না রূপসা! আমি আসছি!" রিয়াজ চিৎকার করে উঠল বাতাসের সাথে লড়াই করতে করতে।
এদিকে ডোমনাচরের পরিস্থিতি তখন চরম রূপ নিয়েছে। আজমল মহাজন কাজী আর কয়েকজন লাঠিয়াল নিয়ে রইস উদ্দিনের বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। রইস সর্দার দাওয়ায় মাথা চাপড়ে কাঁদছেন। আজমল চিৎকার করে বলছে, "কই সর্দার, তোমার টাকা? সময় শেষ! এবার রূপসাকে বের করো। কাজীর সামনে কবুল বললেই সব ঋণ মাফ।"
ঘরের ভেতর থেকে রূপসা বেরিয়ে এলো। তবে সে কোনো বিয়ের সাজে সাজেনি। তার গায়ে ছিল সেই প্রথম দিনের বাসন্তী চাদর, চুলগুলো খোলা, আর মুখখানা পাথরের মতো ভাবলেশহীন।
আজমল কুৎসিত হেসে বলল, "বাহ্, পরী তো তৈরি! আসো, খাতায় সই করো।"
রূপসা আজমলের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার কণ্ঠে ছিল আশ্চর্য এক হিমশীতল দৃঢ়তা, "মহাজন, গোধূলির এক ফোঁটা আলোও যতক্ষণ আকাশে আছে, ততক্ষণ দিনের শেষ হয়নি। আমি বিলের ধারে যাচ্ছি। সূর্য পুরোপুরি ডুবলে তবেই তোমার কাজী ডাকবে। যদি তার আগে আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করো, তবে আমার এই গলার শিরা আমি নিজের হাতে বঁটি দিয়ে কেটে ফেলব। তুমি জ্যান্ত রূপসাকে পাবে না, পাবে একটা লাশ।"
রূপসার হাতের বঁটি আর তার চোখের উন্মাদের মতো দৃষ্টি দেখে আজমলের মতো পাষণ্ডও এক পা পিছিয়ে গেল। আজমল দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "ঠিক আছে! আধা ঘণ্টা পর সূর্য ডুববে। তুই বিলের ধারেই থাকবি। ওখানেই কাজী নিয়ে আমি আসছি। দেখি তোর কোন পরদেশি নাগর তোরে বাঁচাতে আসে!"
রূপসা ধীর পায়ে হেঁটে নীলপদ্ম বিলের শিমুলতলায় এসে দাঁড়াল। বৃষ্টি থেমে এসেছে, কিন্তু মেঘলা আকাশে সূর্য ডোবার আয়োজন দ্রুত এগোচ্ছে। পশ্চিম আকাশের এক চিলতে লাল আভা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে কালচে নীল অন্ধকারে। রূপসা বিলের জলের দিকে তাকাল। জল যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
"রিয়াজ ভাই... তুমি কি এলে না?" রূপসার চোখ বেয়ে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল শীতল জলে।
সে জলের ভেতর এক পা বাড়াল। জল তার হাঁটু স্পর্শ করল। আরেকটু সামনেই অতল খাদ, যেখানে ডুব দিলে আর কোনোদিন ভেসে উঠতে হবে না, কোনো মহাজনের নোংরা হাত তার শরীর ছুঁতে পারবে না।
পেছন থেকে আজমল মহাজনের লাঠিয়ালদের উল্লাস আর হাসির শব্দ ভেসে এলো। তারা বিলের ঘাটে এসে পৌঁছেছে। আজমল চিৎকার করে বলল, "ধরে আন মাগীরে! পানি থেকে টেনে তোল!"
রূপসা চোখ বন্ধ করল। সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে শেষ পদক্ষেপটা নিতে গেল,
"রূপসাআআআ!"
বাতাস চিরে এক আর্তচিৎকার ভেসে এলো বাঁশঝাড়ের ওপার থেকে।
রূপসা চমকে চোখ খুলল।
কাদায় মাখামাখি, কাপড়ে রক্তের দাগ, খালি পায়ে পাগলের মতো দৌড়ে আসছে একটি ছেলে। তার চোখ দুটো যেন জ্বলন্ত অঙ্গার, হাঁপাতে হাঁপাতে সে বিলের পাড়ে এসে আছড়ে পড়ল।
"রূপসা... আমি এসেছি! যেও না রূপসা!" রিয়াজ জলে নেমে এক ঝটকায় রূপসাকে নিরাপদে জড়িয়ে নিল।
রূপসা রিয়াজের ভেজা বুকে মুখ গুঁজে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। এতক্ষণের জমে থাকা সমস্ত ভয়, শঙ্কা আর অভিমান এক মুহূর্তে ধুয়েমুছে গেল।
আজমল এগিয়ে এসে কর্কশ গলায় বলল, "এই ছোকরা, হাত ছাড়! নাটকের সময় শেষ। এক লাখ টাকা ছাড়া রূপসা এখান থেকে নড়বে না!"
রিয়াজ রূপসাকে নিজের পেছনে আড়াল করে দাঁড়াল। সে কাঁধের ব্যাগটা খুলে সজোরে আজমলের পায়ের কাছে ছুঁড়ে মারল। ভেজা নোটের তাড়াগুলো ছড়িয়ে পড়ল কাদার ওপর।
"এই নাও তোমার টাকা আজমল মহাজন!" রিয়াজ গর্জে উঠল, "পঞ্চাশ হাজার তো নয়, পঞ্চান্ন হাজার আছে এখানে। পাঁচ হাজার টাকা তোমার সুদের সুদ! রইস চাচার ঋণের খাতা এখনই ছিঁড়ে ফেলো, আর কোনোদিন যদি এই বাড়ির দিকে চোখ তুলেছ, তবে এই গ্রামের মানুষ আর পুলিশ মিলে তোমাকে শ্রীঘরে পাঠাবে!"
কাশেম মাস্টার ইতিমধ্যে গ্রামের সাধারণ মানুষদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। রিয়াজের সাহসিকতা আর আত্মত্যাগ দেখে এতদিনের ভীত গ্রামবাসীরাও যেন এক হয়ে গর্জে উঠল। তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে আজমলের লোকদের ঘিরে ফেলল।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আজমল টাকাগুলো কাদা থেকে কুড়িয়ে নিয়ে থুতু ফেলে সঙ্গীদের নিয়ে লেজ গুটিয়ে পালাল। গ্রামের মানুষের তাকবির আর জয়ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল বিলের বাতাসে।
পৌষের শেষ পেরিয়ে বসন্তের আগমন ঘটল ডোমনাচরে।
শিমুল গাছে তখন আগুন লেগেছে লাল টটকফে ফুলে। নীলপদ্ম বিলে নতুন পাতার ফাঁকে ফুটে উঠেছে শত শত রক্তকমল।
কাশেম মাস্টারের উঠোনে আজ উৎসবের আমেজ। পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছে রইস উদ্দিন সর্দারের উঠোনে। খুশির সুর বাতাসে ভাসছে। আজ রূপসা আর রিয়াজের বিয়ে। গ্রামের মানুষের দোয়ায় সিক্ত হয়ে রইস সর্দার নিজের হাতে তার চোখের মণিকে তুলে দিচ্ছেন এক আদর্শ যুবকের হাতে, যে কেবল রূপসার রূপ ভালোবাসেনি, ভালোবেসেছে তার আত্মাকে।
রূপসা আজ সেজেছে লাল বেনারসিতে। তার কপালে স্নিগ্ধ লাজুকতা, হাতে কাঁচের চুড়ি। কিন্তু তার চোখে সেই চিরচেনা সারল্য আর গভীর মায়া এতটুকু ম্লান হয়নি। বিদায়বেলায় রিয়াজ যখন রূপসার হাত ধরে নৌকায় তুলল, রূপসা একবার ফিরে তাকাল তার চিরচেনা নীলপদ্ম বিলের দিকে। বাতাস যেন শিমুল ফুল ঝরিয়ে তাদের পথ রাঙিয়ে দিল।
রিয়াজ রূপসার চিবুক ছুঁয়ে ভালোবেসে বলল, "সবাই তোমাকে মায়ার পরী বলত কেন, জানো?"
রূপসা মিষ্টি হেসে চোখ নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেন?"
"কারণ, পরীরা কেবল রূপের মোহে মানুষকে বাঁধতে পারে, কিন্তু তুমি মানুষের মনকে ভালোবেসে বেঁধে ফেলো। তোমার এই মায়ার কাছে আমার সমস্ত তুলি, সমস্ত রঙ, এমনকি আমার গোটা জীবনও চিরকালের জন্য সঁপে দিয়েছি।"
নৌকা এগিয়ে চলল দূর দিগন্তের দিকে। আর নীলপদ্ম বিলের শান্ত ঢেউগুলো তাদের পেছনে এঁকে দিয়ে গেল এক অনন্ত, অপার্থিব ভালোবাসার রূপকথা।