Story

মনের অসুখ

October 23, 2026

20 views

শহরের রাজপথ তখন সন্ধ্যার নিওন আলো আর গাড়ির কর্কশ হর্নে হাঁপিয়ে উঠেছে। অক্টোবরের শেষ দিক, বাতাসে হালকা হিমেল ছোঁয়া। ধানমন্ডির সাত নম্বর রোডের শেষ মাথায় একতলা পুরোনো বাংলো ধাঁচের বাড়িটার বারান্দায় কাঠগোলাপের গাছটার নিচে একটি কাঠের ছোট্ট নেমপ্লেট ঝুলছে,‘ডা. ফারহান আহমেদ, সাইকিয়াট্রিস্ট’। ফারহান পেশায় মনের চিকিৎসক। বয়স বত্রিশের কোঠায়, শান্ত গভীর চাহনি আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা একচিলতে ম্লান হাসি তার নিয়মিত ট্রেডমার্ক। মানুষের ভেতরের ভাঙচুর, অপ্রকাশিত কান্না আর গোপন দীর্ঘশ্বাসগুলো প্রতিদিন শুনতে শুনতে ফারহান নিজেই যেন এক আস্ত পাথর হয়ে উঠেছে। তার কাছে মন মানে স্রেফ কিছু নিউরোট্রান্সমিটারের রাসায়নিক ওঠা-নামা,ডোপামিন, সেরোটোনিন আর নর-এপিনেফ্রিনের খেলা। মন খারাপ মানেই হরমোনের ঘাটতি, আর প্রেম মানে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টারের ক্ষণিকের মোহ। অন্তত ফারহান নিজের জীবনকে এই সমীকরণেই বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু জীবন তো কোনো প্রেসক্রিপশনের সাদা পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সারাদিনের দীর্ঘ রোগী দেখার পর ফারহান যখন চেম্বার বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই রিসেপশনিস্ট রফিক এসে মৃদু টোকা দিল দরজায়।

"স্যার, একজন পেশেন্ট এসেছেন। কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই, কিন্তু খুব জরুরি বলছেন।"

ফারহান ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত আটটা পঁয়তাল্লিশ। কাজের নিয়মে সে অত্যন্ত কঠোর, কিন্তু রফিকের অনুরোধের চেয়েও বাইরে থেকে ভেসে আসা একটা মৃদু অস্থির পায়ের আওয়াজ তাকে টানল।

"আসতে বলো," ফারহান ফাইলটা বন্ধ করতে করতে বলল।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল একটি মেয়ে। পরনে গাঢ় নীল রঙের তাঁতের শাড়ি, কাঁধে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগ, এলোমেলো খোঁপা করা চুল। মেয়েটির বয়স ছাব্বিশ-সাতাইশের বেশি হবে না। মুখে কোনো প্রসাধন নেই, তবে চোখ দুটো অতিরিক্ত বড় আর ক্লান্ত। সেই চোখের ভেতর অদ্ভুত এক তীব্র অস্থিরতা, যেন কোনো অতল গহ্বরে ডুবতে ডুবতে শেষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে।

"বসুন," ফারহান পেশাদার গলায় বলল। মেয়েটি চেয়ারে বসল। টেবিলে রাখা কাঁচের পানির গ্লাসটার দিকে একবার তাকাল, কিন্তু হাত বাড়াল না।

ফারহান প্যাড এগিয়ে নিয়ে কলমের ক্যাপ খুলল, "নাম?"

"মায়া। পুরো নাম অতসী চৌধুরী মায়া।"

"বলুন মায়া, কী সমস্যা আপনার? কীভাবে সাহায্য করতে পারি?"

 মায়া ফারহানের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা বা কাঁপুনি নেই, অদ্ভুত এক শান্ত দৃঢ়তা, "ডাক্তার সাহেব, আমার মনে হয় আমার একটা কঠিন মনের অসুখ হয়েছে। এই শহরের সেরা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে তাই এসেছি।" ফারহান মৃদু হাসল, "কী সেই অসুখ?"

"আমি কাউকে ভুলতে পারছি না। আর এই না ভুলতে পারাটা এখন আমার শ্বাসরোধ করে ফেলছে। স্মৃতিরা যখন ক্যানসারের মতো কোষগুলোকে কুরে কুরে খায়, মেডিকেলের ভাষায় তাকে কী বলে ডাক্তার সাহেব?"

 ফারহান বহু মানুষের কান্নার গল্প শুনেছে। কিন্তু মায়ার এই স্পষ্টোচ্চারিত প্রশ্ন তাকে এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ করে দিল। সে কলমটা টেবিলে রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।

"মেডিকেলের ভাষায় এটাকে জটিল গ্রিফ (Complicated Grief) বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের অংশ বলা যায়। কিন্তু আপনি যেভাবে বলছেন, এটা বিজ্ঞানের চেয়ে সাহিত্যের দিকে বেশি চলে যায়। কী হয়েছিল আপনার?"

মায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ দিয়ে কোনো জল পড়ল না, কেবল বুকের খাঁচায় আটকে থাকা এক সমুদ্র বাতাস বাইরে বেরিয়ে এলো। "তিন বছর আগে এক বিকেলে আমার বাগদান ভেঙে যায়। মানুষটি যাকে আমি নিজের আত্মার সমতুল্য ভাবতাম, সে স্রেফ একটি মেসেজ পাঠিয়ে অন্য এক জীবনে চলে গেছে। তিন বছর ধরে আমি ভালো থাকার অভিনয় করছি। হাসছি, চাকরি করছি, পরিবারের যত্ন নিচ্ছি। কিন্তু ডাক্তার সাহেব, একা হলেই আমার মনে হয় ঘরের দেয়ালগুলো সংকুচিত হয়ে আমাকে পিষে ফেলছে। আমি ওর মুখটা স্মৃতি থেকে মুছতে চাই। কোনো ট্যাবলেট কি আছে, যা খেলে মানুষ অতীত ভুলে যেতে পারে?"

ফারহান কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে মায়ার মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, "স্মৃতি মুছে ফেলার কোনো ওষুধ চিকিৎসাবিজ্ঞানে নেই মায়া। তবে স্মৃতিগুলোকে সহ্য করার শক্তি বাড়ানোর ওষুধ আছে। ওষুধ আপনার ঘুম এনে দেবে, বুকের ধড়ফড়ানি কমাবে, কিন্তু মনের ক্ষত সারাতে সময় লাগে। আর সেই সময়টাতে আপনাকে নিজের মুখোমুখি হতে হবে।"

সেদিন ফারহান কিছু হালকা অ্যান্টি-অ্যাংজাইটি ওষুধ লিখে দিল, আর প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় একটি করে থেরাপি সেশনের সময় নির্ধারণ করে দিল। মায়া প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল, মৃদু মাথা নুইয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। ফারহান জানলার কাঁচ দিয়ে দেখল, নীল শাড়ি পরা মেয়েটি একা হেঁটে মিলিয়ে যাচ্ছে ধানমন্ডির কুয়াশাচ্ছন্ন রাজপথে। এক অদ্ভুত অনুভূতি তার বুকের ভেতর চুঁইয়ে পড়ল, যা তার কোনো মেডিকেল টেক্সটবুক কোনোদিন শেখায়নি।
শনিবারের সন্ধ্যাগুলো খুব দ্রুতই ফারহানের ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে অপেক্ষার দিন হয়ে উঠল। মায়া প্রতি শনিবার ঠিক সাতটায় আসত। সে নিয়ম মেনে ওষুধ খেত, ফলে তার চোখের নিচের কালচে দাগগুলো একটু ফিকে হতে শুরু করেছিল। তবে ফারহান বুঝতে পারল, মায়ার অসুখটা স্রেফ বিষণ্ণতা নয়; তার অসুখটা হলো তীব্র শূন্যতাবোধ। সে নিজেকে কোনো এক অতীতের দ্বীপে নির্বাসন দিয়ে রেখেছে, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো ইচ্ছাই তার নেই।

তৃতীয় সেশনে মায়া কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেল। ফারহান জিজ্ঞেস করল, "থেমে গেলেন কেন?"

মায়া ডায়েরির পাতা থেকে চোখ তুলে ফারহানকে দেখল, "ডাক্তার সাহেব, আপনি সবসময় আমার মনের অসুখ নিয়ে প্রশ্ন করেন। আপনার মন কি কখনো অসুস্থ হয়নি? আপনার এই গম্ভীর চোখের পেছনে কি কোনো গল্প নেই?"

ফারহান চমকে উঠল। সাইকিয়াট্রিতে থেরাপিস্ট আর পেশেন্টের মধ্যে একটা অদৃশ্য প্রাচীর থাকে, যাকে প্রফেশনাল বাউন্ডারি বলে। ফারহান সবসময় সেই দেওয়াল শক্ত হাতে পাহারা দিয়ে এসেছে। কিন্তু মায়ার সহজ প্রশ্নের মুখে সেই দেওয়াল কেমন যেন একটু টলে উঠল।

ফারহান মৃদু হেসে বলল, "আমি চিকিৎসক মায়া, এখানে গল্পটা আপনার।"

"সব চিকিৎসকই কি পাথর হন?" মায়া অনুযোগের সুরে বলল, "পাথরের সাথে কথা বললে তো মন ভালো হয় না।"

ফারহান কলমটা নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, "পাথর হতে হয় মায়া। প্রতিদিন এত এত মানুষের ভাঙা মনের ভার বইতে হলে নিজেকে একটু শক্ত না রাখলে ভেঙে পড়তে হয়।"

"তাহলে আপনি মানুষ নন, কাঠামো," মায়া নিঃশব্দে হাসল। সেই প্রথম ফারহান মায়ার মুখে এক চিলতে অকৃত্রিম হাসি দেখল। সেই হাসিতে কোনো মেঘ ছিল না, ছিল নিখাদ সরলতা। ফারহানের বুকের ভেতর অচেনা এক তার যেন টুং করে বেজে উঠল।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটতে লাগল। থেরাপির সেশনগুলো ধীরে ধীরে কেবল একতরফা কাউন্সিলিংয়ে সীমাবদ্ধ রইল না। তারা কথা বলত জীবন নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে, শহরের একাকিত্ব নিয়ে, ভ্যান গঘের ছবির হলুদ রঙের বিষাদ নিয়ে। ফারহান দেখল, মায়ার চিন্তাগুলো কতটা স্বচ্ছ, কতটা গভীর। তার শিল্পবোধ, তার কথার মায়া ফারহানকে মুগ্ধ করতে শুরু করল। ফারহান বুঝতে পারল, সে এক বিপজ্জনক খেলায় নেমেছে। যে মানুষটির মন সারাতে সে বসেছে, অজান্তেই সে সেই মানুষটির প্রেমে পড়তে শুরু করেছে। একজন সাইকিয়াট্রিস্টের জন্য তার রোগীর প্রেমে পড়া পেশাগত নীতিবিরুদ্ধ, কিন্তু হৃদয়ের নিয়ম যে কোনো এথিক্স মানে না।

একদিন বৃষ্টির সন্ধ্যায় মায়ার সেশন শেষ হলো। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। ধানমন্ডির রাস্তায় হাঁটু সমান জল জমে গেছে, কোনো সিএনজি বা রিকশা মিলছে না। মায়া ক্লিনিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে জল দেখছিল। ফারহান এসে দাঁড়াল পাশে।

"আপনাকে নামিয়ে দেব? আমার গাড়ি আছে।"

মায়া একটু ইতস্তত করল, তারপর বলল, "আপনাকে কষ্ট দেব না।"

"কষ্টের কিছু নেই। এই বৃষ্টিতে গাড়ি ছাড়া আপনি ফিরতে পারবেন না।"

গাড়ির কাঁচ বেয়ে জলের ধারা নামছে। ভেতরটায় নরম এসি আর শান্ত মিউজিক। শহরটা যেন এক জলমগ্ন স্বপ্নপুরী। পেছনের সিটে না বসে মায়া সামনে ফারহানের পাশেই বসেছিল।

হঠাৎ সিগন্যালে গাড়ি থামতেই মায়া ফারহানের দিকে তাকাল। "ফারহান সাহেব, গত এক মাসে আমি লক্ষ্য করেছি, আপনি এখন আর খুব বেশি প্রেসক্রিপশন লেখেন না। আমার কি মনের অসুখটা সেরে যাচ্ছে?"

ফারহান স্টিয়ারিং হুইলে হাত শক্ত করে ধরে রাখল। বৃষ্টির আবছা আলোয় মায়ার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের রক্ত দ্রুত বইতে লাগল।

"আপনি কি ওষুধ ছাড়া ঘুমাতে পারছেন এখন?" ফারহান পাল্টা প্রশ্ন করল।

"ওষুধ ছাড়া হয়তো পারছি না, তবে..." মায়া একটু থামল, তার চোখ দুটো ফারহানের চোখে স্থির হলো, "এখন আর একা হলে ঘরের দেওয়াল আমাকে পিষে ফেলে না। এখন আমি শনিবারের সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করি। এটা কি অসুখের লক্ষণ, নাকি ভালো হয়ে যাওয়ার লক্ষণ?"

ফারহানের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। সে বুঝতে পারল, মায়া কী বলতে চাইছে। কিন্তু তার ভেতরের পেশাদার চিকিৎসক চিৎকার করে উঠল,না, এটা ট্রান্সফারেন্স (Transference), থেরাপির সময় রোগী চিকিৎসকের ওপর আবেগীয় নির্ভরতা তৈরি করে ফেলে, এটা ভালোবাসা নয়। ফারহান নিজেকে সামলে নিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, "এটা রিকভারির একটা ধাপ মায়া। নির্ভরতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, তবে সময়ের সাথে সাথে আপনি একা বাঁচতেও শিখে যাবেন।"

মায়ার চোখের দীপ্তি এক মুহূর্তে নিভে গেল। সে দৃষ্টি সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। বাকি পথটুকু দুজনের মাঝে আর কোনো কথা হলো না। শুধু নীরবতা আর বৃষ্টির শব্দ। সেই রাতের পর থেকে মায়া আর থেরাপিতে এলো না। পরের শনিবার ফারহান চেম্বারে বসে অস্থিরভাবে অপেক্ষা করল। ঘড়ির কাঁটা সাতটা পেরিয়ে আটটা, আটটা পেরিয়ে নয়টা বাজল। মায়া এলো না। কোনো ফোন নেই, কোনো বার্তা নেই।

ফারহান নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল,এটাই তো স্বাভাবিক। একজন রোগী সুস্থ হয়ে গেলে চিকিৎসকের কাছে আর কেন আসবে? এটাই নিয়ম। কিন্তু তার মন সেই যুক্তি মানতে চাইল না। চেম্বারের নীরবতা তাকে গ্রাস করতে লাগল। যে বইগুলো সে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ত, সেগুলোর পাতায় এখন কেবল মায়ার মুখ ভেসে ওঠে। ফারহান বুঝতে পারল, সে রোগীর মন সারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজের মনে এমন এক দুরারোগ্য অসুখ বাঁধিয়ে বসেছে যার কোনো প্রেসক্রিপশন তার জানা নেই।

দুই সপ্তাহ পর। সন্ধ্যায় ফারহান চেম্বার থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল ক্লিনিকের গেটের বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে মায়া। তবে আজ তার পরনে নীল শাড়ি নেই, সাদা একটি সালোয়ার-কামিজ। মুখে এক অদ্ভুত রূপান্তর।

ফারহান দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল, "মায়া? আপনি আসেননি কেন গত দুই সপ্তাহ? আপনার ওষুধ তো শেষ হয়ে যাওয়ার কথা!"

মায়া মৃদু হাসল। সেই হাসিতে আর কোনো দ্বিধা বা বিষাদ নেই।

"ওষুধের আর দরকার নেই ফারহান সাহেব। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।"

ফারহানের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। "সুস্থ?"

"হ্যাঁ। আপনি বলেছিলেন না, আমার নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, এটা থেরাপির একটা ধাপ? আমি দুই সপ্তাহ নিজেকে সময় দিয়েছি। নিজের ঘরের চার দেওয়ালে একা থেকেছি, শহরের রাস্তায় একা হেঁটেছি। আমার অতীত... যে অতীত আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, বিশ্বাস করুন, গত দুই সপ্তাহে এক সেকেন্ডের জন্য তার কথা আমার মনে পড়েনি।"

ফারহান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

মায়া আরও এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখ দুটো যেন তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। "আমার অতীত স্মৃতি মুছে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার জায়গায় অন্য এক নতুন অসুখ এসে বাসা বেঁধেছে। যে অসুখে মানুষ প্রতি মুহূর্তে একটি বিশেষ মুখের জন্য আকুল হয়ে থাকে, যার গলায় কথা না শুনলে ঘুম আসে না। আমি আপনার পেশেন্ট হিসেবে নয় ফারহান, একজন সাধারণ নারী হিসেবে আজ এসেছি।"

মায়া তার কাঁধের ব্যাগ থেকে ফারহানের দেওয়া প্রেসক্রিপশনের পুরোনো প্যাডটা বের করল। সেটার ওপর লাল কালিতে লেখা ছিল ওষুধের নামগুলো। মায়া কাগজটা ফারহানের হাতে তুলে দিল।

ফারহান উল্টে দেখল, প্রেসক্রিপশনের পেছনের সাদা অংশে মায়ার পরিষ্কার হস্তাক্ষরে লেখা,

"ডাক্তার সাহেব,

আপনি মন সারাতে পারেন, কিন্তু মনের যে অসুখে কোনো ওষুধ কাজ করে না, তার দায় কি নেবেন?

আমি অতীত থেকে মুক্তি পেয়েছি, কিন্তু আপনার বর্তমানের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে চাই। আপনি কি আমার এই আজন্মের অসুখ হবেন?"

ফারহানের চোখের পাতা ভিজে এলো। এতগুলো বছর ধরে যে নিরেট পাথর সে নিজের বুকের ভেতর লালন করে এসেছে, তা যেন এক নিমিষে গলে জল হয়ে গেল। সমাজের নীতি, মেডিকেল এথিক্সের অদৃশ্য শৃঙ্খল আর আত্মসংবরণের সমস্ত দেওয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল মায়ার সেই দুটি চোখের মায়ায়।

ফারহান প্রেসক্রিপশনটা বুকের সাথে চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই বহু প্রতীক্ষিত আলো।

"মায়া," ফারহানের কণ্ঠস্বর একটু কেঁপে উঠল, "তুমি জানো না, যে অসুখ সারাতে আমি বসেছিলাম, আমি নিজেই সেই অসুখে কতদিন ধরে তিলে তিলে মরছি।"

অক্টোবরের হিমেল বাতাস বয়ে গেল তাদের দুজনের ওপর দিয়ে। নিওন আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষ তখন আর কোনো চিকিৎসক বা রোগী ছিল না। তারা ছিল দুটি ভাঙা মনের মানুষ, যারা একে অপরের ক্ষতে ভালোবাসার প্রলেপ দিয়ে পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছে।

শহরের কোলাহল তখন অনেক দূরে মিলিয়ে গেছে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে রইল এক অনন্ত সত্য,মনের আসল অসুখ হয়তো যুক্তি বা বিজ্ঞানে সারে না, তার একমাত্র দাওয়াই হলো নিঃশর্ত সমর্পণ আর একফোঁটা ভালোবাসা।

 

Picked up where you left off

Comments

Ayesha akter Shilpi was this story’s first reader

+25 XP

    Please login to post comment. Login

  • Ayesha akter Shilpi 19 hours ago First reader

    পড়তে পড়তে সুচিত্রা সেনের দীপ জ্বেলে যাই ছায়াছবির কথা মনে পড়ে গেলো। তবে আপনি ডাক্তারকে ঠকাননি। ভীষণ মুগ্ধতায় পড়লাম💗

    • Kabir Al Mamun 10 hours ago

      আপু, অনেক ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য। ভালো থাকুন।