Story

লাল শাড়ি

October 24, 2026

13 views

ভোরের কুয়াশা তখনও চরের পলিমাটি থেকে পুরোপুরি ওপরে ওঠেনি। শীতের বিদায়ী বাতাস আর ফাল্গুনের প্রথম ছোঁয়ায় মাধবীলতা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা শিশির টুপটুপ করে ঝরছিল। মেঘনা নদীর এই বাঁকে গ্রামটির নাম কুসুমপুর। নদীর ওপারের বালুচর থেকে মাছরাঙা ডানা ঝাপটে উড়াল দিল খোলা আকাশের পানে। গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার ভাঙাচোরা টিনের চালার নিচে তখন খটখট শব্দ উঠছে। শব্দটা অতি পরিচিত, অন্তত এই পাড়ার মানুষের কাছে। রহিম মিঞার তাঁত চলছে। তার শীর্ণ, রোদে পোড়া হাতের আঙুলগুলো মাকুটাকে এপাশ-ওপাশ ছুড়ে দিচ্ছে আশ্চর্য দক্ষতায়। বুড়ো বয়সের বাতের ব্যথা উপেক্ষা করে রহিম মিঞা কাজ করে চলেছেন, যেন সুতোর প্রতিটি বাঁধনে তাঁর সারাজীবনের দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে আছে।

দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল ফুলবানু। বছর আঠারোর এক তরুণী। মুখের আদলে পল্লীপ্রকৃতির স্নিগ্ধ কোমলতা, তবে তার টানা টানা চোখে জমাট বেঁধে আছে এক অদ্ভুত নীরব প্রতীক্ষা। তার গায়ে জড়ানো ধুলোমলিন সুতি শাড়ি, মাথায় আলগা করে দেওয়া ঘোমটা।

"বাবা, চা জুড়িয়ে পানি হয়ে গেল। এবার হাতটা একটু থামাও।"

রহিম মিঞা পায়ের প্যাডেল থেকে পা সরালেন। খটখট শব্দটা থেমে যেতেই সকালের শান্ত বাতাস যেন আবার ফিরে এল ঘরে। চশমার ভাঙা ফ্রেমটা নাকের ডগায় ঠেলে দিয়ে তিনি মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। একটা বিষাদের হাসি ফুটে উঠল তার কোটরগত চোখে।

"থামলে কি চলবে রে মা? আর মাত্র কয়েকটা দিন। হাটের মহাজন তো তাগাদা দিয়ে গেছে। সময়মতো দিতে না পারলে চড়া সুদ কেটে রাখবে।"

ফুলবানু এগিয়ে এসে মাটির সানকিতে রাখা লাল চায়ের বাটিটা বাবার সামনে নামিয়ে রাখল। তার চোখ গেল তাঁতের ফ্রেমে জড়ানো কাপড়টার দিকে। গাঢ় লাল রঙের সিল্কের জমিন, তার ওপরে জরির সূক্ষ্ম নকশা। সূর্যের প্রথম আলো জানালা গলে এসে ঠিক সেই লাল কাপড়ের ওপর পড়েছে, যেন এক টুকরো আগুন জীবন্ত হয়ে উঠেছে অন্ধকার মাটির ঘরে।

"শাড়িটা সত্যিই খুব সুন্দর হচ্ছে বাবা। এমন লাল রং আমি আগে কখনো দেখিনি।" মৃদু গলায় বলল ফুলবানু।

রহিম মিঞা চায়ে চুমুক দিয়ে তৃপ্তির শ্বাস ফেললেন। "হবে না? এটা তো শুধু কাপড় নয় মা, এটা হল বধূর সাজ। জমিদারের মেজ কর্তার মেয়ের বিয়ের ফরমাশি শাড়ি। খাস বেনারসী সুতো আনিয়েছেন ঢাকা থেকে। লাল রঙের এমন জৌলুস সাধারণ কাপড়ে হয় না। খাঁটি সিঁদুর রাঙা লাল।"

ফুলবানু শাড়ির আঁচলের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে পড়ে গেল গত বছরের বৈশাখী মেলার কথা। সেই মেলায় গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে আসছিল কাশেম। নৌকার মাঝি কাশেম, যার হাসিতে ছিল নদীর জোয়ারের মতো উচ্ছ্বাস। মেলায় কাঠের চুড়ি কেনার সময় কাশেম চুপিচুপি বলেছিল, "একদিন আমি পদ্মাপারের বড় হাট থেকে তোর জন্য সবচেয়ে লাল শাড়িটা কিনে আনব, ফুলি। যে শাড়ি দেখলে আকাশের সূর্যও লজ্জা পাবে।"

ফুলবানুর বুকের ভেতর কোথায় যেন চিনচিন করে ব্যথা ওঠে। কাশেম এখন কোথায়? ছয় মাস আগে ঝড়ের রাতে মহাজনের মালবাহী নৌকা নিয়ে পদ্মার মোহনায় গিয়েছিল সে। তারপর আর ফিরে আসেনি। গ্রামের লোকে বলে কাশেম আর বেঁচে নেই, অতল নদীর তলদেশে সে হারিয়ে গেছে। কিন্তু ফুলবানুর মন তা মানে না। প্রতি সন্ধ্যায় সে ঘাটে গিয়ে বসে থাকে, যদি দূর থেকে পরিচিত বৈঠার ছপছপ শব্দ ভেসে আসে।

"কী ভাবছিস রে ফুলি?" বাবার ডাকে ফুলবানুর ঘোর ভাঙল।

"কিছু না বাবা। তুমি খেয়ে নাও, আমি উঠানটা ঝাড়ু দিয়ে আসি।"

উঠানে এসে ফুলবানু বাঁশের ঝাঁটা হাতে নিল। উঠানের কোণে রক্তজবার গাছটায় লাল ফুল ফুটে আছে থোকায় থোকায়। লাল,চারিদিকে কেবল লাল রঙের ছড়াছড়ি। অথচ তার নিজের জীবনটা যেন কেমন এক ধূসর রোদহীন দুপুরের মতো বিবর্ণ হয়ে গেছে।

দুপুর গড়াতেই উঠানে এসে হাজির হলেন গফুর মহাজন। মাথায় তেল চুকচুকে টাক, পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর গলায় ঝুলছে মোটা সোনার চেন। সঙ্গে দুই পেয়াদা। গফুর মহাজন গ্রামের ধনী মানুষ, কিন্তু তার লোভের সীমা নেই। গ্রামের বহু তাঁতির জমি-জায়গা সুদের ফাঁদে ফেলে তিনি গিলে ফেলেছেন। রহিম মিঞাও তার ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা।

"কী হে রহিম মিঞা! শাড়ির কাজ কতদূর?" মহাজনের কর্কশ গলায় উঠানের পায়রাগুলো ভয়ে উড়ে গেল।

রহিম মিঞা ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এসে হাত জোড় করলেন। "আসুন মহাজন বাবু, বসুন। শাড়ির পাড় তোলার কাজ প্রায় শেষ। আর দুই দিন সময় পেলেই পুরোটা নামিয়ে ফেলতে পারব।"

মহাজন ঘরের ভেতরে উঁকি দিলেন। তাঁতের ওপর বিছানো লাল শাড়ির দীপ্তি দেখে তার চোখ চকচক করে উঠল। কিন্তু মুখে গম্ভীর ভাব এনে বললেন, "দুই দিন? জমিদার বাড়ি থেকে লোক এসেছিল। মেজ কর্তার কড়া হুকুম, কাল সন্ধ্যার মধ্যে শাড়ি পৌঁছাতে হবে। বিয়ে পরশু দিন। যদি কালকের মধ্যে না দাও, তবে পুরো বায়নার টাকা ফেরত দিতে হবে, সঙ্গে সুদের হিসেবটাও চুকিয়ে দিতে হবে।"

রহিম মিঞার মুখ শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "কাল সন্ধ্যা? বাবা মহাজন, আমার শরীরটা ভালো নেই। সারারাত জাগলেও কাল দুপুরের আগে তো শেষ করা যাবে না।"

"সেসব ওজর-আপত্তি আমি শুনতে চাই না। যদি কালকের মধ্যে না দাও, তবে তোমার ভিটেমাটি আমি নিলামে তুলব। মনে রেখো, আমার কাছে তোমার পাঁচ হাজার টাকার তমশুক সই করা আছে।" মহাজনের কণ্ঠস্বর ছিল বরফের মতো ঠান্ডা ও নিষ্ঠুর।

মহাজন চলে যাওয়ার পর রহিম মিঞা দাওয়ার খুঁটি ধরে বসে পড়লেন। ফুলবানু ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

"বাবা, তুমি ভেবো না। আমি তোমাকে সাহায্য করব। চরকায় সুতো কাটার কাজ আমি করে দেব, তুমি শুধু তাঁত চালাও।"

রহিম মিঞা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেললেন। "তোর কপালের ভাগ্যটাই এমন মা। তোকে একখানা ভালো শাড়ি কিনে দিতে পারলাম না, উল্টো আমার ঋণের বোঝা তোকে বইতে হচ্ছে।"

রাত নামল কুসুমপুর গ্রামে। চারপাশের গাছপালা ঢেকে গেল ঘন অন্ধকারে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের হাঁক ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। শুধু রহিম মিঞার ঘরে টিমটিম করে জ্বলছে কেরোসিনের কুপি।খটখট... খটখট...

শব্দটা অবিরাম চলছে। রহিম মিঞার কপালে ঘাম। ফুলবানু একমনে সুতো গুটিয়ে মাকুতে ভরে বাবার হাতে তুলে দিচ্ছে। লাল রঙের সুতোর গুটিগুলো যেন রক্তের এক একটি বিন্দু। রাতের গভীরতার সাথে সাথে রহিম মিঞার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। বুক চেপে ধরে তিনি একবার কাশলেন।

"বাবা, একটু জিরিয়ে নাও। জল খাবে?"

"না রে মা, সময় নেই। ওই নিষ্ঠুর মহাজন কাল সকালে এসে দাঁড়াবে।" রহিম মিঞা দাঁতে দাঁত চেপে আবার মাকু চালালেন।

রাত যখন শেষ প্রহরে, তখন হঠাৎ করেই মাকুর শব্দটা থেমে গেল। এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা নেমে এল ঘরে।

ফুলবানু চমকে তাকাল। রহিম মিঞা তাঁতের কাঠের ওপর ঢলে পড়েছেন। তার হাত থেকে খসে পড়েছে সুতোর মাকু।

"বাবা! বাবা!" ফুলবানু আর্তনাদ করে উঠল।

বাবার বরফের মতো ঠান্ডা শরীরটাকে নাড়া দিল সে। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। অতিরিক্ত পরিশ্রমে আর বুকের ব্যথায় বৃদ্ধ তাঁতির নিঃশ্বাস তখন ক্ষীণ হয়ে এসেছে। ফুলবানু চিৎকার করে প্রতিবেশীদের ডাকল। পাশের বাড়ির রহমান কাকা ছুটে এলেন। গ্রামের কবিরাজ এলেন লণ্ঠন হাতে নিয়ে।

কবিরাজ নাড়ি পরীক্ষা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন। "হার্টের ব্যারাম। আজ রাতটা খুব সংকটজনক। কোনো নড়াচড়া করানো যাবে না। শক্ত কোনো কাজ বা উত্তেজনা যেন একদম না হয়।"

রহমান কাকা ফুলবানুর মাথায় হাত রেখে বললেন, "মা রে, তুই ধৈর্য ধর। আল্লাহ ভরসা।"

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রহিম মিঞা বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে আছেন, কষ্টে শ্বাস নিচ্ছেন। আর ঘরের কোণে অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে সেই লাল শাড়ি। আঁচলের শেষ অংশের কারুকাজটুকু তখনও বাকি। ফুলবানু উঠে দাঁড়াল। তার চোখের জল শুকিয়ে এক অদ্ভুত জেদ ফুটে উঠল দৃষ্টিতে। এই শাড়ি যদি সময়মতো না দেওয়া যায়, তবে মহাজন তাদের এই শেষ সম্বল ভিটেমাটিটুকু কেড়ে নেবে। তার বাবাকে পথে বসাবে। যে শাড়ির জন্য তার বাবার এই অবস্থা, সেই শাড়ি তাকে শেষ করতেই হবে।

ফুলবানু কোনোদিন একা পুরো শাড়ি বোনার কাজ করেনি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সে বাবাকে দেখেছে। তাঁতের প্রতিটা কাঠির টান, সুতোর ছন্দ তার রক্তে মিশে আছে। সে গিয়ে বসল তাঁতের আসনে। ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় তার হাত কাঁপছিল। কিন্তু সে মাকু তুলে নিল। খটখট... খটখট...

আবার শব্দ উঠল। তবে এবার এই শব্দের গতি অন্যরকম। এ যেন এক অসহায় মেয়ের বাঁচার লড়াইয়ের শব্দ। সুতোয় সুতোয় সে বুনে দিতে লাগল তার সমস্ত শক্তি, তার সমস্ত ভালোবাসা আর বাবার প্রতি শ্রদ্ধা। আঙুল কেটে রক্ত বের হলো, সেই রক্ত মিশে গেল লাল সুতোর রঙ্গে। আলাদা করে বোঝার কোনো উপায় রইল না,কোনটা বেনারসী সুতোর রং আর কোনটা জীবনের তাজা রক্ত।সকাল দশটা নাগাদ মহাজন সদলবলে এসে হাজির হলেন। রহিম মিঞাকে বিছানায় শোয়া দেখে মহাজনের মুখে এক কুটিল তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

"কী হে রহিম? শাড়ি তো শেষ হয়নি দেখছি! তবে ভিটেটা এবার খালি করার ব্যবস্থা করো।"

ঠিক তখনই ঘরের পর্দা ঠেলে বেরিয়ে এল ফুলবানু। তার দুই চোখ জবাফুলের মতো লাল, সারা গায়ে সুতোর রোঁয়া। তার দুহাতে ভাঁজ করা একখানা আশ্চর্য সুন্দর লাল শাড়ি। সূর্যের আলোয় সেই শাড়ির জরির কাজ হিরের মতো জ্বলজ্বল করছে। শাড়ির লাল আভা যেন পুরো উঠানটাকে রাঙিয়ে দিল।

মহাজন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পেয়াদারা অবাক চোখে চেয়ে রইল। গ্রামের কিছু মানুষও এসে ভিড় জমিয়েছিল উঠানে, তারা বিস্ময়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।

"এই নিন আপনার শাড়ি, মহাজন মশাই," ফুলবানুর কণ্ঠস্বর ছিল শান্ত কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়। "বাবার কাজ অসম্পূর্ণ থাকেনি। পুরো হিসেব বুঝে নিন। আর আমাদের ঋণের খাতা থেকে বাবার নামটা কেটে দিয়ে যান।"

মহাজন শাড়িটা হাতে নিলেন। কাপড়ের মসৃণতা আর বুননের নিখুঁত বাঁধন দেখে কোনো খুঁত ধরার সুযোগ ছিল না। এক পা এক পা পিছিয়ে মহাজন বললেন, "ঠিক আছে... হিসেব চুকে গেল। তবে মেয়ে হয়ে তাঁত চালানো... এ গ্রামে কখনো শুনিনি।"

মহাজন শাড়ি নিয়ে চলে গেলেন। ফুলবানু ক্লান্ত পায়ে এসে বাবার বিছানার পাশে বসল। রহিম মিঞা তখন চোখ মেলে তাকিয়েছেন। তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দাশ্রু। দুর্বল হাতখানা তুলে তিনি মেয়ের মাথায় রাখলেন। কোনো কথা বললেন না, কিন্তু সেই স্পর্শে ছিল এক গভীর আশীর্বাদ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। গ্রামের মানুষ একে একে ফুলবানুর সাহসের প্রশংসা করে গেল। যে ফুলবানু ছিল লাজুক, শান্ত এক কিশোরী, সে আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু এসব প্রশংসার কোনোটিই ফুলবানুর মনের ভেতরের শূন্যতা ভরাতে পারছিল না। তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল সেই লাল শাড়ির রূপ। এমন একটা লাল শাড়ি পরেই তো তার কাশেমের ঘরে যাওয়ার কথা ছিল। সূর্য যখন পশ্চিমের দিগন্তে হেলে পড়েছে, আকাশটা আবিরে রাঙা হয়ে উঠেছে, ফুলবানু নদীর ঘাটের দিকে পা বাড়াল। নদীর পাড়ে কাশফুলের শুকনো ডালগুলো বাতাসে দুলছে। জল ছুঁয়ে আসা মৃদু হাওয়া তার এলোমেলো চুলগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছে।

ঘাটের সিঁড়িতে বসে ফুলবানু নদীর শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে রইল। নদী যেন এক অনন্ত পথ, যার কোনো শেষ নেই। লাল শাড়িটা চলে গেছে জমিদারের ঘরে। তার বাবার ঋণ হয়তো শোধ হয়েছে, কিন্তু ফুলবানুর জীবনের যে স্বপ্নগুলো সেই সুতোর মতো ছিঁড়ে গেছে, তার কী হবে?

হঠাৎ দূর থেকে এক অচেনা সুরের গান ভেসে এল। বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ।

ফুলবানু চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। নদীর বাঁক ঘুরে একটা ছোট পানসি নৌকা ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে। নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে এক জোয়ান পুরুষ, তার মাথায় গামছা বাঁধা, পরনে লুঙ্গি। রোদে পোড়া শ্যামলা মুখে সেই চিরচেনা হাসি।

"কাশেম?" ফুলবানুর ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে কি স্বপ্ন দেখছে?

নৌকা ঘাটে এসে ভিড়ল। কাশেম লাফিয়ে নামল কাদামাটিতে। তার কাঁধে একটা কাপড়ের পুঁটলি। ফুলবানুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে কাশেম এক মুহূর্ত থমকে গেল। দুজনের চোখেই অবিরল অশ্রু।

"ফুলি! তুই আমাকে ভুলে যাসনি তো?" কাশেমের গলা কাঁপছিল।

"তুই... তুই বেঁচে আছিস? সবাই যে বলল তুই আর ফিরবি না!" ফুলবানু কান্নায় ভেঙে পড়ল।

কাশেম তার পুঁটলিটা খুলে ফেলল পরম যত্নে। "ঝড়ে নৌকা ভেঙে আমি ভেসে গিয়েছিলাম দূর চরে। সেখানে এক সাধু আমাকে বাঁচিয়েছিল। সুস্থ হতে অনেক দিন লাগল। তারপর দিনমজুরি করে, খেটেখুটে টাকা জমিয়েছি। ফেরার পথে তোর জন্য একটা জিনিস নিয়ে এসেছি।"

পুঁটলির ভেতর থেকে কাশেম বের করে আনল একখানা গাঢ় লাল রঙের সুতি শাড়ি। খুব দামি বেনারসী নয়, জরির ঝিলিকও নেই তাতে, কিন্তু সেই লাল রঙের ভেতর মিশে ছিল এক যুবকের অক্লান্ত পরিশ্রম, ভালোবাসা আর ফিরে আসার আকুল আর্তি।

কাশেম শাড়িটা ফুলবানুর হাতে তুলে দিয়ে বলল, "বলেছিলাম না, তোর জন্য লাল শাড়ি আনব? বেনারসী কেনার সাধ্য আমার নেই ফুলি, তবে এই শাড়িতে আমার সমস্ত ভালোবাসা আছে।"

ফুলবানু শাড়িটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। চোখের জলে ভিজে গেল সেই সাধারণ লাল কাপড়ের আঁচল। সকালে যে লাল শাড়িটা সে নিজের হাতে বুনেছিল, তা ছিল এক কঠিন সংগ্রামের গল্প; আর এই যে লাল শাড়িটা তার হাতে এলো, এ যেন তার নতুন করে বাঁচার আনন্দ, তার হারানো জীবনের পুনর্জন্ম।

নদীর ওপারে তখন রক্তিম সূর্যটা ডুবছে। আকাশের লাল, নদীর জলের লাল আর ফুলবানুর হাতের লাল শাড়ি,সব যেন একাকার হয়ে কুসুমপুর গ্রামের বুকে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ শান্তির মায়াজাল বিস্তার করল। 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login