একটি নির্জনতম দুপুর। যেখানে নেই কোনো পাখির কোলাহল। নেই কোনো মানুষের আনাগোনা।
একটি বাড়ির বারান্দায় শুধু দুইটা মেয়ে। একজন সদ্য পা রাখা যুবতী আরেকজন সদ্য পৃথিবীকে চিনতে থাকা ছোট্ট শিশু।
শিশুটি খেলা করছে ফ্লোরে বসে। তার থেকে কিছুটা দূরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে যুবতী-টি।
তার হাতে একটা সাদা কাগজ।
যুবতী-টি কাগজের ভাঁজ বেশ আলতো হাতে খুলতে লাগলো।
কাগজটি দেখেই বোঝা যাচ্ছে বহুদিন ধরে বিছানার তোশকের নিচে চাপা পড়ে ছিলো। কোননা কাগজটির ভাঁজ একেবারে কাগজের সাথে বসে গেছে।
মেয়েটি কাগজের ভাঁজটি খুলে বিড় বিড় করে পড়তে লাগে কাগজের লেখাগুলো।
প্রিয় মেয়ে,
কেমন আছো জিজ্ঞেস করবো না। কেননা আমি বিনে তুমি কখনোই ভালো থাকবে না। এটা আমার ভালো করে জানা।
আমি কেমন আছি সেটা তুমি জিজ্ঞেস কর না।
কারণ আমার ভালো থাকা একমাত্র নির্ভর করে তোমার উপর। যতদিন আমি তোমার সঙ্গ পেয়েছিলাম ততদিন আমি ভালো ছিলাম। বেশ ভালো। কিন্তু যখনই তুমি আমাকে রেখে দূরে চলে গেছো বহু দূরে তখনই আমি আবারও নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছি।
তোমার থাকা না থাকাতে প্রথমে আমার কোনো যাই আসতো না। কিন্তু যখন তুমি হারিয়ে গেছো তখন তোমার শূন্যতা আমাকে কুঁকড়ে কুঁকড়ে খাচ্ছিলো।
আমার প্রতি মুহূর্তে মনে হতো তোমাকে ছাড়া নিঃশ্বাস নেওয়াও আমার জন্য অনেকটা কঠিন।
যাই-হোক এখন আর আবেগময় কথা বলে কীই-বা হবে।
আমি চলে যাচ্ছি মেয়ে বহুদূরে। যেখান থেকে মানুষ ফিরে আসার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করে না।
আমাকে তুমি খুঁজে তোমার মূল্যবান সময়গুলোকে নষ্ট কর না।
কেননা আমাকে খুঁজলেই তুমি আমায় পাবে না।
কারণ তুমি আমায় হারিয়ে ফেলেছো।
আমি তোমায় বলেছিলাম না মেয়ে। তোমার মনটা বেশ কৌতূহলী। আর এই কৌতূহলী মনের কৌতূহল যত তাড়াতাড়ি মিটে যাবে ঠিক তত তাড়াতাড়ি আমি তোমার জীবন থেকে বিদায় নিবো।
কিন্তু তুমি ঐদিন আমার কথাকে বুঝোনি। তুমি তোমার স্বার্থটা দেখেছো। তুমি তোমার কৌতূহল মেটাতে একেবারে আকাশ ছাঁপিয়ে উঠেছো।
আমিও তোমার স্বার্থটাকেই বেশ ভালো করে প্রাধান্য দিয়েছিলাম।
তাই তোমার কৌতূহলী মনের কৌতূহল অতি তাড়াতাড়ি মিটিয়ে দিলাম এবং আমি নিরবে তোমার থেকে বিদায় নিলাম।
আমার শূন্যতা হয়তো তুমি প্রথমেই বুঝতে পারবে না। কিন্তু একটা সময় আমার শূন্যতা তোমাকে কুঁকড়ে কুঁকড়ে খাবে।
যা তোমার হৃদয়ে দহন ঘটাতে সক্ষম।
আমাকে দূরে কোথাও খুঁজো না মেয়ে।
কেননা আমি আছি তোমার দেহে মিশে। আমি আছি তোমার শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরায় মিশে।
আমি আছি তোমার নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে।
এক সেকেন্ডে তোমার হৃদয়ে যতগুলো কম্পন হয়, তার থেকেও বেশি তোমার আমার কথা স্মরণ হয়।
যখন তুমি আমায় শূন্যতায় অসহ্য হয়ে আমাকে খুঁজবে তখন তুমি শুধু তোমার অক্ষিপট দুইটা বন্ধ করবে।
দেখবে আমি তোমার সামনে এসেছি। তোমাকে ডেঁকে উঠেছি এই মেয়ে বলে।
তুমি আমার মুখে মেয়ে ডাঁকটা শুনে তোমার সেই চিরচেনা হাসিটুকু হাসবে। যেই হাসিটুকু তোমার মুখ থেকে বহুদিন আগেই হারিয়ে গিয়েছিলো।
আমি আর লিখতে পারছি না মেয়ে। পুরো শরীর জুড়ে ব্যাথা করছে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় হাত-পা কাঁপছে। দুই চোখ জুড়ে ঘুম এসেছে। আমার কী মনে হচ্ছে মেয়ে জানো।
এখন যদি আমি চোখদুইটা বন্ধ করে আর কখনোই এই চোখ খুলবে না।
তুমি জানো মেয়ে। আজকে আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে জিঙ্গাসাবাদ করার জন্য। আমাকে তারা অনেক প্রশ্ন করেছে কিন্তু আমি তাদের কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেয়নি। তাই তারা আমাকে মেরেছে। শরীরের অনেক জায়গায় কেটে রক্ত ঝরছে।
কাটা স্থানগুলো অনেক যন্ত্রণা দিচ্ছে।
তারা আমাকে একঘন্টা সময় দিয়ে গেছে ভেবে নিতে। বলে গেছে সত্যি বলার জন্য।
কিন্তু আমি জানি আমি সত্যি বললেও তারা আমার উপর মিথ্যা মামলা দায়ের করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলাবে।
কিন্তু তারা ভুলে গেছে আমাকে বিনা দোষে ফাঁসানো এত সহজ না।
তারা কী জানে নৃত্য করা শিকারকে ধরার জন্য নিরবে থাকা শিকারীর ভান।
যাই-হোক মেয়ে আর লেখছি না। আমার এখন প্রচুর কাজ। প্রথমেই এই চারদেওয়ালের জেল থেকে বের হতে হবে। পরে তোমার নিকট এই চিঠিটি পৌঁছাতে হবে।
তারপর আমাকে কবর খুঁড়তে হবে। কার কবর সেটা আমি জানি না। হয়তো সেটা আমারও কবর হতে পারে।
তোমাকে শেষবারের মতো বলছি মেয়ে আমায় ভুলে যেও না। আমাকে ভোলা সম্ভব নই। তুমি চাইলেও আমাকে ভুলতে পারবে না। কারণ এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমার স্মৃতি তোমার মাঝে চিরস্থায়ী।
আমি যাচ্ছি মেয়ে। কিন্তু মনে রেখো আমি ফিরবো।
হয়তো আমি সোহান ফিরবো না কিন্তু আমিই ফিরবো। তুমি শুধু অপেক্ষায় থাকো। ফিরবো আমি আবার ফিরবো!
ইতি,
তোমার তোমার ক্ষণস্থায়ী জীবনের চিরস্থায়ী স্মৃতি।
চিঠিটা পড়া শেষ হতেই যুবতী মেয়েটি চোখবন্ধ করে। চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে তৎক্ষনাৎ দুইচোখ থেকে দুই ফোঁটা অশ্রু জড়িয়ে পড়ে।
মেয়েটা যেনো এমুহূর্তে একেবারে নিরুপায়।
তাকে দহনের আগুনে পুঁড়ে ছাই হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
মেয়েটি চোখ বন্ধ করে দেওয়ালে নিজের পিঠ ঠেঁকাতেই তার কানে ভেঁসে আসে একটি শব্দ- মেয়ে!
মেয়েটা তাঁড়াহুড়ো করে নিজের চোখ খুলে এবং ডানে-বামে তাঁকায় কারোর আগমনের প্রত্যাশায়। কিন্তু আসে-পাশে কেউ নেই।
মেয়েটি আবারও দেওয়ালে নিজের পিঠ ঠেঁকিয়ে নিজের অক্ষিপট দুইটা বন্ধ করে।
তখই আবার তার কানে ভেঁসে আসে-
আমায় শুনতে পারছো মেয়ে।
মেয়ে! মেয়ে! এই
মেয়ে!