বাঙালির আধ্যাত্মিক সাধনার মানচিত্রে ফরিদপুর জেলা এক অনন্য মহিমায় ভাস্বর। পদ্মা, কুমার ও আড়িয়াল খাঁ বিধৌত পলিমাটির এই জনপদ যেমন লালন করেছে বাউল ও সুফি দর্শনকে, তেমনই বক্ষে ধারণ করেছে সনাতন ভক্তি আন্দোলনের এক চিরন্তন ধারা। ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকায় অবস্থিত ‘শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন’ কেবল একটি সুবিশাল মন্দির বা মঠ প্রাঙ্গণ নয়; এটি অবিভক্ত বাংলা ও বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভক্তিতীর্থ।
শ্রীঅঙ্গন মূলত ‘মহানাম সম্প্রদায়’-এর কেন্দ্রীয় ধাম বা প্রধান তীর্থপীঠ। উনিশ শতকের শেষভাগে ও বিশ শতকের সূচনালগ্নে যে প্রেমধর্ম ও হরিনাম সংকীর্তনের তরঙ্গে বাংলার জনজীবন প্লাবিত হয়েছিল, তারই কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই আঙিনা। এই পবিত্র আঙিনার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর,যিনি সাধারণ ভক্ত ও অনুসারীদের কাছে ‘জগৎ সাধু’ বা ‘বন্ধুসুন্দর’ রূপে সমধিক পরিচিত। শ্রীঅঙ্গনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভক্তি, সম্প্রীতি, অলৌকিক বিশ্বাস এবং ত্যাগের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। একই সাথে এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের এক রক্তাক্ত ও বীরত্বগাথার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত রূপরেখা
ফরিদপুর জেলা সদরের প্রাণকেন্দ্র থেকে সামান্য দূরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের সন্নিকটে গোয়ালচামটে শ্রীঅঙ্গনের অবস্থান। ছায়াঢাকা, শান্ত ও সুপরিসর এক চত্বরে বিস্তৃত এই আশ্রম। নগরজীবনের ব্যস্ততা ও কোলাহলের ঠিক পাশেই অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এর তোরণ অতিক্রম করার সাথে সাথেই এক অপার আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও স্তব্ধতা দর্শনার্থীকে আচ্ছন্ন করে।
বিশাল দীঘি, সুবিন্যস্ত পুষ্পোদ্যান, সুউচ্চ শিখরবিশিষ্ট মন্দিরসমূহ, নামযজ্ঞের মণ্ডপ, নাটমন্দির, এবং সাধু-সন্ন্যাসীদের বাসোপযোগী সুশৃঙ্খল আশ্রমিক বিন্যাস নিয়ে শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন প্রতিষ্ঠিত। এর পরিবেশের মূল সুরই হলো সার্বক্ষণিক নামধ্বনি। বাতাসে ভেসে থাকা চন্দন, ধূপ এবং তুলসীর ঘ্রাণে পুরো প্রাঙ্গণ এক চিরন্তন বৈকুণ্ঠের আবহ সৃষ্টি করে রেখেছে।
প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের আবির্ভাব ও আত্মিক যাত্রা
শ্রীঅঙ্গনের ইতিহাস বুঝতে হলে এর প্রাণপুরুষ প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত এবং তাঁর ভাবান্দোলনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া অপরিহার্য।
জন্ম ও শৈশব
জগদ্বন্ধু সুন্দর ১৮৭১ সালের ২৮ এপ্রিল (১৬ বৈশাখ, ১২৭৮ বঙ্গাব্দ) সীতা নবমীর পুণ্যলগ্নে অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার ডাহাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃপুরুষের নিবাস ছিল ফরিদপুরের গোবিন্দপুরে। তাঁর পিতা দীননাথ ন্যায়রত্ন ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত ও ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ এবং মাতা বামাসুন্দরী দেবী ছিলেন পরম বৈষ্ণবী। বাল্যকালেই মাতৃহীন এবং পরবর্তীকালে পিতৃহীন হয়ে তিনি ফরিদপুরের গোবিন্দপুরে পৈতৃক ভিটায় ও আত্মীয়দের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন।
অদ্ভুত বাল্য ও আধ্যাত্মিক উন্মেষ
শৈশব থেকেই জগদ্বন্ধুর আচরণ সাধারণ বালকদের মতো ছিল না। তিনি পার্থিব বিদ্যাশিক্ষার প্রতি উদাসীন হয়ে হরিপ্রেম ও নামের গভীর সাগরে নিমজ্জিত থাকতেন। শৈশবেই তাঁর মধ্যে কৃষ্ণভাবের স্ফূরণ দেখা যেত। তিনি নদ-নদী, বৃক্ষলতা এবং প্রকৃতির মাঝে পরম সত্যের অন্বেষণ করতেন। কোনো আনুষ্ঠানিক দীক্ষাগুরুর অধীনে না থেকেও তাঁর অন্তরে এক সহজাত বৈষ্ণবীয় ভক্তির ধারা প্রবহমান ছিল।
সামাজিক সংস্কার ও দলিত প্রীতি
জগদ্বন্ধু সুন্দরের আবির্ভাবের সময় বাংলার সমাজ কাঠামোয় তীব্র বর্ণভেদ ও সামাজিক বৈষম্য বিরাজ করছিল। তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ,বিশেষ করে ডোম, বাগদী, মালো এবং অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষেরা সমাজে অবহেলিত ও লাঞ্ছিত ছিল। প্রভু জগদ্বন্ধু তৎকালীন উচ্চবর্ণের গোঁড়ামিকে উপেক্ষা করে এই অবহেলিত অন্ত্যজ মানুষদের বুকে টেনে নেন। তিনি প্রচার করেন যে, ভগবানের নামে কোনো জাতিভেদ নেই; হরিনামে সবার সমান অধিকার। তাঁর এই মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দলিত সম্প্রদায়কে এক বিশাল আধ্যাত্মিক আশ্রয় প্রদান করে, যা পরবর্তীকালে শ্রীঅঙ্গন প্রতিষ্ঠার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছিল।
শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত
১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৩ মে, ১৮৯৯ / ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) গোয়ালচামটের এক নির্জন প্রান্তরে শ্রীঅঙ্গনের সূচনা হয়। তখনকার গোয়ালচামট আজকের মতো জনবহুল বা উন্নত ছিল না। সেখানে ছিল ঘন জঙ্গল, ঝোপঝাড় এবং সাপ-খোপের উপদ্রব। স্থানীয় মানুষেরা সন্ধ্যার পর সেই পথ দিয়ে চলাচল করতে ভয় পেত।
স্থান নির্বাচন ও গোয়ালচামটের রূপান্তর
কথিত আছে, প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর তাঁর কয়েকজন অন্তরঙ্গ ভক্ত ও অনুসারীকে নিয়ে এই বনাকীর্ণ নির্জন স্থানে আসেন। তিনি এখানে পদার্পণ করে ঘোষণা করেন যে, এই স্থানটি সাধারণ কোনো ভূমি নয়, এটি ভক্তির এক পবিত্র নিকেতন হবে। ভক্তরা প্রথমে জঙ্গল পরিষ্কার করে একটি খড়ের চালাঘর নির্মাণ করেন। এই সামান্য খড়ের ঘরটিই ছিল আজকের বিশাল শ্রীঅঙ্গনের আদি রূপ।
প্রভু জগদ্বন্ধু এই স্থানটির নামকরণ করেন ‘শ্রীঅঙ্গন’। বৈষ্ণব পরিভাষায় ‘অঙ্গন’ শব্দের অর্থ আঙিনা বা উঠান। তিনি বলতেন, এটি কোনো রাজা বা ধনীর অট্টালিকা নয়, এটি হরিনামপ্রেমী দীন-দরিদ্র সাধারণ ভক্তের মিলনমেলা,‘জগৎ সাধুর আঙিনা’।
শুরুর দিনগুলোর সাধনা ও সংকীর্তন
শ্রীঅঙ্গন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সেখানে শুরু হয় অহর্নিশ নামসংকীর্তন। ফরিদপুর ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্তরা আসতে শুরু করেন। বিশেষ করে গ্রামীণ সাধারণ কৃষক, মাঝি এবং শ্রমজীবী মানুষ তাঁর প্রভাবে এক নতুন জীবনের দিশা পায়। প্রভু জগদ্বন্ধু রচিত ‘হরিসংকীর্তন’ এবং তাঁর ভাবাবেগপূর্ণ নৃত্য হাজারো মানুষকে সম্মোহিত করত। গোয়ালচামটের সেই নীরব জঙ্গল অচিরেই পরিণত হয় ভক্তিগীতি ও মৃদঙ্গ-করতালের সুরতরঙ্গে মুখরিত এক মহাপীঠে।
ষোলো বছরের মহাগম্ভীর লীলা: এক অনন্য আধ্যাত্মিক রহস্য
শ্রীঅঙ্গনের ইতিহাসের সবচেয়ে বিষ্ময়কর ও গভীর অধ্যায় হলো প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের ‘মহাগম্ভীর লীলা’ বা দীর্ঘ ষোলো বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন ও নিভৃত সাধনা।
ঘরের কপাট বন্ধ ও নিভৃত সাধনা
১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের আশ্বিন মাস। কোনো প্রকার পূর্বঘোষণা ছাড়াই প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর শ্রীঅঙ্গনের একটি ছোট্ট মাটির ঘরে প্রবেশ করেন এবং ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। তিনি নির্দেশ দেন, যেন কোনো অবস্থাতেই এই দরজা খোলা না হয় এবং কোনো মানুষ যেন তাঁর ভেতরে প্রবেশ না করে। ১৯০২ থেকে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ,টানা দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি সেই বন্ধ প্রকোষ্ঠের ভেতরে কাটান। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি লোকচক্ষুর সম্পূর্ণ অন্তরালে ছিলেন। বাইরের পৃথিবীর সাথে তাঁর দৃশ্যমান কোনো সংযোগ ছিল না।
খাদ্য ও জীবনযাপনের রহস্য
এই দীর্ঘ ষোলো বছর তিনি কীভাবে বেঁচে ছিলেন, কী আহার করতেন, তা আজও ভক্ত ও গবেষকদের কাছে এক অলৌকিক রহস্য। প্রকোষ্ঠের দেয়ালের একটি ছোট ছিদ্র বা ঘুলঘুলি দিয়ে মাঝেমধ্যে সামান্য দুধ বা জল ভেতরে দেওয়া হতো, তবে অধিকাংশ সময়ই তা অভুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকত। কোনো সূর্যালোক সেই ঘরে ঢুকত না, কোনো মানুষের পদচিহ্ন সেখানে পড়ত না। ভেতর থেকে কেবল ভেসে আসত গভীর দীর্ঘশ্বাস, অব্যক্ত ক্রন্দন, কখনো বা অস্পষ্ট হরিনামের গুঞ্জন। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রভু জগদ্বন্ধু জগতের কলুষতা মোচন, বিশ্বমানবতার কল্যাণ এবং প্রেমধর্মের পুনরুজ্জীবনের জন্য এই কৃচ্ছ্রসাধন বা আত্মনিগ্রহের পথ বেছে নিয়েছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পুরীর গম্ভীরার লীলার সাথে তুলনা করে একে ‘মহাগম্ভীর লীলা’ বলা হয়।
কপাট উন্মোচন ও পরবর্তী অধ্যায়
১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সমসাময়িক সময়ে প্রভু জগদ্বন্ধু সেই বন্ধ ঘরের কপাট খুলে পুনরায় ভক্তদের মাঝে ফিরে আসেন। দীর্ঘ অন্ধকারের প্রকোষ্ঠ থেকে বের হয়ে আসার পর তাঁর শারীরিক অবয়ব সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর দীর্ঘ জটাজুট, শীর্ণ অথচ দীপ্তিময় দেহাবয়ব এবং দৃষ্টির অতল গভীরতা ভক্তদের মধ্যে এক স্বর্গীয় ভাবাবেগের সঞ্চার করেছিল। এই মহাগম্ভীর লীলা শ্রীঅঙ্গনকে সাধারণ মঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বিশ্বজনীন আধ্যাত্মিক রূপ দান করে।
শ্রীমহেন্দ্রজী ও ডক্টর মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজীর অবদান
প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের তীরোধানের পর শ্রীঅঙ্গনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, এর ভাবাদর্শ সংরক্ষণ এবং বিশ্বমঞ্চে এর দর্শন পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে দুজন মহাপুরুষের অবদান অনস্বীকার্য।
শ্রীমৎ মহেন্দ্রজী ও ‘মহানাম সম্প্রদায়’ গঠন
প্রভু জগদ্বন্ধুর অন্তরঙ্গ সেবক ও প্রধান শিষ্য ছিলেন শ্রীমৎ মহেন্দ্রজী। তিনিই প্রভুর আদর্শকে ভিত্তি করে একটি সুসংগঠিত ধারা হিসেবে ‘মহানাম সম্প্রদায়’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শ্রীঅঙ্গনকে এই সম্প্রদায়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলেন। সন্ন্যাসীদের জীবনচর্চা, নামযজ্ঞের নিয়মকানুন এবং সেবামূলক কার্যক্রমের সার্বিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন মহেন্দ্রজী। তিনিই নির্ধারণ করেন যে, শ্রীঅঙ্গনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অন্নসংস্থান ও আশ্রয় নিশ্চিত থাকবে।
ডক্টর মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজী: বিশ্বমঞ্চে শ্রীঅঙ্গনের দূত
শ্রীঅঙ্গন ও মহানাম সম্প্রদায়ের ইতিহাসে ডক্টর মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজী (১৯০৪–১৯৯৯) এক জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে সুপণ্ডিত, দার্শনিক, সুবক্তা এবং আধ্যাত্মিক সাধক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের তুলনামূলক তত্ত্বে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৩৩ সালে শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি স্বামী বিবেকানন্দের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বৈষ্ণব দর্শন ও জগদ্বন্ধুর সর্বজনীন প্রেমবার্তা বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন। তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষণ ও সরল জীবনাচরণ পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের চমৎকৃত করেছিল। ডক্টর মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজী শ্রীঅঙ্গনের সার্বিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর পরিচিতি এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে আজীবন নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর রচিত বহু গ্রন্থ বৈষ্ণব দর্শনের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
স্থাপত্যশৈলী ও কাঠামোগত বিন্যাস
শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গনের বর্তমান স্থাপত্যশৈলীতে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি মন্দির স্থাপত্য এবং আধুনিক ভারতীয় মঠরীতির এক সুষম সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়। পুরো চত্বরটি সুপরিকল্পিতভাবে বিন্যস্ত।
চন্দন সমাধি মন্দির ও শ্রীমন্দির
শ্রীঅঙ্গনের মূল আকর্ষণ হলো প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের পবিত্র শ্রীমন্দির এবং তাঁর চন্দন সমাধি মন্দির। প্রভুর পবিত্র পার্থিব দেহ যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মূল শিখর মন্দিরটি। এর চূড়া বহু দূর থেকে দৃষ্টিগোচর হয়। মন্দিরের অভ্যন্তরীণ অংশে শ্বেতপাথরের কারুকাজ এবং স্নিগ্ধ আলোকবিন্যাস ভক্তের চিত্তে এক শান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে।
জগদ্বন্ধু মহাপ্রভুর মহাগম্ভীর কুটির
যে ঐতিহাসিক প্রকোষ্ঠে প্রভু জগদ্বন্ধু দীর্ঘ ষোলো বছর নিভৃত সাধনা করেছিলেন, সেই কুটিরটিকে পরম ভক্তিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই কুটিরের সামনে দাঁড়ালে আজও ভক্তরা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা অনুভব করেন। কুটিরটির সাদামাটা রূপ তৎকালীন ঐতিহাসিক কৃচ্ছ্রসাধনার সাক্ষ্য দেয়।
নাটমন্দির ও কীর্তন মণ্ডপ
মূল মন্দিরের সম্মুখে অবস্থিত বিশাল নাটমন্দির। এটি হাজার হাজার ভক্তের সংকীর্তনে অংশগ্রহণের উপযোগী করে নির্মিত। এর স্তম্ভ এবং মেঝের পরিচ্ছন্নতা ভক্তদের সুশৃঙ্খলভাবে বসার সুযোগ করে দেয়। এর ঠিক পাশেই রয়েছে শ্রীমৎ মহেন্দ্রজী এবং ডক্টর মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজীর স্মৃতিরক্ষা মন্দির ও সমাধি।
বিশাল জলাশয় ও আশ্রম চত্বর
শ্রীঅঙ্গন প্রাঙ্গণে একটি সুবিশাল দীঘি রয়েছে, যার শান্ত জলরাশি চত্বরের স্নিগ্ধতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে আগত সাধু, সন্ন্যাসী ও গৃহী ভক্তদের থাকার জন্য রয়েছে কয়েকটি সুবৃহৎ অতিথিশালা, প্রাচীন গ্রন্থাগার, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং গোশালা।
আধ্যাত্মিক দর্শন ও ২৪ ঘণ্টার অবিরাম সংকীর্তন
শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গনের দৈনন্দিন জীবন ও আধ্যাত্মিক চর্চার প্রধানতম স্তম্ভ হলো ‘অখণ্ড হরিনাম সংকীর্তন’।
অষ্টপ্রহর ও অখণ্ড নামযজ্ঞ
শ্রীঅঙ্গনে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবিরাম নামসংকীর্তন চলে আসছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট তিথি ও উৎসবে এখানে ২৪ ঘণ্টা ব্যাপী অবিচ্ছিন্নভাবে হরিনাম সংকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। মৃদঙ্গ, করতাল ও খোল সহযোগে মহানাম সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী ও ভক্তরা পালায় পালায় এই নামগান পরিবেশন করেন। দিনের কোনো ক্ষণেই এই নামধ্বনি স্তব্ধ হয় না।
মহানাম মন্ত্রের তাৎপর্য
মহানাম সম্প্রদায়ের মূল সাধনা আবর্তিত হয় একটি বিশেষ মন্ত্রকে কেন্দ্র করে, যা প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর প্রবর্তন করেছিলেন: "হরিপুরুষ জগদ্বন্ধু মহাদ্ধারক,মহানাচে নামদাতা করুণাসাগর।জয় জগদ্বন্ধু, জয় জগদ্বন্ধু, জয় জগদ্বন্ধু, জয় জগদ্বন্ধু..."
এই মন্ত্রটি কেবল কোনো ব্যক্তিবন্দনা নয়; মহানাম দর্শনে এটি বিশ্বজগতের ত্রাণকর্তা এবং সর্বজীবে ঈশ্বরের অনুকম্পা লাভের এক আকুল প্রার্থনা। জাতি, গোত্র নির্বিশেষে এই নাম যে কেউ গ্রহণ ও জপ করতে পারেন।
প্রেম ও অহিংসার প্রচার
শ্রীঅঙ্গনের দর্শন কোনো সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে সেবা ও অহিংসাকে ধর্মের সর্বোচ্চ অঙ্গ বলে মনে করা হয়। শ্রীঅঙ্গনের অন্নছত্রে প্রতিদিন শত শত ক্ষুধার্ত মানুষকে অন্ন বিতরণ করা হয়, যেখানে কোনো জাত-পাতের বিচার করা হয় না।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও শ্রীঅঙ্গনের রক্তঝরা ইতিহাস
শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গনের সুদীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে শোকাবহ, লোমহর্ষক অথচ গর্বের অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে শ্রীঅঙ্গন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকারদের চরম আক্রোশের শিকার হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিলের বর্বর গণহত্যা
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ফরিদপুর শহর দখল করে নেয়। দখলদারিত্বের সূচনালগ্নেই তাদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে হিন্দু অধ্যুষিত ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতীক গোয়ালচামটের শ্রীঅঙ্গনের ওপর। ২১ এপ্রিল, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি ঘাতক দল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শ্রীঅঙ্গন আক্রমণ করে। আশ্রমের ভেতরে তখন বহু সাধু ও সন্ন্যাসী অবস্থান করছিলেন। যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও তাঁরা প্রভুর বিগ্রহ এবং শ্রীঅঙ্গন ত্যাগ করে কোথাও যাননি। তাঁরা হরিনাম জপেই মগ্ন ছিলেন।
হানাদার বাহিনী আশ্রমে ঢুকেই নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে। মন্দিরের চত্বরেই তারা মহানাম সম্প্রদায়ের আটজন নিরীহ, নিরপরাধ ও আত্মনিবেদিত সাধুকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। নিহত সাধুরা হলেন:
১. শ্রীমৎ কৃত্যবন্ধু ব্রহ্মচারী
২. শ্রীমৎ নিমাইবন্ধু ব্রহ্মচারী
৩. শ্রীমৎ হরিপ্রিয় ব্রহ্মচারী
৪. শ্রীমৎ রবীন্দ্রবন্ধু ব্রহ্মচারী
৫. শ্রীমৎ ক্ষিতিবন্ধু ব্রহ্মচারী
৬. শ্রীমৎ গোবিন্দবন্ধু ব্রহ্মচারী
৭. শ্রীমৎ ভোলানাথ ব্রহ্মচারী
৮. শ্রীমৎ সত্যবন্ধু ব্রহ্মচারী
ধ্বংসলীলা ও শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ
সাধুদের হত্যার পর ঘাতক দল মন্দিরে ব্যাপক লুটপাট চালায়, প্রাচীন বিগ্রহ ও ঐতিহাসিক স্মারকগুলোকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে এবং অগ্নিসংযোগ করে। পবিত্র প্রাঙ্গণ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। কিন্তু সেই রক্তপাত সন্ন্যাসীদের আধ্যাত্মিক মেরুদণ্ডকে ভাঙতে পারেনি। স্বাধীনতার পর এই আটজন আত্মত্যাগী সাধুর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে শ্রীঅঙ্গন প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিমন্দির নির্মাণ করা হয়। প্রতি বছর ২১ এপ্রিল অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধার সাথে শ্রীঅঙ্গনে ‘শহীদ সাধু স্মরণ দিবস’ পালিত হয়। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সনাতন ধর্মীয় সাধুসমাজের আত্মত্যাগের এক অনন্য ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল।
উৎসব ও লোকায়ত সংস্কৃতি
শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গনকে কেন্দ্র করে সারাবছরই নানা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উৎসব উদযাপিত হয়, যা ফরিদপুরের লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক মেলবন্ধনের প্রধান অংশে পরিণত হয়েছে।
রথযাত্রা উৎসব
ফরিদপুরের শ্রীঅঙ্গনের রথযাত্রা উৎসব অত্যন্ত প্রাচীন ও বর্ণাঢ্য। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের বিগ্রহ নিয়ে সুবিশাল কাঠের রথ গোয়ালচামট থেকে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এই রথযাত্রায় কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই নন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ শামিল হন। রথের রশি টানার জন্য মানুষের ঢল নামে। রথযাত্রা উপলক্ষে আশ্রমের আশপাশে বসে বিশাল লোকমেলা, যেখানে মৃৎশিল্প, বাঁশ-বেতের সামগ্রী এবং গ্রামীণ মিষ্টির সমাহার ঘটে।
প্রকাশোৎসব ও সীতা নবমী
প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের জন্মজয়ন্তী বা ‘শ্রীশ্রীপ্রকাশোৎসব’ বৈশাখ মাসের সীতা নবমী তিথিতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। দেশ-বিদেশের লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম ঘটে এই সময়ে। সাত দিনব্যাপী চলে অখণ্ড নামসংকীর্তন, পদাবলী কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা সভা এবং মহাপ্রসাদ বিতরণ।
রাস উৎসব ও দোলযাত্রা
শরতের রাস পূর্ণিমা এবং বসন্তের দোল পূর্ণিমাতেও শ্রীঅঙ্গন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। আলোকসজ্জায় সাজানো হয় পুরো চত্বর। ভক্তরা পরস্পরের প্রতি আবির ও ভক্তির শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
আধুনিক যুগে শ্রীঅঙ্গন: আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি সমাজকল্যাণ
আজকের একবিংশ শতাব্দীতেও শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন তার প্রাচীন আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে সমকালীন সমাজবাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। এটি এখন শুধু একটি পূজার স্থান নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও মানবিক কেন্দ্র।
শিক্ষাবিস্তার ও নৈতিক শিক্ষা: শ্রীঅঙ্গন ট্রাস্টের পরিচালনায় বহু স্থানে প্রাথমিক বিদ্যালয়, টোল ও নৈতিক শিক্ষাদান কেন্দ্র পরিচালিত হয়। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে এটি অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
বিনামূল্যে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা: আশ্রমের দাতব্য চিকিৎসালয় থেকে প্রতিদিন দরিদ্র মানুষকে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়া হয়। বিভিন্ন দূর্যোগে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
ত্রাণ ও পুনর্বাসন: বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা মহামারীর সময়ে শ্রীঅঙ্গন সর্বদাই মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২০-২১ সালের করোনা মহামারীর সময়েও এখান থেকে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছিল।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা: ফরিদপুরের স্থানীয় মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে শ্রীঅঙ্গনের সাধুসমাজ সবসময় ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। যেকোনো জাতীয় বা স্থানীয় সংকটে এটি শান্তির প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
উপসংহার
ফরিদপুরের শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন নিছকই ইট-পাথরে নির্মিত কোনো প্রাচীন স্থাপত্যের সমষ্টি নয়; এটি আবহমান বাংলার সমন্বিত ভক্তি আন্দোলন, মানবিক দর্শন এবং আত্মিক মুক্তির এক জীবন্ত বাতিঘর। উনিশ শতকের শেষলগ্নে যে গোয়ালচামটের গভীর বনে প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর প্রেম ও ভক্তির বীজ বপন করেছিলেন, কালক্রমে তা আজ এক সুবিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ১৬ বছরের কৃচ্ছ্রসাধনার রহস্য, ডক্টর মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজীর বিশ্ববিজয়ী পাণ্ডিত্য, আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আটজন বীর সাধুর আত্মবলিদানের রক্তস্নাত ইতিহাস,সব মিলিয়ে শ্রীঅঙ্গন বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। জাতপাতহীন সমাজগঠনের যে স্বপ্ন ‘জগৎ সাধু’ দেখেছিলেন, শ্রীঅঙ্গন আজও তাঁর সেই মানবতাবাদী দর্শনকে ধারণ করে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে কোটি ভক্ত ও মানবপ্রেমীর অন্তরে।