### ছোটবেলার মেলায় হারিয়ে যাওয়া এক বিকেল 🎡
ছোটবেলা মানেই ছিল আনন্দ, দুষ্টুমি আর হাজারো আবদার। আর গ্রামের মেলা! মেলার নাম শুনলেই মনটা আনন্দে নেচে উঠত।
তখন আমার বয়স হয়তো আট-নয় বছর। একদিন বিকেলে শুনলাম, আমাদের পাশের গ্রামে বিশাল মেলা বসেছে। খবরটা শুনেই মায়ের কাছে দৌড়ে গেলাম।
—মা, আজ মেলায় যাব!
মা বললেন, —বাবা আসুক, তারপর দেখা যাবে।
আমি বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছি। কখন বাবা আসবে! অবশেষে বাবা বাড়ি ফিরতেই দৌড়ে গিয়ে বললাম,
—বাবা, চলো না, মেলায় যাব!
বাবা হেসে বললেন, —আচ্ছা, আগে হাত-মুখ ধুয়ে নাও। তারপর যাব।
আমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম।
### মেলার প্রথম আনন্দ
মেলায় ঢুকতেই চারদিকে আলো, মানুষের ভিড়, মাইকের শব্দ আর দোকানের সারি দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
একদিকে নাগরদোলা ঘুরছে, অন্যদিকে খেলনার দোকান। কোথাও জিলাপি ভাজা হচ্ছে, কোথাও আবার বাঁশি বাজছে।
আমি বাবার হাত টেনে বললাম,
—বাবা, আগে নাগরদোলায় উঠব!
বাবা আমাকে নাগরদোলায় তুলে দিলেন। ওপরে উঠতেই পুরো মেলাটা ছোট ছোট খেলনার মতো মনে হচ্ছিল। আমি আনন্দে চিৎকার করে বলছিলাম,
—বাবা, দেখো! আমি কত ওপরে!
নাগরদোলা থেকে নেমে আবার বায়না ধরলাম জিলাপি খাব। বাবা গরম গরম জিলাপি কিনে দিলেন। জিলাপির রস হাতে লেগে গেলেও আমার আনন্দের শেষ ছিল না।
### খেলনা কেনার বায়না
মেলার এক দোকানে সুন্দর একটা খেলনা গাড়ি দেখে আমার খুব পছন্দ হলো।
আমি বাবাকে বললাম,
—বাবা, এই গাড়িটা কিনে দাও।
বাবা দাম জিজ্ঞেস করে কিনে দিলেন। গাড়িটা হাতে পেয়ে মনে হচ্ছিল, আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস পেয়ে গেছি।
এরপর বেলুন, বাঁশি আর একটা ছোট্ট পুতুলও চাইতে লাগলাম।
বাবা হেসে বললেন,
—তোমার সব আবদার পূরণ করতে গেলে তো আমার পুরো মেলাই কিনতে হবে!
আমি হেসে বাবার হাত ধরে হাঁটতে লাগলাম।
### ছোট্ট একটা ভয়
হঠাৎ খেলনার দোকানের সামনে একটা রঙিন বাঁশি দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। বাবা একটু সামনে চলে গিয়েছিলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, বাবা কোথাও নেই!
মুহূর্তেই আমার আনন্দটা ভয় হয়ে গেল।
আমি এদিক-ওদিক তাকিয়ে বাবাকে খুঁজতে লাগলাম। চোখে পানি চলে এল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে বাবা ডাকলেন,
—এই যে, আমার ছোট্ট বাবু!
বাবাকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে তাঁর হাত শক্ত করে ধরলাম।
বাবা বললেন,
—মেলায় কখনো একা দূরে চলে যেতে নেই। আমার হাত ধরে থাকবে, কেমন?
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
—আর কখনো হাত ছাড়ব না।
### বাড়ি ফেরার সময়
রাত হয়ে গিয়েছিল। হাতে খেলনা গাড়ি, মুখে জিলাপির মিষ্টি স্বাদ আর মনে অনেক আনন্দ নিয়ে বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলাম।
বাড়ি ফিরে মাকে সব গল্প শোনালাম। কোন খেলনা কিনেছি, কতবার নাগরদোলায় উঠেছি, কত জিলাপি খেয়েছি—কিছুই বাদ দিলাম না।
সেদিন রাতে খেলনা গাড়িটা বালিশের পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
আজ অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। সেই মেলা হয়তো আর আগের মতো নেই, সেই খেলনা গাড়িটাও কোথায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়ার স্মৃতিটা আজও মনে আছে।
বড় হয়ে বুঝেছি, ছোটবেলায় মেলায় শুধু খেলনা কিনতে যেতাম না; বাবার হাত ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আনন্দগুলো খুঁজে পেতাম।
❤️ ছোটবেলার মেলা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সেই মেলার স্মৃতিগুলো কখনো শেষ হয় না।