আজ হরতাল!
বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে পত্রিকা পড়ছে এক যুবক। মাসিক ৩০,০০০ টাকা বেতনের দাবিতে হরতাল ডেকেছে ট্রেড ইউনিয়ন। গত রাত থেকে এই শান্ত, স্নিগ্ধ যুবকের মনে ঘুম নেই। কেন যেন সে ঘুমাতে পারছে না।
সে একটা স্কুলের শিক্ষক। মাসে ৫৫,০০০ টাকা বেতনে চাকরি করে। তার বাবা também শ্রমিক ছিলেন। একই দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন। সেই থেকে বাবার পুরনো পিস্তলটা আলমারির কোণে পড়ে আছে—লাইসেন্স ছিল, মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বহু আগে।
দুপুরে খাওয়ার সময় সে ভালো করে খেতে পারল না। অথচ তার স্ত্রী আসমানি তার জন্য তার প্রিয় গরুর মাংস রান্না করেছে। সে খাওয়াদাওয়া করে বিছানায় শুল। তার স্ত্রীর সাথে খুনসুটি ও গল্পে মেতে উঠল। গত ২৪ ঘণ্টায় সে এত শান্তি অনুভব করেনি। কেন যেন খুব ভালো লাগছে তার। মনে হচ্ছে জীবনে নতুন কিছু পেতে যাচ্ছে সে।
হঠাৎ!
ফোনে রিং হলো। সে দেখল, সারাদিন হরতালে সহিংসতায় শতাধিক শ্রমিক নিহত হয়েছে। প্রশাসন কারফিউ ঘোষণা করেছে। এবং ট্রেড ইউনিয়ন কারফিউ ভেঙে মিছিলের ডাক দিয়েছে।
সে দ্রুত উঠে পড়ল। আর কোনো কথা নেই। আলমারি থেকে নিজের চে গেভারার ছবি সম্বলিত টি-শার্ট নামাল। গায়ে জরালো। উপরে একটা জ্যাকেট। জ্যাকেটের পকেটে সেই পুরনো পিস্তল ও ২০ রাউন্ড গুলি।
সে তার একমাত্র কন্যার কপালে চুমু খেল। তার মেয়ে ঘুমাচ্ছে। দেখতে কী মিষ্টি লাগছে। সে আর বেশি কোমল বিষয়ে মাথা ঘামাল না।
দরজার সামনে এসে তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল আসমানির গাল ছুঁয়ে গেল। আরও কিছু করতে মন চাইছিল। কিন্তু এখন মনের কথা শোনার সময় না। সময় না কোমলতা প্রদর্শনের। এখন সময় শুধু অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নের উত্তর রক্তের কালিতে ইতিহাসের পাতায় লেখা।
সে তার ক্রিকেটের স্ট্যাম্প নিয়ে নিল। রাস্তায় বের হলো। আকাশ মেঘলা। দূরে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই সংঘর্ষ হচ্ছে। সামনে একটি মিছিল দেখল—২০০-৩০০ জনের একটা মাঝারি মিছিল। সবাই স্লোগান দিচ্ছে: "রক্ত রক্ত চাই, কর্পোরেটের রক্ত চাই! শ্রমিকের রক্ত, আগুন দেব শক্ত!"
সে মিছিলে মিশে গেল। তার বুকে উল্লাস, সবকিছু সংহার করার উদ্দামতা, আজরাইলকে থাপ্পড় মারার মতো মনোভাব, আর নতুন কিছু সৃষ্টির মাতৃসুলভ আকাঙ্ক্ষা—সব মিলেমিশে একাকার।
সেই মিছিল এক গলিতে এসে পৌঁছাল। সে দেখল, সবাই এক বিশাল ব্যারিকেড গড়ে তুলছে। কী নেই সেই ব্যারিকেডে? একটি ট্রাক উল্টে ফেলা হয়েছে। তার উপর অসংখ্য বালুর বস্তা। তার উপর নতুন ওঠা গাছসহ টব। তার সাথে মিশে আছে পুলিশ ও শ্রমিকের লাশ। যেন জীবন ও মৃত্যুর এক স্তম্ভ।
এক নেতা মাইক হাতে ব্যারিকেডের উপর দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিল: "কেউ পিছনে হটবে না। আজ আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। যদি আজ আপনারা এক পাও পিছনে যান, আজ ফ্যাসিবাদ বিজয় লাভ করবে। হাজারো সাধারণ মানুষ মারা যাবে। আজ একটাই প্রশ্ন। দুটো অপশন। প্রতিরোধ অথবা মৃত্যু।"
পুলিশ-সেনাবাহিনী একযোগে হামলা শুরু করল। গুলি শুরু হলো বৃষ্টির মতো। টিয়ার গ্যাসে অন্ধকার চারদিক। তবু সংঘর্ষ চলছে। জীবনের জন্য, শিশুদের জন্য, একটি মুক্ত পৃথিবীর জন্য।
সে দেখল, এক তরুণ এক তরুণীর লাশের পাশে বসে কাঁদছে। সেই তরুণীর মাথা থেঁতলে গেছে স্নাইপারের গুলিতে। ছেলেটির চোখ দেখলে বোঝা যায়—সে জীবনে সবকিছু হারিয়েছে।
সে দেখল, এক দল শ্রমিক এক পুলিশকে ধরে সমানে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে। সেই পুলিশ আর বেঁচে নেই। তাদের মুখে মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো উল্লাস।
হঠাৎ পুলিশ পিছু হটল। তারা উল্লাসিত হলো। সে নিজের মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে নিল। তাকে এক শ্রমিক এক বোতল দেশি মদ দিয়ে গেল। বলল, "এই মালটা লন। মাথায় দিলে আরাম পাইবেন। আবার খাইতেও পারবেন।"
সে মাথায় ঢালল। এরপর একটা চুমুক দিল। ভালো লাগছে। সে এটি খেয়ে খুব দ্রুত মাতাল হয়ে গেল। তার মনে তখন চরম আনন্দ। পিশাচ হত্যার, এই সমাজ হত্যার, নতুন কিছু জন্মানোর।
সে হঠাৎ খেয়াল করল—তার ডান হাতের বুড়ো আঙুল নেই। তার চোখে পানি নেই। কোনো ব্যথা নেই।
আবার সংগ্রাম শুরু হলো। লাগাতার হামলা। সে এবার বন্দুক ব্যবহার করে যুদ্ধ শুরু করল। দেখল, কয়েকজন আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েছে। তাদের চেহারা দেখলে বোঝা যায়—তাদের কষ্ট হচ্ছে। কিসের কষ্ট? জন্মভূমি ছেড়ে স্বর্গে যাওয়ার কষ্ট? তাই মনে হচ্ছে।
হঠাৎ তার বুকে এক তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভূত হলো। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বেশ কিছুক্ষণ পর, তার লাশ টেনে নিয়ে গেল কিছু নীল পোশাকের জানোয়ার।
সে মাটিতে শুয়ে আছে। তার চোখ খোলা। আকাশে মেঘ। দূরে কোথাও গুলির শব্দ। তার ঠোঁটে একটা ফ্যাকাশে হাসি।
দেখেছো প্রিয়তমা বিপ্লব? তোমার সন্তানদের শকুনেরা কীভাবে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে?