পোস্টস

পোস্ট

নিতুন কুন্ডু ও কমার্শিয়াল আর্ট

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩

শাহরিয়ার কবির

মূল লেখক শাহরিয়ার কবির

"শিল্পী"-শব্দটি এর অর্থের মতোই রঙিন, প্রাণবন্ত এবং উজ্জ্বল।শিল্পীরা স্রষ্টা,তাঁরা সৃষ্টি করেন শিল্প।তারা সময় ধরে রাখতে পারেন।পঁচিশ বছর আগের সময়কেও তারা আটকে রাখেন ক্যানভাসে।প্রকৃতি পড়ার ক্ষমতা তাদের আছে।মূলত শিল্পী হতে গেলে এই ক্ষমতা থাকতে হয়।প্রকৃতির রূপ,রস,গন্ধ কখন কিভাবে কতটুকু পরিবর্তন হচ্ছে জানতে হবে।আলো ছায়ার খেলা জানতে হয়।হয়তো দুপুরের রোদে কোন জায়গা যেমন কর্কষ,বিকেলের মলিন আলোতে ততটাই স্নিগ্ধ।দূর থেকে ধানক্ষেত দেখতে লাগছে সোনালী কাছে গেলে হয়ে যাচ্ছে সবুজ।এই বিষয়টা শিল্পীদের দেখতে হয় বুঝতে হয় শিল্পতে ফুটিয়ে তুলতে হয়।

'নিতুন কুন্ডু'- তার মধ্যে উপরের সবগুলো গুণ ছিলো।পুরো নাম নিত্য গোপাল কুন্ডু;জন্ম ৩ ডিসেম্বর ১৯৩৫;দিনাজপুরে।পিতা জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুন্ডু, মাতা বীণাপাণি কুন্ডু।একাধারে তিনি চিত্রশিল্পী, নকশাবিদ, ভাস্কর, মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্প-উদ্যোক্তা।

বড়বন্দর পাঠশালায় তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় এবং ১৯৫২ সালে গিরিজানাথ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন।ছোটবেলা থেকেই আঁকা-আঁকির নেশা।তাদের গ্রামে আমগাছের নিচে পানবিড়ির দোকান, অল্পবয়সেই সেই ছবি এঁকে গ্রামের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন।এরই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন ঢাকা আর্ট কলেজে (বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট) ভর্তি হন এবং সেখান থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান ও মরমি শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদের প্রিয় ছাত্র ছিলেন।

তার মতো প্রতিভাবান শিল্পী সচরাচর দেখা যায় না।নিজের অসাধারণ প্রতিভা অতুলনীয় দূরদর্শিতা এবং অনুপম সৃজনশীলতা তাকে শিল্পজগতের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।প্রকৃতিকে টেনে নিয়ে তিনি ক্যানভাসে জায়গা দিতেন।রংতুলির রেখা,প্রকৃতি,যেমন তার কেনভাসে জায়গা করে নিয়েছে ঠিক তেমনি তিনি জায়গা করে নিয়েছেন প্রকৃতির মনে,রংতুলির মনে,বাঙালির মনে।শিল্প চিত্রপটে স্থান পেলেও শিল্পী স্থান পান মানুষের মনে - এই ধরণার নিদর্শন হয়ে আছেন নিতুন কুন্ডু।

মূলত তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী তবে ভাস্কর্যেও তার ক্ষমতা ঈর্ষণীয়। তার তৈরি 'শাবাশ বাংলাদেশ' ভাস্কর্যটির অবস্থা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।ভাস্কর্যে দেখা যায় দুইজন টগবগে যুবক দাড়িয়ে।পাকিস্তানীদের অত্যাচারে তাদের রক্ত গরম।অস্ত্র হাতে তারা প্রস্তুত যুদ্ধের জন্য।একজন এক হাত উঁচু করে স্লোগান দিচ্ছে তার অন্য হাতে অস্ত্র ধরা।দ্বিতীয়জন দুই হাত দিয়েই অস্ত্র চেপে আছে।যেকোনো সময় তারা পাকিস্তানীদের উপর ঝাপিয়ে পড়বে,ছিনিয়ে আনবে স্বাধীনতা,ছিনিয়ে আনবে মুক্তি।
এছাড়াও তার তৈরি আরো কিছু উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য ও চিত্রকর্ম হলো সার্ক ফোয়ারা(প্যান প্যাসেফিক সোনারগাঁও হোটেল) ,কদমফুল ফোয়ারা(পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়),মুর‌্যাল-পিতল(পাকিস্তান এয়ারলাইন অফিস, হোটেল শেরাটন, ঢাকা)ম্যুরাল-তেল রঙ(জনতা ব্যাংক, ঢাকা)ম্যুরাল-কাঠ, লোহা, পিতল(মধুমিতা সিনেমা হল, ঢাকা),সাম্পান, ঐতিহ্যবাহী নৌকার প্রতীক(চট্টগ্রাম বিমানবন্দর)।

নিতুন কুন্ডু ভাবনার দিক থেকে বেশ ব্যাতিক্রম একজন মানুষ ছিলেন। মানুষের বেচেঁ থাকতে সৌন্দর্য প্রয়োজন আর সৌন্দর্যের প্রথম ধাপ আসা উচিত নিজের ঘর থেকে - তিনি এই বিষয়টা নিয়ে ভেবেছেন,কাজ করেছেন,সার্থক হয়েছে।তিনি শিল্পকে ঘরের অংশ করতে চেয়েছেন এবং সফল হয়েছেন।তার মস্তিষ্কপ্রসূত প্রতিষ্ঠান 'অটবী' বাংলাদেশের শিল্পরাজ্যের বিশাল একটা জায়গা দখল করে আছে।অটবী মানে বন।'অটবী' নাম রাখার পেছনে মূল কারণটি আমি জানি না।তবে ধারণা করতে পারি অটবী ঘরে স্থান দিয়ে তিনি যেনো পুরো বনের সৌন্দর্যকেই ঘরে জায়গা দিয়েছিলেন।একসময় আসবাব বলতে আমাদের ধারণা ছিল কাঠের কারুকার্যমণ্ডিত সব বিশালাকৃতির খাটপালঙ্ক, আলমারি।অটবী আমাদের দেশে আসবাবের ধরণাই বদলে দিয়েছে। নিতুন কুণ্ডু সাধারণ নকশার আসবাব নিয়ে এলেন, দেখালেন আভিজাত্য মানেই জাকজমক নয়।বরং সহজ শিল্প,সৌন্দর্য বা নান্দনিকবোধ সাধারণ ঘরকে সহজেই আকর্ষণীয় করতে পারে, মনকে প্রশান্তি দিতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধেও তার অবদান রয়েছে।যুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় প্রবাসী বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগে কাজ করেন।তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে পোস্টার ডিজাইন ও অন্যান্য নকশা প্রণয়ন করেন। তার প্রণীত মুক্তিযুদ্ধের পোস্টারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী ও বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধা।
এছাড়াও তিনি ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশে আগমন উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঞ্চ নির্মাণ,বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতার ট্রফির নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণ,বাংলাদেশ টেলিভিশনের নতুন কুঁড়ি পুরস্কার পদকের নকশা নির্মাণ,প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ-এর নকশা নির্মাণ,জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-এর পদকের নকশা নির্মাণ,প্রেসিডেন্ট শিশু-কিশোর ফুটবল কাপের নকশা নির্মাণ,এশিয়া কাপ ক্রিকেট পুরস্কার পদকের নকশা নির্মাণ,শিল্পমেলা ট্রফির নকশা নির্মাণ,জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের অভ্যন্তরের লাইটিংয়ের কারুকাজ ইত্যাদি করেছেন।

তার প্রতিভা এবং এতোসব অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক(১৯৯৭),ডেইলি স্টার-ডিএইচএল শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা পদক,জাতীয় চিত্রকলা পুরস্কার(১৯৬৫) অর্জন করেছেন।

২০০৬ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর এই প্রতিভাধর চিত্রশিল্পী হৃদরোগে আক্রান্ত হন।পরে ১৫ই সেপ্টেম্বর সকালে তিনি বারডেম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।১৬ই সেপ্টেম্বর পোস্তগোলা শ্মশানে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

আজ ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৩ তার ১৭ তম মৃত্যুবার্ষিকী।

হে শিল্পী,হে শাবাশ বাংলাদেশের স্রষ্টা,
রেখেছিগো মনে,
হৃদয়ের গোপনে......