FF.
পর্ব ১ঃ হিজিবিজবিজ Book page

Chapter 1

পর্ব ১ঃ হিজিবিজবিজ

Oct 13, 2026 6 min read

কুমারটুলি ঘাটে সন্ধ্যে টা কেমন যেন ঝুপ করে নামলো! বোঝা যাচ্ছিলো না চাঁদ সূর্য কে গিললো না পৃথিবী নিজের অক্ষের চারপাশে অর্ধেক ঘুরে ফেলল! অবশ্য বোঝা যাবে কি না জানি না কিন্তু এটুকু বলা যায় আপনি যেভাবে এই কাহিনি পড়তে পড়তে বোর হয়ে গিয়ে ধপাস করে বই টা নামিয়ে রাখবেন, খানিকটা ওরকম করেই ! শীতকাঁথার ওম টুকু ছেড়ে উঠে বসলো অঞ্জন, খানিক ত্রস্তব্যস্ত হয়ে নিজের হাইপাওয়ারের চশমা টা খুঁজতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের  কম্পিউটার টেবিলের উপর সেটা আবিষ্কার করল তর্জনী আর অনামিকার সাহায্যে। আজকেও মা ফিরবে না। সেই টাকি তে গেছে ছোটমামার কাছে। কারণ হল নুক্টির ভাইরাল ফিভার হয়েছে। এই মামাতো বোনটি কে ভারী ভালবাসে অঞ্জন। বয়েসে তার থেকে বছর আস্টেকের ছোট নুক্টি ! ফিজিওলজি তে বর্তমানে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করছে ক্যালকাটা ইউনিভারসিটি থেকে। প্যারিমোহন স্ট্রিটে কোন একটা পিজি তে এক বান্ধবীর সাথে ঘর শেয়ার করে থাকে নুক্টি। ওর ভালো নামটা খালি বারবার ভুলে যায় অঞ্জন তাই ওর বাবার দেওয়া ডাকনামেই ডাকে তাকে ! এখন অসুস্থ বলে ছোটমামা ওকে বাড়ি নিয়ে গেছে। ও এখানে থাকলে ফি রবিবার মাঝে মাঝেই পিসির বাড়ি একবার করে ঢুঁ মেরে যায়। রবিবার অঞ্জনের অফ ডে থাকে বলে তার মামাতো বোনটি কে সঙ্গ দেয় সে ! 

  • অনি ই ই ই ই ই ! অনি ! আরে এই হারামি অনামুখো?

চমকে উঠলো অঞ্জন ! আজ তো শনিবার। আজ তো শ্রীয়ার আসার কথা না। ও তো শুনেছিল শ্রীয়া নাকি উদয়পুর যাচ্ছে কোন কাজে। তো এখন কোথা থেকে এল???? ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে নেমে জানলা দিয়ে চোখ বাড়াল সে। ওমা !! শ্রীয়া ই তো ! একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে নিচে নেমে এল সে। 

  • “কিরে শালা ! তুই এখন??? তোর না অফিসের কাজে উদয়পুর যাবার কথা,” ?

  • “যাবার কথা ছিল পাঁচদিন আগে। গিয়ে ফিরেও এসেছি। মাইরি বলছি ভাই “ অনেক দিন খাসির চর্বি দিয়ে ঘুগনি খাইনি ! চ না শ্যামল দার দোকানে”।

  • ফিরেছিস কখন??? 

  • এই তো ২ ঘন্টা আগে। ফিরেই ভাবলাম ঘাসপাতা খেয়ে খেয়ে পেটে সুন্দরবন হয়ে গেছে তাই অনু ডার্লিং এর কাছে গিয়ে মুখ ছাড়িয়ে আসি- ফ্যাক ফ্যাক করে হাসে শ্রীয়া! 

বাইক টা বের করল অঞ্জন, এবং শ্রীয়া কে পেছনে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। ওর বাড়ি থেকে কুমারটুলি ঘাট যেতে বাইকে সময় লাগে ৫ মিনিট। কিন্তু বাগবাজারে জ্যাম থাকলে সেটা ১৫ মিনিট হয়ে যায়। অন্য সময় হলে রাতুল দা ফোন করে খিস্তি মারত কিন্তু আজ শনিবার আর ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম আছে তাই ও জানে রাতুল দা বিশেষ ফোন করবে না, শুধু সময়মত কাজ করে দিলেই হবে। 

  • আস্তে চালা না বাল ! আমার এদিক ওদিক দিয়ে হাওয়া ঢুকছে বে। 

গাড়ির গতি কমিয়ে লুকিং গ্লাসের দিকে তাকাল অঞ্জন হেসে বলল, “ভেতরে কি অন্তরবাস পড়িস নি নাকি শালা” !

অদ্ভুত মানুষের সম্পর্ক। আপনি নিশ্চয় ভাবছেন যে শ্রীয়া অঞ্জনের প্রেমিকা! না একদমই না। অনেক বছর, প্রায় কলেজ জীবন থেকে শ্রীয়া আর অঞ্জন খুব ভালো বন্ধু। সেই যখন সুচন্দন স্যারের ইংলিশ ক্লাসে পড়তে যেত প্রায় তখন থেকে। ওর পাশের কোচিংয়ে সৌম্য স্যারের কাছে অঙ্ক করতে আসত শ্রীয়া। নোটস আদান প্রদান, আহিরিটোলা, কুমারটুলি ঘাটে বসে ফুকফুক করে সিগারেট খাওয়া সঙ্গে শ্যামলদার ঘুগনি, ব্যাস ! এর থেকে বেশি আর কিছু এগোয়নি। আসলে বিদিশা কে পছন্দ করত অঞ্জন, শ্রীয়া জানত বিষয় টা। কিন্তু লালবাজারের ডিসিডিডি র মেয়ে বিদিশা ভালবাসত ওর পাশের পাড়ার এক বখাটে ছেলে রন্টু কে। শ্রীয়ার সাথে কথা বলে চাইলেই ভাংচি দিতে পারত অঞ্জন। কিন্তু ভিতু টাইপের আর শান্তিপ্রিয় অঞ্জনের পছন্দ হয়নি সেসব।     

ইতিমধ্যেই অঞ্জনের বাইক বাঁক নিলো বাগবাজার ক্রসিং এর দিকে। এদিক দিয়ে রাস্তা সরু হলেও কুমারটুলি ঘাটে সহজে পৌছনো যায়। রাস্তার বামপাশে বেশ কিছু স্থায়ী অস্থায়ী দোকান, বেশিরভাগই খাবারের আর ডানপাশে বয়ে যাচ্ছে সেই আদি প্রবাহিনী ! বাগবাজারের দিকের ঘাট টা বেশ সুন্দর বাঁধানো তাই এখানে কাপল দের ভিড় ছুটির দিনে বেশ ভালই লক্ষ্য করা যায়। তারপরেই কুমোরটুলি ঘাট আর এই ঘাট ই সবচেয়ে প্রিয় অঞ্জনের। মাঝে মাঝেই রাতুল দার সাথে এই ঘাটে আসে অঞ্জন। বসে বসে গঙ্গা দেখে। কখনও ঘুগনি খায় কখনও চা খায় এবং আড্ডা মারে। এই সময় ঘাটে বেশ কিছু কপোত-কপোতী কে বসে থাকতে দেখা যায়, কেউ আবার কন্টেট ক্রিয়েটর। তারা ফেসবুকে রিল বানায় আর পাশের লোকগুলো কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে যেন কোন এলিয়েন দেখছে। 

সেসব দিকে মন নেই শ্রীয়ার। ও জানে শুধু খেতে, আর ছবি তুলতে। ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করে কোন একটা প্রোডাকশন হাউসে আর অবসর সময়ে পাখির ছবি তুলে বেড়ায়। এই রিসেন্টলি সেই সংক্রান্ত কোন কাজে গেছিল উদয়পুর। 

হঠাৎ করেই ব্রেক মারল অঞ্জন। কে যেন একটা রাস্তা পার হতে গিয়ে তার বাইকের সামনে এসে হাতে তালি বাজাল। মুখ টা তুলে দেখল “ শ্রীয়া’’ !!!!!!  

মরার আগে কোন মুরগীকে দেখেছেন আপনি? এই ধরুন ফি রোববার জগার দোকানে যখন মাংস কিনতে যান? দেখবেন কসাই একটা মুরগি কে যখন ধরে কোপায় তখন খাঁচার ভেতরে থাকা বাকি মুরগী গুলো কিরকম একটা করুণ অথচ ভয়ের চোখে তাকায় সামনের দিকে। অঞ্জনের মুখের দিকে তাকালে খানিকটা পরে বুঝতে পারতেন অনেকটা অমন ই দেখতে লাগছে! বাইকের আক্সিলেটরের উপরে তার আর কোন কন্ট্রোল নেই। তীব্রবেগে একটা টেম্পো কানের কাছে সাঁ সাঁ করতে করতে হর্ন মেরে চলে গেল । অঞ্জন শুনতে পাচ্ছে তার পিছনে একজন ফিসফিস করে বলছে “ নে অঞ্জন টেম্পো টাকে ঠুকে দে, ঠুকে দে” - কিন্তু না অঞ্জন ঠুকতে পারে না, কিন্তু সে দুম করে এড়িয়ে যেতেও পারে না। কয়েক সেকেন্ড সব চুপচাপ!  

  • অনু ! আরে এই মাংমারানি ! 

অঞ্জনের সম্বিৎ ফেরে শ্রীয়ার ডাকে ! 

  • হ্যাঁ ! 

  • আমি প্রায় তিন মিনিট ধরে তোর সাথে কথা বলে যাচ্ছি আর তুই হাঁ করে গঙ্গার দিকে কি দেখছিস শালা ?

  • আমি ! গঙ্গার ঘাট ! মানে ?

  • আরে এই ত ! তোকে ঘাটে বসিয়ে শ্যামলদার দোকানে গেলাম ঘুগনী আনতে। এসে দেখলাম একা একা কার সাথে ব্যারব্যার করে যাচ্ছিস। বাচ্চাবেলায় ত নাটক করতিস তা আমি ভাবলাম হয়ত পার্ট মুখস্ত করছিস। তাই কিছু বলিনি। তোকে আমার উদয়পুর ট্যুর নিয়ে বলছিলাম আর তার মাঝখানেই তুই কেমন বোমভোলা হয়ে বসে গেলি। কি হয়েছে ভাই তোর?  

উত্তর দিতে পারেনা অঞ্জন। কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করে সে, কিন্তু মাথার দুপাশ টা একটু টনটন করে ওঠে! 

  • যাই বলিস ভাই, এই হাল্কা সন্ধ্যের সময় ঘাটে কিন্তু বেশ ভালো স্যাম্পেল পাওয়া যায় ! 

  • তুই কি স্যাম্পেল দেখাতে নিয়ে এলি আমায়? 

  • হেঁহেঁ। সরাসরি আমি সেটা বলব না। কিন্তু তুই আমায় বল এরকম প্রায় হাফসুল মেরে তিরিশ টা বছর পার করে যদি জীবন থর মরুভুমি হয়ে থাকে তবে বাইরের দু একটা স্যাম্পেল দেখা কি দোষের? 

উত্তর দেয়নি অঞ্জন। দেবার সময় পায়নি। কারণ তার জিন্সের পকেটে রাখা মোবাইল টা টুংটাং করে বাজতে আরম্ভ করেছে। কল স্লাইডার টা অন্যমনস্ক ভাবে ডান দিকে টানতে যাবার আগে বিস্ময়ে তার হাতটা থমকে যায়। একটা আননোন নাম্বার থেকে কলটা এসেছে! ট্রু-কলার এ নাম দেখাচ্ছে- “শ্রীয়াংশি চক্রবর্তী” ! 

হ্যাঁ শ্রীয়ার ভালো নাম “শ্রীয়াংশি চক্রবর্তী”!!!!!!!!


Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.