আগস্টের প্রথম বৃহস্পতিবার। সকাল থেকে বৃষ্টি।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে ভারী, মখমলের পর্দাখানা তিন আঙুলে সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল আরিয়ান তালুকদার। আঠারো ডিগ্রিতে চলা সেন্ট্রাল এসির হিমেল বাতাস তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। ধূসর আকাশ ও কাচ-ধোয়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, একঘেয়েমি কাটানোর জন্য আজ আদর্শ আবহাওয়া।
আইফোন থেকে দ্রুত কটা মেসেজ উড়ে গেল বন্ধুদের কাছে।
“রাফি, ব্রো, গুড স্টাফ আছে? থাকলে নিয়ে আয়।”
“ব্লু লেবেল নিয়ে আয়। চিপ কিছু খাব না।”
“টেল অহনা, ওর বোসটা নিয়ে আসতে। মাইন ইজ ফাকড।”
তিন সেকেন্ড কী যেন ভাবল আরিয়ান। তারপর ওয়াটসঅ্যাপ থেকে বেরিয়ে টেলিগ্রাম খুলল।
“জিনিস আছে?”
কয়েক সেকেন্ড পর রিপ্লাই এল, “আছে। কয়টা লাগব?”
ঘড়িতে সকাল এগারো ছুঁই ছুঁই। নিচতলার সুপরিসর রান্নাঘরে দুজন গৃহকর্মী আদার রস ও গোলমরিচ দিয়ে যত্ন করে গরুর মাংস ম্যারিনেট করছে। আরিয়ান ইতালিয়ান লেদার সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ফুডপ্যান্ডার রাইডার কেন দেরি করছে, তা নিয়ে নিজের ভাগ্য ও থার্ড-ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির গুষ্টি উদ্ধার করছে।
একই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ধানমন্ডি সাতাশ নম্বরে বসে আছে দেলোয়ার। তার পরনের পুরোনো চেক লুঙ্গি হাঁটুর বেশ খানিক ওপরে ফোল্ড করা। টিনের চালের নিচে আধভাঙা রিকশা অপেক্ষমাণ। সস্তা পলিথিন মুড়িয়ে সে খেয়াল করল, কসাইয়ের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া নিরুপায় মুরগির মতো অফিসগামী মধ্যবিত্ত মানুষের দোকানের কার্নিশের নিচে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময়ের জন্যে বৃষ্টি দুনিয়ার সবাইকে সমান করে দিয়েছে। রিকশাওয়ালা এবং স্যুট-টাই পরা এক্সিকিউটিভ, সবাই প্রকৃতির কাছে জিম্মি।
শুরু হলো দরকষাকষি।
“গ্রিন রোড যাইবেন?”
“একশ বিশ।”
“মাথা খারাপ নাকি আপনার? ষাইট টাকার ভাড়া একশ বিশ!”
ভাঙা ইটের ফাঁকে জমে থাকা কাদাপানিতে খুব সাবধানে পানের পিক ফেলল দেলোয়ার। তার চোখেমুখে আদিম, পুঁজিবাদী স্পর্ধা। “তাইলে বৃষ্টি থামা পর্যন্ত ওই চিপায় খাড়ায়া থাকেন, স্যার।” যাত্রী অসহায়ভাবে আকাশের দিকে তাকাল। দেলোয়ার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। আজকের এই দুর্যোগের দিনে সে নিজেই একচেটিয়া বাজার। নিজেই পুঁজিবাদ।
কিলোমিটার দুয়েক দূরে, গ্রিন রোডের নিউ লাইফ হাসপাতালের কাছাকাছি সামিউল হোসেন হাঁটুসমান কালো, দুর্গন্ধযুক্ত জলের ভেতর পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সস্তার বাটা জুতো জোড়া খুলে বগলের নিচে সযতনে গুঁজে রাখা। ফরমাল প্যান্ট গুটিয়ে সে এতই ওপরে তুলেছে যে সেটা রীতিমতো হাফপ্যান্টে পরিণত হয়েছে। ইস্ত্রি করা সাদা অফিস-শার্ট বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে বুকে লেপ্টে আছে, ঠিক তার মধ্যবিত্ত আত্মসম্মানের মতো। হাতে কালো ছাতা, পিছে ল্যাপটপের ব্যাগ। প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগে আছে সাতাশি টাকা।
দেলোয়ার প্যাডেল মেরে ঠিক তার পাশে এসে ব্রেক কষল।
“মামা, কারওয়ান বাজার যাবেন?”
“একশ বিশ।”
“সত্তরে যাবেন?”
“একশ বিশ কইলাম না!”
“আমি রেগুলার এই রোড দিয়াই যাই। সত্তর-আশির বেশি লাগে না।”
“রেগুলার দিনে যান। আজকের রাস্তা দেখতেছেন না?”
“আশি নেন।”
দেলোয়ার সোজা সামনের দিকে তাকাল।
“একশ।”
সামিউলের রাগে শরীর রিমঝিম করে উঠল। ইচ্ছে করল লোকটার গলা চেপে ধরতে। অন্তহীন বৃষ্টি, অপরিকল্পিত ঢাকা, নিজের ভাগ্য, অফিসের ম্যানেজার, সবকিছুর উপর প্রচণ্ড রাগ উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, সিগন্যাল অমান্য করে কালো রঙের একটা চকচকে টয়োটা এসইউভি প্রচণ্ড বেগে জল চিরে বেরিয়ে গেল। চালক গতি কমিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করল না। নোংরা, পচা ময়লা মেশানো এক বাদামি ঢেউ আছড়ে পড়ল সামিউলের গায়ের ওপর। কোমর থেকে কাঁধ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভিজে গেল। সাদা শার্টটা মুহূর্তে পরিণত হলো শহরের নোংরামির ক্যানভাসে।
টয়োটার ভেতরে বসা অহনা রহমান গ্লাসের ভেতর দিয়ে দৃশ্যটা দেখে হালকা আঁতকে উঠল। “ওহ শিট!” তার বান্ধবী পাশে বসে খিলখিল করে হাসল। “কী রে, লোকটারে লিটারেলি গোসল করায়ে দিলি!” “খেয়ালই করি নাই। পুওর গাই! ব্যাক করব নাকি?”
অহনা রিয়ার-ভিউ মিররে তাকাল। সামিউল রাস্তার ওপর স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পেছনের গাড়িগুলো হর্ন দিয়ে রাস্তা ফাটিয়ে ফেলছে। “নাহ, এখন ব্যাক করা ইম্পসিবল। অলরেডি লেট হয়ে যাচ্ছি।” এগারো সেকেন্ডের জন্য অহনার মনের ভেতর একটু সূক্ষ্ম অপরাধবোধ উঁকি দিয়েছিল। ফোন বেজে উঠল। “হ্যালো, ব্রো, কামিং?” অহনা পার্টি ও স্পিকারের চিন্তায় সামিউলকে ভুলে গেল।
সামিউলের পকেটে পলিথিনে মোড়ানো ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভাসছে বসের নাম। সে কাঁপা হাতে রিসিভ করল।
“সামিউল, কোথায় আপনি? এগারোটা বেজে গেছে!”
“স্যার, রাস্তায়... পানি জমে গেছে...”
“দেখুন, সামিউল, বৃষ্টি শুধু আপনার একার জন্য হচ্ছে না। ঢাকা শহরের সবাই অফিসে এসেছে।”
সামিউল চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। রাস্তার ওপারে দেলোয়ার না শোনার ভান করে প্যানেল ঠুকছে।
“অফিসের একটা ডিসিপ্লিন আছে,” ওপাশের যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বলে চলল। “বুঝতে পেরেছেন?”
“জি, স্যার।”
“দশটা মানে দশটা। নেক্সট টাইম থেকে লেট কাউন্ট হবে। কিপ দ্যাট ইন মাইন্ড।”
“জি, স্যার।”
কলটা কেটে গেল।
সামিউল বৃষ্টির ভেতর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল। সে কাঁদতে শুরু করল। বৃষ্টির পানি আগে থেকে তার গাল বেয়ে পড়ছিল, তাই ব্যাপারটা বুঝতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। সে প্রথমে দু’সেকেন্ড অদ্ভুতভাবে হাসল। তারপর আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না, ডুকরে কেঁদে উঠল। মধ্যবিত্তের ইগোর দেয়াল ধসে পড়ল নোংরা জলের রাস্তায়।
দেলোয়ার আড়চোখে তার দিকে তাকাল। লোকটার কান্না দেখে তার কেমন যেন অস্বস্তি হতে লাগল।
“ভাই।”
সামিউল হাতের উল্টো পিঠে নাক টানল। চোখ লাল।
“কী?”
“নব্বই টাকা দিয়েন।”
সামিউল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। দেলোয়ার সিটের দিকে মাথা ঝাঁকাল।
“নব্বই টাকা। আইসা বসেন।”
“আশি।”
দেলোয়ার এবার পাল্টা কড়া দৃষ্টি হানল।
“আজিব মানুষ! রাস্তার মইধ্যে খাড়ায়া কানতেছেন, এর মইধ্যেও দামাদামি ছাড়তে পারলেন না?”
“কানতেছি বইলা আমার পকেটে বাড়তি টাকা ম্যাজিক কইরা ঢুকে নাই।”
সকাল থেকে এই প্রথম দেলোয়ার শব্দ করে হাসল। “ওঠেন। আশি টাকাতেই নামায়া দিমু।”
তারা কারওয়ান বাজারের দিকে রওনা হলো।