আবরাকের যুদ্ধ
আবরাকের যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে, এটি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশার কোনো যুদ্ধ নয়। প্রচলিত ইসলামী ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি হজরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের শুরুর সময়কার, যখন ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর আরব উপদ্বীপে রাজনৈতিক আনুগত্য, গোত্রীয় সম্পর্ক এবং ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিয়ে গভীর সংকট দেখা দেয়। এই সংকটের ধারাবাহিক সংঘর্ষগুলো ইতিহাসে রিদ্দার যুদ্ধ নামে পরিচিত।
মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মদিনায় মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন হজরত আবু বকর (রা.)। কিন্তু আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে মতভেদ দেখা দেয়। কিছু গোত্র মদিনার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থেকে সরে যেতে চেয়েছিল, কিছু গোত্র যাকাত প্রদান বন্ধ করে দেয়, আবার কিছু অঞ্চলে মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদারদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। তবে সব গোত্রের অবস্থান এক ছিল না; তাদের বিরোধের পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয়—বিভিন্ন কারণ কাজ করেছিল।
এই পরিস্থিতিতে আবু বকর (রা.) মদিনার নিরাপত্তা রক্ষা এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রাচীন ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, উসামা ইবনে যায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনী অভিযান শেষে ফিরে আসার পর আবু বকর (রা.) মদিনায় তাঁকে দায়িত্বে রেখে নিজে একটি মুসলিম বাহিনী নিয়ে রাবাযা অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে আবরাক নামক স্থানে বনু আবস, বনু জুবইয়ান এবং বনু কিনানার কয়েকটি দলের সঙ্গে তাঁর বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষই ইতিহাসে আবরাকের যুদ্ধ বা আবরাক অভিযান নামে পরিচিত।
আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গীরা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, তিনি যেন নিজে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে অন্য কাউকে সেনাপতি করে পাঠান। কারণ, মদিনার নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা তখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁর বক্তব্যের মর্ম হলো, তিনি সঙ্গীদের বিপদের মুখে একা রেখে নিরাপদে থাকতে চাননি। এরপর তিনি বাহিনী নিয়ে আবরাকের দিকে এগিয়ে যান। এই ঘটনা তাঁর নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সংকটের সময় নিজে দায়িত্ব গ্রহণের মানসিকতার উদাহরণ হিসেবে পরবর্তী মুসলিম ইতিহাসে আলোচিত হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যের শব্দে বিভিন্ন বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে।
যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ প্রাচীন সূত্রে খুব দীর্ঘ নয়। আত-তাবারি ও ইবনে কাসিরের বর্ণনা অনুসারে, সংঘর্ষে আবু বকর (রা.)-এর বাহিনী প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে। আল-হারিস ও আওফ নামের দুই নেতার পরাজয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরব কবি আল-হুতাইয়াকে বন্দি করা হয়েছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। বনু আবস ও বনু বকরের লোকেরা সেখান থেকে সরে যায়। তবে এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট সৈন্যসংখ্যা, হতাহতের মোট হিসাব কিংবা প্রতিটি সামরিক কৌশল নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
مكتبة أهل البيت
+1
যুদ্ধের পর আবু বকর (রা.) কয়েক দিন আবরাক অঞ্চলে অবস্থান করেন বলে আত-তাবারির ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। সেই বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি আবরাককে মুসলিম বাহিনীর ঘোড়ার চারণভূমি হিসেবে সংরক্ষণ করেন এবং রাবাযার অন্য অংশের ভূমি পশুচারণের জন্য ব্যবহারের ব্যবস্থা করেন। পরে বনু সা'লাবার কিছু লোক সেখানে নিজেদের বসতি পুনঃস্থাপনের দাবি জানালে তাঁদের সঙ্গে ভূমির অধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। এই ঘটনাটি দেখায় যে আবরাকের সংঘর্ষ শুধু সামরিক বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; যুদ্ধের পর ভূমির ব্যবহার, গোত্রীয় অধিকার এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও সামনে এসেছিল। তবে ভূমি-সংক্রান্ত এই সিদ্ধান্তগুলো সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান মূলত ঐতিহাসিক গ্রন্থের বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল।
আবরাকের যুদ্ধে পরাজিত বনু আবস ও বনু জুবইয়ানের লোকেরা পরে তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদের সঙ্গে যোগ দেয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে। তুলাইহা তখন বুজাখা অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন এবং তিনি নবুওয়াতের দাবি করেছিলেন। ফলে আবরাকের সংঘর্ষকে বৃহত্তর রিদ্দার যুদ্ধসমূহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। মদিনার আশপাশে বিদ্রোহী গোত্রগুলোর শক্তি ছত্রভঙ্গ করা এবং পরে অন্যান্য অঞ্চলে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা—এই বৃহত্তর প্রক্রিয়ারই একটি অংশ ছিল এটি।
আবরাকের যুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তাই শুধু একটি সংঘর্ষে বিজয় অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নবগঠিত মুসলিম রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন আবু বকর (রা.) মদিনার নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। আবরাকের সংঘর্ষ সেই প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চার জন্য মনে রাখা জরুরি, এই যুদ্ধের বিবরণ প্রধানত পরবর্তী যুগের মুসলিম ইতিহাসগ্রন্থ থেকে এসেছে; তাই সূত্রে যা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তার বাইরে অতিরিক্ত সংলাপ, সৈন্যসংখ্যা বা নাটকীয় দৃশ্য যোগ করে সেগুলোকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি, তারিখ আল-রুসুল ওয়াল-মুলুক; ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া; আল-দুরার আস-সানিয়্যাহ, “غزو أبي بكر بني عبس وذبيان في الربذة بالأبرق”।