
বারো বছর বয়সে বউ হয়ে রফিকের ঘরে আসে খাদিজা। সংসারের দায়িত্বের শেকল বেঁধে দেওয়া হয় তার ছোট্ট পায়ে।
আলতায় লাল টুকটুকে হওয়া ছোট্ট পা দুটোতে দুনিয়ার ধুলো লাগার জো নেই। জানালার ধারে বসে আকাশ দেখে দিন যায় খাদিজার। স্বামী, সংসারের বাহিরে তার আর কোনো পৃথিবী নাই।
জীবনের পঁচিশটা বছর কেটে যায় পায়ে এই শেকল পরে।
আজ তার দুটো মেয়ে আছে৷ মেয়েদের সে নিজের মত বানাবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে।
স্বামী, সংসারের বাহিরেও তার মেয়েদের নিজের একটা দুনিয়া থাকবে। তার বড় মেয়ে আয়েশা আজ ভার্সিটিতে পড়ে। সংসারের সব বাঁধা অতিক্রান্ত করে মেয়েদের সে স্বাবলম্বী করে তুলছে।
মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়ালেই যেন খাদিজার পায়ের নীচের মাটি শক্ত হয়ে যাবে, এইসব সারাদিন ভাবে সে।
ভাবনাটা মাথা থেকে যাওয়ার আগেই কলিং বেল বেজে ওঠে।
ছোট মেয়ে দরজা খুলতেই হতবুদ্ধি হয়ে যায় তারা। রক্তাক্ত, বিধ্বস্ত অবস্থায় দরজার সামনে নিজের জীবনটাকে হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে তার বড় মেয়ে আয়েশা৷ যে সিড়ি বেয়ে সে হেঁটে এসেছে তাতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পরে আছে।
বুঝতে আর অপেক্ষা থাকে না কি হয়েছে আয়েশার সাথে।
স্থানীয় থানায় ডায়েরী হয়। দোষীদের পরিচয়-ঠিকানাসহ দেওয়া হয়৷ পুলিশেরা টুঁটি ধরে তাদের নিয়ে আসে। খবর ছড়িয়ে পরলে সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও কিছুদিন যাবত খুব হইচই, তোলপার হয়৷
তারপর বছরের পর বছর চলতে থাকে সেই কেস। এদিকে আয়েশার মানুষ্য জীবনের ইতি ঘটে, সমাজের চোখে সে বেঁচে আছে আজ একজন ধর্ষিতা হিসেবে।
আয়েশা ধর্ষণ মামলার আজ পাঁচ বছর ফুর্তি।
ধর্ষকদের দুইজনেরই বিয়ে হয়েছে। কিন্তু আয়েশাকে কেউ বিয়ে করে নি।
আয়েশার ছোট বোন ফাতেমাকে বেশ কয়েকবার দেখতে এসেছিল। একবার তো সোনার চেইন পরিয়েও গেল। এত সুন্দর মেয়ে, রূপে-গুনে একদম ষোল আনা। কিন্তু তারপর যে কি হল বিয়েটা তারা ভেঙ্গে দিল।
কেউ না বললেও আয়েশা জানে, সে যে ধর্ষিতা এই পাপের শাস্তিই ফাতেমা পাচ্ছে।
কোর্ট থেকে একটা নোটিশ এসেছে। আবার কোর্টে যেতে হবে আয়েশাকে, সম্মুখীন হতে হবে আসামী পক্ষের উকিলের কুৎসিত সব প্রশ্নের।
কোর্টে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়ে আয়েশা আয়নায় নিজেকে দেখে। তাকে দেখতে তো মানুষের মতই লাগে, তবে কেন লোকে তাকে দেখে মুখ কুঁচকায় যেন খুব কুৎসিত কিছু দেখে ফেলেছে তারা।
খাদিজা মেয়ের ঘরের দরজায় টোকা দেয়। কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রফিক দরজা ভাঙ্গতে বাধ্য হয়।
খাদিজার কেন যেন হঠাৎ আকাশ দেখতে মন চায়। জানালা দিয়ে নীল আকাশ দেখে সে, নিজেকে ফিরে পায় সেই বারো বছর বয়সে।
বিয়ের দিন পালিয়ে বাড়ির ছাদের উপরে উঠে বসে থাকে খাদিজা। বিয়ে সে করবে না।
খাদিজার মা তাকে বোঝায় এটাই সমাজের নিয়ম, মেয়ে হয়ে জন্মালে নিয়তি ভেবে এইসব কিছুকে মেনে নিতে হবে। সমাজের নিয়ম না মানলে সমাজ তাকে মেনে নেবে না।
ফাতেমার চিৎকারে হুশ হয় খাদিজার। চোখ ঘুরিয়ে ঘরের অন্য প্রান্তে আয়েশার ঝুলন্ত শরীরটা দেখে সে।
এমনটা নয় যে সে জানে না তার মেয়ে মরে গেছে। কিন্তু কেন যেন তার কষ্ট হয় না, চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরে না।
রফিক মেয়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরে বুক ফেঁটে কাঁদতে থাকে আর শরীরটাকে নামানোর চেষ্টা করে।
ফাতেমার হাতে এক টুকরো কাগজ যাতে ছড়িয়ে যাওয়া কলমের কালিতে লেখা,
‘অন্যায়-অপরাধের সাথে আমি লড়েছি কিন্তু সমাজের সাথে আর লড়তে পারলাম না। আমাকে তোমরা ক্ষমা করো।’
খাদিজা নিথর চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। একদিন যে শেকল সমাজ তার পায়ে বেঁধেছিল, সেই শেকলই আজ তার মেয়ের ফাঁসির দড়ি হয়ে ঝুলছে।
এলাকার মানুষ আসে তামাশা দেখতে। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পরে সামাজিক মাধ্যমে।
হাসির একটা আওয়াজের মাঝে ক্ষীণ আওয়াজে ভেসে আসে, ‘ইস! কি ভাল মেয়ে ছিল! এভাবে মরে গেল!’