
পাওলো কোয়েলহোর একখানা কথা আছে জানিস, 'তোমার অনভূতি তোমার। সেটা অন্য কাউকে বলো না। কারন তোমার মত করে সেটা কেউ বোধ করতে পারবে না।'—জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব করে বলে ইশা।
তাহলে বলব না বলছিস? ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে জামিন।
কি?
অনুভূতি!
হ্যাঁ, ওসব বলতে হয় না, বোধ করাতে হয়।
তা কিভাবে করায়?
আবারও কণ্ঠে জ্ঞানী ভাব এনে বলে ইশা, কাজের মাধ্যমে, ব্যবহারের মাধ্যমে, মাঝেমাঝে কথার মাধ্যমেও—
তবে তো বড় সমস্যা হয়ে গেল।
তা কেন?
ভালবাসা দেখাব কিভাবে? কণ্ঠভর্তি বিভ্রান্তি জামিনের।
আমি বলে দেব?
না থাক।
কেন কেন? বলে দেই। আমার জানা আছে তো, কিভাবে ভালবাসা দেখাতে হয়।
ওই যে বললি, 'আমার অনুভূতি আমার'। আমার অনুভূতি তুই কিভাবে দেখাবি?
হিন্দি সিনেমার মত করে। প্রেম হবার সময় নায়িকা আসলে বাতাস বইবে, চুল উড়বে, শাড়ির আচল না হয় ওরনা উড়ে এসে নায়কের চোখে মুখে পরবে—কণ্ঠে সামান্য চঞ্চলতা এনে বলতে থাকে ইশা। চোখগুলো প্রতি শব্দে হেসে ওঠে।
আমিও ভেবেছিলাম ওভাবেই ভালবাসা হয়।
তারপর?
কি তারপর? বিরক্তির সাথে বলে জামিন।
তোর ভালবাসা কিভাবে হল?
বলব বলছিস?
হু হু।
একদিন কথা বলতে বলতে বোধ হল ওর চোখে আমি আলাদা, সবচেয়ে আলাদা। ও আমায় যেভাবে দেখে সেভাবে আর কেউ দেখতে পারে না—জামিনের চোখগুলোতে এক অন্যরকম মায়া এসে জুড়ে বসে। যেন পৃথিবীর সব ভালবাসা এক করে কারো পায়ের কাছে লুটিয়ে দেওয়ার তার জীবনের লক্ষ্য।
মাথায় একটা প্রশ্ন আসল জানিস?
কি?
নায়িকার চুল ছোট হলে হিন্দি সিনেমায় প্রেম দেখায় কিভাবে বল তো?
এই প্রশ্নটা কি এখনই জিজ্ঞেস করতে হল? বিরক্তির সাথে জামিন বলে, আমি জানি না। হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের চুল কখনও ছোট হয় না।
আমার মত ছোট চুলের মেয়েদের প্রেমে কি তবে কেউ পড়ে না?
পড়ে হয়ত৷ তবে ওসব প্রেম খুব সাধারণ হয়। সিনেমার গল্প হতে হলে অসাধারণ হতে হয়।
এই সাধারণ-অসাধারণের মাপকাঠিটা কিভাবে তৈরি হল বল তো?
অনুভূতি দিয়ে। এক ধরনের উত্তেজনামূলক অনুভূতি। যেখানে মানুষ কনফ্লিক্ট দেখতে পছন্দ করে, সাধারণ দুটো মানুষের সুখী জীবন কেউ পয়সা দিয়ে দেখতে চায় না। মানুষ দেখতে চায় গন্ডগোল। যা দেখে তারা নিজেদের সুখী মনে করবে।
তোর কথাগুলো কেমন যেন, একদম বিদ্বেষে ভরা।
ওটা তোর অনুভূতি। আমাকে বলিস না। জামিন একখানা বাজিমাত করে দেওয়ার হাসি দেয়।
মুখ ভেঙ্গিয়ে ইশা বলে, পেয়েছিস একখানা অনুভূতির বুলি। এখন ও লেবু কচলে তিঁতে না করা পর্যন্ত তোর শান্তি হবে না।
জামিন হাসে। বলে, তুই না বললি তোর প্রিয় লেখকের বলা কথা।
তো? ব্যাটা বলেছে ওর ভাল লেগছে। তাই বলে তোর প্রতি শব্দে তা আওরাতে হবে?
কি মুস্কিল! আমি কি করলাম!
আমার এখন রাগ হচ্ছে, ভীষন রাগ।
ইয়ে মানে, ওটাও কিন্তু তোর একবারে নিজস্ব অনুভূতি—আমাকে বলা তোর ঠিক উচিৎ হবে না৷ হাসতে হাসতে জামিন বলে, আমি একদমই তোর মত করে বোধ করতে পারছি না। আমার কিন্তু বেশ শান্তিই বোধ হচ্ছে।
তোর তো সবসময়ই শান্তি বোধ হয়। নাহলে এখন বেহায়ার মত এখানে বসে থাকতে পারতি?
কেন? এখানে বসে থাকার ভেতর হায়া-বেহায়ার কি আছে?
বিষাদ ভরা কণ্ঠে ইশা জিজ্ঞেস করে, আজ কি জানিস?
হাসি থামিয়ে জামিন বলে, জানি বলেই তো এলাম।
আমার বিয়ে খেতে বুঝি? দেখতে আসছে আজ আমায়!
আমার মন বলছে তোর বিয়েটা হবে না। ওরা আজ আসবে না।
এমন কথা কেন বলছিস?
বোধ হচ্ছে। অনভূতি—
হাহ! তুই আর তোর অনুভূতি! যা তো এখন, আমার পার্লারেও যেতে হবে।
আলগা খোপা লাগাস নে কেমন?
খোপা না লাগালে বউ বউ লাগবে নাকি, বোকা! ওদের পছন্দ করতে হবে না আমায়?
অসাধারণ হওয়ার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
হাহা, ভুল বলিস নি। বিয়ের প্রসঙ্গে মেয়েরা কেমন যেন নায়িকা সাজতে চায়।
দ্যা পিলগ্যামেজ
এহ?
যে লাইনটার কথা বলছিলি সেটা এই বইয়ের।
হ্যাঁ, পড়েছিস বুঝি?
কিছুটা, আগ্রহ পাই নি। আমার কেমন গল্প পছন্দ জানিস?
কেমন?
যার শেষটা আমি আগে থেকেই জানব। তাও পড়ব, শেষটা কিভাবে হল তা জানার জন্য।
তুই বড্ড অদ্ভুত! উঠতে উঠতে বলে ইশা।
আমি রাতে আসব। বারান্দায় অপেক্ষা করিস।
পেছনে ফিরে অনিশ্চয়তার সুরে ইশা বলে, পাগল! রাতে আমি রেস্তোরাঁয় থাকব, ছেলের পরিবারের সাথে।
উঁহু তুই থাকবি এই বারান্দায়, আমার অপেক্ষায়। জামিনের কণ্ঠভরা আত্মবিশ্বাস।
একদম যা তা!
কে যেন কাঁদছে— মৃদুকণ্ঠে বলে জামিন।
দেখে আসব? কৌতুহলী কন্ঠে ইশা জিজ্ঞেস করে।
তোর মা—
দেখে আসি কেমন? যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় ইশা।
ও বাড়ির মানুষজন আসছে না।
ইশার পা দুটো যেন থমকে দাঁড়ায়। ফিরে রাগী চোখে বলে, তুই বললেই হল?
জামিন হাসে। বলে, আমি তো বলি নি। ওরা খোঁজ নিতে এসেছিল।
কিসের খোঁজ?
বাহ রে, বিয়ে পড়াবে, খোঁজ নেবে না! এলাকায় খোঁজ নিয়েছিল—তোর ব্যাপারে।
ওহ—ধীরে আবার জামিনের পাশে বসে ইশা। নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তো ওরা সব বলে দিয়েছে?
হ্যাঁ, তবে সব না।
কোনটা বলে নি? ইশার চোখ দুটো জামিনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে উত্তরের আশায়।
জামিন ইশার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে, যেটা তোর আর আমার ছিল—আমাদের অনুভূতি। ওদের পক্ষে তো তা বুঝা সম্ভব ছিল না।
ইশা হাসে। জিজ্ঞেস করে, তুই কি আর যাবি?
ভেবেছিলাম যাব, এখন ভাবছি আর প্রয়োজন নেই। মুচকি হেসে বলে, তোর সাথেই আছি।
ইশার চোখ দুটোতে বিষাদে ভরে ওঠে। কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলে, সেদিনও যদি এভাবেই আমার সাথে থাকতি তবে আজ আমরা একসাথে থাকতাম।
কি মুস্কিল! আমি আগে থেকে কিভাবে জানতাম যে বাসটা আমায় উড়িয়ে দিয়ে যাবে? বিরক্তির সুরে বলে জামিন।
আমি জানতাম জানিস, আমার মন বলছিল খারাপ কিছু হবে—বলি নি, কারন তুই এসব শুনতে পছন্দ করতি না। কণ্ঠভরা আফসোস নিয়ে বলে, আমি যদি তোকে জোর করে হলেও সেদিন আটকাতাম!
তাহলে আজ লোকে তোকে পাগল ভাবত না আর তোর বিয়েটাও হয়ে যেত। হাসতে হাসতে বলে জামিন।
ঠিক বলেছিস। ইশাও হাসে।
তোর বোন ডাকছে।
যেতে মন চাইছে না যে।
যাহ, তোর বদলে ওকে দেখতে আসবে বলেছে।
তাহলে তো যাওয়া প্রয়োজন। আবারও উঠে দাঁড়ায় ইশা।
হ্যাঁ।
পেছনে ফিরে অনুনয়ের চোখে ইশা জিজ্ঞেস করে, তুই চলে যাবি না তো?
নাহ, এখানেই থাকব, তোর অপেক্ষায়।
তাহলে আমি খুশি মনে যেতে পারব। এক গাল হেসে বলে ইশা।
এই জন্যই বোধহয় আমার মনে এত শান্তি বোধ হয়।
মানে?
এই যে আমি জানতাম দিন শেষে তুই আমাকেই খুঁজবি।
আমি জলদি চলে আসব। ইশা পা বাড়ায়।
আয়! মুচকি হাসি দিয়ে বিদায় জানায় জামিন।
খালি বারান্দাটায় গাছগুলো বাতাসে নড়ে ওঠে। যেন কেউ তাদের উপরে খুব আদরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
খানিক বাদে ইশা আবার আসে। খালি বারান্দায় গাছগুলোর সাথে একা একাই কথা বলে। আবারও সবাই তাকে পাগল ভাবে কিন্তু তারা কি আর ওর অনুভূতি বুঝে!
এই জন্যই হয়ত পাওলো কোয়েলহো বলেছিলো, আমাদের অনভূতিগুলো একদমই আমাদের ব্যক্তিগত। সেটা কেউ আর আমাদের মত করে বোধ করতে পারে না।