
কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে হুমায়ূন আহমেদের "বহুব্রীহি" নাটকটি আমরা পরিবারসমেত উপভোগ করতাম।
আমি লক্ষ্য করলাম, এই নাটকটি দেখার পর আমার বাংলা ভাষা সুন্দর করে বলার প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি হয়। নাটকের অভিনেতাদের মত সুন্দর করে কথা বলার চেষ্টাও করতাম।
কোরেন্টাইনের সুবাদে অফুরন্ত বন্ধ পেয়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বেশ কিছু উপন্যাস পড়ি। তার লেখার অপরূপ ভঙ্গি পাঠক হৃদয়ে জায়গা করেই নেয়। কথাবার্তা থেকে শুরু করে লেখার ভেতরও কাব্যিক একটা ভাব চলে আসল।
যদিও এর এক কি দুই বছর আগেই পর পর বেশ কিছু কোরিয়ান, জাপানিজ সিরিজ দেখার কারনে কথার মাঝে দুই-চারটা কোরিয়ান, জাপানিজ শব্দ ব্যবহার করতাম।
লক্ষ্য করে বুঝলাম বিষয়টি আসলে অভ্যাসের। প্রশ্ন আসে এই অভ্যাসটা হয় কেন!
ভেবে মনে হল এই অভ্যাসের মাঝে কিছুটা সৌন্দর্যও লুকানো আছে। উক্ত ভাষা ভাল লাগা এই অভ্যাসের একটি কারন হতে পারে।
এই ভাল লাগা থেকে দৈনন্দিন জীবনের কিছু শব্দের বদলে অন্য ভাষার ব্যবহার শুরু হয়। এভাবেই সামান্য একটা ভাল লাগা আমাদের কঠিন এক ব্যধিতে পরিনত হয়।
ফিলিপ্পা ল্যালির গবেষণা মতে, একজন সাধারণ মানুষ যেকোন কাজকে নিজের অভ্যাসে পরিনত করতে সময় নেয় মাত্র ১৮ দিন। সেখানে নিজেদের মার্তৃভাষার সাথে অন্যান্য ভাষা মিশ্রণের অভ্যাসটা আমাদের না জানি কত বছরের পুরোনো।
সবে কথা বলতে শিখলাম আর শিশুশ্রেণীতে ‘ইংরেজি শব্দের বাংলা অর্থ’ পড়তে যেয়ে জানতে পারলাম, ‘চেয়ার’ আসলে চেয়ার নয় বরং ‘কেদারা’। স্কুলেরও ‘বিদ্যালয়’ নামক একখানা বাংলা শব্দ আছে। কাপটাও নাকি ইংরেজি ভাষার শব্দ, বাংলা এটার ‘পেয়ালা’।
মাঝেমাঝে মনে হয় ‘কেদারায় বসব, এক পেয়ালা চা দাও, বিদ্যালয়ে যাচ্ছি’ এসব কথা শুনতে কতটা বেমানান লাগে। তখনই মনে পরে ফিলিপ্পা ল্যালির কথা, অভ্যাস, সবই অভ্যাস।
আজ যদি আমি ছোট থেকেই কেদারা, পেয়ালা, বিদ্যালয়ের মত বাংলা শব্দের সাথে পরিচিত থাকতাম তাহলে বোধহয় ‘স্কুলে যাচ্ছি, চেয়ারে বসব, এক কাপ চা খাব’—এসব শুনতেই আমার বেশি বেমানান লাগত।
একটা সময় ছিল যখন বাংলা নাটক-সিনেমাতে শুদ্ধ বাংলা বা আঞ্চলিক বাংলার ব্যবহার হত। তখন কোনো চরিত্রকে হাস্যকর বা বিরক্তিকর করতে বিদেশী ভাষার প্রয়োগ হত। যেমন, ভুল-ভাল ইংরেজি বলা কোনো চাকর বা অতিরিক্ত ইংরেজি বলা কোনো দুষ্ঠ চরিত্র।
কিন্তু বিষয়টা যে কখন হাস্যরস থেকে আমাদের নিন্দনীয় সত্যি হয়ে দাড়াল আমরা বুঝতেই পারলাম না। আমাদের অজান্তেই বাংলার মাঝে গোটাকয়েক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার আমাদের কাছে সুন্দর এবং জ্ঞানের প্রতীক হয়ে দাড়াল।
বিষয়টি যেন সকলের নজর এড়িয়েই হল, কেউ বুঝতেই পারল না কিন্তু খাঁটি সোনায় খাদের মিশ্রণ বেড়েই চলল।
অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘ভাষাদূষণ নদী দূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শীর্ষক একটি কলাম লেখেন যা হাইকোর্টের নজরে আসে। ২০১২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষার জন্য হাইকোর্ট থেকে আদেশ আসে।
ঠিক ষাট বছর আগে ফেব্রুয়ারী মাসে ভাষার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, শফিকের মত ভাষা শহীদেরা। তখন তো ভাষার প্রকাশ্য শত্রু ছিল, কিন্তু এখন ঘরের শত্রু বিভীষণের মত ভেতর থেকে তিঁলে তিঁলে ভাষাকে দূষিত করছি আমরাই।
বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষায় হাইকোর্টের আদেশের এই তথ্যটি আমি ‘বাংলা নিউজ ২৪’-এর ২০১২ সালের একখানা লেখা থেকে জানতে পারি। আর হাস্যকর বিষয় হল, এই লেখাতেই অধ্যাপক মনজুরুল ইসলামকে ‘প্রোফেসর’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে।
এতেই বোঝা যায়, লংকা এখন কার দখলে।
বাংলাদেশের বেতার-টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বাংলা, ইংরেজির মিশ্রণ, ভুল উচ্চারণে বাংলা বলা যেন এখন একটি নিত্যদিনকার বিষয়। অনেকদিন যাবত বেতার শোনা হয় না তাই ভাবলাম বর্তমানে বেতারের কি অবস্থা জানা যাক।
বেশির ভাগ চ্যানেলের আরজেদের ভাষায় বেশ পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হল। শুদ্ধ বাংলা, সুন্দর উচ্চারণ। মনে হল হয়ত মিশ্রণের ব্যাপারটা এখন কমেছে।
কিছুক্ষণের ভেতরই ক্যাপিটাল এফএম (৯৪.৮) নামক একটি এফএম এর সন্ধান পেলাম যেখানে একটি গানের অনুষ্ঠান চলছিল। হাতে গোণা পাঁচ মিনিট শুনলাম, এর ভেতর উপস্থাপক এবং অতিথি দুইজন কম করে হলেও পঞ্চাশ-ষাটটি ইংরেজি শব্দের ব্যবহার করেছেন বলেই মনে হল।
এর ভেতর উল্লেখযোগ্য কিছু শব্দ হল, ‘গোল’, ‘গার্লফ্রেন্ড’, ‘সেলিব্রিটি’, ‘লাইফ’, ‘এইম’, ‘ফোকাস’, ‘ইজি’, ‘গিফট’— লিস্টটা এতটুকই থাকুক। একটা প্রশ্ন এসেছেই যায়, বাংলাতেও তো এইসকল শব্দগুলো আছে। লক্ষ্য, প্রেয়সী, কীর্তিবান, জীবন, মনোযোগ, সহজ, উপহার; কোনোটিই কঠিন বা বলতে না পারার মতো কোনো শব্দ নয়। তবে কেন এই মিশ্রণ!
এর তিনটি কারন আমি অনুভব করি। সেগুলো নিম্নরূপ:
- রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে (অফিস, আদালত ইত্যাদি) ইংরেজিকে বাংলার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া
- এক শ্রেণীর মানুষের মনে হয় কথায় কথায় ইংরেজি বললে তাকে পারদর্শী বা জ্ঞানী মনে হবে
- বাংলা ভাষার সৌন্দর্য আমরা পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে পারি নি
কথায় কথায় ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ করে নিজেদের দক্ষ বা জ্ঞানী মনে করা মানুষদের নিয়ে আমার একটি প্রতিবেদনের কথা মনে পরে যাচ্ছে।
২০১৯ সালের আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে দেশের সনামধন্য এক চ্যানেলের সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নেন মার্কিন নাগরিক দেব্রা এফ্রমিশনের।
দেব্রা তার ব্যক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ “বাংলা আমাদের ভালবাসা” এসব বলে কিন্তু বাংলা যখন বলে তখন দেখি অর্ধেকই ইংরেজি।’ উদাহরণ হিসেবে মার্কিন নাগরিক বলেন, ‘আমার ওয়াইফের সাথে ঘুরছি, একটু লেইটে আসছি, আমার ফ্রেন্ডের সাথে একটু রাইস খাব’ বাঙালীদের এই মিশ্র ভাষার ব্যবহারে মার্কিন নাগরিক যথেষ্ট বিব্রতবোধ করেন বলেও জানান। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবি এই শব্দগুলো নাই বাংলায়? আমার খুবই বাজে লাগে। আমি যে দেশেই যাই, সুন্দর করে ওই দেশের ভাষা বলি। আমি ফ্রেঞ্চ যখন বলব তখন ফ্রেঞ্চ বলব, ইংরেজি যখন বলব তখন ইংরেজি বলব। কিন্তু সব খিচুড়ি করে বলব না।’
এমন কি সাক্ষাৎকারের মাঝে সাংবাদিকের ব্যবহার করা কিছু ইংরেজি শব্দকে হাসতে হাসতে শুধরে দেন এই মার্কিন নাগরিক। একজন বাঙালী হিসেবে প্রতিবেদনটি দেখার সময় নিজেরই লজ্জাবোধ হচ্ছিল।
এখন প্রশ্ন আসে, যদি একজন বিদেশী এত সুন্দর করে বাংলা বলতে পারেন তাহলে আমরা বাঙালীরা কেন পারব না! এটা তো আমাদের মায়ের ভাষা।
একটা কারন আমার বেশ যুক্তিযুক্ত মনে হয়। আর তা হল দেশের বিভিন্ন বিষয়ে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজির ব্যবহার, এমন কি চাকরির ক্ষেত্রেও ইংরেজির প্রাধান্য।
অনেকেরই মনে হয় ইংরেজি না জানলে মানুষ জ্ঞানীই না। তাদের বলতে মন চায়, প্রযুক্তিতে বিশ্বের প্রথম দেশ জাপানের অধিকাংশ মানুষ ইংরেজিতে ঠিকমতো দুই লাইন কথাও বলতে পারে না। এর মানে কি তারা জ্ঞানী না?
অভিভাবকদের নজর নেই শিশুদের বাংলার দিকে। ইংরেজি ঠিকঠাক পারলেই তার বাচ্চা সেরা।
কিছুদিন আগে একটি সাত বছরের বাচ্চার শুদ্ধ ব্রিটিশ উচ্চারণে বলা ইংরেজি সোস্যাল মিডিয়াগুলোতে ছড়িয়ে পরে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু ইংরেজি শেষ করে যখন বাংলা বলল তখন মুগ্ধতায় খানিকটা ছিড় ধরল। শুদ্ধ বাংলা তো দূরে থাক, সাধারণ বাংলাও ঠিকঠাকভাবে সে বলতে পারছে না।
আমার মনে হয় না তার বাবা-মায়ের একবারের জন্যও মনে হয়েছে যে ইংরেজির পূর্বে হয়ত মার্তৃভাষা বাংলাটা শুদ্ধ উচ্চারণে তাকে শেখানো উচিৎ। এভাবেই ছোট শিশুদের মনে আমরা ‘বাংলা শেখা এতটা জরুরী নয়’ এই মনোভাবটির জন্ম দিচ্ছি। ফলে আমরা পাচ্ছি এমন এক ভবিষ্যত প্রজন্ম যারা নিজেদের মার্তৃভাষাই জানে না।
নদী থাকতেই যেমন পানির দূষণ রোধ করতে হয়, তেমনি সময় থাকতেই এই ভাষা দূষণ রোধ করা প্রয়োজন। লালন শাহ তো বলেই গেছেন, সময় গেলে সাধন হবে না।