Posts

ভ্রমণ

আহারে জীবন !

August 19, 2025

Rakib Shafqat Reza

Original Author Original post

176
View

এইযে দিন দুনিয়ায় আপনারা ঘুরেন, কখনো কোন কিছুর সামনে দাঁড়ালে পুরাতন স্মৃতিতে শরীর অবশ হয়ে আসে ? চারপাশের আলো জ্বলমলে পৃথিবী কিছু সময়ের জন্যে অবসাদে ডুবে যায় ?

অ-নে-কদিন আগে, আমি ইউরোপের এক ভাষা না জানা দেশে পড়তে গিয়েছিলাম। পড়াশোনা ফ্রি, জীবনে বেঁচে থাকা তো আর না। বাবা হারানো ছেলে, টাকা চেয়ে আকাশের ঠিকানায় পত্র লেখা যায়। উত্তর আসে না। একেবারেই মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ, কিন্তু আমার নানী আমাকে বড় করেছেন তাঁর বুকের ভেতরে খুব যত্নে আগলে রাখা ওমে। আমি যে আদর আর প্রশ্রয়ে বড় হয়েছি, এই পৃথিবীর কেউ তা কল্পনা করতে পারবে না !

কিন্তু একদিন দেখলাম, আমার খাবার এর খুব একটা টাকা নেই। আমাকে পাইপাই করে হিসেব করে বাঁচা লাগে। বংগবাজার থেকে কেনা জাম্পারে আমার শীত মানায় না – আমি বরফে ঢাকা রাতে থরথর করে কাঁপি। শ্যাম্পু কি জিনিস ভুলে গেলাম। টুথপেস্টের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, আজকে দাঁত ব্রাশ না করলে কি হয় ? এলেবেলে মানুষ বলে এসবকে খুব একটা পাত্তা দিতাম না। কিন্তু কেন জানি, খাবারের কষ্টটা ভুলতে পারি না। সেই যে বয়স বাড়লো, আর থামলো কই ?

সে দেশে এই মামুলী, সস্তা খাবারকে বলে Pfannkuchen – মিষ্টি প্যানকেক। নাম উচ্চারনে দাঁত ভাঙলে Crepes বলতে পারেন। ফ্রান্সে তাই বলে। ভেতরে কিছু হুইপড ক্রীম, গোল করে কাঁটা কলা, উপরে মধু বা চকলেট সিরাপ। প্রায় দোকানী স্ট্রবেরীর টুকরো দেয়। অনেকেই আবার চেরি কিংবা Blackberry দিয়ে বিক্রি করে। ইউরোপের পথেঘাটেই পাবেন, আমি মিউনিখের কথা বলছি। আমরা যেমন রাস্তায় আইসক্রিম কিংবা সিঙ্গারা-সমুচা নিয়ে হাটি, এসব দেশে এমন খাবারই সই। লোকে আগ্রহ নিয়েও খায়। খুব সহজে সকালের নাস্তা হিসেবেও চলে। ডেজার্ট হিসেবেও খেতে পারেন, পশ কফির রেস্তোরায় মানুষ সেভাবেই খায়।

মিউনিখের পথেঘাটে হাটছি। দেয়ালে হাত বুলালে ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে। যুগের পর যুগ ঠাই দাঁড়িয়ে থাকা Rathaus-Glockenspiel, Marienplatz কিংবা Maximilianstrasse এর পড়তে পড়তে আমার বেড়ে ওঠার স্মৃতি মিশে আছে। এখন পকেটে টাকার অভাব নেই। কিন্তু Pfannkuchen দেখতে পেয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। একসময় ক্যাফের কাঁচের দেয়াল কিংবা পথের ধারে আড়চোখে মানুষকে কিনে খেতে দেখতাম। আমার পয়সা ছিল না।

আমি ভাবতাম, আহারে – না জানি কি সুখী মানুষ তারা !

আমি মিষ্টি জাতীয় জিনিস তেমন খাই না। বহুদিন পরে Pfannkuchen দেখে কিনলাম, কিন্তু খেতে পারলাম না। আমার চোখ দিয়ে কেন জানি কান্না থামানো যাচ্ছে না। চারপাশ ঝাপসা দেখছি। সূর্য অস্ত যাবার ঢের বাকি, আমার জগতে রাত যেন নেমে এলো আজ সহসা। আজকে আমার পকেটে পয়সার অভাব নাই, কিন্তু একসময় আমি এই মামুলী খাবার কিনতে পারতাম না। আমি দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখতাম আর ভাবতাম আহারে – কি সুখী মানুষই না তারা ! আগুনের দিন শেষ হলে, আমিও একদিন Pfannkuchen কিনে খাবো !

আগুনের দিন শেষ হয়েছে। কিন্তু আজ কিনেও খেতে পারছি না। পোড়া চোখ জুড়ে বর্ষা আসে – এত মানুষের ভীরে আমি থমকে আছি একা।

মিউনিখ শহর যেন আমার জন্যে এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ, আজ রাতে আমার জন্যে আর কোন রূপকথা নেই …

-রাকীবামানিবাস

১৯ই অগাস্ট, ২০২৫

Comments

    Please login to post comment. Login