লোভের আগুন
শহরের নাম রাজনগর। এখানে ছিলেন মানিক সরকার—পৌরসভার চেয়ারম্যান। বয়স মাত্র আটচল্লিশ, কিন্তু গাড়ি-বাড়ি-ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স দেখলে মনে হতো তিনি তিন পুরুষ ধরে লুট চালাচ্ছেন। লোকে বলত, “মানিক সরকার হাত বাড়ালেই টাকা এসে পকেটে ঢোকে।” চতুরদিকে ছিল তার দুর্দান্ত দাপট আর ক্ষমতা।
একবার শহরে মেট্রো রেলের প্রজেক্ট এল। কোটি কোটি টাকার কাজ। মানিক সরকার ঠিকাদারদের ডেকে বললেন, “ত্রিশ শতাংশ আমার। বাকিটা তোমরা নিয়ে কাজ করো। কেউ মুখ খুললে জান কবজা করব।”
ঠিকাদাররা ভয়ে মাথা নাড়ল। কাজ শুরু হল। কিন্তু খরচ কমাতে তারা সস্তার সিমেন্ট, পুরাতন লোহা, নিম্নমানের অন্যান্য দ্রব্যাদি ব্যবহার করল। মানিক সরকার নিজে গিয়ে সব দেখে হাসলেন। তাঁর ভাগের টাকা প্রতি মাসে সুইস ব্যাঙ্কে চলে যেত। তিনি দুবাইয়ে ফ্ল্যাট কিনলেন, লন্ডনে ছেলেকে পড়ানোর জন্য পাঠালেন, স্ত্রীকে হীরের নেকলেস উপহার দিলেন।
মেট্রোর রেলের প্রথম লাইন উদ্বোধন হল। ঝকঝকে ট্রেন, রঙিন লাইট, ভিআইপি-দের ভিড়। মানিক সরকার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, “এই শহর এখন বিশ্বমানের!”
সেইদিন সন্ধ্যায় প্রথম ট্রেন চলা শুরু করলো। ভিড় খুব। হঠাৎ টানেলের মধ্যে একটা প্রচণ্ড শব্দ। দেওয়াল ধসে পড়ল। ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে দুমড়ে-মুচড়ে গেল। মিনিটের মধ্যে শত শত লোক চাপা পড়ল। রক্ত আর চিৎকারে ভরে গেল টানেল।
মানিক সরকার তখনো বাড়িতে পার্টি করছিলেন। টিভি খুলতেই দেখলেন—তাঁর নিজের ছবি আর “দুর্নীতির কারণে মেট্রো দুর্ঘটনা” হেডলাইন। তাঁর ছেলে লন্ডন থেকে ফোন করল, “বাবা, আমার বন্ধুরা আমাকে জিজ্ঞেস করছে, তুমি কি সত্যিই এতটাকা খেয়েছ?”
রাতারাতি সিবিআই এল। মানিক সরকার বাড়িতে তল্লাশি। সুইস ব্যাঙ্কের হিসাব, দুবাইয়ের ফ্ল্যাটের কাগজ, সব বাজেয়াপ্ত। তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। রাস্তায় লোক চিৎকার করছে, “চোর! চোর!” দূর্নীতাবাজ, খুনি ইত্যাদি।
জেলে ঢোকার দিন মানিক সরকার একটা ছোট্ট চিরকুট পেলেন। তাঁর স্ত্রী লিখেছেন: “তোমার হারাম টাকায় কেনা হীরের নেকলেস আমি বিক্রি করে দিয়েছি। ওই টাকায় যে পরিবারগুলো ছেলে-মেয়ে হারিয়েছে, তাদের একটু সাহায্য করব। তোমার সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নাই।”
জেলের ঠান্ডা মেঝেতে শুয়ে মানিক সরকার প্রথমবার বুঝলেন—যে টাকা হারাম, রক্তমাখা, সেই টাকা শেষ পর্যন্ত নিজের সুখ, শান্তি, আত্মীয়-স্বজন সবই কেড়ে নেয়।
রাজনগরের লোকে এখনো বলে, “যে লোভের আগুনে অন্যের ঘর পোড়ায়, শেষে নিজেই সেই আগুনে পুড়ে ধ্বংশ হয়ে যায়।”
শিক্ষাঃ লোভ ধ্বংশের কারণ, হারাম উপর্জনে বরকত নাই, সুখ নাই, শান্তি নাই।