কলকাতায় থাকলে ও প্রদীপ বাবু বরাবর বড্ডো ছাপসা। একদম সাধারণ একটা মানুষ। মানুষটা কে দেখলে কেউ বলবে না উনি একজন শিক্ষক। যেমন সাধারণ চলাফেরা তেমনি সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব সুফল আচরন। সারাজীবন লোকটির দিকে কেউ আঙ্গুল তুলে কথা পর্যন্ত বলেনি। আসলে প্রদীপ বাবু মানুষ টা এতো ভালো,,,,,
তবে উনার ছেলে হিসাবে প্রবাহ ও খারাপ নয়। শুধু ছেলেটার রাগটাই যা একটু বেশি।
আজ একটা বছর হয়ে গিয়েছে প্রদীপ বাবু রিটায়ার্ড করেছেন। এখন ওনার পুরো সময়টাই স্ত্রী এবং একমাত্র ছেলে প্রবাহর সঙ্গে কাটে। প্রবাহ এই বছর মাস্টার্স কমপ্লিট করলো। ইচ্ছা আছে বাবার মতন শিক্ষক হবে। তাই ওর দিনের বেশিরভাগ সময় পড়াশোনা করেই কেটে যায়।
আজ দুপুরে খেতে বসে প্রদীপ বাবু বললেন।
বাবা - বুঝলে গিন্নি, অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম নীচের তলাটা পরে আছে, ওটাকে কোনো একটা কাজে লাগাবো। কিন্তু ভেবেই পাচ্ছিলাম না কিভাবে কাজে লাগাবো।
মা - তা কিছু ভাবলে তুমি।
বাবা - হ্যাঁ আজ বাজারে গিয়ে একজনের সঙ্গে আলাপ হলো। লোকটার বয়স ওই ৪৮ মতো হবে। মনে হয় এখানে নতুন এসেছে ,, আমি ওনার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম তারপর বুঝলাম ভদ্রলোকের চাকরি চলে গিয়েছে তাই ওনাদের থাকার বড্ডো অসুবিধা হচ্ছে। আর এদিক ওদিক সবার কাছে জিজ্ঞেস ও করছিলো এই এলাকায় কোথায় ঘর ভাড়া পাওয়া যায়।
মা - ও তারপর,,,
বাবা - আমি ভেবে দেখলাম সেই যখন আমাদের নিচের তলাটা পরেই আছে কোনো প্রয়োজন হয় না। তাহলে বরং ওখানে ওদের ব্যবস্থা করে দিই।
এতোক্ষণ মাথা নিচু করে খেয়ে গেলে ও এবার প্রবাহ মাথা উঁচু করে ওর বাবার দিকে তাকিয়ে বললো।
প্রবাহ - তা বলে তুমি হঠাৎ করে চেনো না জানো না একজন কে এই বাড়িতে থাকতে বলে দিলে।
বাবা - আরে আমি কি এমনি থাকতে দিচ্ছি। সে মাসের শেষে ভাড়া দেবে ।
প্রবাহ - শোনো বাবা আমাদের তেমন অভাব এখনো আসেনি যে বাড়ি ভাড়ায় সংসার চালাতে হবে। আমাকে আর অন্তত একটা বছর সময় দাও। আমি তো চাকরির চেষ্টা করছি।
মা - বাবু তুই সব কিছুতে এমন চিৎকার চেঁচামেচি করিস কেনো বলতো। তোর বাবা কি তোকে সেই কথা বললো।
বাবা - ছেড়ে দাও গিন্নি ওকে বলে কোনো লাভ নেই ও বুঝবে না।
প্রবাহ - তোমরা আমাকে কেনো বুঝছো না বলোতো ।
বেশ ঠিক আছে যা ভালো মনে হয় করো। শুধু আঁধার কার্ড আর যা যা ডকোমেইন্স আছে সব কিছু আমি একবার ভালো করে দেখে নিতে চাই।
বাবা - আচ্ছা ঠিক আছে তাই হবে।
প্রবাহ খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে নিজের রুমে চলে যায়।
মা - কিগো ওরা তাহলে কবে থেকে থাকবে। নিচের তলাটা যা অপরিষ্কার , সব কিছু তো পরিষ্কার করতে হবে।
বাবা - ও তুমি ভেবো না আমি ভোলাকে বলে দিয়েছি ও কাল এসে সব পরিষ্কার করে দিয়ে যাবে। তারপর পরশু থেকে ওনারা চলে আসবে।
মা - আচ্ছা। বলছি ওনাদের ফ্যামিলিতে কে কে আছে!
বাবা - ওইতো বললো। এক ছেলে এক মেয়ে আর স্বামী স্ত্রী।
মা - বাহ। তাহলে তুমি ওনাদের কে পরশু চলে আসতে বলো।
দেখতে দেখতে দুটো দিন কেটে গেলো। আজ প্রবাহর একটা কাজ পরে যাওয়ায় ও সকাল সকাল বেরিয়ে। অন্যদিকে অলোক বাবুরা চলে এসেছে।
প্রদীপ - আরে অলোক এসো, ভিতরে এসো। আলাপ করিয়ে দিই, এই হলো আমার স্ত্রী সুধা দত্ত।
অলোক বাবু- নমষ্কার বৌদি, দাদা আপনারা না থাকলে আমরা বড্ডো সমস্যায় পরে যেতাম।
প্রদীপ বাবু - ওই সব ছাড়ো আগে আলাপ টা করিয়ে দাও।
অলোক বাবু- হ্যাঁ নিশ্চয়ই। এই হলো আমার স্ত্রী রিমা, এই আমার মেয়ে আর এটা আমার ছেলে।
প্রদীপ বাবু - এবার আমি ওদের সঙ্গে একটু পরিচয় করে নিই। মা,,, কি নাম তোমার।
মেয়েটা একটু হেসে বললো।
রাজন্যা চ্যাটার্জী।
বাহ খুব সুন্দর নাম আর তোমার নাম কি বাবা।
আবির চ্যাটার্জী।
প্রদীপ - বাহ দুজনের নাম খুব সুন্দর। অনেক গল্প হয়েছে এবার ভিতরে চলো তো সবাই তোমরা এতটা এসেছে। হাত মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নেবে।
সুধা - রিমা তুমি আমার থেকে বয়সে ছোট হবে তাই আমি তোমাকে তুমি করে বলছি।
রিমা - হ্যাঁ দিদি নিশ্চয়ই। আমি আপনার বোনের মতন।
সুধা - বলছি যে আজ তো তোমরা সবে এসেছো তাই আজ আর রান্না বান্নার ব্যবস্থা করতে হবে না। আমি সব করে রেখেছি,, আজ একটু গুছিয়ে নাও কাল থেকে বরং রান্না করো।
অলোক বাবু- আপনাদের কে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না। আপনারা আমাদের জন্য যা করছেন, আজকাল নিজেদের লোকের জন্য ও কেউ এতটা করে না।
সুধা - হয়েছে, বাচ্চা গুলোর মুখ একদম শুকিয়ে গিয়েছে। রিমা চলো তো আমরা ভিতরে গিয়ে ওদের জন্য খাবার গোছায় ততক্ষণ তোমরা হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসো।
রিমা - হ্যাঁ দিদি চলুন।
অলোক বাবু- দাদা আপনি বলছিলেন আপনার ছেলে সমস্ত কাগজ পত্র দেখবে বলেছে। আমি সব কিছু কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।
প্রদীপ বাবু - আমার ছেলে একটু বেরিয়েছে। ও আসলে না হয় ওই সব হবে। এখন চলো তো সবাই খেতে চলো।
খাওয়া টেবিলে বসে সকলে টুকটাক কথা বলতে থাকে। প্রদীপ বাবু রাজন্যা কে জিজ্ঞেস করলো।
রাজন্যা মা তুমি কোন ক্লাসে পড়ছো।
রাজি - ভালো জেঠু তুমি চাইলে আমাকে রাজি বলতে পারো। বাবা মা ও আমাকে রাজি বলে ডাকে। আর তুই করে বলো না, শুনতে ভালো লাগে।
প্রদীপ বাবু - কি বললে ভালো জেঠু।
রাজি - হ্যাঁ তুমি খুব ভালো। তাই আমি এবার থেকে তোমাকে ভালো জেঠু বলে ডাকবো।
প্রদীপ বাবু হেসে বললেন।
ঠিক আছে তাহলে আমি ও এবার থেকে তোমায় রাজি বলে ডাকবো। তো বল রাজি মা তুই কোন ক্লাসে পড়ছিস।
রাজি - সামনে আমার মাধ্যমিক।
প্রদীপ বাবু- বাব বা তাহলে তো তোকে খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করতে হবে রে মা।
এরপর নানা রকমের কথা বার্তায় ওদের খাওয়া শেষ হয়। খাওয়া দাওয়া সেরে রাজি পুরো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে ছাদে আসতেই রাজি আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। পুরো ছাদে কতো ফুল গাছ,, আর ঠিক মাঝখানে একটা ছোট লোহার দৌলা রয়েছে। রাজির এই জায়গাটা খুব পছন্দ হলো।
অপরদিকে কাজ মিটিয়ে ফিরতে ফিরতে প্রবাহর বিকেল হয়ে গেলো। বাড়ি ফিরে নীচের তলার দরজা খোলা দেখে ও আর বুঝতে বাকি রইলো না যে ওনারা চলে এসেছে।
প্রবাহ মাথা নিচু করে তারাতারি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিলো, হঠাৎ করে খুব জোরে ধাক্কা খেয়ে একটু থমকে গেলো । মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখলো একটা মেয়ে ওর বুকের উপর মাথা রেখে ওর জামাটা শক্ত করে ধরে আছে।
প্রবাহ - কে,,,
প্রবাহর গলার আওয়াজ শুনে মেয়েটা আস্তে আস্তে ওর দিকে তাকিলো। 😲 রাজি হা করে প্রবাহ কে দেখছে। এতো সুন্দর ছেলে ও আজ পর্যন্ত কোনো দিন দেখেনি। যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি গায়ের রং। মেয়েটা কে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রবাহ পাত্তা না দিয়ে এবার পাশ কাটিয়ে উপরে চলে গেলো।
প্রবাহ - মা,,, মা,,,
মা - কি হয়েছে,,
প্রবাহ - এই মাত্র যে মেয়েটা এসেছিলো ওটা কে।
মা - ওটা তো রাজি,, আমাদের নিচের তলার ভাড়াটে।
প্রবাহ- রাজি না সাজি আমার দেখার দরকার নেই। ভাড়াটে তো এখানে কি করতে এসেছে। নীচে থাকবে,,,
মা - বাবু এ আবার কি কথা দরকার থাকতে পারে না।
এমনিতেই মাত্র ঘুম থেকে উঠে এসেছি।
এখনো চোখে ঘুম ঘুম ভাব।তারউপর পুরো ক্লাসে থমথম ভাব কারণ এবারের ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের প্রি টেস্ট পরীক্ষায় আমাদের পুরো ব্যাচ খারাপ রেজাল্ট করেছে।প্রিন্সিপাল স্যার সেই খ্যাপা খেপেছে।
দু মাস পরই টেস্ট পরীক্ষা।সেই টেনশনও আছে।
আর এই গাধী টা সেই কখন থেকে খোঁচা দিয়েই যাচ্ছে।মানুষ কাউকে ডাকার হলে আস্তে খোঁচা দিয়ে ডাকে কিন্তু না,তমা এমনভাবে খোঁচাবে যে হাত ব্যাথা বানিয়ে ছারবে।
আমি পাশ ফিরে বললাম কি?
প্রবাহ - তোমার ভাড়াটে কে বলো পরের বার থেকে চোখ খুলে হাঁটতে। আমার খিদে পেয়েছে তুমি খাবার বারো।
চলবে,,,,,,,,
78
View