** জেলখানার ডায়েরি **
নাজিম হিকমতের জেলখানার কবিতা আছে;
গ্রামসি-র আছে জেলখানার ডায়েরি
ঘাম-রক্ত সহ কত-শত অকুতোভয় শোষিতের বীরগাঁথা ফুটে আছে, কাগজে কাগজে…
আমার একটা ‘চটি বই’ আছে, “জেলখানার চটি বই।”
তখন আমার একুশ বছর বয়েস, ফুটন্ত রক্ত।
তখন আমার জীবন-দর্শন, “জীবন হল, ভালোবাসা ও যুদ্ধের সমাহার।”
যুদ্ধ করে বেড়াচ্ছি, নাম তার ছাত্র আন্দোলন। কোন দল নেই, একা, সবাই ভাবে অন্য দলের পেরিফেরি অথবা খোচর।
প্রেম করেছি অনেক, কখনো টাকি-র জঙ্গলে অথবা প্লেনে করে উড়ে গিয়ে তামিলনাড়ু-র ছোট্ট গ্রাম ‘ইরোডে’।
জেলখানায় যাওয়া-টা পরিকল্পিত নাকি ডেস্টিনি জানিনা। ‘ফ্রি উইল’ বলে আসলে যে কিছু নেই সেটা আরেকদিন প্রমাণ করবো।
এখন, বিবেকানন্দ-র বাণীতে দাগা বুলিয়ে বলি, “ অভিজ্ঞতা আমাদের একমাত্র শিক্ষক”।
সুতরাং, আমাকে জেলে যেতেই হত, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অথবা এই লেখাটা ভাইরাল হওয়ার জন্য।
হাওড়া সেন্ট্রাল জেলে মাথা নামিয়ে যখন ঢুকছি, মাইরি বলছি, আমার আসল মাথাটা একটুও হেঁট হয়নি। পুলিশ মানেই, ঢ্যামনা অন্তত প্রায় সবাই।
“ যা টাকা আছে দিয়ে দে, এমনি থ্রেট দিতে লাগলো।
আমার সম্বল কেবল একুশ-টি টাকা আর আর্তুর ৱ্যাবো-র একটা কবিতার বই। আমি ইন্টেলেকচুয়াল কি না!
অফিসিয়াল কাজকর্ম, ধমক-ধামক শেষে। ভেতরের মাঠে লাইন দিয়ে দাঁড় করানো হল, কয়েদি-দের।
দেখি, কারো মধ্যেই লজ্জা- ঘৃণা- ভয় এসব ওরা জয় করে ফেলেছে। শুধু একটাই আর্ত প্রচেষ্টা, কি করে, বিড়ি-খৈনি-পুরিয়া…লুকিয়ে নিয়ে ঢুকতে পারে জেলখানায়।
আমাকে সার্চ করে, মেজবাবু সন্দেহ করে বললেন, শরীর পুরো চ্যাট-চ্যাট করছে কেন?
আমি কিছু বললাম না, হাসলাম।
হাসি-কে দুষ্ট লোকেরা ভয় পায়।
জেলখানায় ঢুকে দেখি, আশ্চর্য প্রাণবন্ত সব মানুষ। আমার তো হৃদয় জুড়িয়ে গেল।
নতুন কয়েদি,আন্দাজের তুলনায় বেশি হওয়ায়, খাবারে শর্ট পড়েছে।
রুটি বন্টনের কর্মকান্ডে আমি উচ্ছাসের সাথে নিয়োজিত হয়ে গেলাম।
আমার কাজের নমুনা দেখে, হেড কয়েদি আমায় একটা এক্সট্রা রুটি, আরেকটা এক্সট্রা কম্বল দিলেন।
রাতে ফার্স্ট ক্লাস ঘুম হল। ঘুম থেকে উঠে একটু মনখারাপ হল, যখন জানতে পারলাম, আমার সাত দিনের জেল।
সেদিন চতুর্থী, মানে পুরো পুজোটাই জেলে কাটাতে হবে!
মনখারাপ সেরে গেল, দেওয়ালের পোস্টার দেখে। কয়েদি-দের জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার।
মোমবাতি জ্বালানো, শঙ্খ বাজানো…এইরকম সব।
মনটা আরো খুশী হয়ে গেল, রান্নার কাজের নেমন্তন্ন পেয়ে, মেনু -খিঁচুড়ি আর লাবড়া!
মনটা খুশীর বাবা হয়ে গেল, যখন আমার ডাক পড়লো একটা মহান এবং আমোদের কাজে।
মহিলা সেলে, কিছু জিনিস যাবে, সেগুলো বয়ে নিয়ে যেতে হবে।
ও আল্লাহ! আমার এত ভাগ্য।
মহিলা সেলের দিকে যাত্রাপথে অতিরিক্ত উত্তেজনায়, একটি সদ্য লাগানো গাছকে মাড়িয়ে দিলাম।
আহা:, ছোট গাছ। তুমি ভালো থেকো।
আমার দুষ্কর্মের জন্য কেউ একটা গালি দিল, আমিও উল্টে আরেকটা গালি দিলাম।
পুরোপুরি নিজের দুনিয়া মনে হচ্ছিলো জেলখানাকে।
মহিলা সেলে গিয়ে দেখি, হাঃ রাম! একটি ও কয়েদি নাই। সব শুনশান।
ঘুঘু ডাকা দুপুরে, আমি আবিষ্কার করলাম, একটা লাইব্রেরি। ইতিহাসের পাতায় ‘ জেলখানার লাইব্রেরি’-র একটা বিশাল স্থান আছে।
আমার ধারণা, কো-অপারেশন, নন-কো-অপারেশন
সব দলেরই মাথারা জেল লাইব্রেরি-র বই পড়েই আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। নাহলে, বাইরে বেরিয়ে আর সময় কোথা, শুধু কাজ আর কাজ।
আমি লাইব্রেরিয়ান-কে বই নেওয়ার আবেদন জানালাম।
তিনি বললেন, তোর সেলের প্রধান কয়েদির অনুমতি পত্র চাই।
আমি খুব সাহস করে, একদম সামনের সারিতে বসা, হেড কয়েদির কাছে গেলাম। উনি মন দিয়ে, গম্ভীর মুখে টি. ভি দেখছিলেন।
আমি বললাম, দাদা
দাদা বললে, উম
আমি খুব দ্রুত এক নিঃশ্বাসে বললাম, আমি জেলের লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে এসে পড়তে চাই, তার জন্য আপনার অনুমতিপত্র লাগবে।
দাদা, হঠাৎ কেমন একটা হয়ে গেল, আমি ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ছিলাম, উনি ছিলেন বসে। উনি হঠাৎ, হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কতদিনের জেল হয়েছে ভাই?
আমি বললাম, সাত দিন।
উনি বললেন, আমার সাত বছর।
মাত্র সাতটা দিনের অতিথি তুমি, আমাদের সাথে আলাপ-পরিচয় হোক, আড্ডা-দারু এসব হোক, তারপর বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করবে, হ্যাঁ বাছা!
এক বোকাচোদা আবার বললে, দেওয়ালে-দেওয়ালে ইংরিজি, বাংলায় কত কি লেখা আছে, ওসব পড়তে পড়তেই তো সাত দিন কেটে যাবে।
সিমুই বলে একটা ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হল, অল্পবয়েস, গরীব, পকেট কাটতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
সে বলল, দাদা, আমার মা জামিন দিয়ে আমাকে আনতে এসেছিল, আমি মা-কে না বলে দিয়েছি।
এখানে জব্বর সুখ তো দাদা। ক্যারাম বোর্ড-ও আছে শুনলাম। সন্ধ্যায় ক্যারাম খেলবো, হ্যাঁ!
বিকেল ম্লান করে সন্ধ্যা নামছে। এবার আমাদের আবার লকাপে ঢুকে যেতে হবে। লক-আপ আর মাঠ এই আমাদের জীবনবৃত্ত।
আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে লকাপে ঢুকতে যাচ্ছি, হঠাৎ ঘোষণা শোনা গেল, পার্থ বসু, কে আছো, অফিসে এসো, তোমার মা বাবা তোমায় ছাড়িয়ে নিতে এসেছে…
ফেরার সময়, ব্যাগ ফেরত নিতে গিয়ে দেখি। একুশ টাকা হাওয়া তবে কবিতার বইটা আছে…
পুনর্লিখন: আচ্ছা, আমি কি কারণে জেলে যেতে পারি, বলে আপনাদের মনে হয়? সুধী, পাঠক বৃন্দ।