Posts

গল্প

প্রেতপুরীর অভিশাপ

December 15, 2025

Israt Jahan

Original Author Israt Jahan

Translated by Zara

76
View

বিক্রমপুর জেলার একদম শেষ প্রান্তে, ধলেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে 'মালঞ্চ নিবাস'। প্রায় দুশো বছরের পুরোনো এই অট্টালিকাটি একসময় ছিল এলাকার জমিদার, রায়বাহাদুর দেবেন্দ্রনারায়ণ সেনগুপ্তের বাসভবন। বিশাল আকারের এই বাড়িটির দেয়াল জুড়ে এখন ইতিহাস আর রহস্যের জীর্ণ ছাপ। দিনের আলোতেও বাড়িটার দিকে তাকালে কেমন যেন একটা গা ছমছমে ভাব আসে। আর রাতের বেলায়? স্থানীয়রা কেউ সেদিকে ভুল করেও পা বাড়ায় না। তাদের মতে, বাড়িটা অভিশপ্ত – এখানে নাকি প্রেতাত্মাদের বাস

রায়বাহাদুরের শেষ রাত

কথিত আছে, ১৮৮৫ সালের এক ঘন বর্ষার রাতে রায়বাহাদুর দেবেন্দ্রনারায়ণ তাঁর শয়নকক্ষে অত্যন্ত রহস্যময় পরিস্থিতিতে মারা যান। তাঁর শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল না, কিন্তু মুখটা ছিল বিকৃত, যেন চরম আতঙ্কে তাঁর শেষ নিশ্বাস পড়েছে। ডাক্তাররা কারণ খুঁজে পাননি, কিন্তু একটা জিনিস সবাই লক্ষ্য করেছিল: সে রাতে বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে যে বিশাল শিউলি গাছটি ছিল, সেটি নাকি বিনা কারণে মাঝরাত থেকেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকেই মালঞ্চ নিবাসে শুরু হয় অলৌকিক কার্যকলাপ।

প্রথমে রায়বাহাদুরের পোষা কুকুরটি হঠাৎ মাঝরাতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠত এবং বারান্দার দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করত। এরপর আসে তাঁর স্ত্রী, সৌদামিনী দেবীর অসুস্থতা। তিনি প্রায়ই বলতেন, তাঁর ঘরে কেউ একজন ঘুরে বেড়ায়, যার পা নেই, শুধু একটা হিমশীতল হাওয়ার স্পর্শ তিনি অনুভব করতে পারেন। ধীরে ধীরে মালঞ্চ নিবাসের ঘরগুলো থেকে অদ্ভুত শব্দ আসতে শুরু করে—কারও চাপা কান্নার আওয়াজ, কারও ভারী পায়ের হাঁটার শব্দ, আবার কখনও রাতের আঁধারে বেসুরের নূপুরের নিক্কণ।

অভিশাপের বিস্তার

দেবেন্দ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র ছেলে, রণজিৎ, বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে যান। তিনি নাকি প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখতেন যে, তাঁর বাবা তাঁকে ডাকছেন, আর সেই ডাকের স্বর ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে একসময় শুধু ফিসফিসে আওয়াজে পরিণত হয়। রণজিৎ আর তাঁর পরিবার এরপর আর কোনোদিন মালঞ্চ নিবাসে ফিরে আসেননি।

তারপর থেকে বহু বছর ধরে বাড়িটা জনমানবশূন্য। এলাকার কিছু সাহসী যুবক একবার দিনের বেলায় কৌতূহলবশত বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিল। তারা দেখেছিল, বাড়ির সমস্ত আসবাবপত্র যেন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছে, আর প্রতিটি দেওয়ালে যেন কিসের নখের আঁচড়ের গভীর দাগ। সবথেকে ভয়ানক ছিল, তারা বাড়ির ভাঁড়ার ঘরের মেঝেতে একগাদা পুরোনো দিনের মুদ্রা আর সোনার গয়নার পাশে একটি শিশুর পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছিল। অথচ আশেপাশে কোনো শিশু ছিল না।

অরুণিমা ও প্রাচীন পুঁথি

২০১৫ সালের কথা। অরুণিমা একজন প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেটর এবং লোকসংস্কৃতি গবেষক। তিনি ভৌতিক ঘটনার সত্যাসত্য উদঘাটন করতে ভালোবাসেন। তিনি বহু পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে জানতে পারেন, রায়বাহাদুরের মৃত্যুর রহস্যটি আসলে তাঁর সম্পত্তির লোভের সঙ্গে যুক্ত। দেবেন্দ্রনারায়ণ নাকি তাঁর বাবার থেকে পাওয়া একটি প্রাচীন পুঁথির মাধ্যমে কোনো এক গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই গুপ্তধন ছিল দেবতার অভিশাপে ভরা

অরুণিমা তাঁর এক বন্ধু, জয়ন্তকে নিয়ে এক অমাবস্যার রাতে মালঞ্চ নিবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয়রা তাদের শতবার বারণ করেছিল, কিন্তু অরুণিমা নাছোড়বান্দা।

সে রাতে যখন তারা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন বাইরের পরিবেশ ছিল থমথমে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। টর্চের আলোয় তারা দেখতে পান, বাড়ির ভেতরে এক ধরণের ধোঁয়াশা ভরে আছে, যেন বাতাস ভারী হয়ে আছে কোনো এক অজানা শক্তির উপস্থিতিতে

তারা সোজা চলে যান রায়বাহাদুরের লাইব্রেরি ঘরে। ঘরটি ছিল অন্য ঘরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ঠান্ডা। এখানে এসে অরুণিমা আবিষ্কার করেন, বইয়ের তাকে একটা ফাঁকা জায়গা। তিনি সেটা থেকে একটা চামড়ার মলাটের পুরোনো পুঁথি বের করেন। পুঁথিটা খুলতেই জয়ন্ত এবং অরুণিমা দুজনেই তীব্র সালফারের গন্ধ এবং একটা অন্ধকার, শীতল দমকা হাওয়ার ঝাপটা অনুভব করেন।

প্রেতের মুখোমুখি

অরুণিমা সেই পুঁথির ভাষা কোনোমতে বুঝতে পারেন। সেখানে লেখা আছে যে, রায়বাহাদুর লোভের বশে একটি বিশেষ গুপ্ত কুঠুরি খুলেছিলেন। কুঠুরিটি রক্ষা করত এক অশুভ শক্তি, যেটি আসলে প্রাচীনকালের এক নির্যাতিত শিশুর প্রেতাত্মা। রায়বাহাদুর সেই প্রেতাত্মাকে মুক্তি দেওয়ার শর্ত পূরণ না করে শুধু সম্পদ হস্তগত করেছিলেন। ফলে, সেই প্রেতাত্মা প্রতিশোধ নিতে রায়বাহাদুরকে চরম ভয় দেখিয়ে মেরে ফেলে।

অরুণিমা যখন এই কথাগুলো পড়ছিলেন, ঠিক তখনই লাইব্রেরির কোণ থেকে একটি অশরীরী ছায়া দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। ছায়াটির চোখ যেন অন্ধকারে জ্বলছিল। জয়ন্ত আতঙ্কে টর্চ ফেলে দেন। অরুণিমা বুঝতে পারেন, এই সেই প্রেতাত্মা!

তিনি কোনোমতে পুঁথিতে লেখা মুক্তির মন্ত্রটি জোরে জোরে আওড়াতে শুরু করেন। মন্ত্র পাঠ শুরু হতেই ঘরজুড়ে শুরু হয় এক তীব্র কম্পন। কাঁচের জিনিসপত্র ভেঙে চুরমার হতে থাকে। সেই ছায়াটি যেন তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে। তাদের মনে হলো যেন কেউ তাদের দম বন্ধ করে দিচ্ছে।

মন্ত্রের শেষ শব্দটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই সেই শীতল ছায়াটি একটি আলোর বিন্দুর মতো হয়ে পুঁথিটির ভেতরে মিলিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের বাতাস হালকা হয়ে যায়, আর অদ্ভুত গন্ধটা দূর হয়ে যায়।

উপসংহার

পরের দিন সকালে অরুণিমা এবং জয়ন্ত যখন মালঞ্চ নিবাস থেকে বের হন, তখন তাঁদের শরীর অবসন্ন, কিন্তু মন শান্ত। তারা পুঁথিটিকে স্থানীয় এক মন্দিরে সুরক্ষিতভাবে রেখে আসেন। এর কিছুদিন পর, মালঞ্চ নিবাসে আর কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটেনি। অনাদৃত এই লিটি অভিশাপমুক্ত হয়, যদিও আজও কেউ সাহস করে সেখানে রাত কাটাতে যায় না। তবে একটা জিনিস পাল্টেছিল - সেই শুকিয়ে যাওয়া শিউলি গাছটিতে নাকি পরের বছর থেকেই আবার নতুন করে কচি পাতা গজাতে শুরু করেছিল, যেন প্রকৃতিও তার দীর্ঘদিনের বোঝা থেকে মুক্তি পেল।

Comments

    Please login to post comment. Login