Posts

উপন্যাস

কুয়াশার ওপারে তুমি

December 15, 2025

Israt Jahan

Original Author Israt Jahan

Translated by Zara

90
View

অচেনা চিঠি

শীতের সকাল। কোলকাতার আকাশ তখনো কুয়াশার চাদরে ঢাকা। ২৮ বছরের অহনা, পেশায় যিনি একজন গ্রাফিক ডিজাইনার, গরম কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। ঠিক তখনই পোস্টম্যান এসে তার হাতে একটি মোটা, হাতে লেখা চিঠি দিয়ে গেল। চিঠিটা দেখে অহনা অবাক হলো। আধুনিক যুগে এমনভাবে কেউ চিঠি লেখে!

খামটা খুলতেই একটা মৃদু সুগন্ধ পেল সে—ওল্ড-ফ্যাশনড চন্দনের গন্ধ। ভেতরে ছিল নিঁখুত ক্যালিগ্রাফিতে লেখা কিছু লাইন:

প্রিয় অহনা,

আমি জানি, তুমি আমাকে চেনো না। কিন্তু আমি গত পাঁচ বছর ধরে তোমাকে দূর থেকে দেখেছি। তোমার হাসি, তোমার গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করার ভঙ্গি, আর রাতের শহরে তোমার একাকী হেঁটে যাওয়া—সবই আমার চেনা। আমি জানি, তুমি জীবনের একঘেয়েমিতে হাঁপিয়ে উঠেছো। তোমার সেই না-বলা কথাগুলো আমি শুনতে পাই। আজ রাতে, ৯টায়, গঙ্গার ধারের সেই পুরোনো কফি শপে এসো। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। এসো, রহস্যের কুয়াশা ভেদ করে আমরা আমাদের গল্প শুরু করি।

—অজ্ঞাত

অহনার শরীরে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। এটা কি শুধুই কোনো ভক্তের পাগলামি? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র? "পাঁচ বছর ধরে দেখছে?" ভাবতেই তার ভয় হলো। কিন্তু একই সঙ্গে এক ধরণের অদম্য কৌতূহল তাকে টানতে শুরু করলো।

পরিচ্ছেদ ২: কফি শপের ছায়া

সঠিক রাত ৯টায়, অহনা নির্দিষ্ট কফি শপটিতে পৌঁছাল। জায়গাটা পুরোনো হলেও খুব ছিমছাম। ভেতরে কাউকেই তার চেনা মনে হলো না। হঠাৎ, এক কোণে বসে থাকা লোকটির দিকে তার চোখ গেল।

লোকটির বয়স ত্রিশের কোঠায়। পরনে একটি কালো জ্যাকেট, আর সে একটা বইয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে চোখ রেখেছে। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত হলো, তার মুখের অর্ধেকাংশ একটা গলায় পেঁচানো কালো মাফলারে ঢাকা, এবং চোখে চশমা থাকার পরেও একটা চাপা রহস্যময়তা তার চেহারাকে ঘিরে রেখেছে।

অহনা সাহস করে তার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। "আপনিই কি আমাকে চিঠিটা লিখেছেন?"

লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখ দুটি ছিল গভীর এবং কিছুটা ক্লান্ত। সে মুচকি হাসল, কিন্তু তার সেই হাসিটা অহনা দেখতে পেল না, শুধু অনুভব করলো।

"বসুন, অহনা," লোকটি বলল। তার কণ্ঠস্বর ছিল নিচু, গভীর এবং ভীষণ পরিচিত—যেন বহু বছর আগে শোনা কোনো সুর। "আমি জানতাম তুমি আসবে।"

"কে আপনি? আর কেন আপনি নিজের পরিচয় গোপন করছেন?" অহনা সরাসরি প্রশ্ন করলো।

"আমার নাম আকাশ," সে জবাব দিল। "আর আমি নিজের পরিচয় গোপন করছি, কারণ আমাদের এই শুরুটা বাইরের জগতের গোলমাল থেকে দূরে রাখা প্রয়োজন।"

আকাশ এরপর অহনার জীবন সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দিতে শুরু করলো, যা শুধু অহনা নিজেই জানত। তার পুরোনো প্রেম ভেঙে যাওয়া, তার ফেলে আসা শৈশবের স্মৃতি, এমনকি তার গোপন ডায়রির একটি নির্দিষ্ট পাতা—সবকিছু। অহনা শিহরিত হলো। এই লোক নিশ্চয়ই একজন স্টকার, অথবা তার জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো পুরোনো স্মৃতি

আকাশ বলল, "আমি শুধু তোমার জীবনকে আরও অর্থপূর্ণ করতে এসেছি, অহনা। তোমার ডিজাইনিংয়ের আসল প্রতিভা তুমি ব্যবহার করছো না। আমি তোমাকে এমন একটা প্রজেক্ট দেব, যা তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করবে।"

পরিচ্ছেদ ৩: কুয়াশার রহস্য

পরের দিন থেকে অহনা আকাশের দেওয়া প্রজেক্টে কাজ শুরু করলো। প্রজেক্টটা ছিল একটা গোপন ডিজাইন—একটি বিখ্যাত শিল্প গ্যালারির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার জন্য দরকারি ব্লুপ্রিন্ট। অহনা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হলেও, আকাশ তাকে বোঝাল যে এটা একটা "আর্ট পারফরম্যান্স", যেখানে তারা গ্যালারির ভেতরে ঢুকে একটি গোপন বার্তা রেখে আসবে।

আকাশের সঙ্গে সময় কাটানোর পর অহনা এক অদ্ভুত বাঁধনে জড়িয়ে গেল। সে আকাশের রহস্যময়তা, তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং তার নীরব মনোযোগে মুগ্ধ হলো। কিন্তু প্রতিবার যখন অহনা তার মাফলার সরাতে চাইত বা তার অতীত জানতে চাইত, আকাশ কৌশলে এড়িয়ে যেত।

একদিন গভীর রাতে কাজ করার সময় অহনা একটা পুরোনো ম্যাগাজিনে একটি ছবি দেখল—ছবিটা ছিল এক বিখ্যাত শিল্পীর, যার নাম ছিল আকাশ রায়। ছবিটার সঙ্গে তার চোখের মিল পেল অহনা, কিন্তু সেই শিল্পী তিন বছর আগে একটি রহস্যময় গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান।

অহনার মাথা ঘুরে গেল। তাহলে তার সামনে বসা এই লোকটি কে? সে কি সত্যিই আকাশ রায়, যে কোনোভাবে বেঁচে ফিরে এসেছে? নাকি সে এমন কেউ, যে মৃত আকাশ রায়ের পরিচয় ব্যবহার করছে?

পরিচ্ছেদ ৪: প্রতিবিম্বের জাল

অহনা এবার সত্য জানার জন্য উঠেপড়ে লাগল। সে গোপনে আকাশের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ঘাঁটতে শুরু করলো। একদিন তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা ছোট্ট চাবির রিং পেল। সেটা ছিল ‘রাইজিং স্টার অ্যাসাইলাম’ নামে একটি মানসিক হাসপাতালের লোগো।

অহনা প্রজেক্টের কাজ শেষ করার ভান করে হাসপাতালের ঠিকানায় গেল। সেখানে পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে সে এক ভয়ঙ্কর সত্য আবিষ্কার করলো।

আসল আকাশ রায় সত্যিই তিন বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু এই যে লোকটি তার সঙ্গে আছে, তার আসল নাম শুভ্রাংশু ব্যানার্জি। শুভ্রাংশু ছিলেন একজন মানসিক রোগী, যিনি বিশ্বাস করতেন যে অহনা তার জীবনের হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা, যাকে সে দুর্ঘটনায় হারিয়েছে। সে অহনার জীবন এবং আসল আকাশ রায়ের জীবনের খুঁটিনাটি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে এই নিখুঁত পরিচয়টি তৈরি করেছে।

আর এই যে ব্লুপ্রিন্ট? এটা কোনো আর্ট পারফরম্যান্স ছিল না। এটা ছিল একটি বিখ্যাত হীরা চুরি করার সম্পূর্ণ পরিকল্পনা, যার জন্য অহনার ডিজাইনিং দক্ষতা ব্যবহার করা হচ্ছিল।

অহনা বুঝতে পারলো, সে এক মায়াজাল এবং মারাত্মক অপরাধের জালে জড়িয়ে পড়েছে।

পরিচ্ছেদ ৫: কুয়াশার ওপারে মুক্তি

সেই রাতে শুভ্রাংশু (আকাশ) যখন অহনাকে নিয়ে গ্যালারির দিকে রওনা হয়, তখন গঙ্গার ধারের রাস্তা ছিল কুয়াশায় ঢাকা। অহনা জানত, এটাই তার শেষ সুযোগ।

গাড়ি চালানোর সময় অহনা হঠাৎ শান্ত গলায় বলল, "আপনার চোখ দুটো আমার ভীষণ চেনা। মনে আছে? সেই রাইজিং স্টার অ্যাসাইলামের বাগানে... আমরা একসঙ্গে কত গল্প করতাম, শুভ্রাংশু।"

নামটা শুনে শুভ্রাংশুর হাত স্টিয়ারিং থেকে কেঁপে উঠল। সে মাফলার খুলে অহনার দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন একই সঙ্গে বিস্ময়, রাগ এবং তীব্র বেদনা

"তুমি... তুমি আমাকে চিনলে কী করে?" তার গলা কাঁপছিল।

"আমি সব জানি, শুভ্রাংশু," অহনা শান্তভাবে বলল। "আপনি আকাশ নন, আপনি শুভ্রাংশু। আর আপনি আমাকে ভালোবাসেন না, আপনি আপনার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি দিয়ে আমাকে তৈরি করতে চেয়েছেন।"

শুভ্রাংশু কিছু বলার আগেই অহনা হঠাৎ গাড়ির ব্রেক চেপে ধরল এবং দ্রুত দরজা খুলে কুয়াশার মধ্যে দৌঁড়ে পালালো। শুভ্রাংশু চিৎকার করে তার নাম ধরে ডাকতে লাগল, কিন্তু অহনা ততক্ষণে কুয়াশার ঘন অন্ধকারে মিশে গেছে।

পুলিশ পরবর্তীতে শুভ্রাংশুকে চুরি এবং মানসিক অসুস্থতার দায়ে ধরেছিল। অহনা বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু সেদিনের সেই রাতের অভিজ্ঞতা তার জীবন চিরতরে পাল্টে দিয়েছিল। 

Comments

    Please login to post comment. Login