Posts

উপন্যাস

হেমন্তের চিঠি আর একটি অচেনা সুর

December 15, 2025

Israt Jahan

Original Author Israt Jahan

Translated by Zara

92
View

পরিচ্ছেদ ১: মেঘলা শহরের প্রথম দেখা

অঙ্কিতা, তেইশ বছর বয়সী এক তরুণী, পেশায় একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। তার লেন্স কেবল দৃশ্য নয়, বরং দৃশ্যের ভেতরের অনুভূতিগুলোকেও ধরতে চাইত। তার কাছে কোলকাতা শহরটা ছিল যেন পুরোনো দিনের একটি ডায়েরি, যার প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো গল্প।

সেদিনের আকাশ ছিল মেঘলা, হালকা শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছিল হেমন্ত। অঙ্কিতা ট্রাম ডিপোর পাশে দাঁড়িয়ে তার ক্যামেরার ফ্রেমে পুরোনো কাঠের বাড়িগুলোর বিষণ্ণতা ধরছিল। তখনই ঘটনাটা ঘটল।

এক হাতে কফির কাপ আর অন্য হাতে একটি পুরোনো বই নিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল এক যুবক। অঙ্কিতা তার ছবি তোলার জন্য ক্যামেরার শাটার চাপার ঠিক আগের মুহূর্তে, যুবকটি হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল। কফির কাপ ছিটকে পড়ল সিমেন্টের রাস্তায়, আর বইটা গিয়ে পড়ল একটা কাদামাখা গর্তে।

অঙ্কিতা দ্রুত এগিয়ে গেল। "আরে! আপনি ঠিক আছেন?"

যুবকটি উঠে দাঁড়িয়ে, কপালটা সামান্য মুছে বলল, "হ্যাঁ, ঠিক আছি। এটা তো নিত্যদিনের ঘটনা, কোলকাতার রাস্তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একটু ব্রেক-আপ আর প্যাচ-আপের মতো।"

তার কথায় একটা মৃদু কৌতুক ছিল। ছেলেটির নাম আর্য। সে একজন লেখক, যে জীবনকে উপন্যাসের মতো দেখতে ভালোবাসে। আর্যর চোখ দুটো ছিল গভীর এবং তার হাসিটা ছিল ভীষণ আন্তরিক।

"আপনার বইটা...," অঙ্কিতা করুণ চোখে কাদা-মাখা বইটার দিকে ইঙ্গিত করলো। সেটা ছিল পাবলো নেরুদার কবিতার পুরোনো সংস্করণ।

"থাক," আর্য হাসল। "বইটার নামই যখন 'টোয়েন্টি লাভ পোয়েমস অ্যান্ড আ ডেস্পারেট সং', তখন একটু কাদা তো লাগবেই। প্রেম কি আর মসৃণ হয়?"

সেদিনের সেই আকস্মিক সাক্ষাতে অঙ্কিতা আর্যর কাছে তার ভিজে যাওয়া বইয়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটা নতুন কফি কিনে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সেই কফি শপের টেবিলে বসে তারা আবিষ্কার করে—অঙ্কিতার ক্যামেরা আর আর্যর কলম, দুজনই আসলে একই জিনিস খোঁজে: জীবনের গভীরতম অনুভূতি

পরিচ্ছেদ ২: পুরোনো অ্যালবামের গল্প

এরপর তাদের দেখা হওয়াটা যেন নিয়তির বাঁধনে বাঁধা পড়ল। দুজনেই সৃষ্টিশীল হওয়ায় তাদের আলাপচারিতা ছিল বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে। আর্য তার লেখায় নিয়ে আসত অঙ্কিতার ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলোর পেছনের না-বলা কথাগুলো।

একদিন, অঙ্কিতা আর্যকে তার পুরোনো ভাড়া বাড়ির ছাদে নিয়ে গেল। সেখানে ছিল একটি পুরোনো মরচে পড়া অ্যালবামের স্তূপ। অ্যালবামের পাতা উল্টাতে উল্টাতে তারা দেখতে পেল অঙ্কিতার শৈশবের ছবি, তার হাসি, তার রাগ, আর তার বাবা-মায়ের সঙ্গে তোলা কিছু ঝাপসা মুহূর্ত।

অঙ্কিতা একটু থেমে বলল, "আমার বাবা-মা, যখন আমি ছোট ছিলাম, তখনই আলাদা হয়ে যান। আর তখন থেকেই আমার জীবনটা যেন দুটো ফ্রেমে ভাগ হয়ে গেছে। আমি কখনও একটার সঙ্গে আরেকটার মিল খুঁজে পাইনি।"

আর্য ধীরে ধীরে তার হাত ধরল। "আমরা প্রত্যেকেই দুটো ফ্রেমে বাঁধা, অঙ্কিতা। একটা যা আমরা সবাইকে দেখাই, আর আরেকটা যা আমরা শুধু নিজের কাছে লুকিয়ে রাখি। আর শিল্পী হিসেবে আমাদের কাজ হলো সেই দুটো ফ্রেমকে এক করে দেওয়া।"

সেই স্পর্শ ছিল নরম, কিন্তু দৃঢ়। সেই মুহূর্ত থেকে তাদের সম্পর্কটি বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের দিকে মোড় নিতে শুরু করল। তাদের প্রেম ছিল অনেকটা নদীর স্রোতের মতো—শান্ত, কিন্তু গভীর আবেগে ভরা। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসাথে হেঁটে যেত, জীবনের দর্শন নিয়ে আলোচনা করত, আর একে অপরের সৃষ্টিশীল কাজের সবচেয়ে বড় সমালোচক হয়ে উঠল।

পরিচ্ছেদ ৩: ভালোবাসার গোপন সুর

আর্যর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। সে সবসময় নিজের পকেটে একটা ছোট টেপ রেকর্ডার রাখত। সে বলত, "পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর সুর হলো না-বলা কথাগুলো, আর আমি সেগুলোকে ধরে রাখতে চাই।"

একদিন আর্য তার লেখা একটি প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করছিল। কবিতাটি ছিল অঙ্কিতাকে নিয়ে, কিন্তু তাতে ছিল একটা বিষাদের সুর। অঙ্কিতা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল, কিন্তু শেষ লাইনে এসে তার মনে একটা খটকা লাগল:

...যদি দূরে চলে যাই, রেখো তবে মনে, এই সুর শুধু তোমার জন্য, এই চির বিচ্ছেদ ক্ষণে।

অঙ্কিতা জিজ্ঞেস করল, "বিচ্ছেদ? কেন এই বিচ্ছেদের কথা লিখলে, আর্য? তুমি কি কোথাও চলে যাচ্ছ?"

আর্য ইতস্তত করল। তার চোখে একটা চাপা কষ্ট খেলা করে গেল। "না, অঙ্কিতা। এটা শুধু কবিতার ভাষা। লেখকদের জীবনে একটু ট্র্যাজেডি না থাকলে পাঠকের কাছে তা পৌঁছায় না।"

অঙ্কিতা সন্তুষ্ট হলো না। সে লক্ষ্য করল, আর্য প্রায়ই তার মোবাইলে এমন কিছু কল পায়, যা সে সবার থেকে লুকিয়ে রাখে। কলগুলো আসত একটি অচেনা নম্বর থেকে, আর কথা বলার সময় আর্যর মুখ হয়ে উঠত ফ্যাকাশে।

অঙ্কিতা জানত, এই ভালোবাসার গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটা অজানা রহস্য, একটা না-বলা সত্য।

পরিচ্ছেদ ৪: অতীত ও বর্তমানের সংঘাত

অঙ্কিতা আর্যর ব্যাপারে আরও জানার চেষ্টা শুরু করল। সে তার পুরোনো বন্ধুমহলে খোঁজ নিল। অবশেষে, তার এক বন্ধুর কাছ থেকে একটি ভয়ঙ্কর তথ্য পেল।

আর্যর আসল নাম আর্য নয়, তার পুরো নাম আর্য সেনগুপ্ত। আর্যর জীবনে এক বছর আগে ঘটেছিল এক মর্মান্তিক ঘটনা। সে ভালোবাসত এক সঙ্গীতশিল্পী মেয়েকে, যার নাম ছিল অরুণিমা। অরুণিমা এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল, সেই দুর্ঘটনার জন্য আর্য নিজেকেই দায়ী করত।

অরুণিমার স্মৃতি আর্যর জীবনে এতটাই গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে, সে একটা ডাবল লাইফ তৈরি করেছিল। সে অঙ্কিতার মধ্যে অরুণিমাকে খুঁজত। অরুণিমা ছিল একজন সেতার বাদক, আর আর্য প্রায়ই সেই অচেনা নম্বর থেকে আসা ফোনকলে অরুণিমার সেতারের সুর শুনতে পেত।

অঙ্কিতা বুঝতে পারল, আর্য তাকে ভালোবাসলেও, সেই ভালোবাসা ছিল অরুণিমার প্রতিচ্ছবিতে ঢাকা। সে ছিল আর্যর নিরাময়ের মাধ্যম, কিন্তু তার প্রেমিকা নয়। এই সত্যটা অঙ্কিতাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিল।

একদিন সন্ধ্যায় যখন তারা গঙ্গার তীরে বসেছিল, অঙ্কিতা আর্যকে জিজ্ঞেস করল, "আর্য, তোমার পকেটে থাকা টেপ রেকর্ডারটা দাও তো। আমি তোমার হৃদয়ের কথা শুনতে চাই।"

আর্য ইতস্তত করল, কিন্তু অঙ্কিতার গভীর চাহনিতে সে বাধ্য হলো রেকর্ডারটি দিতে।

রেকর্ডার চালু হতেই সেখানে বেজে উঠল অরুণিমার সেতারের এক করুণ সুর। আর্যর চোখে জল এসে গেল।

অঙ্কিতা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "আর্য, তুমি আমাকে কেন ভালোবাসো? আমার জন্য? নাকি তোমার হারিয়ে যাওয়া সুরটার জন্য?"

আর্য ভেঙে পড়ল। "আমি... আমি জানি না, অঙ্কিতা। তুমি আমার জীবনে আলো এনেছিলে। তোমার হাসি, তোমার ছবি তোলার ধরন, অরুণিমার মতো... আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি ওর স্মৃতি থেকে বের হতে পারি না।"

পরিচ্ছেদ ৫: ভালোবাসার কঠিন মুক্তি

অঙ্কিতা বুঝল, তাদের ভালোবাসার ভিত্তি ছিল একটি সুন্দর বিভ্রম। সে আর্যকে এভাবে বাঁচতে দিতে পারে না।

"তুমি মুক্ত, আর্য," অঙ্কিতা বলল। "আমার ভালোবাসা তোমার জন্য বাঁধন নয়, মুক্তি হওয়া উচিত। যতক্ষণ তুমি অতীতের ছায়া থেকে বের হতে পারবে না, ততক্ষণ তুমি সত্যি করে কাউকেই ভালোবাসতে পারবে না। আমি তোমার অরুণিমা নই, আর আমি তোমার নিরাময়ের পথ হতেও চাই না।"

সে আর্যর হাত থেকে রেকর্ডারটা নিল এবং নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। "তোমার ভেতরের সেই না-বলা সুরটাকে আজ মুক্তি দিলাম। তুমি যাও, আর্য। আগে নিজেকে ভালোবাসো।"

আর্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অঙ্কিতা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে তার ক্যামেরা আর তার অসমাপ্ত গল্পটা নিয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন গঙ্গার পাড় ধরে হেঁটে চলে গেল।

মাস ছয়েক পর।

অঙ্কিতা তখন দেশের অন্য প্রান্তে একটি পাহাড়ি গ্রামে তার নতুন ছবি প্রদর্শনী নিয়ে ব্যস্ত। সেদিনের সেই বিষণ্ণ হেমন্তের মেঘলা আকাশ আজ অনেক পরিষ্কার। সে এখন বুঝতে পারে, প্রেম হলো সাহস—যা অতীতকে ছেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়।

একদিন এক ক্যাফেতে সে একটা বই দেখল। প্রচ্ছদে লেখা: "হেমন্তের চিঠি: অরুণিমা ও আমার মুক্তি", লেখক: আর্য সেনগুপ্ত।

অঙ্কিতা দ্রুত পাতা উল্টাল। বইটা ছিল আর্যর আত্মজীবনী, যেখানে সে অরুণিমা এবং অঙ্কিতা—দুজনের সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীর সত্য লিখেছিল। বইটি শেষ হয়েছে এই লাইন দিয়ে:

অঙ্কিতা আমাকে দেখিয়েছিল, ভালোবাসা হলো আলোর মতো, যা ছায়া দূর করে, ছায়া তৈরি করে না। আজ আমি নিজেকে ভালোবাসি, আর তাই আমি জানি, একদিন আমি তোমাকে, শুধু তোমাকেই, ভালোবাসব—যখন আমার হৃদয়ে কোনো পুরোনো সুরের প্রতিধ্বনি থাকবে না।

অঙ্কিতা অনুভব করল, আর্য আজ সত্যিই মুক্ত। সে আর্যর জন্য একটা ছোট চিঠি লিখল:

তোমার নতুন গল্পের জন্য অভিনন্দন, আর্য। কুয়াশা কেটে গেছে। এবার আমি তোমার নতুন সুর শোনার জন্য অপেক্ষা করব।—অঙ্কিতা

পরিচ্ছেদ ১: মেঘলা শহরের প্রথম দেখা

অঙ্কিতা, তেইশ বছর বয়সী এক তরুণী, পেশায় একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। তার লেন্স কেবল দৃশ্য নয়, বরং দৃশ্যের ভেতরের অনুভূতিগুলোকেও ধরতে চাইত। তার কাছে কোলকাতা শহরটা ছিল যেন পুরোনো দিনের একটি ডায়েরি, যার প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো গল্প।

সেদিনের আকাশ ছিল মেঘলা, হালকা শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছিল হেমন্ত। অঙ্কিতা ট্রাম ডিপোর পাশে দাঁড়িয়ে তার ক্যামেরার ফ্রেমে পুরোনো কাঠের বাড়িগুলোর বিষণ্ণতা ধরছিল। তখনই ঘটনাটা ঘটল।

এক হাতে কফির কাপ আর অন্য হাতে একটি পুরোনো বই নিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল এক যুবক। অঙ্কিতা তার ছবি তোলার জন্য ক্যামেরার শাটার চাপার ঠিক আগের মুহূর্তে, যুবকটি হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল। কফির কাপ ছিটকে পড়ল সিমেন্টের রাস্তায়, আর বইটা গিয়ে পড়ল একটা কাদামাখা গর্তে।

অঙ্কিতা দ্রুত এগিয়ে গেল। "আরে! আপনি ঠিক আছেন?"

যুবকটি উঠে দাঁড়িয়ে, কপালটা সামান্য মুছে বলল, "হ্যাঁ, ঠিক আছি। এটা তো নিত্যদিনের ঘটনা, কোলকাতার রাস্তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একটু ব্রেক-আপ আর প্যাচ-আপের মতো।"

তার কথায় একটা মৃদু কৌতুক ছিল। ছেলেটির নাম আর্য। সে একজন লেখক, যে জীবনকে উপন্যাসের মতো দেখতে ভালোবাসে। আর্যর চোখ দুটো ছিল গভীর এবং তার হাসিটা ছিল ভীষণ আন্তরিক।

"আপনার বইটা...," অঙ্কিতা করুণ চোখে কাদা-মাখা বইটার দিকে ইঙ্গিত করলো। সেটা ছিল পাবলো নেরুদার কবিতার পুরোনো সংস্করণ।

"থাক," আর্য হাসল। "বইটার নামই যখন 'টোয়েন্টি লাভ পোয়েমস অ্যান্ড আ ডেস্পারেট সং', তখন একটু কাদা তো লাগবেই। প্রেম কি আর মসৃণ হয়?"

সেদিনের সেই আকস্মিক সাক্ষাতে অঙ্কিতা আর্যর কাছে তার ভিজে যাওয়া বইয়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটা নতুন কফি কিনে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সেই কফি শপের টেবিলে বসে তারা আবিষ্কার করে—অঙ্কিতার ক্যামেরা আর আর্যর কলম, দুজনই আসলে একই জিনিস খোঁজে: জীবনের গভীরতম অনুভূতি

পরিচ্ছেদ ২: পুরোনো অ্যালবামের গল্প

এরপর তাদের দেখা হওয়াটা যেন নিয়তির বাঁধনে বাঁধা পড়ল। দুজনেই সৃষ্টিশীল হওয়ায় তাদের আলাপচারিতা ছিল বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে। আর্য তার লেখায় নিয়ে আসত অঙ্কিতার ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলোর পেছনের না-বলা কথাগুলো।

একদিন, অঙ্কিতা আর্যকে তার পুরোনো ভাড়া বাড়ির ছাদে নিয়ে গেল। সেখানে ছিল একটি পুরোনো মরচে পড়া অ্যালবামের স্তূপ। অ্যালবামের পাতা উল্টাতে উল্টাতে তারা দেখতে পেল অঙ্কিতার শৈশবের ছবি, তার হাসি, তার রাগ, আর তার বাবা-মায়ের সঙ্গে তোলা কিছু ঝাপসা মুহূর্ত।

অঙ্কিতা একটু থেমে বলল, "আমার বাবা-মা, যখন আমি ছোট ছিলাম, তখনই আলাদা হয়ে যান। আর তখন থেকেই আমার জীবনটা যেন দুটো ফ্রেমে ভাগ হয়ে গেছে। আমি কখনও একটার সঙ্গে আরেকটার মিল খুঁজে পাইনি।"

আর্য ধীরে ধীরে তার হাত ধরল। "আমরা প্রত্যেকেই দুটো ফ্রেমে বাঁধা, অঙ্কিতা। একটা যা আমরা সবাইকে দেখাই, আর আরেকটা যা আমরা শুধু নিজের কাছে লুকিয়ে রাখি। আর শিল্পী হিসেবে আমাদের কাজ হলো সেই দুটো ফ্রেমকে এক করে দেওয়া।"

সেই স্পর্শ ছিল নরম, কিন্তু দৃঢ়। সেই মুহূর্ত থেকে তাদের সম্পর্কটি বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের দিকে মোড় নিতে শুরু করল। তাদের প্রেম ছিল অনেকটা নদীর স্রোতের মতো—শান্ত, কিন্তু গভীর আবেগে ভরা। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসাথে হেঁটে যেত, জীবনের দর্শন নিয়ে আলোচনা করত, আর একে অপরের সৃষ্টিশীল কাজের সবচেয়ে বড় সমালোচক হয়ে উঠল।

পরিচ্ছেদ ৩: ভালোবাসার গোপন সুর

আর্যর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। সে সবসময় নিজের পকেটে একটা ছোট টেপ রেকর্ডার রাখত। সে বলত, "পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর সুর হলো না-বলা কথাগুলো, আর আমি সেগুলোকে ধরে রাখতে চাই।"

একদিন আর্য তার লেখা একটি প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করছিল। কবিতাটি ছিল অঙ্কিতাকে নিয়ে, কিন্তু তাতে ছিল একটা বিষাদের সুর। অঙ্কিতা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল, কিন্তু শেষ লাইনে এসে তার মনে একটা খটকা লাগল:

...যদি দূরে চলে যাই, রেখো তবে মনে, এই সুর শুধু তোমার জন্য, এই চির বিচ্ছেদ ক্ষণে।

অঙ্কিতা জিজ্ঞেস করল, "বিচ্ছেদ? কেন এই বিচ্ছেদের কথা লিখলে, আর্য? তুমি কি কোথাও চলে যাচ্ছ?"

আর্য ইতস্তত করল। তার চোখে একটা চাপা কষ্ট খেলা করে গেল। "না, অঙ্কিতা। এটা শুধু কবিতার ভাষা। লেখকদের জীবনে একটু ট্র্যাজেডি না থাকলে পাঠকের কাছে তা পৌঁছায় না।"

অঙ্কিতা সন্তুষ্ট হলো না। সে লক্ষ্য করল, আর্য প্রায়ই তার মোবাইলে এমন কিছু কল পায়, যা সে সবার থেকে লুকিয়ে রাখে। কলগুলো আসত একটি অচেনা নম্বর থেকে, আর কথা বলার সময় আর্যর মুখ হয়ে উঠত ফ্যাকাশে।

অঙ্কিতা জানত, এই ভালোবাসার গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটা অজানা রহস্য, একটা না-বলা সত্য।

পরিচ্ছেদ ৪: অতীত ও বর্তমানের সংঘাত

অঙ্কিতা আর্যর ব্যাপারে আরও জানার চেষ্টা শুরু করল। সে তার পুরোনো বন্ধুমহলে খোঁজ নিল। অবশেষে, তার এক বন্ধুর কাছ থেকে একটি ভয়ঙ্কর তথ্য পেল।

আর্যর আসল নাম আর্য নয়, তার পুরো নাম আর্য সেনগুপ্ত। আর্যর জীবনে এক বছর আগে ঘটেছিল এক মর্মান্তিক ঘটনা। সে ভালোবাসত এক সঙ্গীতশিল্পী মেয়েকে, যার নাম ছিল অরুণিমা। অরুণিমা এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল, সেই দুর্ঘটনার জন্য আর্য নিজেকেই দায়ী করত।

অরুণিমার স্মৃতি আর্যর জীবনে এতটাই গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে, সে একটা ডাবল লাইফ তৈরি করেছিল। সে অঙ্কিতার মধ্যে অরুণিমাকে খুঁজত। অরুণিমা ছিল একজন সেতার বাদক, আর আর্য প্রায়ই সেই অচেনা নম্বর থেকে আসা ফোনকলে অরুণিমার সেতারের সুর শুনতে পেত।

অঙ্কিতা বুঝতে পারল, আর্য তাকে ভালোবাসলেও, সেই ভালোবাসা ছিল অরুণিমার প্রতিচ্ছবিতে ঢাকা। সে ছিল আর্যর নিরাময়ের মাধ্যম, কিন্তু তার প্রেমিকা নয়। এই সত্যটা অঙ্কিতাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিল।

একদিন সন্ধ্যায় যখন তারা গঙ্গার তীরে বসেছিল, অঙ্কিতা আর্যকে জিজ্ঞেস করল, "আর্য, তোমার পকেটে থাকা টেপ রেকর্ডারটা দাও তো। আমি তোমার হৃদয়ের কথা শুনতে চাই।"

আর্য ইতস্তত করল, কিন্তু অঙ্কিতার গভীর চাহনিতে সে বাধ্য হলো রেকর্ডারটি দিতে।

রেকর্ডার চালু হতেই সেখানে বেজে উঠল অরুণিমার সেতারের এক করুণ সুর। আর্যর চোখে জল এসে গেল।

অঙ্কিতা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "আর্য, তুমি আমাকে কেন ভালোবাসো? আমার জন্য? নাকি তোমার হারিয়ে যাওয়া সুরটার জন্য?"

আর্য ভেঙে পড়ল। "আমি... আমি জানি না, অঙ্কিতা। তুমি আমার জীবনে আলো এনেছিলে। তোমার হাসি, তোমার ছবি তোলার ধরন, অরুণিমার মতো... আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি ওর স্মৃতি থেকে বের হতে পারি না।"

পরিচ্ছেদ ৫: ভালোবাসার কঠিন মুক্তি

অঙ্কিতা বুঝল, তাদের ভালোবাসার ভিত্তি ছিল একটি সুন্দর বিভ্রম। সে আর্যকে এভাবে বাঁচতে দিতে পারে না।

"তুমি মুক্ত, আর্য," অঙ্কিতা বলল। "আমার ভালোবাসা তোমার জন্য বাঁধন নয়, মুক্তি হওয়া উচিত। যতক্ষণ তুমি অতীতের ছায়া থেকে বের হতে পারবে না, ততক্ষণ তুমি সত্যি করে কাউকেই ভালোবাসতে পারবে না। আমি তোমার অরুণিমা নই, আর আমি তোমার নিরাময়ের পথ হতেও চাই না।"

সে আর্যর হাত থেকে রেকর্ডারটা নিল এবং নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। "তোমার ভেতরের সেই না-বলা সুরটাকে আজ মুক্তি দিলাম। তুমি যাও, আর্য। আগে নিজেকে ভালোবাসো।"

আর্য স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অঙ্কিতা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে তার ক্যামেরা আর তার অসমাপ্ত গল্পটা নিয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন গঙ্গার পাড় ধরে হেঁটে চলে গেল।

মাস ছয়েক পর।

অঙ্কিতা তখন দেশের অন্য প্রান্তে একটি পাহাড়ি গ্রামে তার নতুন ছবি প্রদর্শনী নিয়ে ব্যস্ত। সেদিনের সেই বিষণ্ণ হেমন্তের মেঘলা আকাশ আজ অনেক পরিষ্কার। সে এখন বুঝতে পারে, প্রেম হলো সাহস—যা অতীতকে ছেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়।

একদিন এক ক্যাফেতে সে একটা বই দেখল। প্রচ্ছদে লেখা: "হেমন্তের চিঠি: অরুণিমা ও আমার মুক্তি", লেখক: আর্য সেনগুপ্ত।

অঙ্কিতা দ্রুত পাতা উল্টাল। বইটা ছিল আর্যর আত্মজীবনী, যেখানে সে অরুণিমা এবং অঙ্কিতা—দুজনের সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীর সত্য লিখেছিল। বইটি শেষ হয়েছে এই লাইন দিয়ে:

অঙ্কিতা আমাকে দেখিয়েছিল, ভালোবাসা হলো আলোর মতো, যা ছায়া দূর করে, ছায়া তৈরি করে না। আজ আমি নিজেকে ভালোবাসি, আর তাই আমি জানি, একদিন আমি তোমাকে, শুধু তোমাকেই, ভালোবাসব—যখন আমার হৃদয়ে কোনো পুরোনো সুরের প্রতিধ্বনি থাকবে না।

অঙ্কিতা অনুভব করল, আর্য আজ সত্যিই মুক্ত। সে আর্যর জন্য একটা ছোট চিঠি লিখল:

তোমার নতুন গল্পের জন্য অভিনন্দন, আর্য। কুয়াশা কেটে গেছে। এবার আমি তোমার নতুন সুর শোনার জন্য অপেক্ষা করব।—অঙ্কিতা

Comments

    Please login to post comment. Login