Posts

চিন্তা

স্বাধীনতাযুদ্ধ ও আমাদের নৈতিক অবস্থান

December 16, 2025

ফারদিন ফেরদৌস

68
View

যিনি মুক্তিযুদ্ধ মানেন না তার কথা বাদ, কিন্তু যিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের মৌল স্পিরিটের সাথে একাত্ম আজকাল দেখা যাচ্ছে তারাও যুদ্ধকালে ভারতের সহায়তা নিমিষে খারিজ করে দেন। যৌথকমান্ডের কাছে শত্রুসৈন্যদের আত্মসমর্পণ নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। কিন্তু এটা তারা অনুধাবন করে না যে একাত্তরের সেসময় আমাদের দেশে বিশ্বস্বীকৃত কোনো নিয়মিত সামরিক বাহিনী ছিল না। এবং জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশও আমরা তখন হইনি। পাকিস্তানের মতো একটি শক্তিধর দেশের সেনাবাহিনী অগঠিত কোনো বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করত; এটা বাহুল্য ভাবনা।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একাত্তরের বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের যুদ্ধ ছিল একটি liberation war with an allied force, যেখানে ভারতের স্বীকৃত সেনাবাহিনী “belligerent power” হিসেবে যুক্ত হয়।

অপরদিকে ভারত কেন ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন করে, নরেন্দ্র মোদি কেন এটা নিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে মেসেজ দেন; এটা নিয়েও বিরাট প্রশ্ন?

১৯৭১ এর ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ভারতের অমৃতসর, শ্রীনগর, আগ্রা, যোধপুর এরকম ৯টা বিমানঘাঁটিতে আকস্মিক হামলা চালায়। ফলে পাকিস্তানের ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টেও যুদ্ধ শুরু হয়। ওই যুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার সৈন্য হারায় ভারত। বাংলাদেশি কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া, লাখো মুক্তিযোদ্ধাকে অস্ত্রের ট্রেনিং দেয়াসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইস্টার্ন ফ্রন্টের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর সর্বাত্মক সহায়তা দেয়াই ওই যুদ্ধ শুরুর মূল কারণ।

তবে পাকিস্তানের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ তাদেরকে ব্যাকফুটে ফেলে দেয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ এবং ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে ৯১ হাজার ৬৩৪ সদস্য নিয়ে ইস্টার্ন হাই কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেন।

একাত্তরে একই সাথে ইস্টার্ন ফ্রন্ট এবং ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে পাকিস্তান হেরেছিল। ইস্টার্ন ফ্রন্ট আমাদের বাংলাদেশের সব সাথে এবং ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট ইন্ডিয়ার সাথে। এবং ওই ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের জয়টাকেই ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিজেদের বিজয় দিবস বলে উল্লেখ করে।

ইস্টার্ন ফ্রন্টে ভারত তাদের নিজেদের বিজয় দিবস পালন করে না। বরং তৎকালীন ইস্টার্ন ফ্রন্টের হেডকোয়ার্টার কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে বরাবরের মতো ২০২৫ সালেও বাংলাদেশের বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। ফোর্ট উইলিয়ামে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের বিজয় দিবস পালনের বিষয়টি সরকারি সামরিক রেকর্ডেও অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, প্রত্যেক বছরের মতো চলতি বছরেও কলকাতায় যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হলো বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস। মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সেনা সদর দপ্তর ফোর্ট উইলিয়ামে ৫৪তম বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিল বাংলাদেশ থেকে আসা ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছাড়াও আটজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা যোগ দেন।

ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ডের উদ্যোগে কলকাতা বিজয় দুর্গের মঙ্গল পান্ডে মিলিটারি ট্রেনিং এরিয়াতে আয়োজিত বর্ণাঢ্য সামরিক প্রদর্শনীতেও অংশগ্রহণ করে প্রতিনিধি দলটি।

তাহলে বলেন, যাদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাই ভালো লাগে না, মনেপ্রাণে ধ্যানে জ্ঞানে পেছনে ফিরতে চায় -তাদের কাছে আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়া কিংবা প্রতিক্রিয়াহীনতায় কীইবা আসে যায়?

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে স্বীকার করে নিলে একাত্তরের বাস্তব ইতিহাসকে স্বীকার করতে হবে। আর সেই ইতিহাসে ভারতকে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই। আবেগ বা রাজনৈতিক সুবিধার খাতিরে ভারতের ভূমিকা অস্বীকার করলে মুক্তিযুদ্ধের মৌল সত্যই বিকৃত হয়। একাত্তরে বাংলাদেশ ছিল একটি সংগ্রামরত জাতি -স্বীকৃত রাষ্ট্র নয়, নিয়মিত সেনাবাহিনী না থাকার বাস্তবতায় ভারতের সামরিক, কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তা ছিল যুদ্ধের অনিবার্য শর্ত। পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ যৌথ বাহিনীর কাছে হওয়া, পূর্ব ও পশ্চিম -দুই ফ্রন্টেই তাদের পরাজয়, এবং আজও ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডে বাংলাদেশের বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিক সম্মান -সবই সেই ইতিহাসের নথিভুক্ত প্রামাণিক সত্য।

যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনাকেই মনেপ্রাণে ধারণ করেন না, তাদের কাছে ভারতের প্রতিক্রিয়া অর্থহীন মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে মানেন, তাদের জন্য ইতিহাস অস্বীকার নয় -ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নেওয়াই একমাত্র সৎ অবস্থান।

ফুটনোটস: 
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর এক্সবার্তায় ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের ভারতীয় বিজয় দিবস স্মরণের সাথে ইস্টার্ন ফ্রন্টের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়টা যদি উল্লেখ করতেন তবে তাঁর মহত্ত্ব বাড়তই। তিনি এতটুকু খাটো হতেন না এবং আমরাও বিরাগভাজন না হয়ে উষ্মাই প্রকাশ করতাম।

লেখক: সাংবাদিক 
১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
 

Comments

    Please login to post comment. Login